Thursday, July 20, 2023

39>বনফুল | বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়।

 39>বনফুল | বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়।

আনন্দবাজারের সাংবাদিক এক সাক্ষাৎকারে তাঁকে প্রশ্ন করছিলেন - ' অনেক পুরস্কার তো পেয়েছেন, কোনটিকে জীবনের সেরা পুরস্কার বলে মনে করেন ? 

তিনি কিঞ্চিৎ ভেবে বললেন --- ' সে অর্থে আমার জীবনের সেরা পুরস্কার কিন্তু অন্যরকম !! ' 

---- ' একটু খুলে যদি বলেন ........! '

----' দেখুন ....ভাগলপুর রেল স্টেশনের দিকে একপ্রকার দৌড়েই যাচ্ছি , সাথে কুলি আছে --- কলকাতা যাবার বিশেষ তাগিদে ....রেল স্টেশনে পৌঁছনোর আগেই দেখি -- ট্রেন ছেড়ে দিল --- !!!!  

এবারে ট্রেন পরদিন । কি করব ভেবে পাচ্ছি না ! এদিকে না গেলেই নয় ! এই রকম অবস্থায় হাঁপাতে হাঁপাতে কোনরকমে স্টেশনের ভিতরে একটা বেঞ্চে বসে পড়লাম।ভাবছি ----  কি  করা যায় ! 

কিছুক্ষণ পরেই দেখি ---  যে প্লাটফর্ম থেকে ট্রেনটি ( কলকাতা যাবার ) ছেড়ে চলে গেল এইমাত্র ...       ওই প্লাটফর্মেই পিছন দিক থেকে একটা ট্রেন ব্যাক করে আসছে ! ট্রেন দাঁড়ালো ----  !!

অনেকেই হৈ চৈ করছেন । এক ভদ্রলোক আমার সামনে এসে বললেন ---- " স্যার আমি আপনাকে চিনি ডাক্তার হিসেবে তো বটেই , কিন্তু তার থেকেও বেশী করে চিনি কারণ আপনার সব কটি লেখাই আমার পড়া । " 

-----  " আপনাকে দৌড়াতে দেখেই বুঝতে পেরেছি .....কলকাতা যাবার গাড়ী ধরতে আসছেন । আমিই  স্যার এই ট্রেনের ড্রাইভার । তাই আপনার জন্যই গাড়ী ব্যাক করে নিয়ে এলাম । চলুন --- স্যার তাড়াতাড়ি চড়ুন !!! "  

 ----  "" একজন ট্রেন চালক রেল গাড়ী ব্যাক করে আমাকে  ট্রেনে তুলে , তারপর আবার সামনের দিকে চলতে শুরু করে ।"

এর চাইতে বড় পুরস্কার কি হতে পারে।

তিনি বনফুল | বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় | তখন তিনি বিহারের সাহেবগঞ্জ রেলওয়ে হাইস্কুলের ছাত্র | লেখালিখির শুরু তখন থেকেই | সেই সময়ে ‘বিকাশ’ নামে হাতে লেখা পত্রিকায় কবিতা লেখালিখি চলত। পরে ‘মালঞ্চ’ পত্রিকায় অষ্টম শ্রেণির ছাত্র বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা ছাপা হল | অসন্তুষ্ট হলেন হেডপণ্ডিত রামচন্দ্র ঝা | তার মনে হল লেখালিখির কারণেই সংস্কৃতে কম নম্বর পাচ্ছেন বলাই | তিনি কবিতা লেখা বন্ধ করার নির্দেশ দিলেন বলাইকে | ফাঁপরে পড়ল কিশোর বলাই | অগত্যা উপায় ? ছদ্মনাম নিলেন বনফুল | বনফুল ছদ্মনামেই চলতে লাগল লেখালিখি | কিন্তু শেষরক্ষা হল না | হেডপণ্ডিত রামচন্দ্র ঝা-র কাছে ধরা পড়ে গেলেন | নির্দেশ অমান্য কেন? জানতে চাইলেন পণ্ডিতমশাই। বলাইয়ের জবাব, ‘না লিখে পারি না যে’! পণ্ডিতমশাই আর বাধা দিলেন না | পরবর্তীতে ১৯১৮ সালে তিনি স্কুলের মধ্যে প্রথম হয়ে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন | 

পরবর্তীতে একদিন জিজ্ঞেস করা হল, "এত কিছু নাম থাকতে আপনার ছদ্মনাম বনফুল কেন?"

বনফুল বললেন - "বন তাঁর বরাবরই খুব পছন্দের, বন তাঁর কাছে সবসময় রহস্য নিকেতন।" তাই বনফুল নামটা তাঁর ভারী পছন্দের।

বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তি | বনফুলের গল্পে বারবার উঠে এসেছে আর্ত ,পীড়িতের কথা। নিরন্ন,খেটে খাওয়া মেহনতী মানুষের কথা | বনফুল হাজারেরও বেশি কবিতা, ৫৮৬টি ছোট গল্প, ৬০টি উপন্যাস, ৫টি নাটক, জীবনী ছাড়াও অসংখ্য প্রবন্ধ রচনা করেছেন। তাঁর উপন্যাস গুলি নিয়ে বিখ্যাত সিনেমাও হয়েছে - যেমন মৃণাল সেনের পরিচালনায় ভুবন সোম, ডা: অগ্নীশ্বর প্রভৃতি | সাহিত্যকর্মের জন্য তিনি পদ্মভূষণ উপাধি লাভ করেন। এছাড়াও পেয়েছেন শরৎস্মৃতি পুরস্কার (১৯৫১), রবীন্দ্র পুরস্কার (১৯৬২), বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের জগত্তারিণী পদক (১৯৬৭)। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ডিলিট উপাধি প্রদান করে ১৯৭৩ সালে | 

তাঁর লেখনীর মুন্সিয়ানায় , তার নিষ্ঠাবান চিকিৎসার মাধ্যমে তিনি সমৃদ্ধ করেছেন বাংলা ও বাঙালিকে | জন্মদিবসে জানাই প্রণাম |

তথ্য : আনন্দবাজার.

           ( সংগ্রহীত)

====================


Tuesday, July 4, 2023

38>ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়::---

 38>ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়::---


বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম হয় বর্তমান উত্তর ২৪ পরগনা জেলার নৈহাটি শহরের নিকটস্থ কাঁঠালপাড়া গ্রামে। তারিখ ২৬ জুন, ১৮৩৮ অর্থাৎ ১৩ আষাঢ় ১২৪৫। চট্টোপাধ্যায়দের আদিনিবাস ছিল হুগলি জেলার দেশমুখো গ্রামে।

নৈহাটির RBC কলেজ ( ঋষি বঙ্কিম চন্দ্র কলেজ) রোড ধরে হনুমান মন্দির থেকে বাঁয়ে গেলেই ঋষি বঙ্কিম চন্দ্রের বসত বাড়ি।


Wednesday, June 28, 2023

37>গুরুসদয় দত্ত ব্রতচারী আন্দোলন::--

  


37>গুরুসদয় দত্ত ব্রতচারী আন্দোলন::--

গুরুসদয় দত্ত মূলত ব্রতচারী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে সবচেয়ে বেশি পরিচিতি লাভ করেন। ব্রতচারীদের মধ্যে তিনি প্রবর্তক জী নামে খ্যাত ছিলেন। ব্রতচারীদের অভিবাদন ভঙ্গি, বেশ, মাতৃভাষা প্রীতি, স্বাস্থ্যজ্ঞান, সত্যনিষ্ঠা, সংযম, প্রফুল্লভাব, অধ্যবসায়, আত্মনির্ভরতা খুব জনপ্রিয়তা লাভ করে।
=============

গুরুসদয় দত্ত (১০ মে ১৮৮২ - ২৫ জুন ১৯৪১)  ছিলেন একজন সরকারি কর্মচারী, লোক সাহিত্য গবেষক এবং লেখক। তিনি ব্রতচারী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বহুল পরিচিত।

গুরুসদয় দত্ত
জন্ম::--১০ মে, ১৮৮২
বীরশ্রী গ্রাম, শ্রীহট্ট জেলা ( অধুনা বাংলাদেশ)
মৃত্যু::---২৫ জুন ১৯৪১ (বয়স ৫৯)
কলকাতা
মৃত্যুর কারণ::--কর্কট রোগ
পেশা:--সরকারী কর্মচারী ঝ(কালেক্টর, কৃষি ও শিল্প বিভাগের সচিব, জেলা শাসক)
পরিচিতির কারণ::--
ব্রতচারী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা
দাম্পত্য সঙ্গী::--সরোজ নলিনী দে
সন্তান::--ক্যাপ্টেন বীরেন্দ্রসদয় দত্ত (পুত্র)

জন্ম ও বংশ পরিচয়::--

গুরুসদয় দত্ত ১৮৮২ সালের ১০ মে সিলেট জেলার জকিগঞ্জ উপজেলার (তৎকালীন করিমগঞ্জ মহকুমা) বিরশ্রী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা রামকৃষ্ণ দত্ত চৌধুরী ছিলেন সম্ভ্রান্ত জমিদার। গুরুসদয় দত্ত নিজে পারিবারিক উপাধি "চৌধুরী" ব্যবহার করতেন না। তার মাতার নাম আনন্দময়ী দেবী‌।

