Wednesday, June 28, 2023

37>গুরুসদয় দত্ত ব্রতচারী আন্দোলন::--

  


37>গুরুসদয় দত্ত ব্রতচারী আন্দোলন::--

গুরুসদয় দত্ত মূলত ব্রতচারী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে সবচেয়ে বেশি পরিচিতি লাভ করেন। ব্রতচারীদের মধ্যে তিনি প্রবর্তক জী নামে খ্যাত ছিলেন। ব্রতচারীদের অভিবাদন ভঙ্গি, বেশ, মাতৃভাষা প্রীতি, স্বাস্থ্যজ্ঞান, সত্যনিষ্ঠা, সংযম, প্রফুল্লভাব, অধ্যবসায়, আত্মনির্ভরতা খুব জনপ্রিয়তা লাভ করে।
=============

গুরুসদয় দত্ত (১০ মে ১৮৮২ - ২৫ জুন ১৯৪১)  ছিলেন একজন সরকারি কর্মচারী, লোক সাহিত্য গবেষক এবং লেখক। তিনি ব্রতচারী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বহুল পরিচিত।

গুরুসদয় দত্ত
জন্ম::--১০ মে, ১৮৮২
বীরশ্রী গ্রাম, শ্রীহট্ট জেলা ( অধুনা বাংলাদেশ)
মৃত্যু::---২৫ জুন ১৯৪১ (বয়স ৫৯)
কলকাতা
মৃত্যুর কারণ::--কর্কট রোগ
পেশা:--সরকারী কর্মচারী ঝ(কালেক্টর, কৃষি ও শিল্প বিভাগের সচিব, জেলা শাসক)
পরিচিতির কারণ::--
ব্রতচারী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা
দাম্পত্য সঙ্গী::--সরোজ নলিনী দে
সন্তান::--ক্যাপ্টেন বীরেন্দ্রসদয় দত্ত (পুত্র)

জন্ম ও বংশ পরিচয়::--

গুরুসদয় দত্ত ১৮৮২ সালের ১০ মে সিলেট জেলার জকিগঞ্জ উপজেলার (তৎকালীন করিমগঞ্জ মহকুমা) বিরশ্রী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা রামকৃষ্ণ দত্ত চৌধুরী ছিলেন সম্ভ্রান্ত জমিদার। গুরুসদয় দত্ত নিজে পারিবারিক উপাধি "চৌধুরী" ব্যবহার করতেন না। তার মাতার নাম আনন্দময়ী দেবী‌।

শিক্ষাজীবন::--

গুরুসদয় দত্তের শিক্ষাজীবন শুরু হয় সিলেট জেলার জকিগঞ্জ উপজেলার বিরশ্রী গ্রামের মাইনর স্কুলে। তারপর তিনি সিলেট শহরের ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি হন। এ স্কুল থেকে ১৮৯৯ সালে তিনি এন্ট্রান্স পরীক্ষা দেন। মেধানুসারে তিনি আসাম প্রদেশে প্রথম স্থান লাভ করেন। ১৯০১ সালে তিনি এফ. এ পরীক্ষা দেন এবং মেধানুসারে প্রথম স্থান অর্জন করেন। এরপর তিনি বিলাত গমন করেন। ১৯০৪ সালে তিনি আই. সি. এস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং মেধা তালিকায় সপ্তম স্থান অধিকার করেন।

কর্মজীবন::--

মহকুমা শাসকের কাজের মধ্য দিয়ে তাঁর কর্মজীবনের সূত্রপাত ঘটে। একজন দক্ষ আইসিএস অফিসার হিসেবে তিনি পল্লী উন্নয়নের কাজে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতেন। ১৯২৮ সালে বামনগাছি রেলওয়ে ওয়ার্কশপের কর্মচারী ও শ্রমিক ও কৃষকদের উপর ব্রিটিশ পুলিশদের নির্বিচারে গুলি চালানোর প্রতিবাদে তিনি সরব হন এবং তাঁর এই প্রতিবাদের সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে লণ্ডনের লর্ডস হাউজেও।

