Tuesday, August 3, 2021

23>আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়

 23>আজ আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের ১৬১তম জন্মবার্ষিকী। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি পুরনো লেখা। ( সংগ্রহ)


🔴 আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় : জীবন ও কর্ম


নির্লোভ, পরোপকারী, শিক্ষা বিস্তারে নিবেদিতপ্রাণ এক মানুষ; যেখানেই মানুষের দুর্ভোগ সেখানেই তিনি, তাই স্বাধীনতা সংগ্রামী হোক আর ঝড়ে-বন্যায় দুর্যোগগ্রস্ত মানুষ হোক ’সকলেরই সহায় হয়ে তিনি আবির্ভূত হয়েছেন। এই মহান কর্মযোগী মানুষটি আর কেউ নন, তিনি আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়। যাঁকে এপিসি রায় বলে আমরা চিনি। ১৮৬১ সালের ২ আগস্ট তিনি সাবেক যশোর জেলা বর্তমানের খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলাধীন রাঢ়ুলি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।


তাঁর পড়াশোনার শুরু কলকাতার হেয়ার স্কুলে। সেখানকার অ্যালবার্ট স্কুল থেকে তিনি এন্ট্রান্স পাশ করে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রতিষ্ঠিত মেট্রোপলিটন কলেজে পড়েন। বিএ ক্লাসের জন্যে ভর্তি হন প্রেসিডেন্সি কলেজে। বিএ পাশ করার আগেই গিলক্রাইস্ট বৃত্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৮৮২ সালে বিলেত যান। সেখানে বিএসসি পাশ করেন এবং ১৮৮৭ সালে রসায়ন শাস্ত্রে মৌলিক গবেষণার জন্যে এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিএসসি ডিগ্রি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের হোপ পুরস্কার পান। ১৮৮৮ সালে তিনি দেশে ফেরেন। তখন সবেমাত্র শিয়ালদহ-খুলনা রেলগাড়ী চালু হয়েছে। কলকাতা থেকে রেলে চেপে খুলনায় নেমে তিনি নৌকায় করে যান বাড়িতে। পরের বছর সহকারী অধ্যাপক হিসেবে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে যোগ দেন। 


শুরু হয় তাঁর শিক্ষক ও গবেষণার জীবন। শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে ভালো করার জন্যে তিনি প্রচুর পড়তেন। নিয়মিত ক্লাস নেওয়া, গবেষণাগারে সময় কাটানো এবং অফিসের কাজ করার মাধ্যমে অল্প সময়েই শিক্ষক হিসেবে তাঁর সুনাম ছড়ায়, তবে শরীরটি ভেঙ্গে যায়। সেই ভাঙ্গা শরীর নিয়ে শিক্ষকতা আর গবেষণার মধ্যে দিয়েই তিনি সারাটা জীবন কাটিয়েছেন। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বিজ্ঞান কলেজ। ষাট বছর বয়স পূর্ণ হলে তিনি অবসর নেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন। কিন্তু স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় তাঁর চাকুরির মেয়াদ পাঁচ বছর বাড়িয়ে দেন। পরে আরও দুইবার পাঁচ বছর করে তাঁর চাকুরির মেয়াদ বাড়ানো হয়। কিন্তু এই পনেরো বছরের বেতনের পুরোটাই তিনি রসায়নের বিশুদ্ধ ও ফলিত শাখার উন্নয়নে দান করেন। 