শিক্ষাজীবন::--

গুরুসদয় দত্তের শিক্ষাজীবন শুরু হয় সিলেট জেলার জকিগঞ্জ উপজেলার বিরশ্রী গ্রামের মাইনর স্কুলে। তারপর তিনি সিলেট শহরের ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি হন। এ স্কুল থেকে ১৮৯৯ সালে তিনি এন্ট্রান্স পরীক্ষা দেন। মেধানুসারে তিনি আসাম প্রদেশে প্রথম স্থান লাভ করেন। ১৯০১ সালে তিনি এফ. এ পরীক্ষা দেন এবং মেধানুসারে প্রথম স্থান অর্জন করেন। এরপর তিনি বিলাত গমন করেন। ১৯০৪ সালে তিনি আই. সি. এস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং মেধা তালিকায় সপ্তম স্থান অধিকার করেন।

কর্মজীবন::--

মহকুমা শাসকের কাজের মধ্য দিয়ে তাঁর কর্মজীবনের সূত্রপাত ঘটে। একজন দক্ষ আইসিএস অফিসার হিসেবে তিনি পল্লী উন্নয়নের কাজে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতেন। ১৯২৮ সালে বামনগাছি রেলওয়ে ওয়ার্কশপের কর্মচারী ও শ্রমিক ও কৃষকদের উপর ব্রিটিশ পুলিশদের নির্বিচারে গুলি চালানোর প্রতিবাদে তিনি সরব হন এবং তাঁর এই প্রতিবাদের সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে লণ্ডনের লর্ডস হাউজেও।

মূল নিবন্ধ: ব্রতচারী আন্দোলন::---
গুরুসদয় দত্ত মূলত ব্রতচারী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে সবচেয়ে বেশি পরিচিতি লাভ করেন। ব্রতচারীদের মধ্যে তিনি প্রবর্তক জী নামে খ্যাত ছিলেন। ব্রতচারীদের অভিবাদন ভঙ্গি, বেশ, মাতৃভাষা প্রীতি, স্বাস্থ্যজ্ঞান, সত্যনিষ্ঠা, সংযম, প্রফুল্লভাব, অধ্যবসায়, আত্মনির্ভরতা খুব জনপ্রিয়তা লাভ করে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ তৎকালীন সময়ের অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ গুরু সদয় দত্ত প্রতিষ্ঠিত ব্রতচারী আন্দোলনের সাথে যুক্ত হন।


★★★★★★★★★★★★★★★★★


Tuesday, June 27, 2023

36>Swami Vivekananda

 36>Swami Vivekananda::--

Born::--12 January 1863 at Kolkata.

 Died,::--4 July 1902 Belur Math, Howrah.

Died at the age of -----93 years.

============================


*"নরেন,আমাকে একটা গরদের শাড়ি কিনে দিতে পারিস ? এটা আর পরা যায় না।"*


তাড়াতাড়ি সরে যাচ্ছিলেন ভুবনেশ্বরী দেবী (স্বামী বিবেকানন্দ'র মাতা )। আর কিছুর জন্য নয়, যে শাড়ি পরে আহ্নিক করছিলেন সেটা শতচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল কথাটা : "আমাকে একটা গরদের শাড়ি কিনে দিতে পারিস ? এটা আর পরা যায় না।"

মাথা হেঁট করল নরেন। সে বেকার, ভূতের বেগার খাটছে। কোথায় পাবে সে গরদ কেনার পয়সা? লজ্জা মা কেন পাবে, লজ্জা পেল ছেলে। 

সেদিনই এক মাড়োয়ারি ভক্ত এসেছে দক্ষিণেশ্বরে। সঙ্গে মিছরির থালা তার উপরে একখানা গরদের কাপড়। দেখে ঠাকুরের বড় খুশি খুশি ভাব।

দুদিন পরে নরেন এসে হাজির। যাকে মানে না, সেই আবার টানে। 

"শোন, কাছে আয়---" নরেনকে ডাকলেন ঠাকুর ।

নরেন কাছে এল। দাঁড়িয়ে রইল, বসল না।

*"শোন, এই মিছরির থালা আর গরদখানা তুই নিয়ে যা-----"*

উচ্চশব্দে হেসে উঠল নরেন। "আমি কি ছোট ছেলে, মিছরি দিয়ে ভোলাবেন? আর গরদ--?"

*"গরদখানা তোর মাকে দিবি। তার আহ্নিক করার শাড়ি ছিঁড়ে গেছে। এই গরদ পরে সে আহ্নিক করবে।"*

বুকের মধ্যে ধ্বক করে উঠল নরেনের। ---"আপনাকে কে বললে?"

---"ওরে আমি জানতে পারি। শোন নিয়ে যা গরদখানা। তোর জন্য নয়, তোর মা'র জন্য বলছি।"

--"মা'র জন্য আপনার কাছে ভিক্ষে করতে যাব কেন? যখন রোজগার করতে পারব তখন কিনে দেব মাকে।"

নরেন চলে গেল হনহন করে। তার তেজ দেখে ঠাকুর হাসতে লাগলেন। এই নাহলে নরেন্দ্র! 

রামলালকে ডাকলেন ঠাকুর। বললেন-"কাল সিমলায় নরেনের বাড়িতে যাবি। যখন দেখবি, নরেন বাড়িতে নেই, সটান চলে যাবি তার মা'র কাছে। এই মিছরির থালা আর গরদখানা দিয়ে বলবি আমি পাঠিয়েছি। সাবধান, নরেন যেন টের না পায়।"

পরদিন দুপুরে লুকিয়ে অপেক্ষা করছে রামলাল। ঐ তো নরেন বেরোচ্ছে। মলিন চাদরখানা গায়ে ফেলে। অমনি ঐ ফাঁকে বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়েছে রামলাল। একেবারে ভুবনেশ্বরীর দরবারে।

'আপনাকে এই মিছরির থালা আর গরদখানা পাঠিয়ে দিলেন ঠাকুর।'

--- *"গরদের কাপড় ! কি করে জানলেন তিনি? এইখানে বিলুর সাথে কি কথা হল, আর দক্ষিণেশ্বরে অমনি টেলিগ্রাম হয়ে গেল?"* 


.... সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে এল নরেন। দেখল মা গরদের কাপড় পরে বসে আছেন পূজার ঘরে। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল মায়ের দিকে।

একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল শিরদাঁড়া দিয়ে। 

চিরস্বাধীন নরেন থমকে গেল। কথা খুঁজে পেল না।।


তথ্যসূত্র :- [ কথামৃত ]

Wednesday, June 7, 2023

35>|| শ্রী শ্রীরামকৃষ্ণ কল্পতরু :--|\

     35>|| শ্রী শ্রীরামকৃষ্ণ কল্পতরু :--|\


আজ ১লা জানুয়ারি, ১৮৮৬ , শুক্রবার। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ আজ কাশীপুরের বাগানবাড়িতে তাঁর বসবাসের ঘরটি থেকে নেমে এসেছেন নীচের বাগানে । তাঁর পরনে লালপেড়ে ধুতি, একটি পিরান , লালপাড়ের একটি মোটা চাদর, কানঢাকা টুপি ও চটি জুতো। সঙ্গে রয়েছেন ভ্রাতুষ্পুত্র রামলাল চট্টোপাধ্যায়। এখন বিকেল। ঠাকুর এসেছেন আমগাছটির কাছে। সেখানে কতিপয় ভক্তের জটলা। ঠাকুরকে দেখে সর্বাগ্রে এগিয়ে এলেন গৃহিভক্ত গিরিশচন্দ্র ঘোষ। তিনি ভক্তির আতিশয্যে জুতো খুলে রেখে শ্রীরামকৃষ্ণকে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করলেন। কৃপাসিন্ধু ভগবানের কৃপাবারি উথলে উঠল। তিনি গিরিশকে জিজ্ঞাসা করলেন -- তুমি যে সকলকে এত কথা ( আমার অবতারত্ব সম্বন্ধে) বলে বেড়াও, তুমি( আমার সম্বন্ধে) কি দেখেছ, কি বুঝেছ? গিরিশ গদগদ স্বরে উত্তর দিলেন -- ব‍্যাস বাল্মীকি যাঁর ইয়ত্তা করতে পারেননি , আমি তাঁর সম্বন্ধে অধিক কি আর বলতে পারি ! 


