Friday, September 17, 2021

24>|| শিবরাম চক্রবর্তী ||

 


 24> || শিবরাম চক্রবর্তী ||


(ডিসেম্বর ১৩, ১৯০৩-আগস্ট ২৮, ১৯৮০)

প্রখ্যাত বাঙালি রম্যলেখক। কবিতা-রচনা দিয়ে সাহিত্য-জীবনের শুরু।

জীবনে বিয়ে করেন নি।

বিচিত্র জীবন ছিল তার। রাজনীতি করেছেন, জেল খেটেছেন, রাস্তায় কাগজ ফেরি করেছেন, ফুটপাথে রাত্রিবাস করেছেন, সাংবাদিকতা করেছেন, আজীবন মেস-জীবন যাপন করেছেন ।

------------------------------

আমি দেখেছিলাম কিছু সময়ের জন্য সেই মহান জীবনকে।


মনেপরে তখন কলেজে ফাস্ট ইয়ারে পড়ি।

কলেজের পড়ে আমি টেক্সি চালাতাম কলকাতার রাস্থায়।

আমাদের বাংলা প্রফেসর পি কে এবংইংরেজি  প্রফেসর রুদ্রপ্রশাদ সর  জানতেন যে আমি বিকেলে টেক্সি চালাই।

সেদিন টেক্সি নিয়েই কলেজে গিয়েছিলাম।

পি কে সর বললেন কলেজের পরে 4:30 টার সময় উনি যাবেন কলেজ স্ট্রিটে।

আমি ওনার জন্য একঘন্টা কলেজে অপেক্ষা করে বসে ছিলাম।

আমার লাস্ট প্রাকটিক্যাল ক্লাস 3টের সময় শেষ হয়ে গিয়ে ছিল।

তবুও আমি অপেক্ষা করলাম ওনার জন্য।

এমনটা আমার রোজেই করতে হতো।

কারন রোজই কলেজ থেকে কেউ না কেউ আগেই বলে রাখতো।

সে যাইহোক সেদিন পি কে সরকে  নিয়ে পৌঁছে ছিলাম মুক্তারামবাবু স্ট্রিটে এক মেসে।

স্যার বললেন ওনার সাথে যেতে , তাই আমিও ওনার সাথে গিয়ে একটি বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম গেটটি তালা বন্ধ।

প্রফেসর ওই তালা দেখেও বার বার কলাপসিবিল গেট ধরে নাড়া দিচ্ছিলেন, এবং স্যার স্যার বলে ডাকছিলেন।

আমি বললাম স্যার , গেটে তো তালা লাগানো , আপনি কাকে ডাকছেন, উনি বোধ হয় বাড়িতে নাই।

পি কে স্যার ইশারায় আমাকে চুপ থাকতে বলে গেট ধরে নাড়িয়েই যাচ্ছেন।

প্রায় আধা ঘন্টা পরে দেখলাম এক জন বেশ বয়স্ক মানুষ এগিয়ে এসে পি কে স্যার কে এক ধমক দিয়ে বললেন " "কাকে চাই, এখানে কেউ থাকে না"

পিকে স্যার অনেক অনুনয় বিনয় করে বললেন " স্যার আমি আপনাকেই চাই ,

আমার প্রুফ টা দেখেছেন কি?"

ওই বয়স্ক লোকটি আরও রেগে গিয়ে বললেন " আমি কেউ নই, এখানে কেউ থাকে না।"

প্রুফ ট্রুফ দেখাতে হয় থানায় গিয়ে দেখান, এখানে কি চান?"

 এমনি বেশ কিছু ক্ষণ কথা কাটাকাটি হবার পরে পি কে স্যার নিজের নাম বললেন।

বললেন" আমি পরিমল"

ব্যাস জেই না বলা অমনি 

সব কিছু পাল্টে গেল।

একটানা দিয়ে তালাটা খুলে নিলেন। আর গেটটা ফাক করে ভীষণ আদরে ঘরের ভেতরে ডেকে নিলেন।

আমি অবাক হয়ে দেখলাম গেটে তালা লাগানো অথচ কোন চাবি ছাড়াই তালা খুলেগেল।

প্রফেসর স্যার কত টানাটানি করেও সেই তালা খুলতে পারেনি।

অথচ উনি কিভাবে তালাটা ছুঁয়েই খুলে নিলেন।

আর ঘরের ভিতরে গিয়ে দেখি 

ওটা কোন মানুষ থাকার মতন রুম নয় , চারিদিকে শুধু বই আর বই বইয়ের পাহাড়ের মাঝে ই আমি দাঁড়িয়ে রইলাম।

প্রফেসর স্যার ওনার সাথে কথায় ব্যস্ত।

আমি দেখছিলাম সমস্ত রুমের দেওয়ালে কত কি লেখা। 

আমি ঐ লেখার একটুও পড়তে পারলাম না।

এমনি করে প্রায় 40 মিনিট পরে আমরা বেরিয়ে আসলাম।

ওখান থেকে আমরা কফি হাউজে গিয়ে ঢুকলাম।

সেখানে গিয়ে আমি জানলাম যে আজ যার বাড়িতে গিয়েছিলাম উনি আর কেউ নয় উনি হলেন সকলের আদরের স্যার শিবরাম চক্রবর্তী।




======================

#ফার্স্টক্লাস_আছি, শিবরাম চক্রবর্তী।


'‘প্রথমে ভেবেছিলাম যে মন্দির বানাবো। শিব মন্দির। তারপর ভেবে দেখলাম সেটা ঠিক হবে না। সেখানে কেবল হিন্দুরাই আসবে। মুসলমান, ক্রিশ্চান এরা কেউ ছায়া মাড়াবে না তার। মসজিদ গড়লেও সেই কথা। মুসলমান ছাড়া আর কেউ ঘেঁষবে না তার দরজায়। গির্জা হলেও তাই। যাই করতে যাই, সর্বধর্ম সমন্বয় আর হয় না। তাছাড়া, পাশাপাশি মন্দির, মসজিদ, গির্জা গড়লে একদিন হয়তো মারামারি লাঠালাঠিও বেঁধে যেতে পারে। তাই অনেক ভেবে চিন্তে এই পায়খানা বানিয়েছি। সবাই আসছে এখানে। আসবে চিরদিন।"

আজ এই ধর্মের হানাহানিকর পরিবেশে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারি তাঁর কথা কতটা প্রাসঙ্গিক ছিল! শিবরাম চক্রবর্তী যিনি হাসির ছলে নিগূঢ় সত্যকে লিখে গেছেন তাঁর অম্লান কলমে। 


বাংলা সাহিত্যের হাসির রাজার নিজের জীবনটাই ছিল একটা মস্ত ঠাট্টা। 

রাজপরিবারের উত্তরাধিকারী হয়েও আজীবন মুক্তরামবাবু স্ট্রিটের একটা মেস বাড়িতে কাটিয়ে দিয়েছিলেন। যেটাকে অনেকেই 'শিবরাম মেস' বলে চেনেন। চিরটাকাল অভাবের মধ্যে থেকেও যাঁর প্রতিটা লেখার মধ্যে বাঙালি সরসতা খুঁজে পেয়েছেন, তিনি হলেন হাসির রাজা শিবরাম চক্রবর্তী। যিনি মৃত্যুর পাঁচ মিনিট আগেও ডাক্তারবাবুকে 'ফার্স্টক্লাস আছি' বলে মৃত্যুকে হেয় করতে পারতেন। 

একবার তিনি পুকুর থেকে জল তুলছিলেন, এক ভদ্রমহিলা জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনি এত বড় বংশের সন্তান। আপনার বাপ, ঠাকুর্দা এত বড় বংশের আর আপনি কিনা গামছা পরে জল তুলছেন?

আমাদের হাসির সম্রাট বেশ গম্ভীর মুখে বলেছিলেন, বাপ, ঠাকুরদা, বংশ, সব তুললেন, তাতেও হলো না? শেষ পর্যন্ত গামছা তুলে কথা বললেন?

এমন মজা বোধহয় ওই একটি মানুষই করতে পারতেন। 

শোনা যায় একবার আমাদের চক্রবর্তী মহাশয় কদিনের জন্য দেশের বাড়ি গিয়েছিলেন। উনি ফিরে আসতে মেস মালিক বলেছিলেন, শিবরামবাবু আপনার ঘরটা চুনকাম করে দিলাম। 

দেওয়ালগুলো যা নোংরা করে রেখেছিলেন। চারিদিক শুধু পেন্সিলের লেখা। 

উনি মাথায় হাত দিয়ে রাস্তায় বসে পড়েছিলেন। 

হায় হায় একি করলেন!

মেস মালিক দ্বন্দ্বে পড়ে বলেছিলেন, খারাপটা কী করলাম মশাই?

শিবরামবাবু বলেন আরে দেওয়ালের ওই নম্বর, ঠিকানা, টাকার হিসেব- ওগুলো হলো কোন কোন প্রকাশকের কাছে আমার কত টাকা পাওনা আছে তার হিসেব, আর তাদের ঠিকানা। আপনি সব চুন ঢেলে দিলেন!


আজ 28 আগস্ট সেই কিংবদন্তি মানুষটির প্রয়াণ দিবস। সশ্রদ্ধ প্রণাম রইলো তাঁর উদ্দেশ্যে। যান্ত্রিক জীবন থেকে হাসি, মজা যখন চিরবিদায় নিতে চায়, তখন আপনার লেখনীই আমাদের সঙ্গী হয়। নির্মল হাসির জোগানদার আপনি, যাঁর বিকল্প আজও পেলো না বাংলা সাহিত্য.

