Saturday, October 26, 2024

44>শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের::---'

 

44>শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের::---'
অপরাজেয় কথাশিল্পী;; কথাসাহিত্যিক
জন্ম::-- ১৫ সেপ্টেম্বর ১৮৭৬
দেবানন্দপুর, ব্যান্ডেল, হুগলি জেলা,
মৃত্যু::--জানুয়ারি ১৬, ১৯৩৮ (বয়স ৬১)
কলকাতা,

শরৎচন্দ্রের সন্তানহীন জীবনকে পূর্ণ করেছিল আফিম ভেলু, বেটু, এবং বাঘারা...

নেশা ধরেছিলেন অনেক কম বয়সেই। দুরন্তও ছিলেন সেরকম। পিতা মতিলাল চট্টোপাধ্যায়ের মতো বোহেমিয়ানা ছিল রক্তে। চণ্ডীমণ্ডপের বয়স্ক ব্যক্তি কিংবা স্কুলের পণ্ডিতমশাই রেহাই ছিল না কারোরই। বোঝা যায়, ‘লালু’ বা ‘ইন্দ্রনাথ’-দের অনেক বৈশিষ্ট্য তাঁর নিজের মধ্যেই ছিল। একবার এন্ট্রান্স পরীক্ষার ফি-র টাকা জমা না করে হাঁটা পথে পাড়ি দিলেন পুরীর উদ্দেশ্যে। মেদিনীপুরের বহু জায়গায় তখন কলেরার মড়ক লেগেছে। রাতে আশ্রয় পেলেন না কোথাও। ক্লান্ত, ক্ষত-বিক্ষত পা দুটিকে কোনোরকমে টেনে পৌঁছে গেলেন পুরীতে। কিন্তু কোনো মন্দিরে ঢুকলেন না। বঙ্গোপসাগরের অসীম জলরাশিকে প্রণাম করে হাঁটা লাগালেন বাড়ির দিকে।

ফিরে এসে পেলেন পিতার মৃত্যুসংবাদ। তিনি পরিবারের বড়ো—সমস্ত দায়িত্ব এসে পড়ল তাঁর কাঁধে। গুরুজনরা দিলেন কাজ খোঁজার সুপরামর্শ। সব শুনে, শেষে একটা যাত্রার দলে নাম লেখালেন। বাউন্ডুলে, নেশাখোর, চরিত্রহীন কত বিশেষণই যে জুটল কপালে। কিছুটা আত্মগ্লানি থেকেই রোজগারের আশায় কদিন কলকাতায় থেকে পাড়ি দিলেন ব্রহ্মদেশে (আজকের মায়ানমার)। জীবনের অভিজ্ঞতার ভাঁড়ারে এক নতুন অধ্যায় যুক্ত করল রেঙ্গুনের একাকী দিনগুলি। দেখলেন মানবচরিত্রের বহু রূপ, নিজের জীবনে না হলেও সাক্ষী থাকলেন প্রেমের মহত্ত্বের। শুরু হল ‘শ্রীকান্তের শরৎচন্দ্র’-এর যাত্রাপথ। চাক্ষুষ সাক্ষাৎ ঘটল ‘পথের দাবী’-র সব্যসাচীর সঙ্গেও।

এসবের মধ্যেই সুস্থির হয়েছে জীবন। সাফল্য পেল ‘বড়দিদি’। প্রকাশিত হতে লাগল ‘পরিণীতা’, ‘পল্লীসমাজ’, ‘শ্রীকান্ত’, ‘দেবদাস’, ‘গৃহদাহ’ ইত্যাদি উপন্যাস। সঙ্গে অসংখ্য ছোটোগল্প। শরৎচন্দ্র হয়ে উঠলেন ‘দরদী কথাসাহিত্যিক’। এ প্রসঙ্গে বোধহয় আরো দুজনের কথা বলে নেওয়া মন্দ হবে না। তার মধ্যে একজন হল ‘ভেলু’ কুকুর, আসলে শরৎচন্দ্রের সন্তান। শ্রীহীন এই নেড়ি কুকুরটির মৃত্যুতে প্রবলভাবে ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। আরেকজন হল পোশা টিয়া পাখি ‘বেটু’। যার খ্যাতি ছিল চোর ধরায়। গাছের পেয়ারা আগে সে খাবে, তারপর অধিকার পাবে বাকিরা। অত্যন্ত কাছের মানুষ হয়েও একবার ঠিক সেই ভুলই করে ফেললেন শৈলেশ বিশী। ব্যাস, শরৎচন্দ্র তো রেগে আগুন। তৎক্ষণাৎ আদেশ হল, সমস্ত পেয়ারা বিলিয়ে দিতে হবে পাড়ায়। বহু আদর যত্নে কমানো হল টিয়া পাখির অভিমান।