মূল নিবন্ধ: ব্রতচারী আন্দোলন::---
গুরুসদয় দত্ত মূলত ব্রতচারী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে সবচেয়ে বেশি পরিচিতি লাভ করেন। ব্রতচারীদের মধ্যে তিনি প্রবর্তক জী নামে খ্যাত ছিলেন। ব্রতচারীদের অভিবাদন ভঙ্গি, বেশ, মাতৃভাষা প্রীতি, স্বাস্থ্যজ্ঞান, সত্যনিষ্ঠা, সংযম, প্রফুল্লভাব, অধ্যবসায়, আত্মনির্ভরতা খুব জনপ্রিয়তা লাভ করে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ তৎকালীন সময়ের অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ গুরু সদয় দত্ত প্রতিষ্ঠিত ব্রতচারী আন্দোলনের সাথে যুক্ত হন।


★★★★★★★★★★★★★★★★★


Tuesday, June 27, 2023

36>Swami Vivekananda

 36>Swami Vivekananda::--

Born::--12 January 1863 at Kolkata.

 Died,::--4 July 1902 Belur Math, Howrah.

Died at the age of -----93 years.

============================


*"নরেন,আমাকে একটা গরদের শাড়ি কিনে দিতে পারিস ? এটা আর পরা যায় না।"*


তাড়াতাড়ি সরে যাচ্ছিলেন ভুবনেশ্বরী দেবী (স্বামী বিবেকানন্দ'র মাতা )। আর কিছুর জন্য নয়, যে শাড়ি পরে আহ্নিক করছিলেন সেটা শতচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল কথাটা : "আমাকে একটা গরদের শাড়ি কিনে দিতে পারিস ? এটা আর পরা যায় না।"

মাথা হেঁট করল নরেন। সে বেকার, ভূতের বেগার খাটছে। কোথায় পাবে সে গরদ কেনার পয়সা? লজ্জা মা কেন পাবে, লজ্জা পেল ছেলে। 

সেদিনই এক মাড়োয়ারি ভক্ত এসেছে দক্ষিণেশ্বরে। সঙ্গে মিছরির থালা তার উপরে একখানা গরদের কাপড়। দেখে ঠাকুরের বড় খুশি খুশি ভাব।

দুদিন পরে নরেন এসে হাজির। যাকে মানে না, সেই আবার টানে। 

"শোন, কাছে আয়---" নরেনকে ডাকলেন ঠাকুর ।

নরেন কাছে এল। দাঁড়িয়ে রইল, বসল না।

*"শোন, এই মিছরির থালা আর গরদখানা তুই নিয়ে যা-----"*

উচ্চশব্দে হেসে উঠল নরেন। "আমি কি ছোট ছেলে, মিছরি দিয়ে ভোলাবেন? আর গরদ--?"

*"গরদখানা তোর মাকে দিবি। তার আহ্নিক করার শাড়ি ছিঁড়ে গেছে। এই গরদ পরে সে আহ্নিক করবে।"*

বুকের মধ্যে ধ্বক করে উঠল নরেনের। ---"আপনাকে কে বললে?"

---"ওরে আমি জানতে পারি। শোন নিয়ে যা গরদখানা। তোর জন্য নয়, তোর মা'র জন্য বলছি।"

--"মা'র জন্য আপনার কাছে ভিক্ষে করতে যাব কেন? যখন রোজগার করতে পারব তখন কিনে দেব মাকে।"

নরেন চলে গেল হনহন করে। তার তেজ দেখে ঠাকুর হাসতে লাগলেন। এই নাহলে নরেন্দ্র! 

রামলালকে ডাকলেন ঠাকুর। বললেন-"কাল সিমলায় নরেনের বাড়িতে যাবি। যখন দেখবি, নরেন বাড়িতে নেই, সটান চলে যাবি তার মা'র কাছে। এই মিছরির থালা আর গরদখানা দিয়ে বলবি আমি পাঠিয়েছি। সাবধান, নরেন যেন টের না পায়।"

পরদিন দুপুরে লুকিয়ে অপেক্ষা করছে রামলাল। ঐ তো নরেন বেরোচ্ছে। মলিন চাদরখানা গায়ে ফেলে। অমনি ঐ ফাঁকে বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়েছে রামলাল। একেবারে ভুবনেশ্বরীর দরবারে।