গিরিশের এই ভাবপূর্ণ স্তব শুনে ঠাকুর ভাবাবিষ্ট ও সমাধিস্থ হলেন। খানিক পরে ভাবের গাঢ়তা তরল হলে তিনি সমবেত ভক্তমন্ডলীর উদ্দেশে বলতে লাগলেন -- তোমাদের আর কি বলব। আশীর্বাদ করি তোমাদের চৈতন‍্য হোক। শ্রীরামকৃষ্ণের এই কৃপা-বিতরণের মহার্ঘ্য-ক্ষণে ভক্তেরা উদ্বেলিত হয়ে উঠল, সকলে তাঁর কৃপাপ্রাপ্তির অভিলাষে সমবেত হল তাঁর চারপাশে, শ্রীরামকৃষ্ণ একে একে সকলকে স্পর্শ করতে লাগলেন । তাঁর কৃপা-পরশে কেউ হাসতে লাগল , কেউ কাঁদতে লাগল , কেউ ধ‍্যানে নিমগ্ন হলো, কেউ প্রার্থনা করতে আরম্ভ করল, কেউ জ‍্যোতি দেখতে পেল, কেউবা নিজের ইষ্টের দর্শন পেল , আবার কেউবা নিজের শরীরে আধ‍্যাত্মিক-তরঙ্গের ঢেউ অনুভব করতে লাগল। 


শ্রীরামকৃষ্ণের নরেন্দ্রনাথ প্রভৃতি অন্তরঙ্গ ত‍্যাগী সন্তানরা অধিকাংশ‌ই তখন ঘুমাচ্ছিলেন। তাঁরা রাতভোর জপধ‍্যান করতেন। সেই কারণেই মধ‍্যাহ্নের পর ঘুমিয়ে নিতেন। গৃহিভক্তরাই আজ বিশেষভাবে ঠাকুরের কৃপাভিলাষে জড়ো হয়েছেন। অক্ষয় সেনকে কাছে ডেকে বক্ষ স্পর্শ করলেন ঠাকুর , কানে দিলেন 'মহামন্ত্র'। অক্ষয় সেনের চোখ থেকে আনন্দাশ্রু ঝরতে লাগল, তাঁর জীবন কৃতার্থ হলো। 


নবগোপাল ঘোষকে শ্রীরামকৃষ্ণ বললেন একটু ধ‍্যানজপ করলেই তাঁর হবে। কিন্তু নবগোপাল সাধারণ গৃহস্থ, তাঁর এসবের অবসর কোথায়? ঠাকুর তখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন -- আমার নাম একটু একটু করতে পারবে তো? নবগোপাল বললেন -- তা খুব পারব। এই উত্তর শুনে ঠাকুর বললেন -- তা হলেই হবে -- তোমাকে আর কিছু করতে হবে না। 


'বসুমতী সাহিত‍্য মন্দির'-এর প্রতিষ্ঠাতা উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় অর্থকষ্টে ভুগছেন। তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে অর্থ প্রার্থনা করলেন। ঠাকুর তাঁকে বললেন -- তোর অর্থ হবে। পরবর্তীকালে তিনি প্রভূত সম্পত্তির অধিকারী হন এবং নানাভাবে শ্রীরামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীদের সেবায় জীবন অতিবাহিত করেন। 


রামলাল দাদা পেছনে দাঁড়িয়েছিলেন। মনে মনে ভাবছিলেন -- সকলের তো একরকম হলো , আমার কি গাড়ু গামছা বয়া সার হবে? অন্তর্যামী ঠাকুর তাঁর মনের ভাব বুঝে তাঁকে ডেকে বললেন - এত ভাবছিস কেন? আয় আয়। এরপর শ্রীরামকৃষ্ণ রামলাল চট্টোপাধ‍্যায়ের বুকে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন -- দেখ্ দিকিনি এইবার। রামলাল দাদা দেখলেন - সে যে কি  রূপ , কি আলো , কি জ‍্যোতি! পরে তিনি স্বামী সারদানন্দকে বলেছিলেন যে -- ঠাকুর স্পর্শ করা মাত্র সর্বাঙ্গসুন্দর ইষ্টমূর্তি তাঁর হৃদয়পদ্মে যেন নিমেষের মধ‍্যেই নড়েচড়ে ঝলমল করে উঠেছিল। 


এমন সময় বৈকুন্ঠনাথ স‍্যান‍্যাল এগিয়ে এলেন। শ্রীরামকৃষ্ণকে প্রণাম করে বললেন -- আমায় কৃপা করুন। ঠাকুর বললেন -- তোমার তো সব হয়ে গেছে। বৈকুন্ঠনাথ বললেন যে ঠাকুর যখন বলছেন , তখন সেকথা নিশ্চয়ই ঠিক, তবে তিনি যাতে সেই অনুভূতি অল্পবিস্তর বুঝতে পারেন , ঠাকুর যেন তা করে দেন। একথা শুনে শ্রীরামকৃষ্ণ ক্ষণিকের জন‍্য বৈকুন্ঠনাথের হৃদয় স্পর্শ করলেন। অমনি বৈকুন্ঠনাথ সর্বত্র শ্রীরামকৃষ্ণ রূপ দেখতে লাগলেন। ক্রমাগত তিনদিন তিনি এই অবস্থায় র‌ইলেন ।যেদিকে তাকান , সেদিকেই শ্রীরামকৃষ্ণকে দেখতে পান। 


ইতিমধ‍্যে বিকেল শেষ হয়ে সন্ধ্যা আগতপ্রায়। শ্রীরামকৃষ্ণ রামলালদাদার সঙ্গে ফিরে চললেন নিজের ঘরে। রামলালদাদাকে তিনি বললেন , সকলের পাপ গ্রহণ করে তাঁর অঙ্গ জ্বলে যাচ্ছে। ঠাকুরের কথামত রামলালদাদা গঙ্গাজল নিয়ে এলেন। ঠাকুর গায়ে মাখলেন। 


  শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন যে যাবার আগে তিনি হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিয়ে যাবেন , অর্থাৎ নিজের স্বরূপ ভক্তদের মাঝে প্রকাশ করে  দিয়ে যাবেন। তাই করলেন তিনি আজ , ১৮৮৬ সালের ১লা জানুয়ারি। কৃপাসিন্ধু ভগবান কল্পতরু হলেন ভক্তদের কাছে। ---                                          জয় শ্রীরামকৃষ্ণ🙏

        ( সংগ্রহীত)

      <----আদ্যনাথ--->

===========================

34>স্বামী সোমেশ্বরানন্দ


34>— স্বামী সোমেশ্বরানন্দ

 ("আমার সন্ন্যাস-জীবন ও বেলুড়মঠ")


সন্ন্যাসের পর থেকে তিনদিন বাইরে ভিক্ষা করে খেতে হয়। ধুতি ও সুতির চাদর ছাড়া আর কিছু পরা চলবে না, আগুনের ব্যাবহারও নিষেধ।

    সকাল ন’টা নাগাদ বেরিয়ে পড়লাম ভিক্ষায়। দু’জন করে সন্ন্যাসীর গ্রুপ। এক-এক গ্রুপ একেক দিকে যাবে। একই বাড়িতে একাধিক সন্ন্যাসী ভিক্ষা করবে না। তিন বা পাঁচ বাড়ির বেশি থেকে ভিক্ষা নেয়া যাবে না। শুধু রান্না করা খাবার নেয়া যাবে, ফলও, কিন্তু টাকা-পয়সা নয়। গেরুয়া কাপড়ের একাংশ ছিঁড়ে ঝোলা তৈরী করলাম (বৈষ্ণবদের সাপুই)। ওটাই ভিক্ষার ঝুলি। দুপুর বারোটার মধ্যে সবাইকে ফিরে আসতে হবে----রথীন মহারাজ বলে দিলেন। 

   মঠের মেন গেটের কাছে অনেক মহিলা ও পুরুষ দাঁড়িয়ে আছেন খাবার নিয়ে। নবীন সন্ন্যাসীদের ভিক্ষা দেবেন। আমরা কয়েকজন তাই পেছনের গেট দিয়ে লুকিয়ে চলে গেলাম। ইচ্ছা ছিল সেই অঞ্চলে যাব যেখানে কেউ আমাদের চেনে না। 

   প্রায় মাইল খানিক হেঁটে আমরা দু’জন একটা পাড়ায় ঢুকলাম। সঙ্গী গেল একদিকে, আমি অন্যদিকে। এক বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই উপরের বারান্দা থেকে একজন প্রৌঢ়া মহিলা বললেন ---এসেছো বাবা? একটু দাঁড়াও। আমি আসছি। তিনি নিচে নেমে আমার ঝুলির মধ্যে ঢেলে দিলেন ভাত, আলু ও পটল ভাজা, ফুলকপির তরকারি। ডালের বাটি দিতে গেলে বললাম—ডাল ভেতরেই ঢেলে দিন। তিনি অবাক হলেন --- সে কি বাবা? চুঁইয়ে-চুঁইয়ে পড়বে যে নীচে দিয়ে। বললাম— এভাবেই ভিক্ষা নেয়ার নিয়ম আমাদের। সব মাখামাখি হয়ে যাবে, তা যাক। 