আর কোনদিন পাবেও বলে মনে হয় না।


========================

 

Tuesday, August 3, 2021

23>আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়

 23>আজ আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের ১৬১তম জন্মবার্ষিকী। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি পুরনো লেখা। ( সংগ্রহ)


🔴 আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় : জীবন ও কর্ম


নির্লোভ, পরোপকারী, শিক্ষা বিস্তারে নিবেদিতপ্রাণ এক মানুষ; যেখানেই মানুষের দুর্ভোগ সেখানেই তিনি, তাই স্বাধীনতা সংগ্রামী হোক আর ঝড়ে-বন্যায় দুর্যোগগ্রস্ত মানুষ হোক ’সকলেরই সহায় হয়ে তিনি আবির্ভূত হয়েছেন। এই মহান কর্মযোগী মানুষটি আর কেউ নন, তিনি আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়। যাঁকে এপিসি রায় বলে আমরা চিনি। ১৮৬১ সালের ২ আগস্ট তিনি সাবেক যশোর জেলা বর্তমানের খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলাধীন রাঢ়ুলি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।


তাঁর পড়াশোনার শুরু কলকাতার হেয়ার স্কুলে। সেখানকার অ্যালবার্ট স্কুল থেকে তিনি এন্ট্রান্স পাশ করে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রতিষ্ঠিত মেট্রোপলিটন কলেজে পড়েন। বিএ ক্লাসের জন্যে ভর্তি হন প্রেসিডেন্সি কলেজে। বিএ পাশ করার আগেই গিলক্রাইস্ট বৃত্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৮৮২ সালে বিলেত যান। সেখানে বিএসসি পাশ করেন এবং ১৮৮৭ সালে রসায়ন শাস্ত্রে মৌলিক গবেষণার জন্যে এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিএসসি ডিগ্রি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের হোপ পুরস্কার পান। ১৮৮৮ সালে তিনি দেশে ফেরেন। তখন সবেমাত্র শিয়ালদহ-খুলনা রেলগাড়ী চালু হয়েছে। কলকাতা থেকে রেলে চেপে খুলনায় নেমে তিনি নৌকায় করে যান বাড়িতে। পরের বছর সহকারী অধ্যাপক হিসেবে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে যোগ দেন। 


শুরু হয় তাঁর শিক্ষক ও গবেষণার জীবন। শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে ভালো করার জন্যে তিনি প্রচুর পড়তেন। নিয়মিত ক্লাস নেওয়া, গবেষণাগারে সময় কাটানো এবং অফিসের কাজ করার মাধ্যমে অল্প সময়েই শিক্ষক হিসেবে তাঁর সুনাম ছড়ায়, তবে শরীরটি ভেঙ্গে যায়। সেই ভাঙ্গা শরীর নিয়ে শিক্ষকতা আর গবেষণার মধ্যে দিয়েই তিনি সারাটা জীবন কাটিয়েছেন। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বিজ্ঞান কলেজ। ষাট বছর বয়স পূর্ণ হলে তিনি অবসর নেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন। কিন্তু স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় তাঁর চাকুরির মেয়াদ পাঁচ বছর বাড়িয়ে দেন। পরে আরও দুইবার পাঁচ বছর করে তাঁর চাকুরির মেয়াদ বাড়ানো হয়। কিন্তু এই পনেরো বছরের বেতনের পুরোটাই তিনি রসায়নের বিশুদ্ধ ও ফলিত শাখার উন্নয়নে দান করেন। 


এরপর ১৯৩৭ সালে ৭৫ বছর বয়সে তিনি যখন পরিপূর্ণ অবসর নিতে চাইলেন, তখন উপাচার্য শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় তাঁকে এমিরিটাস প্রফেসর হিসেবে রসায়নের গবেষণা কর্মের সঙ্গে তাঁকে যুক্ত রাখেন। বিজ্ঞান কলেজে যোগ দিয়ে তিনি কলেজেরই দোতলার দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের একটি ঘরে থাকতেন। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি ওই ঘরে কাটিয়েছেন। কলেজে সবসময় আট-দশজন ছাত্র গবেষণা কাজের জন্যে তাঁর কাছে থাকতেন। খাবারে ভেজাল নির্ণয়ের রাসায়নিক পদ্ধতি উদ্ভাবন সংক্রান্ত তাঁর প্রথম মৌলিক গবেষণা। তাঁর যুগান্তকারী আবিস্কার মারকিউরাস নাইট্রাইট। এছাড়াও পারদ সংক্রান্ত এগারোটি মিশ্র ধাতু আবিস্কার করে তিনি রসায়ন জগতে বিস্ময়ের সৃষ্টি করেন। গবাদিপশুর হাড় পুড়িয়ে তাতে সালফিউরিক এসিড যোগ করে তিনি সুপার ফসফেট অব লাইম তৈরি করেছেন। 


হাতে-কলমে গবেষণা শুধুমাত্র নয়, তাঁর নজর ছিল শিক্ষার্থীরা যেন বিজ্ঞানমনষ্ক হয়ে ওঠেন। একারণে অনেক কাজ করতেন একান্ত স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীতে। ক্লাসে রসায়নের পরীক্ষা করে দেখাতে গিয়ে তিনি একটি হাড়ের টুকরো বুনসেন বার্নারে উত্তপ্ত করে দেখালেন যে, তা ক্যালসিয়াম অক্সাইডে পরিবর্তিত হয়ে গেছে। তারপর হঠাৎই সেটাকে নিজের মুখে পুরে দিতেন। শিক্ষার্থীরা আঁতকে উঠতো - কোন প্রাণীর হাড় তা কি জানি, তা আবার খাওয়ার বিধান আছে কি-না! শিক্ষার্থীদের এই ভ্যাবাচেকা অবস্থা দেখে তিনি নিজেই বুঝিযে বলতেন, হাড় গরুরই হোক বা শুকরেরই হোক, এখন তা শুধুমাত্র ক্যালসিয়াম অক্সাইড। এভাবেই তিনি শিক্ষার্থীদের মনোজগতে যুক্তিবাদিতা গেঁথে দেয়ার চেষ্টা করতেন।


শুধুমাত্র গবেষণা নয়, গবেষণার ফলাফল কাজে লাগানোর জন্যে তিনি শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে মানুষকে উদ্বুদ্ধ ও সহায়তা করেছেন। প্রতিষ্ঠা করেন বেঙ্গল কেমিক্যাল এন্ড ফার্মাসিউটিক্যালস ওয়ার্কস। নিজের সর্বস্ব দিয়ে এবং প্রচুর পরিশ্রমে জোগাড় করেন প্রয়োজনীয় মুলধন। বাজার তৈরি করতে নিজে ব্যাগে করে ওষুধের নমুনা নিয়ে দোকানে দোকানে ঘুরেছেন। এরপর ধীরে ধীরে কোম্পানি বড় হয়। কয়েক বছরের মধ্যেই বেশ কিছু রাসায়নিক এবং ওষুধের ক্ষেত্রে বেঙ্গল কেমিক্যাল বিদেশী কোম্পানিকে হঠিয়ে বাজার দখলে নিতে সক্ষম হয়। 


তাঁর পরামর্শেই গড়ে ওঠে দি বেঙ্গল এনামেল ওয়ার্কস লিমিটেড। বেঙ্গল স্টীম নেভিগেশন কোম্পানী নামের একটি জাহাজ কোম্পানীর সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন।  বলা হয়, ১৯১০ সাল থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত যেসব শিল্প প্রতিষ্ঠানের আগে বেঙ্গল শব্দটি যুক্ত ছিল তার সবগুলির সঙ্গে আচার্যদেবের সংযুক্তি ছিল। তিনি নিজ হাতে যেমন শিল্প কল-কারখানা গড়ে তুলেছেন, তেমনি অন্যদের উৎসাহও দিয়েছেন। সেই সময়ে ভারতের বিভিন্ন জায়গায় আয়োজিত শিল্পমেলায় তিনি বক্তৃতা করেছেন। করাচীতে শিল্পমেলার উদ্বোধন উপলক্ষে গিয়ে তিনি সেখানকার সমবায় ব্যাঙ্ক উদ্বোধন করেন। 


১৯৩৪ সালে তিনি খুলনায় বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের জন্যে একটি কাপড়ের কল স্থাপনের উদ্যোগ নেন। তিনি তাঁর উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্থানীয় ধনাঢ্য ব্যক্তি ও রাজনীতিকদের সাথে আলোচনা করেন এবং এই উদ্যোগে সাড়া দেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে অনেকেই এগিয়ে আসেন। প্রতিষ্ঠিত হয় কটন মিল। নামকরণ করা হয় প্রফুল্ল চন্দ্র কটন মিলস্ লি:। পরবর্তীতে এই মিলটির নাম পাল্টে নতুন নাম হয় খুলনা টেক্সটাইল মিলস লি:।


নিজের নিতান্ত ব্যক্তিগত প্রয়োজন ছাড়া তাঁর আর কোন খরচ ছিল না। নিজের সকল অর্থ ব্যয় করেছেন মানুষের হিতার্থে। শিক্ষা বিস্তারের জন্যে নিজের অর্থে অনেকগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। বাগেরহাটের পিসি কলেজ, খুলনা শহরের এপিসি স্কুল, রাঢ়ুলিতে একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাঁর অবদান। মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছেন সঞ্চয়ে, গড়ে তুলেছেন সমবায় ব্যাঙ্ক। রাজনীতি সরাসরি না করলেও রাজনীতির সঙ্গে ছিল তাঁর গভীর যোগাযোগ। মারাঠী রাজনীতিক গোখলের সঙ্গে ছিল তাঁর গভীর সখ্য। বয়সে গোখলে প্রফুল্ল চন্দ্রের ছোট ছিলেন। গোখলে আচার্যদেবকে বলতেন, ‘বৈজ্ঞানিক সন্ন্যাসী।’ গোখলের মাধ্যমে তাঁর সখ্য হয় গান্ধীর সঙ্গে। 


সরকারি চাকুরি করার কারণে তিনি কোন আন্দোলন সরাসরি সমর্থন করেননি। তবুও বৃটিশ গোয়েন্দাদের মতে, তিনি ছিলেন বিজ্ঞানী বেশে বিপ্লবী। যে কোন নাগরিককে গ্রেফতার করে বিনা বিচারে আটক রাখার আইন পাশ হওয়ার পর ১৯১৯ সালের ১৮ জানুয়ারি কলকাতার টাউন হলে এক প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ এতে সভাপতিত্ব করেন। সেখানে বিজ্ঞানী প্রফুল্ল চন্দ্র বক্তৃতা করেন। তিনি বলেন, ‘আমি বৈজ্ঞানিক, গবেষণাগারেই আমার কাজ, কিন্তু এমন সময় আসে যখন বৈজ্ঞানিককেও দেশের আহ্বানে সাড়া দিতে হয়। আমি অনিষ্টকর এই আইনের তীব্র প্রতিবাদ করিতেছি।’ 


জালিওয়ানালাবাগ হত্যাকান্ডের পর তিনি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে বেশ যুক্ত হয়েছিলেন। এসম্পর্কে তিনি নিজেই লিখেছেন, ‘১৯২১-২৬ এই ছয় বৎসরে আমি দেশের সর্বত্র ঘুরিয়া জাতীয় বিদ্যালয় রক্ষার প্রয়োজনীয়তা, খদ্দর প্রচলন এবং অস্পৃশ্যতা বর্জনের জন্য প্রচার কার্য করিয়াছি। খুলনা, দিনাজপুর, কটক প্রভৃতি স্থানে কয়েকটি জেলা সম্মেলনে আমাকে সভাপতিত্ব করিতে হইয়াছে। কেননা ওই সময়ে প্রায় সমস্ত খ্যাতনামা রাজনৈতিক নেতাই অবরুদ্ধ ছিলেন। অসহযোগ আন্দোলনের যখন পূর্ণবেগ সেই সময় আমি ঘোষণা করিয়াছি— বিজ্ঞান অপেক্ষা করিতে পারে কিন্তু স্বরাজ অপেক্ষা করিতে পারে না।’ 