'আপনাকে এই মিছরির থালা আর গরদখানা পাঠিয়ে দিলেন ঠাকুর।'

--- *"গরদের কাপড় ! কি করে জানলেন তিনি? এইখানে বিলুর সাথে কি কথা হল, আর দক্ষিণেশ্বরে অমনি টেলিগ্রাম হয়ে গেল?"* 


.... সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে এল নরেন। দেখল মা গরদের কাপড় পরে বসে আছেন পূজার ঘরে। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল মায়ের দিকে।

একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল শিরদাঁড়া দিয়ে। 

চিরস্বাধীন নরেন থমকে গেল। কথা খুঁজে পেল না।।


তথ্যসূত্র :- [ কথামৃত ]

Wednesday, June 7, 2023

35>|| শ্রী শ্রীরামকৃষ্ণ কল্পতরু :--|\

     35>|| শ্রী শ্রীরামকৃষ্ণ কল্পতরু :--|\


আজ ১লা জানুয়ারি, ১৮৮৬ , শুক্রবার। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ আজ কাশীপুরের বাগানবাড়িতে তাঁর বসবাসের ঘরটি থেকে নেমে এসেছেন নীচের বাগানে । তাঁর পরনে লালপেড়ে ধুতি, একটি পিরান , লালপাড়ের একটি মোটা চাদর, কানঢাকা টুপি ও চটি জুতো। সঙ্গে রয়েছেন ভ্রাতুষ্পুত্র রামলাল চট্টোপাধ্যায়। এখন বিকেল। ঠাকুর এসেছেন আমগাছটির কাছে। সেখানে কতিপয় ভক্তের জটলা। ঠাকুরকে দেখে সর্বাগ্রে এগিয়ে এলেন গৃহিভক্ত গিরিশচন্দ্র ঘোষ। তিনি ভক্তির আতিশয্যে জুতো খুলে রেখে শ্রীরামকৃষ্ণকে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করলেন। কৃপাসিন্ধু ভগবানের কৃপাবারি উথলে উঠল। তিনি গিরিশকে জিজ্ঞাসা করলেন -- তুমি যে সকলকে এত কথা ( আমার অবতারত্ব সম্বন্ধে) বলে বেড়াও, তুমি( আমার সম্বন্ধে) কি দেখেছ, কি বুঝেছ? গিরিশ গদগদ স্বরে উত্তর দিলেন -- ব‍্যাস বাল্মীকি যাঁর ইয়ত্তা করতে পারেননি , আমি তাঁর সম্বন্ধে অধিক কি আর বলতে পারি ! 


গিরিশের এই ভাবপূর্ণ স্তব শুনে ঠাকুর ভাবাবিষ্ট ও সমাধিস্থ হলেন। খানিক পরে ভাবের গাঢ়তা তরল হলে তিনি সমবেত ভক্তমন্ডলীর উদ্দেশে বলতে লাগলেন -- তোমাদের আর কি বলব। আশীর্বাদ করি তোমাদের চৈতন‍্য হোক। শ্রীরামকৃষ্ণের এই কৃপা-বিতরণের মহার্ঘ্য-ক্ষণে ভক্তেরা উদ্বেলিত হয়ে উঠল, সকলে তাঁর কৃপাপ্রাপ্তির অভিলাষে সমবেত হল তাঁর চারপাশে, শ্রীরামকৃষ্ণ একে একে সকলকে স্পর্শ করতে লাগলেন । তাঁর কৃপা-পরশে কেউ হাসতে লাগল , কেউ কাঁদতে লাগল , কেউ ধ‍্যানে নিমগ্ন হলো, কেউ প্রার্থনা করতে আরম্ভ করল, কেউ জ‍্যোতি দেখতে পেল, কেউবা নিজের ইষ্টের দর্শন পেল , আবার কেউবা নিজের শরীরে আধ‍্যাত্মিক-তরঙ্গের ঢেউ অনুভব করতে লাগল। 