    ওখান থেকে বেশ কিছুটা হেঁটে অন্য এলাকায় গেলাম। জবরদস্ত অভিজ্ঞতা হলো। দরজা খুলে এক ভদ্রলক জিজ্ঞেস করলেন—  আপনি কোন আশ্রমের? বললাম— বেলুড়মঠের। শুনেই তিনি চোখ গোল গোল করে বিস্ময় প্রকাশ করলেন— সে কি? মঠের সাধু হয়ে ভিক্ষা করছেন? বেলুড়মঠের আর্থিক অবস্থা এতো খারাপ যে সাধুরা রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষা করছেন? ওগো শুনছো— স্ত্রীকে  ডাক দিলেন তিনি— মঠের সাধুরা পথে পথে বেরিয়ে ভিক্ষা চাইছে। তাঁর স্ত্রী এসে দাঁড়ালেন। ভ্রূ কুঁচকে আমার দিকে তাকালেন। পরে স্বামীকে বললেন — আমার সন্দেহ হচ্ছে। কালই তো বেলুড়মঠে খিচুড়ি প্রসাদ খেয়েছি। একদিনেই অবস্থা এতো খারাপ? না আমার মনে হয় এই সাধু ঠগ। বেলুড়মঠের নাম করে ভিক্ষা চাইছে। ওদিকে পাড়ার কয়েকজন এসে আমায় ঘিরে ধরেছে। ভদ্রলোক চেঁচাচ্ছেন --- “চোর-টোর নয় তো! গেরুয়ার ছদ্মবেশে এসেছে। এই, আপনারা একে ধরে রাখুন। আমি পুলিশে ফোন করছি।” আমি তো নার্ভাস।      

সন্ন্যাস নিতে-না-নিতেই এমন বিপত্তি! তাদের বুঝিয়ে বললাম— “আমি বেলুড়মঠের ফোন নাম্বার দিচ্ছি। আপনারা ফোন করে জেনে নিন আমার বিষয়ে।” এভাবেই রক্ষা পেয়েছিলাম সেদিন। ভিক্ষা তো দিলই না, উল্টে পুলিশের হুমকি! 

   দ্বিতীয় দিন এক মুসলমান বস্তিতে গেলাম। একটা বাড়ির বারান্দায় দু’জন মহিলা কথা বলছিলেন। সেখানে গিয়ে ভিক্ষা চাইলাম। এক ভদ্রমহিলা “আসছি বাবা” বলে ভেতরে ঢুকে বেরিয়ে এলেন খালি হাতে। এসেই গল্প করতে শুরু করলেন। কোথায় থাকি, বাড়ি কোথায় ছিল, কতদূর পড়াশোনা ইত্যাদি। ১০-১২ মিনিট ধরে তিনি গল্প চালিয়ে যেতে লাগলেন। আমি ভাবছি — ভিক্ষা না দিলে বলে দিলেই হয়! এতো প্রশ্ন কেন? এমন সময় একটি বাচ্চা ছেলে বাইরে থেকে এলো। হাতে ঠোঙা। তাকে নিয়ে ভদ্রমহিলা ভেতরে গেলেন। পরে এক বাটিতে মুড়ি এনে আমায় ভিক্ষে দিলেন। জানলাম যে বাড়িতে খাবার নেই। স্বামী রিকশা চালান। বারোটা নাগাদ চাল-ডাল নিয়ে আসবেন, তখন রান্না হবে। তাই ছেলেকে পাঠিয়েছিলেন বাজার থেকে মুড়ি নিয়ে আসতে। এজন্যই গল্প করে আমায় ব্যস্ত রেখেছিলেন এতক্ষণ। সন্ন্যাসী ভিক্ষা চাইতে এসেছেন। খালি হাতে বিদায় করতে নেই। 

   মজা হয়েছিল ললিত মহারাজকে নিয়ে। বেলুড় অঞ্চলে যুবকদের মধ্যে তিনি খুব জনপ্রিয়। এক পাড়ায় ঢুকতেই ৮-১০ জন ছেলে তাঁকে ঘেরাও করে বসলো — আমাদের ক্লাবে চলুন, ভিক্ষা দেবো। মহারাজ আপত্তি করলেন, কি করছিস তোরা? বাড়ি থেকে ভিক্ষা নেয়ার নিয়ম। ছেলেরা কথা শুনবে না। জোর করে নিয়ে গেল ক্লাবে। চেয়ারে বসিয়ে গলায় মালা দিল। বলল— মহারাজ, আজ আমাদের পুণ্য অর্জন করতে দিন। প্রচুর ফল কিনে রেখেছে ক্লাবের সদস্যেরা। কোল্ড ড্রিংস খেতে দিল। ইতিমধ্যে একজন গিয়ে এক সাইকেল-রিকশা ডেকে এনেছে। চাঙ্গাড়ি ভর্তি ফল। কমলা, আপেল, কলা, সন্দেশ। ৫-৬ টা বড় বড় ঝুড়ি। মহারাজের সীটে বসিয়ে দিল তারা। পায়ের কাছে, সীটে, হাতের পাশে ফলের ঝুড়ি। “কি করছিস বল তো তোরা!” মহারাজ ধমকে দিলেও ছেলেরা পাত্তা দিল না। সীটের এককোণায় মহারাজ কোনরকমে বসলে তারা মহারাজের হাতে কয়েকটা ডাব ধরিয়ে দিল। আর রিকশাওয়ালাকে পাঁচটাকা দিয়ে বলল--- “সোজা বেলুড়মঠে যাও। মাঝপথে মহারাজকে নামতে দেবে না।” 

     এক বাড়িতে ভিক্ষা নিচ্ছি। ভদ্রমহিলা রুটি আর আলুর তরকারি দিচ্ছেন। পাশেই তাঁর বাচ্চা ছেলে। চকোলেট খাচ্ছিল, মাকে দেখলো কিছুক্ষণ। পড়ে আমার দিকে তাকালো। হঠাৎ ছুটে এসে পকেট থেকে একটা চকোলেট দিল আমার ঝুলিতে। ভদ্রমহিলা “কি করছো” বলে চেঁচিয়ে উঠতেই বাচ্চাটি অম্লান বদনে বললো— আমিও ভিক্ষা দিচ্ছি।

তার দিকে তাকিয়ে আমি হাসিমুখে “থ্যাংকিউ” বলতে বাচ্চাটি হতভম্ব হয়ে আমাকে দেখলো কয়েক সেকেন্ড। তারপর মা’র উদ্দেশ্যে বলল— মামমি ভিখারী ইংরেজি বলছে। মা লজ্জিত। 

     একদিন ভিক্ষার শেষে বেলুড়মঠে ফিরে আসছি। একটা গলিতে ঢুকতেই একজন ভদ্রমহিলা থামালেন আমাকে। বললেন— একটু দাঁড়ান, ভিক্ষা দেব। তাঁকে বললাম যে আজ আর ভিক্ষা নিতে পারবো না, পাঁচ বাড়ি হয়ে গেছে। তিনি করুণ মুখে বল্লেন---দু’ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করে আছি, আপনারা কেউ এলে ভিক্ষা দেবো। কেউ না আসায় ভগবানের কাছে খুব প্রার্থনা করছিলাম যেন কেউ আসেন। আপনি এলেন, আর আমার ভিক্ষা নেবেন না? তিনি প্রায় কেঁদে ফেললেন। আমি অপ্রস্তুত। বললাম— নেবো, ভিক্ষা নিয়ে আসুন। 

     মঠে যখন ফিরলাম ভিক্ষার শেষে তখন ঝোলার অবস্থা খুবই খারাপ। ডাল চুঁইয়ে পড়ছে। ভেতরে ফুলকপির ঝোলে মিশে বেগুনভাজা নিস্তেজ। রুটিগুলির একপাশে দই লেগে আছে, অন্যপাশে চাটনী। খিচুড়ি আর পায়েস একসাথে মিশে গিয়ে অদ্ভুদ অবস্থা। শুক্তোর ঝোলে জিলিপি পড়ে ভেঙ্গে গেছে। 

    বারোটা নাগাদ আমরা সবাই ফিরে এলাম ভিক্ষা থেকে। মঠে লেগেট হাউসের কাছে বিশ্রাম করতে লাগলাম। তিনদিন ফাঁকা জায়গায় বসেই খেতে হবে, কোনো ঘরে নয়। সবার ঝুলি থেকে ভিক্ষান্ন নিয়ে একসঙ্গে রাখা হলো বিশাল গামলায়। সবকিছু মাখামাখি হয়ে একাকার। সেদ্ধ চাল, বাসমতী, আতপ চালের ভাত, মুগ-ছোলা-মুসুরী ডাল, ঝোল-চচ্চড়ি-শাক- সেদ্ধ-ভাজা, সন্দেশ-আচার-শুক্তো-পায়েস — সব মিলে মিশে মহাপ্রসাদ। হাতা দিয়ে ভাল করে মিশিয়ে দেয়া হল সব। 

     হ্যাঁ, এর নাম মহাপ্রসাদই। খাবার ঘরে সাধুরা বসে অপেক্ষা করছেন। মহাপ্রসাদ আগে খেয়ে পরে দৈনন্দিনের খাবার। প্রেসিডেন্ট মহারাজ, অন্যান্য প্রধান মহারাজরা, সবাই অপেক্ষা করছেন এর জন্য। শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন — ভিক্ষার অন্ন শুদ্ধ অন্ন। 

     বাইরে গাছের নীচে লাইন করে আমরা নবীন সন্ন্যাসীরা, বসে গেলাম। শালপাতায় পরিবেশন করা হলো মহাপ্রসাদ। আমরা ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত। তাড়াতাড়ি খাওয়া শুরু করলাম। কি খাচ্ছি, কেমন স্বাদ, কিচ্ছু বোঝা যাচ্ছে না। খিদে লাগলে সবই অমৃত। 