১৯১৯ ও ১৯২০ সালে পরপর দুই বছর অনাবৃষ্টির ফলে সমগ্র খুলনা (বর্তমানের খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলা) জেলায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। অজন্মার কারণে তখনকার সাতক্ষীরা মহকুমা জুড়ে এবং পাইকগাছা (বর্তমানের পাইকগাছা ও কয়রা) ও দাকোপ থানা এলাকায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। ১৯২১ সালে চতুর্থবার বিলেত থেকে আসার পর গরমের ছুটিতে গ্রামে বেড়াতে এসে তিনি দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করেন। বহু মানুষ ততোদিনে মারা গেছেন। অখাদ্য, কু-খাদ্য খেয়ে পচা দূষিত জল পান করে রোগ-ব্যাধির প্রকোপ বাড়ে। ছড়িয়ে পড়ে ম্যালেরিয়া। জেলা কালেকটরেট (বর্তমানের জেলা প্রশাসক) এই দুর্ভিক্ষের কথা স্বীকার করেনি। মানুষকে বাঁচাতে এই মহান মানুষটির নেতৃত্বে গড়ে ওঠে রিলিফ কমিটি। ১৯২২ সালে উত্তরবঙ্গে ভয়াবহ বন্যা হলে সেখানেও তিনি ছুটে যান। সেখানকার মানুষদের রক্ষায় গঠিত ত্রাণ কমিটিরও তিনি সভাপতি নির্বাচিত হন। 


ভারতে বিধিবদ্ধ সমবায় আইন চালু হয় ১৯০৪ সালে। ১৯০৬ সালে তিনি রাড়ুলি ও আশেপাশের গ্রামের মানুষদের জড়ো করে ৪১টি কৃষি ঋণদান সমবায় সমিতি গড়ে তোলেন। ১৯০৮ সালে আচার্যদেব ও তাঁর ভাই রায়সাহেব নলিনীকান্ত রায়-চৌধুরীর চেষ্টায় সমবায় সমিতিগুলো নিয়ে রাড়ুলি সেন্ট্রাল কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠা করেন। যা ছিল অবিভক্ত বাংলায় তৃতীয় ব্যাঙ্ক। 


চিরকুমার প্রফুল্ল চন্দ্রের জীবন ছিল অনাড়ম্বর। ছাত্রদের সঙ্গে ছিল নিবিড় বন্ধুত্বের সম্পর্ক। জাতীয় শিক্ষা ও শিল্পোদ্যেগের প্রতি ছিল অকৃপণ সহায়তা। মানব কল্যানে নিজের অর্জিত সকল অর্থ অকাতরে দান করেছেন। ইতিহাস, ইংরেজি ও বাংলা সাহিত্যের প্রতি তাঁর ছিল বিশেষ অনুরাগ। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে তিনি অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। ’বাঙালির মস্তিষ্ক ও তাহার অপব্যবহার’ এবং ’অন্ন সমস্যায় বাঙালির পরাজয় ও তাহার প্রতিকার’ তাঁর লেখা অন্যতম দু’টি গ্রন্থ। ব্রিটিশ সরকারের সিআইই ও নাইট উপাধি ছাড়াও দেশী-বিদেশী চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডিগ্রী পান এবং লন্ডন ও মিউনিখ বিশ্বদ্যিালয় তাঁকে সম্মানিত সদস্যরূপে গ্রহণ করে। ১৯১০ সালে রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলন এবং ১৯২০ সালে ভারতীয় বিজ্ঞান সভার তিনি ছিলেন মূল সভাপতি।


যুক্তিবাদিতা ধারণ ও চর্চা করা এবং শিক্ষার্থীদের মাঝে তা ছড়িয়ে দেয়ার নিয়ত যে চেষ্টা তিনি করেছেন, তার শতভাগ সফলতা যে পেয়েছেন, এমনটি নয়। এ নিয়ে তাঁর বেদনাও ছিল। তিনি লিখেছেন, ’প্রায় অর্ধ শতাব্দীকাল অধ্যাপনার কাজ করিয়া আসিতেছি এবং সেই উপলক্ষ্যে কত হাজার ছাত্রকে বুঝাইয়া দিয়াছি যে, সূর্য এবং চন্দ্রগ্রহণ রাহু নামক কোন রাক্ষসের ক্ষুধা নিবারণের চেষ্টায় সূর্য এবং চন্দ্রকে গলধ:করণের ফলে সংঘটিত হয়না এবং শেষে মর্তবাসীদের কাঁসর, ঘন্টা, ঝাঁজর এবং খোল করতালের সংযোগে পূজা অর্চনার ফলে রাক্ষসাধিপতি রাহু তৃপ্ত ও তুষ্ট হইয়া কবলিত চন্দ্রসূর্যকে ছাড়িয়া দেওয়ার ফলেই তাহাদের মুক্তি সংঘটিত হয় না। এই যে সকল জনশ্রুতি, ইহা নিছক মিথ্যা ও কল্পনাপ্রসূত। ..... আজ অর্ধ শতাব্দীকাল ছাত্রদিগকে এই বৈজ্ঞানিক সত্যের ব্যাখ্যা করিয়া বুঝাইয়া আসিলাম, তাহারাও বেশ বুঝিল এবং মানিয়া লইল, কিন্তু গ্রহণের দিন যেই ঘরে ঘরে শঙ্খ-ঘন্টা বাজিয়া ওঠে এবং খোল-করতাল সহযোগে দলে দলে কীর্তনীয়ারা রাস্তায় মিছিল বাহির করে, অমনি এই সকল সত্যের পূজারীরাও সকল শিক্ষাদীক্ষা জলাঞ্জলি দিয়া দলে ভিড়িতে আরম্ভ করে।’


জাতপাতের প্রসঙ্গে তাঁর লেখনি ছিল আরও নির্মম -'হায় আমরা কি মানুষ? ঐ যে হাঁড়ী, ডোম, বাগদী, চামার, মালী, মাইঠ্যাল তোমার বাড়ির আশেপাশে চারিদিকে অজান্তে অন্ধকারে আচ্ছন্ন হইয়া পড়িয়া আছে এবং পশুর জীবন যাপন করিতেছে, উহাদের উন্নতির জন্য তোমরা যুগ-যগান্ত কি করেছ বলিতে পার? তোমরা তাঁহাদের ছোঁও না, কাছে আসতে দাও না, দূর দূর কর। জাপানি কুকুরটাকেও আদর করিয়া কোলে পিঠে নিয়ে বেড়াও আর সুশ্রী সবল হৃষ্টপুষ্ট নাদুস নুদুস মুচির ছেলেটি যদি ঘরের দাওয়ায় হামা দিয়া ওঠে’ তবে জাত গেল, ধর্ম গেল বলিয়া হুঙ্কার দিয়া উঠ।’.........       

৭৫ বছর বয়সে তিনি পালিত অধ্যাপক হিসেবে অবসর নেয়ার পরও আট বছর বেঁচেছিলেন। সেই সময়ও কেটেছে বিজ্ঞান কলেজের ওই ছোট কক্ষে। যেখানে ছিল একটা খাটিয়া, দুটি চেয়ার, খাওয়ার ছোট একটি টেবিল, একটি পড়ার টেবিল ও একটি আলনা। যেসব ছেলেরা তাঁর কাছে থাকতেন তাঁরই একজনের হাতে মাথা রেখে তিনি শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন ১৯৪৪ সালের ১৬ জুন। নিভে যায় এক ত্যাগী কর্মবীরের জীবন। যাঁর সাহিত্য ও ইতিহাসে ছিল অবাধ গতি। মনের চোখ ছিল খোলা। অদম্য জ্ঞানস্পৃহা। মানব দরদি এক মন। অদমনীয় কর্মোদ্যোগ। আর বিজ্ঞানচেতনা প্রসারে আপসহীন। 

—————————————

✍🏼 গৌরাঙ্গ নন্দী, খুলনা।

     (সংগ্রহ)

Wednesday, May 26, 2021

22>|| কবির বিদায় কালে ||

   

22>|| কবির বিদায় কালে ||


দোহাই ডাক্তার, আর যাই করো। অপারেশানের কথা বোলো না। কাতরস্বরে বললেন রবীন্দ্রনাথ।


বিধান রায় একটু যেন বিরক্তই হলেন। তবু যথাসম্ভব গলাটা মিষ্টি করে বললেন - কেন এরকম ছেলেমানুষি করছেন বলুন তো। অলরেডি অনেক দেরী হয়ে গেছে। তখন পইপই করে বারণ করলাম। শুনলেন না। কালিম্পং যাবার পরই কিরকম বাড়াবাড়ি হল দেখলেন ত ?


অভিমানী রোগী মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইলেন।


ধন্বন্তরি চিকিৎসক এবার হেসেই ফেললেন। নাহ্। আপনি রেগে গেছেন দেখছি। আচ্ছা, আপনার এর আগে অপারেশান হয়নি ?


হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ধীরেধীরে বললেন। লন্ডনে।পাইলসের জন্যে। প্রায় আঠাশ ঊনত্রিশ বছর আগে।


তারপর কেমন ছিলেন। ভাল না ?


তা অবশ্য। একেবারে ভাল না হলেও, নাইনটি পারসেন্ট ত বটেই।


তাহলে ?


মনটা মানছে না হে। বুঝতে পারছি তোমাদের যুক্তি। আমি বুঝতে পারছি পরপারের ডাক এসে গেছে। তাই চাইছি আমার এই শরীরটা যথাসম্ভব নিটোলভাবে তেনার হাতে সমর্পণ করতে।


না। না। এরকম বলছেন কেন। প্রস্টেটটা বড় হয়ে গিয়ে ঝামেলা করছে। শরীরে ইউরিয়া বেড়ে যাচ্ছে। সুপ্রাপিউবিক সিস্টোস্টমি করে দিলেই ঝামেলা চুকে যাবে। বিধান রায় আশ্বাস দিলেন।


ও বাবা। কি অপারেশান ? এ তো বড্ড খটোমটো নাম।


মানে হল ইউরিনারি সিস্টেমের বাইপাস। ইউরিনটা আর আটকাবে না।


তাই বলো। যার ভালো নাম জ্যোতিষার্ণব, তারই ডাক নাম যতে। রবীন্দ্রনাথ মুচকি হেসে বললেন।


আজ তাহলে উঠি ?