শ্রীরামকৃষ্ণের নরেন্দ্রনাথ প্রভৃতি অন্তরঙ্গ ত‍্যাগী সন্তানরা অধিকাংশ‌ই তখন ঘুমাচ্ছিলেন। তাঁরা রাতভোর জপধ‍্যান করতেন। সেই কারণেই মধ‍্যাহ্নের পর ঘুমিয়ে নিতেন। গৃহিভক্তরাই আজ বিশেষভাবে ঠাকুরের কৃপাভিলাষে জড়ো হয়েছেন। অক্ষয় সেনকে কাছে ডেকে বক্ষ স্পর্শ করলেন ঠাকুর , কানে দিলেন 'মহামন্ত্র'। অক্ষয় সেনের চোখ থেকে আনন্দাশ্রু ঝরতে লাগল, তাঁর জীবন কৃতার্থ হলো। 


নবগোপাল ঘোষকে শ্রীরামকৃষ্ণ বললেন একটু ধ‍্যানজপ করলেই তাঁর হবে। কিন্তু নবগোপাল সাধারণ গৃহস্থ, তাঁর এসবের অবসর কোথায়? ঠাকুর তখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন -- আমার নাম একটু একটু করতে পারবে তো? নবগোপাল বললেন -- তা খুব পারব। এই উত্তর শুনে ঠাকুর বললেন -- তা হলেই হবে -- তোমাকে আর কিছু করতে হবে না। 


'বসুমতী সাহিত‍্য মন্দির'-এর প্রতিষ্ঠাতা উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় অর্থকষ্টে ভুগছেন। তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে অর্থ প্রার্থনা করলেন। ঠাকুর তাঁকে বললেন -- তোর অর্থ হবে। পরবর্তীকালে তিনি প্রভূত সম্পত্তির অধিকারী হন এবং নানাভাবে শ্রীরামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীদের সেবায় জীবন অতিবাহিত করেন। 


রামলাল দাদা পেছনে দাঁড়িয়েছিলেন। মনে মনে ভাবছিলেন -- সকলের তো একরকম হলো , আমার কি গাড়ু গামছা বয়া সার হবে? অন্তর্যামী ঠাকুর তাঁর মনের ভাব বুঝে তাঁকে ডেকে বললেন - এত ভাবছিস কেন? আয় আয়। এরপর শ্রীরামকৃষ্ণ রামলাল চট্টোপাধ‍্যায়ের বুকে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন -- দেখ্ দিকিনি এইবার। রামলাল দাদা দেখলেন - সে যে কি  রূপ , কি আলো , কি জ‍্যোতি! পরে তিনি স্বামী সারদানন্দকে বলেছিলেন যে -- ঠাকুর স্পর্শ করা মাত্র সর্বাঙ্গসুন্দর ইষ্টমূর্তি তাঁর হৃদয়পদ্মে যেন নিমেষের মধ‍্যেই নড়েচড়ে ঝলমল করে উঠেছিল। 


এমন সময় বৈকুন্ঠনাথ স‍্যান‍্যাল এগিয়ে এলেন। শ্রীরামকৃষ্ণকে প্রণাম করে বললেন -- আমায় কৃপা করুন। ঠাকুর বললেন -- তোমার তো সব হয়ে গেছে। বৈকুন্ঠনাথ বললেন যে ঠাকুর যখন বলছেন , তখন সেকথা নিশ্চয়ই ঠিক, তবে তিনি যাতে সেই অনুভূতি অল্পবিস্তর বুঝতে পারেন , ঠাকুর যেন তা করে দেন। একথা শুনে শ্রীরামকৃষ্ণ ক্ষণিকের জন‍্য বৈকুন্ঠনাথের হৃদয় স্পর্শ করলেন। অমনি বৈকুন্ঠনাথ সর্বত্র শ্রীরামকৃষ্ণ রূপ দেখতে লাগলেন। ক্রমাগত তিনদিন তিনি এই অবস্থায় র‌ইলেন ।যেদিকে তাকান , সেদিকেই শ্রীরামকৃষ্ণকে দেখতে পান। 


ইতিমধ‍্যে বিকেল শেষ হয়ে সন্ধ্যা আগতপ্রায়। শ্রীরামকৃষ্ণ রামলালদাদার সঙ্গে ফিরে চললেন নিজের ঘরে। রামলালদাদাকে তিনি বললেন , সকলের পাপ গ্রহণ করে তাঁর অঙ্গ জ্বলে যাচ্ছে। ঠাকুরের কথামত রামলালদাদা গঙ্গাজল নিয়ে এলেন। ঠাকুর গায়ে মাখলেন। 


  শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন যে যাবার আগে তিনি হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিয়ে যাবেন , অর্থাৎ নিজের স্বরূপ ভক্তদের মাঝে প্রকাশ করে  দিয়ে যাবেন। তাই করলেন তিনি আজ , ১৮৮৬ সালের ১লা জানুয়ারি। কৃপাসিন্ধু ভগবান কল্পতরু হলেন ভক্তদের কাছে। ---                                          জয় শ্রীরামকৃষ্ণ🙏

        ( সংগ্রহীত)

      <----আদ্যনাথ--->

===========================

34>স্বামী সোমেশ্বরানন্দ


34>— স্বামী সোমেশ্বরানন্দ

 ("আমার সন্ন্যাস-জীবন ও বেলুড়মঠ")


সন্ন্যাসের পর থেকে তিনদিন বাইরে ভিক্ষা করে খেতে হয়। ধুতি ও সুতির চাদর ছাড়া আর কিছু পরা চলবে না, আগুনের ব্যাবহারও নিষেধ।

    সকাল ন’টা নাগাদ বেরিয়ে পড়লাম ভিক্ষায়। দু’জন করে সন্ন্যাসীর গ্রুপ। এক-এক গ্রুপ একেক দিকে যাবে। একই বাড়িতে একাধিক সন্ন্যাসী ভিক্ষা করবে না। তিন বা পাঁচ বাড়ির বেশি থেকে ভিক্ষা নেয়া যাবে না। শুধু রান্না করা খাবার নেয়া যাবে, ফলও, কিন্তু টাকা-পয়সা নয়। গেরুয়া কাপড়ের একাংশ ছিঁড়ে ঝোলা তৈরী করলাম (বৈষ্ণবদের সাপুই)। ওটাই ভিক্ষার ঝুলি। দুপুর বারোটার মধ্যে সবাইকে ফিরে আসতে হবে----রথীন মহারাজ বলে দিলেন। 

   মঠের মেন গেটের কাছে অনেক মহিলা ও পুরুষ দাঁড়িয়ে আছেন খাবার নিয়ে। নবীন সন্ন্যাসীদের ভিক্ষা দেবেন। আমরা কয়েকজন তাই পেছনের গেট দিয়ে লুকিয়ে চলে গেলাম। ইচ্ছা ছিল সেই অঞ্চলে যাব যেখানে কেউ আমাদের চেনে না। 

   প্রায় মাইল খানিক হেঁটে আমরা দু’জন একটা পাড়ায় ঢুকলাম। সঙ্গী গেল একদিকে, আমি অন্যদিকে। এক বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই উপরের বারান্দা থেকে একজন প্রৌঢ়া মহিলা বললেন ---এসেছো বাবা? একটু দাঁড়াও। আমি আসছি। তিনি নিচে নেমে আমার ঝুলির মধ্যে ঢেলে দিলেন ভাত, আলু ও পটল ভাজা, ফুলকপির তরকারি। ডালের বাটি দিতে গেলে বললাম—ডাল ভেতরেই ঢেলে দিন। তিনি অবাক হলেন --- সে কি বাবা? চুঁইয়ে-চুঁইয়ে পড়বে যে নীচে দিয়ে। বললাম— এভাবেই ভিক্ষা নেয়ার নিয়ম আমাদের। সব মাখামাখি হয়ে যাবে, তা যাক। 