 

            — স্বামী সোমেশ্বরানন্দ

 ("আমার সন্ন্যাস-জীবন ও বেলুড়মঠ")

Tuesday, June 6, 2023

33>একই দশকে ব্যবধানে জন্ম ভারতের চারজন মহাপুরুষের।

 33>একই দশকে ব্যবধানে জন্ম ভারতের চারজন মহাপুরুষের।

মাত্র 11 বৎসরের ব্যবধানে জন্ম চার 

মহাপুরুষের।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জন্ম কলকাতা 

 7 মে 1861 

স্বামী বিবেকানন্দের জন্ম কলকাতা

  12 জানুয়ারি 1863

মহাত্মা গান্ধীর জন্ম গুজরাতে 

  2 অক্টোবর 1869

ঋষি আরবিন্দের জন্ম কলকাতা

  15 আগস্ট 1872

এই 11বৎসরের মধ্যেই জন্মেছিলেন ভারতের চার স্বনামধন্য মহাপুরুষ।

 লেখক শ্রী শঙ্করের ভাষায় 

""চার মহাপুরুষ আশ্রয়ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান স্থাপনের প্রাণদায়ী স্বপ্ন দেখেছিলেন।

মহাত্মা গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শ্রী অরবিন্দ ও বিবিবেকানন্দকে আমরা প্রাতিষ্ঠানিক সংগঠক হিসাবে দেখতে পাই।

স্বপ্নের আশ্রম জীবনকে বাস্তবায়িত করতে গিয়ে এঁদের প্রত্যেকেই যথেষ্ট সময় দিয়েছেন।

কিন্তু একশ বছরের মধ্যে গান্ধীর 

সবরমতী আশ্রম মিউজিয়ামে পরিণত হয়েছে।

পন্ডিচেরিতেও আদিযুগের সেই প্রাণবন্ত রূপ আজ বোধহয় তেমন নেই, আর শান্তিনিকেতনের আশ্রমজীবন,সে তো ইতিহাসের পাতায় নিরাপদ আশ্রয় দেবার জন্য ছুট দিয়েছে।

এঁদের প্রতিষ্ঠাতারা সকলেই তাঁদের নিজেস্ব ব্যক্তিমহিমায় এবং সৃস্টিমহিমার এখনও বিশ্ববন্দিত হচ্ছেন, কিন্তু সংগঠক হিসাবে তাঁরা কিছুটা হার মেনেছেন বললে বোধহয় সত্যের অপলাপ করা হবে না।

অন্য তিনজনের তুলনায় বিবেকানন্দ তাঁর প্রতিষ্ঠিত সঙ্ঘকে সবচেয়ে কম সময় দিতে পেরেছেন। রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের নিতান্ত শৈশবকালেই তিনি ইহলীলা সংবরণ করেছেন, কিন্তু শতবর্ষের দূরত্বেও

একটি প্রাণবন্ত প্রতিষ্ঠান হিসর্বে তার ক্রমাগত বিস্তার অব্যাহত।"

আজও রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের শাখা বাড়ছে, এই একবিংশ শতাব্দীতেও প্রতি বছর শতাধিক যুবক এই সঙ্ঘে সর্বত্যাগের ব্রত গ্রহণ করছে।



Sunday, May 7, 2023

32>)শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের শিষ্য গণ।

 


32>)শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের শিষ্য গণ। 

সন্ন্যাসী শিষ্য গণ::---

          (1 to 17)


★1>স্বামী বিবেকানন্দ::---

★2>স্বামী ব্রহ্মানন্দ::---

★3>স্বামী তুরীয়ানন্দ::---

★4>স্বামী অভেদানন্দ::----

★5>স্বামী অদ্ভূতানন্দ::--

★6>স্বামী অদ্বৈতানন্দ::;---

★7>স্বামী নির্মলানন্দ:::----

★8>স্বামী অখণ্ডানন্দ:::---

★9>স্বামী ত্রিগুণাতীতানন্দ::--

★10>স্বামী সুবোধানন্দ:::----

★11>স্বামী বিজ্ঞানানন্দ::---

★12>স্বামী নিরঞ্জনানন্দ::;--

★13>স্বামী প্রেমানন্দ:::---

★14>স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ::--

★15>স্বামী সারদানন্দ:::---

★16>স্বামী শিবানন্দ::--

★17>স্বামী যোগানন্দ::::---


        - এবং 



★★শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ দেবের গৃহস্থ শিষ্য গণের নাম।( সংক্ষিপ্ত)

               ( 1 to 36)


●1>রাণী রাসমণি

●2>মথুরমোহন বিশ্বাস

●3>হৃদয়রাম মুখোপাধ্যায়

●4>লক্ষ্মী দেবী

●5>শম্ভুচরণ মল্লিক - ঠাকুরের দ্বিতীয় রসদদার।

●6>পূর্ণচন্দ্র ঘোষ - কথামৃতের প্রকাশক শ্রী মহেন্দ্র গুপ্ত কর্তৃক শ্রীরামকৃষ্ণের সাথে তার পরিচয়।

●7>অক্ষয়কুমার সেন

●8>অধরলাল সেন — ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা বিভাগের সদস্য।

●9>অঘোর ভাদুড়ী

কি●10>অতুলচন্দ্র ঘোষ

●11>অশ্বিনীকুমার দত্ত

●12>বৈদ্যনাথ — কলকাতা উচ্চ আদালতের বিচারপতি

●13>রামচন্দ্র দত্ত - কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের রাসায়নিক পরীক্ষক এবং সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশনের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক।

●14>মনমোহন মিত্র

●15>মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত ("শ্রীম")

●16>গিরিশচন্দ্র ঘোষ

●17>যোগীন মা - যোগীন্দ্রমোহিনী বিশ্বাস

●18>গৌরী মা

●19>গোলাপ মা

●20>গোলাপ মা

●21>প্রতাপচন্দ্র মজুমদার

●22শিবনাথ শাস্ত্রী

●23>গিরিশ চন্দ্র সেন

●24>ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়

●25বলরাম বসু

●26>সুরেন্দ্রনাথ মিত্র

●27>দুর্গাচরণ নাগ

●28অক্ষয় কুমার সেন

●29>বিশ্বনাথ উপাধ্যায় — ভারত সরকারের ভাইসরয়ের কাছে নেপাল সরকারের রাষ্ট্রদূত।

●30>ঈশানচন্দ্র মুখোপাধ্যায় — সুপারিনটেনডেন্ট অফ একাউন্টেন্ট জেনারেল অফিস, বাংলা।

●31>চুনীলাল বসু

●32>প্রতাপচন্দ্র হাজরা

●33>নবগোপাল ঘোষ ও নিস্তারিণী দেবী

●34>দেবেন্দ্রনাথ  মজুমদার

●35>তেজচন্দ্র মিত্র

●36>মণীন্দ্রকৃষ্ণ গুপ্ত

==========================



==============


★★1>স্বামী বিবেকানন্দ::---

স্বামী বিবেকানন্দ (১৮৬৩-১৯০২)

 ছিলেন একজন হিন্দু সন্ন্যাসী, দার্শনিক, লেখক, সংগীতজ্ঞ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর ভারতীয় অতীন্দ্রিয়বাদী রামকৃষ্ণ পরমহংসের প্রধান শিষ্য। বিবেকানন্দের পিতৃপ্রদত্ত নাম ছিল নরেন্দ্রনাথ দত্ত। ১৮৬৩ খ্রিষ্টাব্দে ১২ জানুয়ারি উত্তর কলকাতার সিমলা অঞ্চলে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ১৮৮১ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে  এফএ পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হওয়ার সময় রামচন্দ্র দত্ত একবার নরেন্দ্রনাথকে সুরেন্দ্রনাথ মিত্রের বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবকে ধর্মোপদেশ দানের জন্য নিমন্ত্রণ জানানো হয়,  এটিই ছিল রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব ও তরুণ নরেন্দ্রনাথের প্রথম সাক্ষাৎকার। পরে নরেন্দ্রনাথের সঙ্গীতপ্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব তাকে দক্ষিণেশ্বরে নিমন্ত্রণ করেন।


১৮৮৪ খ্রিষ্টাব্দে নরেন্দ্রনাথের পিতা হঠাৎ মারা গেলে ও ঋণদাতারা ঋণশোধের জন্য তাদের তাগাদা দিতে শুরু করে এবং আত্মীয়স্বজনরা তাদের পৈতৃক বাসস্থান থেকে উৎখাত করার চেষ্টা শুরু করে। তিনি চাকরির অনুসন্ধান শুরু করেন এবং ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে ওঠেন। কিন্তু একই সময়ে দক্ষিণেশ্বরে রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের সান্নিধ্যে তিনি শান্তি পেতে থাকেন। এরপর নরেন্দ্রনাথ ঈশ্বর-উপলব্ধির জন্য সংসার ত্যাগ করতে মনস্থ করেন এবং রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবকে গুরু বলে মেনে নেন।  ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দে রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের গলার ক্যান্সার ধরা পড়লে নরেন্দ্রনাথসহ রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের অন্যান্য শিষ্যগণ তার সেবা-যত্ন করেন। এই সময়ও নরেন্দ্রনাথের ধর্মশিক্ষা চলতে থাকে। কাশীপুরে নরেন্দ্রনাথ নির্বিকল্প সমাধি লাভ করেন। নরেন্দ্রনাথ ও অন্যান্য কয়েকজন শিষ্য এই সময় রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের কাছ থেকে সন্ন্যাস ও গৈরিক বস্ত্র লাভ করেন। এভাবে রামকৃষ্ণ শিষ্যমণ্ডলীতে প্রথম সন্ন্যাসী সংঘ স্থাপিত হয়।  রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব নরেন্দ্রনাথকে শিক্ষা দেন মানব সেবাই ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠ সাধনা। 


রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের মৃত্যুর পর তার ভক্ত ও অনুরাগীরা তার শিষ্যদের সাহায্য করা বন্ধ করে দেন। নরেন্দ্রনাথ ও অন্যান্য শিষ্যেরা বসবাসের জন্য নতুন বাসস্থানের খোঁজ শুরু করেন। অনেকে বাড়ি ফিরে গিয়ে গৃহস্থ জীবন যাপন করতে থাকেন। অবশিষ্ট শিষ্যদের নিয়ে নরেন্দ্রনাথ উত্তর কলকাতার বরাহনগর অঞ্চলে একটি ভাঙা বাড়িতে নতুন মঠ প্রতিষ্ঠা করার কথা চিন্তা করেন। বরাহনগর মঠ হল রামকৃষ্ণ মঠের প্রথম ভবন। এই মঠে নরেন্দ্রনাথ ও অন্যান্য শিষ্যেরা ধ্যান ও কঠোর ধর্মানুশীলন অভ্যাস করতেন। 


১৮৮৭ খ্রিষ্টাব্দে, নরেন্দ্রনাথ বৈষ্ণব চরণ বসাকের সঙ্গে সঙ্গীতকল্পতরু নামে একটি সঙ্গীত-সংকলন সম্পাদনা করেন। নরেন্দ্রনাথই এই বইটির অধিকাংশ গান সংকলন ও সম্পাদনা করেছিলেন। কিন্তু প্রতিকূল পরিস্থিতির জন্য তিনি বইটির কাজ শেষ করে যেতে পারেননি। 


নরেন্দ্রনাথের গুরুভ্রাতা বাবুরামের মা নরেন্দ্রনাথ ও অন্যান্য সন্ন্যাসীদের আঁটপুর গ্রামে আমন্ত্রণ জানান। আঁটপুরেই বড়দিনের পূর্বসন্ধ্যায় নরেন্দ্রনাথ ও আটজন শিষ্য আনুষ্ঠানিকভাবে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন।  নরেন্দ্রনাথ গ্রহণ করেন "স্বামী বিবেকানন্দ" নাম।


অদ্বৈত আশ্রম, মায়াবতী, রামকৃষ্ণ মঠের একটি শাখা, প্রতিষ্ঠাকাল মার্চ ১৯, ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দ, পরবর্তীতে স্বামী বিবেকানন্দের অনেক লেখা প্রকাশ করে, বর্তমানে "প্রবুদ্ধ ভারত" সাময়িকী প্রকাশ করে

প্রথম বিশ্বধর্ম মহাসম্মেলন ১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দের ১১ সেপ্টেম্বর শিকাগোর আর্ট ইনস্টিটিউটে উদ্বোধন হয়। এদিন বিবেকানন্দ তার প্রথম সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন। তিনি ভারত এবং হিন্দু ধর্মের প্রতিনিধিত্ব করেন।


১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দের ১ মে কলকাতায় বিবেকানন্দ প্রতিষ্ঠা করেন ধর্ম প্রচারের জন্য সংগঠন "রামকৃষ্ণ মঠ" এবং সামাজিক কাজের জন্য সংগঠন "রামকৃষ্ণ মিশন"। এটি ছিল শিক্ষামূলক, সাংস্কৃতিক, চিকিৎসা-সংক্রান্ত এবং দাতব্য কাজের মধ্য দিয়ে জনগণকে সাহায্য করার এক সামাজিক-ধর্মীয় আন্দোলনের প্রারম্ভ।  রামকৃষ্ণ মিশনের আদর্শের ভিত্তি হচ্ছে কর্ম যোগ।  স্বামী বিবেকানন্দের দ্বারা দুটি মঠ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যার মধ্যে কলকাতার কাছে বেলুড়ের মঠটি রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের প্রধান কার্যালয় করা হয়েছিল এবং অন্যটি হিমালয়ের মায়াবতীতে আলমোড়ার নিকটে অদ্বৈত আশ্রম নামে পরিচিত এবং পরে তৃতীয় মঠটি মাদ্রাজে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। ইংরেজিতে প্রবুদ্ধ ভারত ও বাংলায় উদ্বোধন নামে দুটি সাময়িকী চালু করা হয়েছিল।


৪ জুলাই ১৯০২ খ্রিষ্টাব্দে ধ্যানরত অবস্থায় তিনি মৃত্যু বরণ করেন, তার শিষ্যদের মতে, বিবেকানন্দের মহাসমাধি ঘটেছিল।

■■■■■◆■■■■■■■■■



★★2>স্বামী ব্রহ্মানন্দ::---


স্বামী ব্রহ্মানন্দ (১৮৬৩-১৯২২)


স্বামী ব্রহ্মানন্দ ছিলেন প্রসিদ্ধ বাঙালি সন্ন্যাসী ও রামকৃষ্ণ পরমহংসের অন্যতম প্রধান শিষ্য। শ্রীরামকৃষ্ণ তাকে নিজের ভাবসন্তানের মর্যাদা দেন। ব্রহ্মানন্দের পিতৃপ্রদত্ত নাম ছিল রাখালচন্দ্র ঘোষ। ১৮৬৩ সালের ২১শে জানুয়ারি কলকাতার নিকটস্থ বসিরহাট মহকুমার শিকরা-কুলীনগ্রামে পিতা আনন্দমোহন ঘোষের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। রাখাল ছোটবেলা থেকে ঈশ্বরে আসক্ত ছিলেন এবং শৈশব থেকেই ধ্যান অনুশীলন করতেন। বারো বছর বয়সে তাকে পড়াশোনার জন্য কলকাতায় পাঠান হয়।


তার জন্মের আগে তার গুরু রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব স্বপ্নদর্শন পেয়েছিলেন যে দেবী তাকে একটি শিশু দেখান পরবর্তীতে যিনি তার পুত্র হবেন। রাখাল দক্ষিণেশ্বরে আসার সাথে সাথে শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস তাকে সেই শিশু বলে স্বীকৃতি দেন এবং তার সাথে পুত্রের মতো আচরণ করেন। কয়েকবার তার সান্নিধ্যে আসার পর রাখাল শ্রীরামকৃষ্ণের সাথে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য দক্ষিণেশ্বরে আসেন। গুরু নির্দেশনায় তিনি তীব্র আধ্যাত্মিক অনুশাসন অনুশীলন করা শুরু করেন এবং গূঢ় আধ্যাত্মিক শক্তি অর্জন করেন। ১৮৮৬ সালে গুরুর মৃত্যুর পর যখন বরানগরে নতুন সন্ন্যাসী ভ্রাতৃত্ব গঠিত হয়, রাখাল তাতে যোগ দেন। তিনি সন্ন্যাস গ্রহণ করেন এবং ব্রহ্মানন্দ নাম ধারণ করেন। দুই বছর পরে তিনি বরানগর মঠ ত্যাগ করেন এবং কিছু সময়ের জন্য একজন পরিব্রাজক সন্ন্যাসী হয়ে বারাণসী, ওঁকারনাথ, বৃন্দাবন, হরিদ্বার এবং অন্যান্য স্থানে ভ্রমণ করে গভীর মননশীল জীবনযাপন শুরু করেন। এই সময়কালে তিনি অদ্বৈতবাদী অভিজ্ঞতার সর্বোচ্চ শিখর অতিক্রম করেন এবং টানা কয়েকদিন সমাধিতে নিমগ্ন থাকতেন বলে জানা যায়। ১৮৯০ সালে তিনি মঠে ফিরে আসেন। ১৮৯৭ সালে ভারতে ফিরে আসার পর স্বামী বিবেকানন্দ যখন সন্ন্যাস জীবনকে নতুন সংজ্ঞা দিতে পরিকর হন, তখন স্বামী ব্রহ্মানন্দ তাকে আন্তরিকভাবে সমর্থন করেছিলেন। এই দুই সন্ন্যাসী গুরুভাইয়ের মধ্যে গভীর ভ্রাতৃত্ব বেশ সমাদৃত ছিল।


১৮৯৭ সালের ১লা মে কলকাতার বাগবাজারে রামকৃষ্ণ মিশনের একটি সংগঠন গঠিত হলে স্বামী বিবেকানন্দ এর সাধারণ সভাপতি নির্বাচিত হন এবং স্বামী ব্রহ্মানন্দ প্রথম এবং একমাত্র কলকাতার সভাপতি নির্বাচিত হন। বেলুড় মঠ প্রতিষ্ঠার পর স্বামী বিবেকানন্দ যখন রামকৃষ্ণ মঠকে একটি ট্রাস্ট হিসাবে নিবন্ধিত করেন, তখন স্বামী ব্রহ্মানন্দ এর সভাপতি হন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।