বিধান রায় উঠে পড়লেন। শান্তিনিকেতন যেতে চান শুনলাম। যান, ঘুরে আসুন। তারপর একটা সেলুন কার বুক করে চটপট জোড়াসাঁকো চলে আসুন। দেরী করবেন না।


আর দেরি ! মরার জন্য আমার তর সইছে না। অস্ফুটে বললেন রবীন্দ্রনাথ।


কিছু বললেন নাকি। বিধান রায় আবার ঘুরে দাঁড়ালেন।


না, কিছু না। তুমি সাবধানে যেও।


শান্তিনিকেতনে ফিরেও একই সমস্যা।

রথীন্দ্রনাথও একদিন বলেই ফেললেন - বাবামশাই, অপারেশানটা করিয়েই নিন। সবাই বলছে।


দূর, তোমাদের সবারই এক কথা। আমার শরীরটাও ফুটোফাটা না করে কারোর শান্তি নেই।

রবীন্দ্রনাথ পাশ ফিরে শুলেন। বড্ড হতাশ লাগছে। বহুদিন আগে কান ভনভনানির জন্য ইউনানি ওষুধ খেলেছিলেন। তাতে রোগ সারলো। কিন্তু বড্ড ডিপ্রশান হয়েছিল। অ্যালোপাথির নাম শুনলেই সেইরকম ডিপ্রেশন যেন ফিরে ফিরে আসছে। আর এই কাটাছেঁড়ার কথা ভাবলেই কবির হাত পা যেন ঠান্ডা হয়ে আসে। তিনি নিজেই বুঝতে পারছেন তার যাবার সময় এগিয়ে আসছে। একসময় কত অত্যাচারই না করেছেন শরীরের ওপর। রোদে পুড়েছেন, জলে ভিজেছেন। কিস্যু হয় নি। আর এখন এত যত্নের মধ্যে থেকেও ......


দুরে আলোর একটা ঝলকানি, না ? তার মধ্যে দিয়ে একটা মানুষের অবয়ব ফুটে উঠছে না ? তবে কি ডাক এসে গেল ! ধড়মড় করে উঠে বসলেন রবীন্দ্রনাথ।

ও হরি। স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন।


এই কে আছ। একটা খাতা পেন নিয়ে এসো না।


ছুটে এলেন রানী। এই যে গুরুদেব। বলুন কাকে কি চিঠি লিখতে হবে ?


না। একটা গান লেখ ত। ওই মহামানব আসে / দিকে দিকে রোমাঞ্চ জাগে ....।


কি সুন্দর গান, গুরুদেব। আর কি মিষ্টি সুরটা !


ভালো হয়েছে না ? ছেলেমানুষের মত খুসি হলেন কবিগুরু। তাহলে এখনো ফুরোই নি ? নিজের মনেই বিড়বিড় করলেন।


পরের দিন আবার ডাক। একটা ছড়া লেখো না।


বলুন গুরুদেব।


লেখো - গলদা চিংড়ি তিংড়ি মিংড়ি / লম্বা দাঁড়ার করতাল।


বেশ কয়েকদিন কেটে গেল। জীবনের শেষ পৌষমেলা চলে গেল। এবারই প্রথম পৌষ উৎসবের প্রার্থনায় অংশ নিতে পারলেন না। বড্ড মন খারাপ লাগছিল, বাপ পিতেমোর ঐতিহ্য। এবারই তাতে ফাঁকি পড়ে গেল। কি করে যাবেন। প্রায় রোজই জ্বর আসে। কবিরাজ মশাই বলেছেন ভাল করে দেবেন। সেই ভরসাতেই শান্তিনিকেতন ছাড়ছেন না। কেটে গেল জীবনের শেষ পঁচিশে বৈশাখও।


মাঝে মাঝে বেশ ভাল লাগে। শরীরটা পুরোনো দিনের মতই তরতাজা লাগেই। তারপর যে কে সেই। এরই মধ্যে চলছে কবিতা লেখা, গান লেখা।


কি করে যে পারেন সবাই অবাক হয়। রবীন্দ্রনাথ কি করে বোঝাবেন ! তিনি তো অক্ষরগুলোকে যেন চোখের সামনে দেখতে পান। কি মসৃণ ভাবেই না তারা একে অপরের ঘাড়ে চড়ে বসে কবিতা আর গান হয়ে যায় !

কিন্তু কয়েকদিন পরে তাও যেন বন্ধ হয়ে গেল। আর শান্তিনিকেতনে রাখাটা খুবই ঝুঁকির হয়ে যাবে সবাই এখন বুঝতে পারছে। প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশও তাগাদা করতে থাকলেন। অগত্যা কবিও মত দিলেন। ওদিকে বিধান রায়ও ভীষণ রাগারাগি করছেন। দিন ঠিক হল।


ন'ই শ্রাবণ। জুলাই মাসের পঁচিশ তারিখ। শান্তিনিকেতন থেকে শেষ যাত্রা শুরু করলেন কবিগুরু। সেই কবে বাবার হাত ধরে ছোট্ট রবির এখানে আসা। কবি নিশ্চিত - আর কোনদিনই দেখতে পাবেন না এই তাল তমাল গাছ, সেই খোয়াই। কেন জানি না আজ মৃণালিনীর কথাও বড্ড মনে পড়ছে। কি ভালই যে সে বাসত এই শান্তিনিকেতন। ও না থাকলে আজ কি কবির স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যেত। আর কি সাংঘাতিক পরিশ্রমই না সে করত। এককথায় সমস্ত গয়নাগাটি সে বন্ধক রেখে দিয়েছিল।


বড্ড কান্না পাচ্ছে। এমনিতে মনের আবেগ সহজে প্রকাশ করেন না রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু আজ ছেলেমানুষের মত কান্না পাচ্ছে !

বউমা, দেখ তো একটা গগলস পাও কিনা।

কয়েকদিন আগে রবীন্দ্রনাথের চুল দাড়ি ছোট করে কাটিয়ে দেওয়া হয়েছে। গগলস পরে বেশ কিম্ভুত টাইপের দেখতে লাগছে নিজেকে। এত দু:খের মধ্যেও রবীন্দ্রনাথ ফিক করে হেসে নিলেন। ই আই আর এর নিবারণ চন্দ্র ঘোষ তার নিজের সেলুনখানা কবিকে দিয়ে দিয়েছেন। তবে ভীষণ গরম। অনেক দিন আগে, ভিজিয়ানাগ্রামে ট্রেনে যেতে যেতে মনে হয়েছিল ট্রেনটা যেন অবিরত ‘সেনগুপ্ত দাশগুপ্ত- সেনগুপ্ত দাশগুপ্ত’ বলতে বলতে ছুটে চলেছে। সেক্রেটারি অনিলের স্ত্রী রানী চন্দকেও বলেছিলেন সেই কথাটা। আজ আবার মনে পড়ে গেল। সেই নিয়ে প্রথমে একটু হাসিঠাট্টা করলেও ট্রেনজার্নি করতে করতেই কিন্তু কবি আবার বেহুঁশ হয়ে গেলেন। কখন যে জোড়াসাঁকোর বাড়িতে ঢুকলেন তা তিনি টেরও পেলেন না।


পরেরদিনই আবার সজ্ঞানে।

কোথায় আমার অপারেশান হবে ? কবি জানতে চাইলেন।


হসপিটালে অপারেশান হবে না। বাড়িরই একটা বারান্দাকে একদম স্টেরিলাইজ করা হয়েছে। সেখানেই হবে।


যাক বাবা । যেখানে জন্মেছি, সেখানেই মরব। মৃদুস্বরে বললেন রবীন্দ্রনাথ।


কিছু বললেন নাকি, গুরুদেব। জিজ্ঞাসা করলেন ডাক্তার নীলরতন সরকার। তিনি এখন প্রায় রোজই আসেন। প্রথিতযশা ডাক্তারদের মধ্যে তিনিই একমাত্র যিনি অপারেশানের বিপক্ষে। বারবার বলছেন - বিধান , সাধারণ পেশেন্ট আর রবীন্দ্রনাথের শরীর কিন্তু সমান নয়। অপারেশানের ফল খারাপও হতে পারে। অথচ আর কোন বিকল্প পথও তিনি দেখাতে পারেন নি।


ব্লাড আর ইউরিন টেস্ট প্রায় রোজই হচ্ছে। নিউট্রোফিল কাউন্টটা একটু বেশী। ইউরিনে ই কোলাইও বড্ড।


মঙ্গলবার দিন। ঊনত্রিশে জুলাই। কবি উচ্চারণ করলেন তার শেষ কবিতা।


তোমার সৃষ্টির পথ / রেখেছ আকীর্ণ করি / বিচিত্র ছলনাজালে / হে ছলনাময়ী / শেষ পুরষ্কার নিয়ে যায় সে যে / আপন ভান্ডারে / অনায়াসে যে পেরেছে ছলনা সহিতে / সে পায় তোমার হাতে / শান্তির অক্ষয় অধিকার।


লিখেও কবির মন খুঁতখুঁত। একটু যেন ন্যাড়া ন্যাড়া লাগছে। কাল ঠিক করে দেব। ভাবলেন কবি।

কিন্তু সে সুযোগ তিনি আর পেলেন না।


সকালে মেজাজটা বেশ ভালো। কারণ শরীরটা শরীফ। কফি আর পেঁপে খেলেন। কবিতাটা নিয়ে বসবেন ভাবছেন। এমন সময় আবির্ভাব ডাক্তার ললিত ব্যানার্জির। নামকরা সার্জেন।


তাহলে আজই ওটিটা করে দিই ?


ওটি আবার কি ? এটি, সেটি, ওটি।


আজ্ঞে। অপারেশানটা। ওটি মানে অপারেশান। আজই করে দি। টুকুস করে হয়ে যাবে !


করে দাও। ( পড়েছ যবনের হাতে ....।)


সকাল থেকে কিছু খান নি ত ?


খেয়েছি ত। পেঁপে আর ....


অ। ঠিক হ্যায়। তাহলে ত অজ্ঞান করা যাবে না। লোকাল অ্যানেস্থেশিয়া দিয়ে করে দেব। কিচ্ছু টের পাবেন না।


কবি কিন্তু খুবই ব্যথা পেলেন। মুখ বুজে সহ্য করলেন। কোনো অনুযোগ করলেন না। দুতিন দিন সাবধানে থাকতে হবে। কারণ ইনফেকশান যা হবার তা সাধারণত তিন দিনের মধ্যেই হয়।


হল ঠিক উল্টো।

অসুস্থতা বাড়ল তিনদিন পর থেকে। ডাক্তারেরা প্রথমে বেশ খুশী খুশী ছিলেন। কবিগুরু বোধহয় এ যাত্রাতেও সয়ে গেলেন। অসম্ভব ওনার জীবনীশক্তি। এর আগে ভয়ানক ইরিসেপেলাস রোগে টানা পঞ্চাশ ঘন্টা অজ্ঞান ছিলেন। সবাইকে অবাক করে সেবার কিন্তু উঠে বসেছিলেন।


তিনদিন পর থেকে জ্বর আবার ফিরে এল। কবি প্রায়ই বেহুঁশ হয়ে যেতে থাকলেন। যখনই জ্ঞান আসে তখন খালি বলেন - জ্বালা, গায়ে বড্ড জ্বালা। ইউরিনের পরিমাণ ক্রমশ কমতে থাকল, কিন্তু পাস্ সেল অনেক বেড়ে গেল। ডাক্তারেরা বুঝতে পারলেন এবার তারা পরাজিত হবেন। হিক্কা কমাতে না পেরে বিধান রায় অসহায়ভাবে বাড়ির মহিলাদের কাছে বললেন- নাহ্। আমি পারলাম না। এত দেরী করে অপারেশান হল ! তোমরা ত অনেক টোটকা জানো। দ্যাখো না। চেষ্টা করে। যদি কিছু হয় !