    ওখান থেকে বেশ কিছুটা হেঁটে অন্য এলাকায় গেলাম। জবরদস্ত অভিজ্ঞতা হলো। দরজা খুলে এক ভদ্রলক জিজ্ঞেস করলেন—  আপনি কোন আশ্রমের? বললাম— বেলুড়মঠের। শুনেই তিনি চোখ গোল গোল করে বিস্ময় প্রকাশ করলেন— সে কি? মঠের সাধু হয়ে ভিক্ষা করছেন? বেলুড়মঠের আর্থিক অবস্থা এতো খারাপ যে সাধুরা রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষা করছেন? ওগো শুনছো— স্ত্রীকে  ডাক দিলেন তিনি— মঠের সাধুরা পথে পথে বেরিয়ে ভিক্ষা চাইছে। তাঁর স্ত্রী এসে দাঁড়ালেন। ভ্রূ কুঁচকে আমার দিকে তাকালেন। পরে স্বামীকে বললেন — আমার সন্দেহ হচ্ছে। কালই তো বেলুড়মঠে খিচুড়ি প্রসাদ খেয়েছি। একদিনেই অবস্থা এতো খারাপ? না আমার মনে হয় এই সাধু ঠগ। বেলুড়মঠের নাম করে ভিক্ষা চাইছে। ওদিকে পাড়ার কয়েকজন এসে আমায় ঘিরে ধরেছে। ভদ্রলোক চেঁচাচ্ছেন --- “চোর-টোর নয় তো! গেরুয়ার ছদ্মবেশে এসেছে। এই, আপনারা একে ধরে রাখুন। আমি পুলিশে ফোন করছি।” আমি তো নার্ভাস।      

সন্ন্যাস নিতে-না-নিতেই এমন বিপত্তি! তাদের বুঝিয়ে বললাম— “আমি বেলুড়মঠের ফোন নাম্বার দিচ্ছি। আপনারা ফোন করে জেনে নিন আমার বিষয়ে।” এভাবেই রক্ষা পেয়েছিলাম সেদিন। ভিক্ষা তো দিলই না, উল্টে পুলিশের হুমকি! 

   দ্বিতীয় দিন এক মুসলমান বস্তিতে গেলাম। একটা বাড়ির বারান্দায় দু’জন মহিলা কথা বলছিলেন। সেখানে গিয়ে ভিক্ষা চাইলাম। এক ভদ্রমহিলা “আসছি বাবা” বলে ভেতরে ঢুকে বেরিয়ে এলেন খালি হাতে। এসেই গল্প করতে শুরু করলেন। কোথায় থাকি, বাড়ি কোথায় ছিল, কতদূর পড়াশোনা ইত্যাদি। ১০-১২ মিনিট ধরে তিনি গল্প চালিয়ে যেতে লাগলেন। আমি ভাবছি — ভিক্ষা না দিলে বলে দিলেই হয়! এতো প্রশ্ন কেন? এমন সময় একটি বাচ্চা ছেলে বাইরে থেকে এলো। হাতে ঠোঙা। তাকে নিয়ে ভদ্রমহিলা ভেতরে গেলেন। পরে এক বাটিতে মুড়ি এনে আমায় ভিক্ষে দিলেন। জানলাম যে বাড়িতে খাবার নেই। স্বামী রিকশা চালান। বারোটা নাগাদ চাল-ডাল নিয়ে আসবেন, তখন রান্না হবে। তাই ছেলেকে পাঠিয়েছিলেন বাজার থেকে মুড়ি নিয়ে আসতে। এজন্যই গল্প করে আমায় ব্যস্ত রেখেছিলেন এতক্ষণ। সন্ন্যাসী ভিক্ষা চাইতে এসেছেন। খালি হাতে বিদায় করতে নেই। 

   মজা হয়েছিল ললিত মহারাজকে নিয়ে। বেলুড় অঞ্চলে যুবকদের মধ্যে তিনি খুব জনপ্রিয়। এক পাড়ায় ঢুকতেই ৮-১০ জন ছেলে তাঁকে ঘেরাও করে বসলো — আমাদের ক্লাবে চলুন, ভিক্ষা দেবো। মহারাজ আপত্তি করলেন, কি করছিস তোরা? বাড়ি থেকে ভিক্ষা নেয়ার নিয়ম। ছেলেরা কথা শুনবে না। জোর করে নিয়ে গেল ক্লাবে। চেয়ারে বসিয়ে গলায় মালা দিল। বলল— মহারাজ, আজ আমাদের পুণ্য অর্জন করতে দিন। প্রচুর ফল কিনে রেখেছে ক্লাবের সদস্যেরা। কোল্ড ড্রিংস খেতে দিল। ইতিমধ্যে একজন গিয়ে এক সাইকেল-রিকশা ডেকে এনেছে। চাঙ্গাড়ি ভর্তি ফল। কমলা, আপেল, কলা, সন্দেশ। ৫-৬ টা বড় বড় ঝুড়ি। মহারাজের সীটে বসিয়ে দিল তারা। পায়ের কাছে, সীটে, হাতের পাশে ফলের ঝুড়ি। “কি করছিস বল তো তোরা!” মহারাজ ধমকে দিলেও ছেলেরা পাত্তা দিল না। সীটের এককোণায় মহারাজ কোনরকমে বসলে তারা মহারাজের হাতে কয়েকটা ডাব ধরিয়ে দিল। আর রিকশাওয়ালাকে পাঁচটাকা দিয়ে বলল--- “সোজা বেলুড়মঠে যাও। মাঝপথে মহারাজকে নামতে দেবে না।” 