এরপর ১৯৩৭ সালে ৭৫ বছর বয়সে তিনি যখন পরিপূর্ণ অবসর নিতে চাইলেন, তখন উপাচার্য শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় তাঁকে এমিরিটাস প্রফেসর হিসেবে রসায়নের গবেষণা কর্মের সঙ্গে তাঁকে যুক্ত রাখেন। বিজ্ঞান কলেজে যোগ দিয়ে তিনি কলেজেরই দোতলার দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের একটি ঘরে থাকতেন। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি ওই ঘরে কাটিয়েছেন। কলেজে সবসময় আট-দশজন ছাত্র গবেষণা কাজের জন্যে তাঁর কাছে থাকতেন। খাবারে ভেজাল নির্ণয়ের রাসায়নিক পদ্ধতি উদ্ভাবন সংক্রান্ত তাঁর প্রথম মৌলিক গবেষণা। তাঁর যুগান্তকারী আবিস্কার মারকিউরাস নাইট্রাইট। এছাড়াও পারদ সংক্রান্ত এগারোটি মিশ্র ধাতু আবিস্কার করে তিনি রসায়ন জগতে বিস্ময়ের সৃষ্টি করেন। গবাদিপশুর হাড় পুড়িয়ে তাতে সালফিউরিক এসিড যোগ করে তিনি সুপার ফসফেট অব লাইম তৈরি করেছেন। 


হাতে-কলমে গবেষণা শুধুমাত্র নয়, তাঁর নজর ছিল শিক্ষার্থীরা যেন বিজ্ঞানমনষ্ক হয়ে ওঠেন। একারণে অনেক কাজ করতেন একান্ত স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীতে। ক্লাসে রসায়নের পরীক্ষা করে দেখাতে গিয়ে তিনি একটি হাড়ের টুকরো বুনসেন বার্নারে উত্তপ্ত করে দেখালেন যে, তা ক্যালসিয়াম অক্সাইডে পরিবর্তিত হয়ে গেছে। তারপর হঠাৎই সেটাকে নিজের মুখে পুরে দিতেন। শিক্ষার্থীরা আঁতকে উঠতো - কোন প্রাণীর হাড় তা কি জানি, তা আবার খাওয়ার বিধান আছে কি-না! শিক্ষার্থীদের এই ভ্যাবাচেকা অবস্থা দেখে তিনি নিজেই বুঝিযে বলতেন, হাড় গরুরই হোক বা শুকরেরই হোক, এখন তা শুধুমাত্র ক্যালসিয়াম অক্সাইড। এভাবেই তিনি শিক্ষার্থীদের মনোজগতে যুক্তিবাদিতা গেঁথে দেয়ার চেষ্টা করতেন।


শুধুমাত্র গবেষণা নয়, গবেষণার ফলাফল কাজে লাগানোর জন্যে তিনি শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে মানুষকে উদ্বুদ্ধ ও সহায়তা করেছেন। প্রতিষ্ঠা করেন বেঙ্গল কেমিক্যাল এন্ড ফার্মাসিউটিক্যালস ওয়ার্কস। নিজের সর্বস্ব দিয়ে এবং প্রচুর পরিশ্রমে জোগাড় করেন প্রয়োজনীয় মুলধন। বাজার তৈরি করতে নিজে ব্যাগে করে ওষুধের নমুনা নিয়ে দোকানে দোকানে ঘুরেছেন। এরপর ধীরে ধীরে কোম্পানি বড় হয়। কয়েক বছরের মধ্যেই বেশ কিছু রাসায়নিক এবং ওষুধের ক্ষেত্রে বেঙ্গল কেমিক্যাল বিদেশী কোম্পানিকে হঠিয়ে বাজার দখলে নিতে সক্ষম হয়। 


তাঁর পরামর্শেই গড়ে ওঠে দি বেঙ্গল এনামেল ওয়ার্কস লিমিটেড। বেঙ্গল স্টীম নেভিগেশন কোম্পানী নামের একটি জাহাজ কোম্পানীর সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন।  বলা হয়, ১৯১০ সাল থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত যেসব শিল্প প্রতিষ্ঠানের আগে বেঙ্গল শব্দটি যুক্ত ছিল তার সবগুলির সঙ্গে আচার্যদেবের সংযুক্তি ছিল। তিনি নিজ হাতে যেমন শিল্প কল-কারখানা গড়ে তুলেছেন, তেমনি অন্যদের উৎসাহও দিয়েছেন। সেই সময়ে ভারতের বিভিন্ন জায়গায় আয়োজিত শিল্পমেলায় তিনি বক্তৃতা করেছেন। করাচীতে শিল্পমেলার উদ্বোধন উপলক্ষে গিয়ে তিনি সেখানকার সমবায় ব্যাঙ্ক উদ্বোধন করেন। 