বাইশে শ্রাবণ। বুধবার। আগস্ট মাসের ছয় তারিখ।

কবির রেডিয়াল পালস প্রায় অন্তর্হিত।


অমিতা ঠাকুর প্রার্থনা করছেন - 

শান্তম্ শিবম্ অদ্বৈতম্। কবির প্রিয় মন্ত্র।

প্রার্থনা করছেন রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়। প্রার্থনা করছেন নির্মলকুমারী মহলানবীশ। তমসো মা জ্যোতির্গময়।

কবির পদতলে রাখা হল চাঁপাফুল। রবীন্দ্রনাথের বড় প্রিয়।

চিনা অধ্যাপক তান ইয়ুন শান নিজস্ব ভাষায় প্রেয়ার করছেন।


বেলা বারোটা বেজে নয় মিনিট।

এতক্ষণ অচেতন কবি যেন সজ্ঞানে ফিরে এলেন। এত ঝরঝরে তিনি বহুদিন বোধ করেন নি। তার শরীরটা যেন লাফিয়ে উঠে ভাসতে লাগল। আরে, একি। তিনি ত সবাইকে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছেন। এমনকি তার শায়িত শরীরটাও ! এই কি তবে মৃত্যু ? এতো বড়ই আরামপ্রদ অনুভূতি। একে তাহলে এতদিন মিছেই ভয় পেয়েছিলেন। বাহ্। কি সুন্দর তিনি ভেসে বেড়াচ্ছেন। ঐ তো শিলাইদহের জমি, আকাশ, নদী। আগে কি যেন নাম ছিল ? হ্যাঁ, হ্যাঁ, মনে পড়েছে। খোরশেদপুর। ঐ তো। পতিসর। যেখানকার তিনি এখনো জমিদার। এখানকার প্রজারা তার যেন বেশী আপনজন। বড় সরল আর পরিশ্রমী ছিল। বিদায়। সবাই ভাল থেক। আরে, সামনে ওটা মৃণালিনী না ? কি যেন বলছে। আজ আমাদের ছুটি, ছুটি, ছুটি। হ্যাঁ গো, আজ আমাদের সব কাজ থেকে ছুটি। ছুটি তোমার বড় প্রিয়, তাই না ? তাই তো তোমার ডাকনামও 'ছুটি'। হাত বাড়িয়ে ওটা কে ? বাবামশাই ! পিছনে দাঁডিয়ে মিটমিট করে হাসছেন, কে উনি ? ও। দাদামশাই। প্রিন্স দ্বারকানাথ। দাদামশাই, আপনার সম্বন্ধে একসময় আমার অনেক ভুল ধারণা ছিল। আমি আপনার ব্যবসার কত জরুরী কাগজ পুড়িয়ে ফেলেছিলাম। আমায় মার্জনা করবেন। কবি হাত জোড় করে প্রার্থনা করলেন। দ্বারকানাথ বুকে টেনে নিলেন তার বংশের সবচেয়ে খ্যাতিমান পুরুষটিকে।


জোড়াসাঁকোয় কবির ঘরটিতে উঠেছে কান্নার রোল। কবি চলে গেছেন। কিন্তু, এ কি। কবির হাতদুটো হঠাৎ বুকের কাছে চলে এল কেন ? কবি কি তাহলে সবার কাছে বিদায় চাইলেন। বলে গেলেন -

পেয়েছি ছুটি / বিদায় দেহ ভাই / সবারে আমি প্রণাম করে যাই।


হাতদুটো আবার এলিয়ে পড়ল।

কবি চিরতরে বিদায় নিলেন।


পৃথিবী আরো একটু দীন হল।


.


(সংগৃহীত)

Monday, April 19, 2021

21>নজরুল=উমা মুখার্জি/ উমা কাজী। ( সংগ্রহ 1--7) )

 21/1>নজরুল=উমা মুখার্জি/ উমা কাজী

2>কাজী নজরুল ইসলাম ও আব্বাসউদ্দীন।

3>দুই.গান লেখা নজরুলের সহজাত প্রতিভা ছিল।

4>তিন. কাজী নজরুল ইসলাম বিখ্যাত হয়ে আছেন তাঁর রচিত নাতে রাসূলের জন্য।

5>আব্বাসউদ্দীন আহমদ বাংলা লোকসঙ্গীত গায়ক

6>কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিনে,

7>জানা অজানায় নজরুল

=====================

21/1>নজরুল=উমা মুখার্জি/ উমা কাজী।

【কাজী নজরুল ইসলাম (২৪ মে ১৮৯৯ – ২৯ আগস্ট ১৯৭৬; ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ – ১২ ভাদ্র ১৩৮৩ বঙ্গাব্দ(বাংলাদেশ ) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রধান বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও সঙ্গীতজ্ঞ। তার মাত্র ২৩ বছরের সাহিত্যিক জীবনে সৃষ্টির যে প্রাচুর্য তা তুলনারহিত। সাহিত্যের নানা শাখায় বিচরণ করলেও তার প্রধান পরিচয় তিনি কবি। 】


বর্ধমানের এক ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম। পড়াশোনা করেছিলেন নার্সিং এর ওপর, এরপর কোলকাতার লেডি ডাফরিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নার্স হিসাবে কর্মরত ছিলেন।

কাজী নজরুল ইসলাম ততোদিনে জীবনীশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। নির্বাক কবির স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধিও লোপ পেয়েছে ইতোমধ্যে। বাঁধনহারা চিরবিদ্রোহী যেই কবি চষে বেড়িয়েছেন সবদিকে, সেই কবির জীবনের গন্ডি আঁটকে গেলো বাড়ির চারদেয়ালের মধ্যে।

কবিপত্নী প্রমীলাও ততোদিনে অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী। তাহলে কবির সেবাযত্ন করবে কে? এজন্য বাড়িতে একজন সার্বক্ষণিক নার্সের দরকার পড়লো।

লেডি ডাফরিন হাসপাতালের হেডনার্সের পরামর্শে উমা সেই দায়িত্বটা নিতে আগ্রহ প্রকাশ করলেন। নজরুল ততোদিনে উভয় বাংলায় তুমুল জনপ্রিয় নাম, তার সেবিকা হওয়ার মাঝেও একটা বড় গৌরব আছে।

বাড়িতে দেখতে গিয়ে কবির একদম মাথার কাছে বসলেন তরুণী উমা। কবিপত্নী প্রমীলা দেবী বললেন, “মা, তুমি কি পারবে কবির সেবা করতে? ওই যে দ্যাখো, উনি খবরের কাগজ ছিঁড়ছেন। উনি এখন শিশুর মতো।” এ প্রশ্নের উত্তরে উমা বললেন, “আমি তো কোলকাতার হাসপাতালে শিশু বিভাগেই ডিউটি করি। কবি যদি শিশুর মতো হন, তবে নিশ্চয়ই পারবো।”

এরপর থেকে কবির সব দায়দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নিলেন উমা। তাকে গোসল করানো, খাওয়ানো, দেখভাল করা সবকিছু পরম যত্নে করতেন তিনি। কবি তখন এতোটাই শিশুর মতো হয়ে গিয়েছিলেন যে তাকে গল্প শুনিয়ে শুনিয়ে খাইয়ে দিতে হতো। সেবা ও স্নেহের দ্বারা অল্পদিনেই কবির কাছে প্রিয় মানুষ হয়ে উঠলেন উমা।

এরইমধ্যে উমার এমন মিষ্টি ব্যবহার দেখে এবং তার দায়িত্বশীল মনোভাব দেখে তার প্রেমে পড়ে গেলো কবিপুত্র সব্যসাচী কাজী। উমার কাছে নিজের ভালোবাসার আহ্বান জানানোর পর উমাও 'না' করতে পারেন নি। দু'জনের ভেতর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠলো। বিয়েও করে ফেললেন তারা। বিয়ের পর উমা মুখার্জি হয়ে উঠলেন উমা কাজী। পুত্রবধুকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন প্রমীলা। 

এতদিন তার দায়িত্বে ছিলো শুধু এক কবি, এখন থেকে পুরো পরিবারের দায়িত্বই তার ওপর চলে গেলো। নিজের নতুন সংসার, কবির যত্ন, অসুস্থ প্রমীলার দেখাশোনা থেকে শুরু করে পুরো সংসারের সবকিছুই নিজের হাতে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সামলাতে শুরু করলেন উমা।

১৯৬২ সালে মাত্র ৫২ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন প্রমীলা কাজী। পুরো সংসারে নেমে এলো শোকের ছায়া। এই সংসারের সবকিছু একা হাতে সামলে নেওয়া শুরু করলেন উমা কাজী। 

সব্যসাচী-উমার ঘরে একে একে এলো তিন সন্তান। মিষ্টি কাজী, খিলখিল কাজী আর বাবুল কাজী। নাতি-নাতনির খেলার সাথী নজরুল। নজরুলও তো মনেপ্রাণে তখন শিশুর মতোই। নিজের সন্তানদের যেভাবে যত্ন করতেন উমা, তেমনি নজরুলকেও রাখতেন পরিপূর্ণ যত্নআত্তির ভেতর। কারণ উমা ছাড়া অন্যকেউ কবিকে সেভাবে বুঝতে পারতো না। পুত্রবধু হয়েও উমা যেন বাস্তবে হয়ে উঠলেন কবির মা। একদম মায়ের মত করেই তাকে আগলে রাখতেন। 

১৯৭২ সালে কবিকে সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশে নিয়ে আসা হলো। সব্যসাচী ব্যবসায়িক কাজে তখন বাংলাদেশে না আসতে পারলেও কবির সাথে নিজের ছেলেমেয়েদের নিয়ে বাংলাদেশে চলে আসলেন পুত্রবধু উমা। এরপর তাদের ঠিকানা হলো ধানমন্ডি।