সভাপতি হিসাবে তাঁর মেয়াদকালে রামকৃষ্ণের উপদেশের ব্যাপক প্রসার ঘটে এবং ভারতে এবং বিদেশে বেশ কয়েকটি নতুন শাখা কেন্দ্র খোলা হয়। স্বামী বিবেকানন্দ একটি সমিতি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা রামকৃষ্ণ মিশন তার সময়ে পুনরুজ্জীবিত এবং নিবন্ধিত হয়েছিল। তার শিষ্য যোগীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১২ সালে বরানগর, কলকাতায় তার নামে "ব্রহ্মানন্দ বালকশ্রম" নামে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা এখন বরানগর রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রম উচ্চ বিদ্যালয় হিসাবে পরিচিত।  প্রশাসনের তার দক্ষ গুণাবলীর জন্য, স্বামী বিবেকানন্দ তাকে 'রাজা' উপাধি দিয়েছিলেন এবং তারপর থেকে তিনি শ্রদ্ধার সাথে সকলের দ্বারা 'রাজা মহারাজ' নামে পরিচিত হন। তিনি ছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণের ছয়জন শিষ্যের একজন যাঁকে গুরু ঈশ্বরকোটী বলে গণ্য করতেন।


তিনি তার জীবনের দীর্ঘ সময় পুরী এবং ভুবনেশ্বরে কাটিয়েছেন। তিনি পুরী এবং ভুবনেশ্বরে রামকৃষ্ণ আশ্রম স্থাপনের জন্য কাজ করেন। ১৯২২ সালের ১০ই এপ্রিল তিনি অসুস্থতার কারণে ইহলোক ত্যাগ করেন। বেলুড় মঠে যেখানে তাঁর দেহ সমাধিস্থ করা হয় সেখানে তাঁর স্মৃতিতে একটি মন্দির রয়েছে।

■■■■■■■■■■■■■■■



★★3>স্বামী তুরীয়ানন্দ::---


স্বামী তুরীয়ানন্দ (১৮৬৩-১৯২২)

কিছু মানুষ যারা এই পৃথিবীতজ আবির্ভূত তো হন কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা এজগতের জন্য নয়, স্বামী তুরীয়ানন্দ ছিলেন তাদেরই একজন। যার পিতৃপ্রদত্ত নাম হরিনাথ চট্টোপাধ্যায়। ১৮৬৩ সালের ৩ জানুয়ারি উত্তর কলকাতায় এক পরিচিত পরিবারে চন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের ঘরে জন্মগ্রহণ করলেও শৈশবে তিনি তার পিতামাতাকে হারান এবং তার বড় ভাই মহেন্দ্রনাথের যত্নে বেড়ে ওঠেন। স্কুলের ফাইনাল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর তিনি আর কলেজে যায়নি। পরিবর্তে, তিনি তার সময়কে ধ্যান এবং শঙ্করের অদ্বৈত বেদান্ত অধ্যয়নের জন্য উৎসর্গ করেন। তার প্রায় ১৭ বছর বয়সে বাগবাজারে কালীনাথ বসু-র পৈতৃক বাড়িতে এসে প্রথমবার দক্ষিণেশ্বরে শ্রী রামকৃষ্ণের সাথে দেখা করেন, এবং তার পরে তিনি প্রায়শই গুরুর কাছে যাওয়া শুরু করেন। গুরু তাকে যোগীপুরুষ বলে আখ্যায়িত করা শুরু করেন। কাশীপুরে শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনের শেষ অসুস্থতার সময় তাকে সেবায় নিয়োজিত থাকা শিষ্যদের মধ্যে তিনিও একজন ছিলেন। গুরুর মৃত্যুর পর হরি বরানগর মঠে যোগ দেন এবং তুরীয়ানন্দ নাম ধারণ করে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। তিন বছর পর তিনি মঠ ত্যাগ করেন এবং বিভিন্ন স্থানে কখনও একা, কখনও তাঁর ভাই সন্ন্যাসীদের সঙ্গে তপস্যা করে সময় কাটান। স্বামী বিবেকানন্দ দ্বিতীয়বার পশ্চিম দেশের উদ্দেশ্যে গেলে তিনি স্বামী তুরীয়ানন্দকে সঙ্গে নিয়ে যান। স্বামীজি ভারতে ফিরে গেলে, তুরীয়ানন্দ তার কাজ চালিয়ে যান। প্রথমে নিউইয়র্ক, বস্টন এবং পরে ক্যালিফোর্নিয়ায় তিনি গুরুর উপদেশ প্রচার করেন। তার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটলে তিনি ১৯০২ সালের জুন মাসে আমেরিকা ত্যাগ করেন। ভারতে এসে তিনি স্বামী বিবেকানন্দের মৃত্যুর খবর শুনে মর্মাহত হন। তুরীয়ানন্দ পরবর্তীকালে বেশ কয়েক বছর বৃন্দাবনে, হিমালয়ের বিভিন্ন স্থানে, দেরাদুন, কনখল, আলমোড়া প্রভৃতি স্থানে গভীর মনন অনুশীলন করে অতিবাহিত করেন। অবশেষে তিনি ১৯১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে বারাণসীতে বসতি স্থাপন করেন। এর গত কয়েক বছর ধরে তিনি মধুমেহ রোগেও ভুগছিলেন। ১৯২২ সালের ২১শে জুলাই বারাণসীতে তিনি মারা যান। মৃত্যুর কয়েক মুহূর্ত আগে তিনি তার গুরুভাই স্বামী অখণ্ডানন্দ-র সাথে 'সত্যম, জ্ঞানম অনন্তম ব্রহ্ম' অর্থাৎ 'ঈশ্বরই সত্য, প্রজ্ঞা এবং অসীম' উপনিষদিক মন্ত্রটি পুনরাবৃত্তি করেছিলেন যার পরে তাকে বাংলায় বিড়বিড় করতে শোনা গিয়েছিল 'ব্রহ্ম সত্য, জগৎ সত্য; সব সত্য, সত্যে প্রাণ প্রতিষ্ঠ' যার অর্থ 'ঈশ্বর সত্য, জগৎও সত্য, সবকিছুই সত্য। জীবন সত্যের উপর ভিত্তি করে'। এটি বিবেকচূড়ামণির গোঁড়াবাক্য 'ব্রহ্ম সত্যম জগৎ মিথ্যা' অর্থাৎ ঈশ্বর সত্য এবং বিশ্ব মিথ্যা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। এই অবিলম্বে উচ্চারিত হওয়া অপ্রচলিত শেষ কথাগুলি একজন সিদ্ধ ঋষির দেখা দর্শন হিসাবে গণ্য যিনি জগতের সর্বত্র ঈশ্বরকে বিরাজমান দেখেন।

■■■■■■■■■■■■■■■



★★4>স্বামী অভেদানন্দ::----


স্বামী অভেদানন্দ (১৮৬৬-১৯৩৯)


 ১৮৬৬ সালের ২রা অক্টোবর উত্তর কলকাতায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন, পিতৃপ্রদত্ত নাম কালীপ্রসাদ চন্দ্র।  তার বাবা রসিকলাল চন্দ্র ও মা নয়নতারা দেবী‌। ১৮৮৪ সালে ১৮ বছর বয়সে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্কুলের ফাইনাল পরীক্ষার জন্য অধ্যয়ন করার সময় তিনি দক্ষিণেশ্বরে যান এবং শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে দেখা করেন। এটিই তার প্রথম সাক্ষাৎকার হলেও তাকে তিনি গুরুর আসনে অধিষ্ঠিত করেন।। এরপর, ১৮৮৫ সালের এপ্রিল মাসে, রামকৃষ্ণের জীবনের শেষ অসুস্থতার সময়ে প্রথমে শ্যামপুকুর এবং তারপর কলকাতার কাছে কাশীপুর গার্ডেন-হাউসে তাঁর সাথে থাকার জন্য নিজ বাসগৃহ ত্যাগ করেন।


১৮৮৬ সালে তাঁর গুরুর মৃত্যুর পর, তিনি বরানগর মঠের একটি ঘরে নিজেকে বন্ধ করে তীব্র সাধনায় (ধ্যানে) নিমজ্জিত হন, এর ফলে তাঁর সহশিষ্যদের মধ্যে তিনি "কালী তপস্বী" নামে পরিচিত পান।রামকৃষ্ণের মৃত্যুর পর, তিনি বিবেকানন্দ এবং অন্যান্যদের সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে সন্ন্যাসী হয়ে এবং "স্বামী অভেদানন্দ" নাম ধারণ করেছিলেন।