১৯৩৪ সালে তিনি খুলনায় বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের জন্যে একটি কাপড়ের কল স্থাপনের উদ্যোগ নেন। তিনি তাঁর উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্থানীয় ধনাঢ্য ব্যক্তি ও রাজনীতিকদের সাথে আলোচনা করেন এবং এই উদ্যোগে সাড়া দেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে অনেকেই এগিয়ে আসেন। প্রতিষ্ঠিত হয় কটন মিল। নামকরণ করা হয় প্রফুল্ল চন্দ্র কটন মিলস্ লি:। পরবর্তীতে এই মিলটির নাম পাল্টে নতুন নাম হয় খুলনা টেক্সটাইল মিলস লি:।


নিজের নিতান্ত ব্যক্তিগত প্রয়োজন ছাড়া তাঁর আর কোন খরচ ছিল না। নিজের সকল অর্থ ব্যয় করেছেন মানুষের হিতার্থে। শিক্ষা বিস্তারের জন্যে নিজের অর্থে অনেকগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। বাগেরহাটের পিসি কলেজ, খুলনা শহরের এপিসি স্কুল, রাঢ়ুলিতে একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাঁর অবদান। মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছেন সঞ্চয়ে, গড়ে তুলেছেন সমবায় ব্যাঙ্ক। রাজনীতি সরাসরি না করলেও রাজনীতির সঙ্গে ছিল তাঁর গভীর যোগাযোগ। মারাঠী রাজনীতিক গোখলের সঙ্গে ছিল তাঁর গভীর সখ্য। বয়সে গোখলে প্রফুল্ল চন্দ্রের ছোট ছিলেন। গোখলে আচার্যদেবকে বলতেন, ‘বৈজ্ঞানিক সন্ন্যাসী।’ গোখলের মাধ্যমে তাঁর সখ্য হয় গান্ধীর সঙ্গে। 


সরকারি চাকুরি করার কারণে তিনি কোন আন্দোলন সরাসরি সমর্থন করেননি। তবুও বৃটিশ গোয়েন্দাদের মতে, তিনি ছিলেন বিজ্ঞানী বেশে বিপ্লবী। যে কোন নাগরিককে গ্রেফতার করে বিনা বিচারে আটক রাখার আইন পাশ হওয়ার পর ১৯১৯ সালের ১৮ জানুয়ারি কলকাতার টাউন হলে এক প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ এতে সভাপতিত্ব করেন। সেখানে বিজ্ঞানী প্রফুল্ল চন্দ্র বক্তৃতা করেন। তিনি বলেন, ‘আমি বৈজ্ঞানিক, গবেষণাগারেই আমার কাজ, কিন্তু এমন সময় আসে যখন বৈজ্ঞানিককেও দেশের আহ্বানে সাড়া দিতে হয়। আমি অনিষ্টকর এই আইনের তীব্র প্রতিবাদ করিতেছি।’ 


জালিওয়ানালাবাগ হত্যাকান্ডের পর তিনি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে বেশ যুক্ত হয়েছিলেন। এসম্পর্কে তিনি নিজেই লিখেছেন, ‘১৯২১-২৬ এই ছয় বৎসরে আমি দেশের সর্বত্র ঘুরিয়া জাতীয় বিদ্যালয় রক্ষার প্রয়োজনীয়তা, খদ্দর প্রচলন এবং অস্পৃশ্যতা বর্জনের জন্য প্রচার কার্য করিয়াছি। খুলনা, দিনাজপুর, কটক প্রভৃতি স্থানে কয়েকটি জেলা সম্মেলনে আমাকে সভাপতিত্ব করিতে হইয়াছে। কেননা ওই সময়ে প্রায় সমস্ত খ্যাতনামা রাজনৈতিক নেতাই অবরুদ্ধ ছিলেন। অসহযোগ আন্দোলনের যখন পূর্ণবেগ সেই সময় আমি ঘোষণা করিয়াছি— বিজ্ঞান অপেক্ষা করিতে পারে কিন্তু স্বরাজ অপেক্ষা করিতে পারে না।’ 