বৌমা চন্দন সাবান দিয়ে গোসল করিয়ে না দিলে গোসল করেন না নজরুল, দাড়ি কেটে দেয় বৌমা-ই, গল্প করে করে খাইয়ে দিতে হবে বৌমাকেই, অন্যকেউ হলে চলবে না। বৌমার কাছে শিশুর মতো আবদার-বায়না করতেন কবি। 

এভাবেই বৌমা থেকে কবির স্বয়ং 'মা' হয়ে গিয়েছিলেন উমা কাজী। কবির জীবনের শেষদিন পর্যন্ত মায়ের মতোই সেবা করে গেছেন নির্বাক অসুস্থ কবির। 

১৯৭৬ সালে সবাইকে কাঁদিয়ে চিরবিদায় নিলেন দুই বাংলার তুমুল জনপ্রিয় কবি নজরুল। উমা যেন তার শ্বশুরকে নয়, হারালেন তার সন্তানকে, নার্সের সেবা করতে এসে যেই সন্তানের দায়িত্ব তিনি বুঝে নিয়েছিলেন, আমৃত্যু নিষ্ঠার সাথে সেই দায়িত্ব পালন করলেন তিনি। কোনদিনই একচুল হেরফের হয়নি।

উমা কাজী বাকী জীবনটা কাটিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশেই। ২০২০ সালে ঢাকায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ৮০ বছর বয়সী বৃদ্ধা উমা কাজী। 

      বিনম্র শ্রদ্ধার্ঘ    

          (সংগৃহীত)



=============================

2>কাজী নজরুল ইসলাম ও
আব্বাসউদ্দীন। ( সংগ্রহ )

শ্যামা সঙ্গীতের রেকর্ডিং শেষে কাজী নজরুল ইসলাম বাড়ি ফিরছেন। যাত্রাপথে তাঁর পথ আগলে ধরেন সুর সম্রাট আব্বাস উদ্দীন। একটা আবদার নিয়ে এসেছেন তিনি। আবদারটি না শোনা পর্যন্ত নজরুলকে তিনি এগুতে দিবেন না।

আব্বাস উদ্দীন নজরুলকে সম্মান করেন, সমীহ করে চলেন। নজরুলকে তিনি ‘কাজীদা’ বলে ডাকেন। নজরুল বললেন, “বলে ফেলো তোমার আবদার।”

আব্বাস উদ্দীন সুযোগটা পেয়ে গেলেন। বললেন, “কাজীদা, একটা কথা আপনাকে বলবো বলবো ভাবছি। দেখুন না, পিয়ারু কাওয়াল, কাল্লু কাওয়াল এরা কী সুন্দর উর্দু কাওয়ালী গায়। শুনেছি এদের গান অসম্ভব রকমের বিক্রি হয়। বাংলায় ইসলামি গান তো তেমন নেই। বাংলায় ইসলামি গান গেলে হয় না? আপনি যদি ইসলামি গান লেখেন, তাহলে মুসলমানদের ঘরে ঘরে আপনার জয়গান হবে।”

বাজারে তখন ট্রেন্ড চলছিলো শ্যামা সঙ্গীতের। শ্যামা সঙ্গীত গেয়ে সবাই রীতিমতো বিখ্যাত হয়ে যাচ্ছে। এই স্রোতে গা ভাসাতে গিয়ে অনেক মুসলিম শিল্পী হিন্দু নাম ধারণ করেন। মুনশী মোহাম্মদ কাসেম হয়ে যান ‘কে. মল্লিক’, তালাত মাহমুদ হয়ে যান ‘তপন কুমার’। মুসলিম নামে হিন্দু সঙ্গীত গাইলে গান চলবে না। নজরুল নিজেও শ্যামা সঙ্গীত লেখেন, সুর দেন।

গানের বাজারের যখন এই অবস্থা তখন আব্বাস উদ্দীনের এমন আবদারের জবাবে নজরুল কী উত্তর দেবেন? ‘ইসলাম’ শব্দটার সাথে তো তাঁর কতো আবেগ মিশে আছে। ছোটবেলায় মক্তবে পড়েছেন, কুর’আন শিখেছেন এমনকি তাঁর নিজের নামের সাথেও তো ‘ইসলাম’ আছে।

আব্বাস উদ্দীনকে তো এই মুহূর্তে সরাসরি ‘হ্যাঁ’ বলা যাচ্ছে না। স্রোতের বিপরীতে সুর মেলানো চট্টিখানি কথা না। আবেগে গা ভাসালে চলবে না। গান রেকর্ড করতে হলে তো বিনিয়োগ করতে হবে, সরঞ্জাম লাগবে। এগুলোর জন্য আবার ভগবতী বাবুর কাছে যেতে হবে। ভগবতী বাবু হলেন গ্রামোফোন কোম্পানির রিহার্সেল-ইন-চার্জ।

নজরুল বললেন, “আগে দেখো ভগবতী বাবুকে রাজী করাতে পারো কিনা।” আব্বাস উদ্দীন ভাবলেন, এইতো, কাজীদার কাছ থেকে সবুজ সংকেত পেলাম, ভগবতী বাবুকে কিভাবে রাজী করাতে হয় সেটা এখন দেখবেন।

গ্রামোফোনের রিহার্সেল-ইন-চার্জ ভগবতী বাবুর কাছে গিয়ে আব্বাস উদ্দীন অনুরোধ করলেন। কিন্তু, ভগবতী বাবু ঝুঁকি নিতে রাজী না। মার্কেট ট্রেন্ডের বাইরে গিয়ে বিনিয়োগ করলে ব্যবসায় লালবাতি জ্বলতে পারে। আব্বাস উদ্দীনযতোই তাঁকে অনুরোধ করছেন, ততোই তিনি বেঁকে বসছেন। ঐদিকে আব্বাস উদ্দীনও নাছোড়বান্দা। এতো বড় সুরকার হওয়া সত্ত্বেও তিনি ভগবতী বাবুর পিছু ছাড়ছেন না। অনুরোধ করেই যাচ্ছেন। দীর্ঘ ছয়মাস চললো অনুরোধ প্রয়াস। এ যেন পাথরে ফুল ফুটানোর আপ্রাণ চেষ্টা!

একদিন ভগবতী বাবুকে ফুরফুরে মেজাজে দেখে আব্বাস উদ্দীন বললেন, “একবার এক্সপেরিমেন্ট করে দেখুন না, যদি বিক্রি না হয় তাহলে আর নেবেন না। ক্ষতি কী?” ভগবতী বাবু আর কতো ‘না’ বলবেন। এবার হেসে বললেন, “নেহাতই নাছোড়বান্দা আপনি। আচ্ছা যান, করা যাবে। গান নিয়ে আসুন।” আব্বাস উদ্দীনের খুশিতে চোখে পানি আসার উপক্রম! যাক, সবাই রাজী। এবার একটা গান নিয়ে আসতে হবে।

নজরুল চা আর পান পছন্দ করেন। এক ঠোঙা পান আর চা নিয়ে আব্বাস উদ্দীন নজরুলের রুমে গেলেন। পান মুখে নজরুল খাতা কলম হাতে নিয়ে একটা রুমে ঢুকে পড়লেন। ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিলেন। ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে আব্বাস উদ্দীন খান অপেক্ষার প্রহর গুনছেন। আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্বের মতো সময় যেন থমকে আছে। সময় কাটানোর জন্য আব্বাস উদ্দীন পায়চারী করতে লাগলেন।

প্রায় আধ ঘন্টা কেটে গেলো। বন্ধ দরজা খুলে নজরুল বের হলেন। পানের পিক ফেলে আব্বাস উদ্দীনের হাতে একটা কাগজ দিলেন। এই কাগজ তাঁর আধ ঘন্টার সাধনা। আব্বাস উদ্দীনের ছয় মাসের পরিশ্রমের ফল।

আব্বাস উদ্দীন  কাগজটি হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করলেনঃ-

“ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ
তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানী তাগিদ।”

আব্বাস উদ্দীনের চোখ পানিতে ছলছল করছে। একটা গানের জন্য কতো কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে তাঁকে। সেই গানটি এখন তাঁর হাতের মুঠোয়। তিনি কি জানতেন, তাঁর হাতে বন্দী গানটি একদিন বাংলার ইথারে ইথারে পৌঁছে যাবে? ঈদের চাঁদ দেখার সাথে সাথে টিভিতে ভেজে উঠবে- ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে...?

...

দুই মাস পর রোজার ঈদ। গান লেখার চারদিনের মধ্যে গানের রেকর্ডিং শুরু হয়ে গেলো। আব্বাস উদ্দীন জীবনে এর আগে কখনো ইসলামি গান রেকর্ড করেননি। গানটি তাঁর মুখস্তও হয়নি এখনো। গানটা চলবে কিনা এই নিয়ে গ্রামোফোন কোম্পানি শঙ্কায় আছে। তবে কাজী নজরুল ইসলাম বেশ এক্সাইটেড। কিভাবে সুর দিতে হবে দেখিয়ে দিলেন।

হারমোনিয়ামের উপর আব্বাস উদ্দীনের চোখ বরাবর কাগজটি ধরে রাখলেন কাজী নজরুল ইসলাম নিজেই। সুর সম্রাট আব্বাস উদ্দীনের বিখ্যাত কণ্ঠ থেকে বের হলো- “ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ...”। ঈদের সময় গানের এ্যালবাম বাজারে আসবে। আপাতত সবাই ঈদের ছুটিতে।

রমজানের রোজার পর ঈদ এলো। আব্বাস উদ্দীন বাড়িতে ঈদ কাটালেন। কখন কলকাতায় যাবেন এই চিন্তায় তাঁর তর সইছে না। গানের কী অবস্থা তিনি জানেন না। তাড়াতাড়ি ছুটি কাটিয়ে কলকাতায় ফিরলেন।

ঈদের ছুটির পর প্রথমবারের মতো অফিসে যাচ্ছেন। ট্রামে চড়ে অফিসের পথে যতো এগুচ্ছেন, বুকটা ততো ধ্বকধ্বক ধ্বকধ্বক করছে। অফিসে গিয়ে কী দেখবেন? গানটা ফ্লপ হয়েছে? গানটা যদি ফ্লপ হয় তাহলে তো আর জীবনেও ইসলামি গানের কথা ভগবতী বাবুকে বলতে পারবেন না। ভগবতী বাবু কেন, কোনো গ্রামোফোন কোম্পানি আর রিস্ক নিতে রাজী হবে না। সুযোগ একবারই আসে।

আব্বাস উদ্দীন যখন এই চিন্তায় মগ্ন, তখন পাশে বসা এক যুবক গুনগুনিয়ে গাওয়া শুরু করলো- ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’। এই যুবক গানটি কোথায় শুনলো? নাকি আব্বাস উদ্দীন ভুল শুনছেন?