     এক বাড়িতে ভিক্ষা নিচ্ছি। ভদ্রমহিলা রুটি আর আলুর তরকারি দিচ্ছেন। পাশেই তাঁর বাচ্চা ছেলে। চকোলেট খাচ্ছিল, মাকে দেখলো কিছুক্ষণ। পড়ে আমার দিকে তাকালো। হঠাৎ ছুটে এসে পকেট থেকে একটা চকোলেট দিল আমার ঝুলিতে। ভদ্রমহিলা “কি করছো” বলে চেঁচিয়ে উঠতেই বাচ্চাটি অম্লান বদনে বললো— আমিও ভিক্ষা দিচ্ছি।

তার দিকে তাকিয়ে আমি হাসিমুখে “থ্যাংকিউ” বলতে বাচ্চাটি হতভম্ব হয়ে আমাকে দেখলো কয়েক সেকেন্ড। তারপর মা’র উদ্দেশ্যে বলল— মামমি ভিখারী ইংরেজি বলছে। মা লজ্জিত। 

     একদিন ভিক্ষার শেষে বেলুড়মঠে ফিরে আসছি। একটা গলিতে ঢুকতেই একজন ভদ্রমহিলা থামালেন আমাকে। বললেন— একটু দাঁড়ান, ভিক্ষা দেব। তাঁকে বললাম যে আজ আর ভিক্ষা নিতে পারবো না, পাঁচ বাড়ি হয়ে গেছে। তিনি করুণ মুখে বল্লেন---দু’ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করে আছি, আপনারা কেউ এলে ভিক্ষা দেবো। কেউ না আসায় ভগবানের কাছে খুব প্রার্থনা করছিলাম যেন কেউ আসেন। আপনি এলেন, আর আমার ভিক্ষা নেবেন না? তিনি প্রায় কেঁদে ফেললেন। আমি অপ্রস্তুত। বললাম— নেবো, ভিক্ষা নিয়ে আসুন। 

     মঠে যখন ফিরলাম ভিক্ষার শেষে তখন ঝোলার অবস্থা খুবই খারাপ। ডাল চুঁইয়ে পড়ছে। ভেতরে ফুলকপির ঝোলে মিশে বেগুনভাজা নিস্তেজ। রুটিগুলির একপাশে দই লেগে আছে, অন্যপাশে চাটনী। খিচুড়ি আর পায়েস একসাথে মিশে গিয়ে অদ্ভুদ অবস্থা। শুক্তোর ঝোলে জিলিপি পড়ে ভেঙ্গে গেছে। 

    বারোটা নাগাদ আমরা সবাই ফিরে এলাম ভিক্ষা থেকে। মঠে লেগেট হাউসের কাছে বিশ্রাম করতে লাগলাম। তিনদিন ফাঁকা জায়গায় বসেই খেতে হবে, কোনো ঘরে নয়। সবার ঝুলি থেকে ভিক্ষান্ন নিয়ে একসঙ্গে রাখা হলো বিশাল গামলায়। সবকিছু মাখামাখি হয়ে একাকার। সেদ্ধ চাল, বাসমতী, আতপ চালের ভাত, মুগ-ছোলা-মুসুরী ডাল, ঝোল-চচ্চড়ি-শাক- সেদ্ধ-ভাজা, সন্দেশ-আচার-শুক্তো-পায়েস — সব মিলে মিশে মহাপ্রসাদ। হাতা দিয়ে ভাল করে মিশিয়ে দেয়া হল সব। 