১৯১৯ ও ১৯২০ সালে পরপর দুই বছর অনাবৃষ্টির ফলে সমগ্র খুলনা (বর্তমানের খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলা) জেলায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। অজন্মার কারণে তখনকার সাতক্ষীরা মহকুমা জুড়ে এবং পাইকগাছা (বর্তমানের পাইকগাছা ও কয়রা) ও দাকোপ থানা এলাকায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। ১৯২১ সালে চতুর্থবার বিলেত থেকে আসার পর গরমের ছুটিতে গ্রামে বেড়াতে এসে তিনি দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করেন। বহু মানুষ ততোদিনে মারা গেছেন। অখাদ্য, কু-খাদ্য খেয়ে পচা দূষিত জল পান করে রোগ-ব্যাধির প্রকোপ বাড়ে। ছড়িয়ে পড়ে ম্যালেরিয়া। জেলা কালেকটরেট (বর্তমানের জেলা প্রশাসক) এই দুর্ভিক্ষের কথা স্বীকার করেনি। মানুষকে বাঁচাতে এই মহান মানুষটির নেতৃত্বে গড়ে ওঠে রিলিফ কমিটি। ১৯২২ সালে উত্তরবঙ্গে ভয়াবহ বন্যা হলে সেখানেও তিনি ছুটে যান। সেখানকার মানুষদের রক্ষায় গঠিত ত্রাণ কমিটিরও তিনি সভাপতি নির্বাচিত হন। 


ভারতে বিধিবদ্ধ সমবায় আইন চালু হয় ১৯০৪ সালে। ১৯০৬ সালে তিনি রাড়ুলি ও আশেপাশের গ্রামের মানুষদের জড়ো করে ৪১টি কৃষি ঋণদান সমবায় সমিতি গড়ে তোলেন। ১৯০৮ সালে আচার্যদেব ও তাঁর ভাই রায়সাহেব নলিনীকান্ত রায়-চৌধুরীর চেষ্টায় সমবায় সমিতিগুলো নিয়ে রাড়ুলি সেন্ট্রাল কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠা করেন। যা ছিল অবিভক্ত বাংলায় তৃতীয় ব্যাঙ্ক। 


চিরকুমার প্রফুল্ল চন্দ্রের জীবন ছিল অনাড়ম্বর। ছাত্রদের সঙ্গে ছিল নিবিড় বন্ধুত্বের সম্পর্ক। জাতীয় শিক্ষা ও শিল্পোদ্যেগের প্রতি ছিল অকৃপণ সহায়তা। মানব কল্যানে নিজের অর্জিত সকল অর্থ অকাতরে দান করেছেন। ইতিহাস, ইংরেজি ও বাংলা সাহিত্যের প্রতি তাঁর ছিল বিশেষ অনুরাগ। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে তিনি অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। ’বাঙালির মস্তিষ্ক ও তাহার অপব্যবহার’ এবং ’অন্ন সমস্যায় বাঙালির পরাজয় ও তাহার প্রতিকার’ তাঁর লেখা অন্যতম দু’টি গ্রন্থ। ব্রিটিশ সরকারের সিআইই ও নাইট উপাধি ছাড়াও দেশী-বিদেশী চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডিগ্রী পান এবং লন্ডন ও মিউনিখ বিশ্বদ্যিালয় তাঁকে সম্মানিত সদস্যরূপে গ্রহণ করে। ১৯১০ সালে রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলন এবং ১৯২০ সালে ভারতীয় বিজ্ঞান সভার তিনি ছিলেন মূল সভাপতি।