না তো। তিনি আবারো শুনলেন যুবকটি ঐ গানই গাচ্ছে। এবার তাঁর মনের মধ্যে এক শীতল বাতাস বয়ে গেলো। অফিস ফিরে বিকেলে যখন গড়ের মাঠে গেলেন তখন আরেকটা দৃশ্য দেখে এবার দ্বিগুণ অবাক হলেন। কয়েকটা ছেলে দলবেঁধে মাঠে বসে আছে। তারমধ্য থেকে একটা ছেলে গেয়ে উঠলো- ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’। আব্বাস উদ্দীন এতো আনন্দ একা সইতে পারলেন না। তাঁর সুখব্যথা হচ্ছে।

ছুটে চললেন নজরুলের কাছে। গিয়ে দেখলেন নজরুল দাবা খেলছেন। তিনি দাবা খেলা শুরু করলে দুনিয়া ভুলে যান। আশেপাশে কী হচ্ছে তার কোনো খেয়াল থাকে না। অথচ আজ আব্বাস উদ্দীনের গলার স্বর শুনার সাথে সাথে নজরুল দাবা খেলা ছেড়ে লাফিয়ে উঠে তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন। নজরুল বললেন, “আব্বাস, তোমার গান কী যে হিট হয়েছে!”

অল্প কয়দিনের মধ্যেই গানটির হাজার হাজার রেকর্ড বিক্রি হয়। ভগবতী বাবুও দারুণ খুশি। একসময় তিনি ইসলামি সঙ্গীতের প্রস্তাবে একবাক্যে ‘না’ বলে দিয়েছিলেন, আজ তিনিই নজরুল-আব্বাসকে বলছেন, “এবার আরো কয়েকটি ইসলামি গান গাও না!” শুরু হলো নজরুলের রচনায় আর আব্বাস উদ্দীনের কণ্ঠে ইসলামি গানের জাগরণ।

বাজারে এবার নতুন ট্রেন্ড শুরু হলো ইসলামি সঙ্গীতের। এই ট্রেন্ড শুধু মুসলমানকেই স্পর্শ করেনি, স্পর্শ করেছে হিন্দু শিল্পীদেরও।

একসময় মুসলিম শিল্পীরা শ্যামা সঙ্গীত গাইবার জন্য নাম পরিবর্তন করে হিন্দু নাম রাখতেন। এবার হিন্দু শিল্পীরা ইসলামি সঙ্গীত গাবার জন্য মুসলিম নাম রাখা শুরু করলেন। ধীরেন দাস হয়ে যান গণি মিয়া, চিত্ত রায় হয়ে যান দেলোয়ার হোসেন, গিরিন চক্রবর্তী হয়ে যান সোনা মিয়া, হরিমতি হয়ে যান সাকিনা বেগম, সীতা দেবী হয়ে যান দুলি বিবি, ঊষারাণী হয়ে যান রওশন আরা বেগম।

তবে বিখ্যাত অনেক হিন্দু শিল্পী স্ব-নামেও নজরুলের ইসলামি সঙ্গীত গেয়েছেন। যেমনঃ অজয় রায়, ড. অনুপ ঘোষল, আশা ভোঁসলে, মনোময় ভট্টাচার্য, রাঘব চট্টোপাধ্যায়।

3>দুই.গান লেখা নজরুলের সহজাত প্রতিভা ছিল।

কাজী নজরুল ইসলামের ইসলামি গান লেখার সহজাত প্রতিভা ছিলো। খাতা কলম দিয়ে যদি কেউ বলতো, একটা গান লিখুন, তিনি লিখে ফেলতেন।

একদিন আব্বাস উদ্দীন নজরুলের বাড়িতে গেলেন। নজরুল তখন কী একটা কাজে ব্যস্ত ছিলেন। আব্বাস উদ্দীনকে হাতের ইশারায় বসতে বলে আবার লেখা শুরু করলেন। ইতোমধ্যে যুহরের আযান মসজিদ থেকে ভেসে আসলো। আব্বাস উদ্দীন বললেন, “আমি নামাজ পড়বো। আর শুনুন কাজীদা, আপনার কাছে একটা গজলের জন্য আসছি।”

কবি শিল্পীকে একটা পরিস্কার জায়নামাজ দিয়ে বললেন, “আগে নামাজটা পড়ে নিন।” আব্বাস উদ্দীন নামাজ পড়তে লাগলেন আর নজরুল খাতার মধ্যে কলম চালাতে শুরু করলেন।

আব্বাস উদ্দীনের নামাজ শেষ হলে নজরুল তাঁর হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “এই নিন আপনার গজল!” হাতে কাগজটি নিয়ে তো আব্বাস উদ্দীনের চক্ষু চড়কগাছ। এই অল্প সময়ের মধ্যে নজরুল গজল লিখে ফেলছেন? তা-ও আবার তাঁর নামাজ পড়ার দৃশ্যপট নিয়ে?

“হে নামাজী! আমার ঘরে নামাজ পড়ো আজ,
দিলাম তোমার চরণতলে হৃদয় জায়নামাজ।”

4>তিন. কাজী নজরুল ইসলাম বিখ্যাত হয়ে আছেন তাঁর রচিত নাতে রাসূলের জন্য।

১। ‘ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ এলো রে দুনিয়ায়
আয় রে সাগর আকাশ-বাতাস দেখবি যদি আয়’

২। ‘মুহাম্মদ নাম জপেছিলি, বুলবুলি তুই আগে,
তাই কি রে তোর কন্ঠের গান, এমন মধুর লাগে।'

৩। ‘আমি যদি আরব হতাম মদীনারই পথ
আমার বুকে হেঁটে যেতেন, নূরনবী হজরত’

৪। ‘হেরা হতে হেলে দুলে নূরানী তনু ও কে আসে হায়
সারা দুনিয়ার হেরেমের পর্দা খুলে যায়।N
সে যে আমার কামলিওয়ালা, কামলিওয়ালা।’

..

গানগুলো ক্লাসিকের মর্যাদা পেয়েছে। গানগুলো রচনার প্রায় নব্বই বছর হয়ে গেছে। আজও মানুষ গুনগুনিয়ে গানগুলো গায়।
=================

5>আব্বাসউদ্দীন আহমদ বাংলা লোকসঙ্গীত গায়ক

আব্বাসউদ্দীন আহমদ (২৭ অক্টোবর ১৯০১ - ৩০ ডিসেম্বর ১৯৫৯) ছিলেন একজন বাঙালি লোক সঙ্গীতশিল্লী, সঙ্গীত পরিচালক, ও সুরকার। সঙ্গীতে অবদানের জন্য তিনি মরণোত্তর প্রাইড অফ পারফরম্যান্স (১৯৬০), শিল্পকলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৭৯) এবং স্বাধীনতা পুরস্কারে (১৯৮১) ভূষিত হন।

আব্বাসউদ্দীন আহমদ
জন্ম
১৭ অক্টোবর ১৯০১
বলরামপুর গ্রাম, তুফানগঞ্জ, কুচ বিহার, পশ্চিমবঙ্গ
মৃত্যু
৩০ ডিসেম্বর ১৯৫৯ (বয়স ৫৮)
পেশা
লোকসঙ্গীত শিল্পী, সরকারী কর্মকর্তা,

লোকসঙ্গীত সুরকার, গায়ক, পল্লীগীতি শিল্পী, সঙ্গীত পরিচালক

★★
আব্বাসউদ্দীন আহমদ ১৯০১ সালের ২৭শে অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার জেলার তুফানগঞ্জ মহকুমার বলরামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। আব্বাস উদ্দীন আহমদের পিতা জাফর আলী আহমদ ছিলেন তুফানগঞ্জ মহকুমা আদালতের উকিল। মাতা হিরামন নেসা।  শৈশবে বলরামপুর স্কুলে আব্বাসউদ্দীনের শিক্ষা জীবন শুরু হয়। ১৯১৯ সালে তুফানগঞ্জ স্কুল থেকে তিনি প্রবেশিকা এবং ১৯২১ সালে কুচবিহার কলেজ থেকে আই.এ পাস করেন। এখান থেকে বি.এ পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হয়ে তিনি সঙ্গীত জগতে প্রবেশ করেন। তার বড় ছেলে ড. মোস্তফা কামাল বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের একজন বিচারপতি ছিলেন। মেজো ছেলে মুস্তাফা জামান আব্বাসী ও একমাত্র মেয়ে ফেরদৌসী রহমান কণ্ঠশিল্পী।

একজন কণ্ঠশিল্পী হিসেবে আব্বাস উদ্দীনের পরিচিতি দেশজোড়া। আধুনিক গান, স্বদেশী গান, ইসলামি গান, পল্লীগীতি, উর্দুগান সবই তিনি গেয়েছেন। তবে পল্লীগীতিতে তার মৌলিকতা ও সাফল্য সবচেয়ে বেশি। গানের জগতে তার ছিল না কোনো ওস্তাদের তালিম। আপন প্রতিভাবলে নিজেকে সবার সামনে তুলে ধরেন। তিনি প্রথমে ছিলেন পল্লীগায়ের একজন গায়ক। যাত্রা, থিয়েটার ও স্কুল-কলেজের সংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান শুনে তিনি গানের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন এবং নিজ চেষ্টায় গান গাওয়া রপ্ত করেন। এরপর কিছু সময়ের জন্য তিনি ওস্তাদ জমিরউদ্দীন খাঁর নিকট উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শিখেছিলেন। পণ্ডিত শাকিল রাসেলের রেফারেন্স অনুযায়ী রংপুর ও কোচবিহার অঞ্চলের ভাওয়াইয়া, ভাভাগো ভাভা, ক্ষীরোল, চটকা গেয়ে আব্বাস উদ্দীন প্রথমে সুনাম অর্জন করেন। তারপর জারি, সারি, ভাটিয়ালি , মুর্শিদি, বিচ্ছেদি, দেহতত্ত্ব, মর্সিয়া, পালা গান ইত্যাদি গান গেয়ে জনপ্রিয় হন। তিনি তার দরদভরা সুরেলা কণ্ঠে পল্লি গানের সুর যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন তা আজও অদ্বিতীয়। তিনি কাজী নজরুল ইসলাম, জসীম উদ্‌দীন, গোলাম মোস্তফা প্রমুখের ইসলামি ভাবধারায় রচিত গানেও কণ্ঠ দিয়েছেন। তিনি কাজী নজরুল ইসলামের সহায়তায় কলকাতায় এসে গ্রামোফোন রেকর্ডে গান রেকর্ড করেন। তাঁর প্রথম রেকর্ড 'কোন বিরহীর নয়নজলে বাদল ঝরে গো' এবং রেকর্ড করা গানের সংখ্যা কমপক্ষে সাত-শো। শহুরে জীবনে লোকগীতিকে জনপ্রিয় করার কৃতিত্ব আব্বাসউদ্দিনের। আবার বাংলার মুসলমান সমাজকে উদীপ্ত করেছিলেন ইসলামি গান গেয়ে। পল্লীগীতির সংগ্রাহক কানাইলাল শীলের কাছে কৃতজ্ঞ ছিলেন। ক্ল্যাসিক্যাল গান শিখেছিলেন ওস্তাদ জমিরুদ্দিন খাঁর কাছে। আব্বাস উদ্দিন ছিলেন প্রথম মুসলমান গায়ক যিনি আসল নাম ব্যবহার করে এইচ এম ভি থেকে গানের রেকর্ড বের করতেন। রেকর্ডগুলো ছিল বাণিজ্যিকভাবে সফল ছিল। তাই অন্যান্য হিন্দু ধর্মের গায়করা মুসলমান ছদ্মনাম ধারণ করে গান করতে থাকে।  আব্বাস উদ্দীন ১৯৩১ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত কলকাতায় বসবাস করেন। প্রথমে তিনি রাইটার্স বিল্ডিংয়ে ডিপিআই অফিসে অস্থায়ী পদে এবং পরে কৃষি দপ্তরে স্থায়ী পদে কেরানির চাকরি করেন।এ কে ফজলুল হকের মন্ত্রীত্বের সময় তিনি রেকর্ডিং এক্সপার্ট হিসেবে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করেন। চল্লিশের দশকে আব্বাস উদ্দিনের গান পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষে মুসলিম জনতার সমর্থন আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দেশ বিভাগের পর (১৯৪৭ সালে) ঢাকায় এসে তিনি সরকারের প্রচার দপ্তরে এডিশনাল সং অর্গানাইজার হিসেবে চাকরি করেন।পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে ১৯৫৫ সালে ম্যানিলায় দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় সঙ্গীত সম্মেলন, ১৯৫৬ সালে জার্মানিতে আন্তর্জাতিক লোকসংগীত সম্মেলন এবং ১৯৫৭ সালে রেঙ্গুনে প্রবাসী বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনে তিনি যোগদান করেন।