     হ্যাঁ, এর নাম মহাপ্রসাদই। খাবার ঘরে সাধুরা বসে অপেক্ষা করছেন। মহাপ্রসাদ আগে খেয়ে পরে দৈনন্দিনের খাবার। প্রেসিডেন্ট মহারাজ, অন্যান্য প্রধান মহারাজরা, সবাই অপেক্ষা করছেন এর জন্য। শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন — ভিক্ষার অন্ন শুদ্ধ অন্ন। 

     বাইরে গাছের নীচে লাইন করে আমরা নবীন সন্ন্যাসীরা, বসে গেলাম। শালপাতায় পরিবেশন করা হলো মহাপ্রসাদ। আমরা ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত। তাড়াতাড়ি খাওয়া শুরু করলাম। কি খাচ্ছি, কেমন স্বাদ, কিচ্ছু বোঝা যাচ্ছে না। খিদে লাগলে সবই অমৃত। 

 

            — স্বামী সোমেশ্বরানন্দ

 ("আমার সন্ন্যাস-জীবন ও বেলুড়মঠ")

Tuesday, June 6, 2023

33>একই দশকে ব্যবধানে জন্ম ভারতের চারজন মহাপুরুষের।

 33>একই দশকে ব্যবধানে জন্ম ভারতের চারজন মহাপুরুষের।

মাত্র 11 বৎসরের ব্যবধানে জন্ম চার 

মহাপুরুষের।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জন্ম কলকাতা 

 7 মে 1861 

স্বামী বিবেকানন্দের জন্ম কলকাতা

  12 জানুয়ারি 1863

মহাত্মা গান্ধীর জন্ম গুজরাতে 

  2 অক্টোবর 1869

ঋষি আরবিন্দের জন্ম কলকাতা

  15 আগস্ট 1872

এই 11বৎসরের মধ্যেই জন্মেছিলেন ভারতের চার স্বনামধন্য মহাপুরুষ।

 লেখক শ্রী শঙ্করের ভাষায় 

""চার মহাপুরুষ আশ্রয়ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান স্থাপনের প্রাণদায়ী স্বপ্ন দেখেছিলেন।

মহাত্মা গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শ্রী অরবিন্দ ও বিবিবেকানন্দকে আমরা প্রাতিষ্ঠানিক সংগঠক হিসাবে দেখতে পাই।

স্বপ্নের আশ্রম জীবনকে বাস্তবায়িত করতে গিয়ে এঁদের প্রত্যেকেই যথেষ্ট সময় দিয়েছেন।

কিন্তু একশ বছরের মধ্যে গান্ধীর 

সবরমতী আশ্রম মিউজিয়ামে পরিণত হয়েছে।

পন্ডিচেরিতেও আদিযুগের সেই প্রাণবন্ত রূপ আজ বোধহয় তেমন নেই, আর শান্তিনিকেতনের আশ্রমজীবন,সে তো ইতিহাসের পাতায় নিরাপদ আশ্রয় দেবার জন্য ছুট দিয়েছে।

এঁদের প্রতিষ্ঠাতারা সকলেই তাঁদের নিজেস্ব ব্যক্তিমহিমায় এবং সৃস্টিমহিমার এখনও বিশ্ববন্দিত হচ্ছেন, কিন্তু সংগঠক হিসাবে তাঁরা কিছুটা হার মেনেছেন বললে বোধহয় সত্যের অপলাপ করা হবে না।

অন্য তিনজনের তুলনায় বিবেকানন্দ তাঁর প্রতিষ্ঠিত সঙ্ঘকে সবচেয়ে কম সময় দিতে পেরেছেন। রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের নিতান্ত শৈশবকালেই তিনি ইহলীলা সংবরণ করেছেন, কিন্তু শতবর্ষের দূরত্বেও

একটি প্রাণবন্ত প্রতিষ্ঠান হিসর্বে তার ক্রমাগত বিস্তার অব্যাহত।"

আজও রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের শাখা বাড়ছে, এই একবিংশ শতাব্দীতেও প্রতি বছর শতাধিক যুবক এই সঙ্ঘে সর্বত্যাগের ব্রত গ্রহণ করছে।