কিন্তু শরৎচন্দ্রকে শান্ত করা যাচ্ছে না। অগত্যা বসতে হল আফিমের আসরে। গলে জল হয়ে গেল সমস্ত রাগ। অযথা উত্তেজনার জন্য ক্ষমাও চাইলেন। আর তারপরই ঘোষণা করলেন, সাহিত্যিক হতে গেলে আফিম-সেবন অনিবার্য! সে যাত্রায় অবশ্য লেখক হতে পারেননি শৈলেশ বিশী। প্রথম দিন গুরুজনের আশীর্বাদ বলে প্রত্যাখ্যান না করলেও, কদিন পরে অসুস্থ হয়ে পড়েন। কিন্তু ওই পাঁচটা থেকে নটার আড্ডাতেই সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন মানবিক শরৎচন্দ্রের। যাঁর সন্তানহীন জীবনকে পূর্ণ করেছিল ভেলু, বেটু, বাঘারা। যিনি কাশীতে গিয়ে ভোজ খাওয়াতেন কুকুরদের। জাতপাতের ব্যবধানে বিভক্ত সমাজকে সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র একের পর এক প্রশ্নে আহত করতেন। আর হয়তো ব্যক্তিগত জীবনে সুখী হতেন অবলা পশুদের সঙ্গে।

সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন রাজনীতির সঙ্গেও। গান্ধীজির অসহযোগ আন্দোলনে যুক্ত হয়ে চরকা কেটেছেন, আবার পকেটে বেআইনি পিস্তল নিয়েও ঘুরতেন। ভেলু মারা যাওয়ার পর আত্মরক্ষার জন্য নাকি এই ব্যবস্থা। সেই সময়ে বাংলার রাজনীতিতে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশই শেষ কথা। তাঁর স্নেহচ্ছত্রেই নিজেকে গড়ে নিচ্ছেন সুভাষচন্দ্র বসু। তাঁদের পত্রিকা ‘নারায়ণী’-তে নিয়মিত লেখালেখি করতেন শরৎচন্দ্র। একবার সুভাষচন্দ্র ধরলেন তাঁকে, সবাই জেলে যাচ্ছে, এবার তিনিও চলুন সেখানে। এমনিতে আপত্তি ছিল না। কিন্তু সমস্যা যে মৌতাতে। জেলের ভিতর আফিম কীভাবে পাবেন? সুভাষচন্দ্র জানালেন, তিনি ঠিক ব্যবস্থা করে দেবেন। আর তিনি বেরিয়ে এলে কী হবে? সবসময় তো তাঁর সঙ্গ পাবেন না। অনেক ভেবেচিন্তে একটা বুদ্ধি বেরোল। সুভাষচন্দ্র দাড়ি কাটার জন্য পায়ের তলায় ব্লেড নিয়ে যেতেন জেলে। শরৎচন্দ্রও সেই পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারেন। কয়েকদিন পরীক্ষানিরীক্ষা চলার পরে ঠিক মনঃপূত হল না ব্যাপারটা। ফলে স্থগিত রইল জেলযাত্রা।

অবশ্য বাইরে সংগঠনের কাজে যুক্ত ছিলেন দীর্ঘদিন। হাওড়া কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট হয়ে একাধিক কনফারেন্সে গেছেন। সাক্ষাৎ পেয়েছেন বহু মানুষের। শেষে কংগ্রেসের সঙ্গ ছেড়ে হাত দিলেন ‘পথের দাবী’-র কাজে। রেঙ্গুনবাসের অভিজ্ঞতা, সুভাষচন্দ্রের সঙ্গ আর সশস্ত্র আন্দোলনের মিশেল ঘটল উপন্যাসে। যা ভয়ে নিষিদ্ধ করে দিতে বাধ্য হয় ব্রিটিশ সরকার। কিন্তু নেভানো যায়নি আগুন। দেশের উত্তর-পূর্ব ধরে আজাদ হিন্দ বাহিনী নিয়ে ফিরে এসেছিলেন সুভাষচন্দ্র। সুমিত্রা-ভারতীদের দেখা পাওয়া গেছে ‘ঝাঁসির রানি’ রেজিমেন্টের বীরাঙ্গনাদের মধ্যে। সমগ্র ভারত দেখতে পেয়েছিল স্বাধীনতার চূড়ান্ত রূপ। তারপর একদিন আবার হারিয়ে গেলেন ‘নেতাজি’, সন্ধান মেলেনি আর। অনেকটা যেন সব্যসাচীর মতোই।

তার অনেক উপন্যাস ভারতবর্ষের প্রধান ভাষাগুলোতে অনূদিত হয়েছে। বড়দিদি (১৯১৩), পরিণীতা (১৯১৪), পল্লীসমাজ (১৯১৬), দেবদাস (১৯১৭), চরিত্রহীন (১৯১৭), শ্রীকান্ত (চারখণ্ডে ১৯১৭-১৯৩৩), দত্তা (১৯১৮), গৃহদাহ (১৯২০), পথের দাবী (১৯২৬), শেষ প্রশ্ন (১৯৩১) ইত্যাদি শরৎচন্দ্র রচিত বিখ্যাত উপন্যাস।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অপ্রতিদ্বন্দ্বী জনপ্রিয়তার জন্য তিনি 'অপরাজেয় কথাশিল্পী' নামে খ্যাত। তিনি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দে জগত্তারিণী স্বর্ণপদক পান৷ এছাড়াও, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে 'ডিলিট' উপাধি পান ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে।

ছদ্মনাম
অনিলা দেবী, অমুরুপা দেবী, অপরাজিতা দেবী, শ্রী চট্টোপাধ্যায়, শ্রীকান্ত আচার্য, শ্রী কান্ডশর্মা, সুরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়, পশুরাম

No comments:

Post a Comment