আব্বাস উদ্দিন সম্পর্কে ফরহাদ মজহার বলেন : আব্বাস উদ্দিন কেবল গায়ক ছিলেন না, এই প্রজন্মের গায়করা যদি ভাবেন আব্বাস উদ্দিন শুধু গান গেয়ে এদেশের মানুষের মন জয় করেছেন তাহলে তা মস্ত বড় ভুল হবে।আব্বাস তার সময়কালের আকাঙ্ক্ষা ও সংগ্রামকে ধারণ করেছিলেন,সঙ্গে ছিলেন কাজী নজরুল এবং আরো অনেকে।
তার সন্তান ফেরদৌসী রহমান এবং মুস্তাফা জামান আব্বাসীও গান গেয়ে খ্যাতি লাভ করেছেন।

তাঁর কিছু বিখ্যাত গান-

'ওকি গাড়িয়াল ভাই’,
‘তোরষা নদী উথাল পাতাল, কারবা চলে নাও’,
‘প্রেম জানে না রসিক কালাচান’
চলচ্চিত্রে অভিনয়
গ্রন্থ ও পুরস্কার সম্পাদনা
আমার শিল্পীজীবনের কথা (১৯৬০) আব্বাস উদ্দীনের রচিত একমাত্র গ্রন্থ। সঙ্গীতে অবদানের জন্য তিনি মরণোত্তর

বছর পুরস্কার বিভাগ ফলাফল সূত্র
১৯৬০ প্রাইড অফ পারফরম্যান্স বিজয়ী
১৯৭৯ শিল্পকলা একাডেমী পুরস্কার বিজয়ী
১৯৮১ স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার শিল্পকলা (মরণোত্তর) বিজয়ী
২০১৩ আরটিভি স্টার অ্যাওয়ার্ডস পরম্পরা পরিবার পদক (মরণোত্তর) বিজয়ী
মৃত্যু:----
তিনি ১৯৫৯ সালের ৩০শে ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন।
        ( সংগ্রহ )

==========================


 6>কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিনে,

আমার শ্রেষ্ঠ মানব দরদী ও বিদ্রোহী কবিকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম।

       

---/////----

মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুর শহরের এক  ব্রাহ্মণ পরিবারের বড় ছেলে নাম নলিনাক্ষ সান্যালের অভিন্ন হৃদয় বন্ধু ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। কোন এক সময়ে সেই নলিনাক্ষের বিয়েতে তার বন্ধু  কাজী নজরুল ইসলামকে বরযাত্রী হিসেবে আমন্ত্রণ করা হলো। 

নজরুল প্রথমটায় কিছুতেই বরযাত্রী হিসেবে যেতে রাজি হচ্ছিলেন না। কিন্তু নলিনাক্ষের একান্ত পীড়াপীড়িতে শেষে বাধ্য হয়ে রাজি হলেন।বর ও বরযাত্রী পৌঁছল পাত্রীর বাড়ি। বরযাত্রীদের সকলকে পংক্তিভোজনে বসানো হয়েছে। হঠাৎ বিয়ের পাত্র অর্থাৎ নলিনাক্ষের  ছোট ভাই  শশাঙ্কশেখর হন্তদন্ত হয়ে দাদার কাছে এসে বললেন,'দাদা, এ বিয়ে তুই করিস না। মুসলিম বলে ওরা নজরুলদাকে আমাদের বরযাত্রীদের সঙ্গে না বসিয়ে অন্য একটা জায়গায় একা বসিয়েছে। এই শুনে বিয়ের পাত্র বিয়ের আসর থেকে তিনি উঠে পড়লেন এবং বললেন,যেখানে আমার বন্ধুর অপমান হয়,সেখানে আমি বিয়ে করবো না। বিয়ের আসরে একটা হুলুস্থুল পড়ে গেল। নজরুল খবর পেয়ে ছুটে এলেন। তিনি বিয়ের পাত্র অর্থাৎ তাঁর বন্ধুকে অনেক বুঝিয়ে বিয়েতে রাজি করলেন। অবশেষে বিবাহকার্য সম্পন্ন হলো। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। পরেরদিন ভোরবেলা। সবাই তখনো ঘুমে আচ্ছন্ন। পাত্রীর বাবা শরৎচন্দ্র ভট্টাচার্য  সকলের আগে উঠেছেন এবং সকালবেলায়  বরযাত্রী বেরোনোর আগে তাঁদের আতিথেয়তার তদারকি করতে বেড়িয়েছেন। 

হঠাৎ তিনি থমকে গেলেন গানের সুরে। শব্দ অনুসরণ করে তিনি উপস্থিত হলেন বাড়ির  মন্দিরের দিকে। সেখানে পৌঁছে  তিনি যা দেখলেন,তা এক অত্যাশ্চর্য ঘটনা। তিনি বাড়ির সবাইকে একে একে ডেকে তুললেন নীরবে এবং নিয়ে গেলেন সেই মন্দিরের কাছে। সকলে অবাক হয়ে গেল। মন্দিরের বারান্দায় বসে নজরুল একটার পর একটা নিজের লেখা ভক্তিসংগীত গাইছেন আর তাঁর দু'চোখ বেয়ে দরদর করে জল ঝরে পড়ছে। পাত্রীর বাবা ছিলেন এক গোঁড়া ব্রাহ্মণ। কিন্তু সেই মুহূর্তে সব ভুলে গেলেন তিনি কোনো এক মায়ামন্ত্রবলে। ছুটে গিয়ে তিনি পায়ে পড়লেন কাজী নজরুল ইসলামের। নজরুল ইসলাম সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে দু'হাত দিয়ে তুলে জড়িয়ে ধরলেন। আর তখন 'চারি চক্ষের ধারায়' তখন সেখানকার মাটি ভিজে স্বর্গভূমি হয়ে উঠেছে। এরপর মেয়ের বাবা নিজে বরযাত্রীদের সাথে এক সারিতে বসিয়ে কাজী নজরুল ইসলামেকে ভোজন করালেন এবং তাঁর মেয়েকে আশীর্বাদ করতে বললেন।........ ..এক গোঁড়া ব্রাহ্মণের মনের অচলায়তন ভেঙেচুরে তছনছ হয়ে যায়, সে শিক্ষা নেয় এক বৃহত্তর সত্য বোধের শিক্ষা।  কে নজরুল ? কে হিন্দু?কে মুসলমান ? কে খ্রিস্টান ? না,না এবং না.....তিনি মনুষ্যত্বের অতন্দ্র প্রহরী , মানবতার মরমিয়া সাধক। আজ তাঁর জন্মদিনে নতনিষ্ঠ প্রণাম।

কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিন    

                      24 May 1899

Died: on dt:--02 March 1979

                  (সংগৃহিত)

     <--আদ্যনাথ রায় চৌধুরী-->

========================


7>জানা অজানায় নজরুল

১৯২৮ সালের মার্চ মাসে আর্থিক শর্তে নজরুর গ্রামোফোন কোম্পানি ‘হিজ মাস্টার্স ভয়েস’-এর সাথে যুক্ত হন। এইচএমভি-তে নজরুল সংগীতের প্রথম রেকর্ড করা শিল্পীর নাম শ্রী হরেন্দ্রনাথ দত্ত। রেকর্ড করা নজরুল ইসলামের প্রথম গানটি হলো ‘জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত জালিয়াতি খেলছ জুয়া’। আমরা কি জানি, নজরুল ইসলামের প্রথম রেকর্ড করা ইসলামি গান কোনটি? কোন শিল্পী গানটি রেকর্ড করেন এবং রেকর্ড নং কত? এইচএমভি থেকে রেকর্ড করা নজরুল ইসলামের প্রথম ইসলামি গানটি হলো- ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে’ : শিল্পী আব্বাস উদ্দিন আহমদ গানটি রেকর্ড করেন। প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ১৯৩২ সাল। ৮টি গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে কাজী নজরুল ইসলাম রচিত প্রায় ২ হাজার গানের রেকর্ড বেরিয়েছিল। তৎকালীন বাংলার ২৮টি জেলায় তার গান বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। কাজী নজরুল ইসলামের রেকর্ড করা প্রথম শ্যামাসংগীতটি হলো- ‘আমার কালো মেয়ের পায়ের তলায়’। শিল্পী মৃণাল কান্তি ঘোষের গানটি ১৯৩২ সালের জুন মাসে রেকর্ড করা হয়েছিল।


কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম রেকর্ডকৃত নাটকটি ছিল ‘ঈদুল ফেতর’। কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের শেষ রেকর্ড করা গান দুটি হলো : ১. চীন ও ভারত মিলেছে; ২. সংঘশরণ তীর্থযাত্রা পথে। গান দুটি গেয়েছিলেন শিল্পী সত্য চৌধুরী ও জগন্ময় মিত্র।


---

তথ্য সংগৃহীত