যুক্তিবাদিতা ধারণ ও চর্চা করা এবং শিক্ষার্থীদের মাঝে তা ছড়িয়ে দেয়ার নিয়ত যে চেষ্টা তিনি করেছেন, তার শতভাগ সফলতা যে পেয়েছেন, এমনটি নয়। এ নিয়ে তাঁর বেদনাও ছিল। তিনি লিখেছেন, ’প্রায় অর্ধ শতাব্দীকাল অধ্যাপনার কাজ করিয়া আসিতেছি এবং সেই উপলক্ষ্যে কত হাজার ছাত্রকে বুঝাইয়া দিয়াছি যে, সূর্য এবং চন্দ্রগ্রহণ রাহু নামক কোন রাক্ষসের ক্ষুধা নিবারণের চেষ্টায় সূর্য এবং চন্দ্রকে গলধ:করণের ফলে সংঘটিত হয়না এবং শেষে মর্তবাসীদের কাঁসর, ঘন্টা, ঝাঁজর এবং খোল করতালের সংযোগে পূজা অর্চনার ফলে রাক্ষসাধিপতি রাহু তৃপ্ত ও তুষ্ট হইয়া কবলিত চন্দ্রসূর্যকে ছাড়িয়া দেওয়ার ফলেই তাহাদের মুক্তি সংঘটিত হয় না। এই যে সকল জনশ্রুতি, ইহা নিছক মিথ্যা ও কল্পনাপ্রসূত। ..... আজ অর্ধ শতাব্দীকাল ছাত্রদিগকে এই বৈজ্ঞানিক সত্যের ব্যাখ্যা করিয়া বুঝাইয়া আসিলাম, তাহারাও বেশ বুঝিল এবং মানিয়া লইল, কিন্তু গ্রহণের দিন যেই ঘরে ঘরে শঙ্খ-ঘন্টা বাজিয়া ওঠে এবং খোল-করতাল সহযোগে দলে দলে কীর্তনীয়ারা রাস্তায় মিছিল বাহির করে, অমনি এই সকল সত্যের পূজারীরাও সকল শিক্ষাদীক্ষা জলাঞ্জলি দিয়া দলে ভিড়িতে আরম্ভ করে।’


জাতপাতের প্রসঙ্গে তাঁর লেখনি ছিল আরও নির্মম -'হায় আমরা কি মানুষ? ঐ যে হাঁড়ী, ডোম, বাগদী, চামার, মালী, মাইঠ্যাল তোমার বাড়ির আশেপাশে চারিদিকে অজান্তে অন্ধকারে আচ্ছন্ন হইয়া পড়িয়া আছে এবং পশুর জীবন যাপন করিতেছে, উহাদের উন্নতির জন্য তোমরা যুগ-যগান্ত কি করেছ বলিতে পার? তোমরা তাঁহাদের ছোঁও না, কাছে আসতে দাও না, দূর দূর কর। জাপানি কুকুরটাকেও আদর করিয়া কোলে পিঠে নিয়ে বেড়াও আর সুশ্রী সবল হৃষ্টপুষ্ট নাদুস নুদুস মুচির ছেলেটি যদি ঘরের দাওয়ায় হামা দিয়া ওঠে’ তবে জাত গেল, ধর্ম গেল বলিয়া হুঙ্কার দিয়া উঠ।’.........       

৭৫ বছর বয়সে তিনি পালিত অধ্যাপক হিসেবে অবসর নেয়ার পরও আট বছর বেঁচেছিলেন। সেই সময়ও কেটেছে বিজ্ঞান কলেজের ওই ছোট কক্ষে। যেখানে ছিল একটা খাটিয়া, দুটি চেয়ার, খাওয়ার ছোট একটি টেবিল, একটি পড়ার টেবিল ও একটি আলনা। যেসব ছেলেরা তাঁর কাছে থাকতেন তাঁরই একজনের হাতে মাথা রেখে তিনি শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন ১৯৪৪ সালের ১৬ জুন। নিভে যায় এক ত্যাগী কর্মবীরের জীবন। যাঁর সাহিত্য ও ইতিহাসে ছিল অবাধ গতি। মনের চোখ ছিল খোলা। অদম্য জ্ঞানস্পৃহা। মানব দরদি এক মন। অদমনীয় কর্মোদ্যোগ। আর বিজ্ঞানচেতনা প্রসারে আপসহীন। 

—————————————

✍🏼 গৌরাঙ্গ নন্দী, খুলনা।

     (সংগ্রহ)