লন্ডনে অদ্বৈত বেদান্তের উপর তাঁর প্রথম বক্তৃতা তাৎক্ষণিকভাবে সফল হয়েছিল। পরে তিনি নিউইয়র্কে চলে যান। তিনি শতাব্দীর এক চতুর্থাংশ ধরে পশ্চিমের (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ উভয়ই) এলাকাগুলোতে খুব ব্যাপকভাবে সফর করেছেন এবং বক্তৃতা দিয়েছেন। তাঁর বক্তৃতাগুলি পশ্চিমা বুদ্ধিমত্তার ক্রিমকে আকৃষ্ট করেছিল এবং সত্যের আন্তরিক অনুসন্ধানকারীদেরও আকৃষ্ট করেছিল। হনুলুলুতে নিখিল প্রশান্ত মহাসাগরীয় শিক্ষা সম্মেলনে অংশগ্রহণ করার পর তিনি ১৯২১ সালে ভারতে ফিরে আসেন এবং নিজের মতো করে কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য ১৯২৩ সালে কলকাতায় একটি 'রামকৃষ্ণ বেদান্ত সোসাইটি' গঠন করেন। ১৯২২ সালে তিনি পায়ে হেঁটে হিমালয় পার হয়ে তিব্বত পৌঁছেন, যেখানে তিনি বৌদ্ধ দর্শন ও তিব্বতি বৌদ্ধধর্ম অধ্যয়ন করেন। ১৯২৪ সালে তিনি বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির (বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ) দার্জিলিং-এ রামকৃষ্ণ বেদান্ত মঠ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯২৭ সালে তিনি রামকৃষ্ণ বেদান্ত সোসাইটির মাসিক ম্যাগাজিন বিশ্ববাণী প্রকাশ করা শুরু করেন, যা তিনি ১৯২৭ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত সম্পাদনা করেছিলেন।  এটি এখনও প্রকাশিত হয়। ১৯৩৬ সালে, তিনি রামকৃষ্ণের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের অংশ হিসেবে কলকাতার টাউন হলে ধর্ম সংসদে সভাপতিত্ব করেন। রামকৃষ্ণ বেদান্ত মঠে ১৯৩৯ সালের ৮ই সেপ্টেম্বর তিনি যখন নশ্বর কুণ্ডলী ত্যাগ করেন তখন গুরু সরাসরি সাক্ষাৎ সন্ন্যাসী শিষ্যদের যুগের অবসান ঘটে। শ্রী রামকৃষ্ণ এবং শ্রী সারদা দেবীর উপর বেশ কয়েকটি সূক্ষ্ম সংস্কৃত স্তোত্রের লেখক তিনি - সবচেয়ে জনপ্রিয় হল 'প্রকৃতিম পরমম্'। স্বামী অভেদানন্দ ছিলেন বৌদ্ধিক বুদ্ধিমত্তা, ভক্তিমূলক উদ্দীপনা এবং যোগিক আত্মদর্শনের মতো বেশ কয়েকটি প্রতিভার বিরল সংমিশ্রণ। তিনি একজন ভাল বক্তা এবং একজন প্রফুল্ল ছিলেন। এমনকি শৈশবকাল থেকেই তার সংস্কৃত অধ্যয়নের প্রতি ঝোঁক ছিল। বড় হওয়ার সাথে সাথে তিনি প্রাচ্য এবং পশ্চিম উভয় দার্শনিক কাজের অধ্যয়নের প্রতি আকৃষ্ট হন। তার যোগী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা তাকে শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে নিয়ে আসে যিনি অবিলম্বে তাকে তার নিকট শিষ্য হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। তিনি গুরুর নির্দেশনায় মনস্তাত্ত্বিক জীবনে দ্রুত অগ্রসর হন। জ্ঞান ও পটুতার জন্য স্বামী বিবেকানন্দ পশ্চিমে কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য একজন উপযুক্ত সহকারী হিসাবে স্বাভাবিকভাবেই স্বামী অভেদানন্দের কথা ভেবেছিলেন।

■■■■■■■■■■■■■■



★★5>স্বামী অদ্ভূতানন্দ::--

স্বামী অদ্ভূতানন্দ (?-১৯২০)

যদিও রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের বেশিরভাগ প্রত্যক্ষ শিষ্য বাঙালি বুদ্ধিজীবী পরিবার থেকে এসেছিলেন, এর বিপরীতে অদ্ভূতানন্দের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাব সত্ত্বেও থাকা মননশক্তি তাকে বাকিদের মধ্যে অনন্য করে তুলেছিল।  ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পূর্ব ভারতের বিহার প্রদেশের ছাপরায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন।  তার পিতৃপ্রদত্ত নাম ছিল রাখতুরাম, যদিও তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের অন্যান্য শিষ্যদের কাছে লাটুরাম বা লাটু মহারাজ নামে পরিচিত ছিলেন। দারিদ্র্যের ফলে লাটুরাম ও তার কাকা জীবিকার সন্ধানে কলকাতায় আসতে বাধ্য হন। লাটুরাম রামকৃষ্ণের গৃহস্থ ভক্ত রামচন্দ্র দত্তর সহায়তায় তাঁর পরিচারক হিসেবে যোগ দেন।  ধীরে ধীরে শ্রীরামকৃষ্ণের শিক্ষায় তিনি আকৃষ্ট হন। শ্রীরামকৃষ্ণের গলায় ক্যানসার ধরা পড়লে তার সুবিধার জন্য, ভক্তরা রামকৃষ্ণকে দক্ষিণেশ্বর থেকে উত্তর কলকাতার শ্যামপুকুরে নিয়ে যান। লাটু তার ব্যক্তিগত পরিচারক হয়ে তার সাথে যান। তিনি পরে ১৮৮৫-র ১১ ডিসেম্বর রামকৃষ্ণের সাথে কাশীপুরে চলে যান। তিনি গুরুর শেষ দিনগুলিতে গুরুসেবায় নিযুক্ত ছিলেন। যার কথা স্মরণ করে লাটু বলেছিলেন, "গুরুর সেবা করা আমাদের উপাসনা ছিল। আমাদের অন্য কোন আধ্যাত্মিক অনুশাসনের প্রয়োজন ছিল না। লাটু রামকৃষ্ণের কাছ থেকে একটি গেরুয়া কাপড় এবং জপমালা পেয়েছিলেন।১৮৮৬ সালের ১৬ আগস্ট রামকৃষ্ণের মৃত্যুর পর, লাটু সারদা দেবী এবং রামকৃষ্ণের অন্যান্য সাধারণ ও সন্ন্যাসী শিষ্যদের সাথে বৃন্দাবন, বারাণসী, অযোধ্যা পরিদর্শনে তীর্থযাত্রায় যান।


রামকৃষ্ণের মৃত্যুর পর, নরেন্দ্র তথা বিবেকানন্দ এবং অন্য কিছু শিষ্য বরানগরে একটি পুরানো জরাজীর্ণ বাড়িতে প্রথম রামকৃষ্ণ মঠ প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে নরেন সহ কিছু শিষ্য তাদের সন্ন্যাসী ব্রত নেন এবং ধর্মগ্রন্থ অধ্যয়ন, ধ্যান ও তপস্যা অনুশীলনে নিযুক্ত হন। লাটু ১৮৮৭ সালে তাদের সাথে যোগ দেন এবং সন্ন্যাসীর ব্রত গ্রহণ করেন, পরে বিবেকানন্দ তাকে সন্ন্যাসীর নাম দিয়েছিলেন অদ্ভূতানন্দ। ১৯০৩ থেকে ১৯১২ পর্যন্ত দীর্ঘ নয় বছর তিনি তার গুরুর অপর এক গৃহস্থ শিষ্য বলরাম বসুর বাড়ীতে কাটান।


১৯১২ সালের অক্টোবর মাসে তিনি বলরাম বসুর বাড়ী ত্যাগ করে বারাণসীর উদ্দেশ্যে রওনা দেন এবং আর কখনো কলকাতা ফেরত আসেননি। এখানে তিনি প্রথম দিকে রামকৃষ্ণ অদ্বৈত আশ্রমে এবং পরে বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করতেন। ভক্তগণ তাকে প্রায়শই ধ্যানে মগ্ন থাকতে দেখতেন এবং তিনি খুব কমই খাবার খাওয়ার জন্য সময় পেতেন। বারাণসীতে, তিনি তার ভক্ত ও সাধারণ মানুষকে তার গুরুর শিক্ষা এবং আধ্যাত্মিক নির্দেশ প্রচার করতে থাকেন। ১৯২০ সালের ২৪শে এপ্রিল মধুমেহ এবং পচনশীল ক্ষত রোগের বশে স্বামী অদ্ভূতানন্দ পূণ্য শহর বারাণসীতে দেহত্যাগ করেন।

■■■■■■■■■■■■



★★6>স্বামী অদ্বৈতানন্দ::;---

স্বামী অদ্বৈতানন্দ (১৮২৮-১৯০৯)


তিনি ছিলেন রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের বয়োজ্যোষ্ঠ সাক্ষাৎশিষ্য। ১৮২৮ সালের ২৮শে আগস্ট কলকাতা থেকে কিছু মাইল দূরে চব্বিশ পরগনার জগদ্দলের নিকট রাজপুর গ্রামে পিতা গোবর্ধন শূর ঘোষের ঘরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পিতৃপ্রদত্ত নাম ছিল গোপালচন্দ্র ঘোষ। ১৮৮৪ সালে তাঁর স্ত্রী মারা গেলে এবছরই মার্চ বা এপ্রিল মাসে ৫৫ বছর বয়সে তিনি রামকৃষ্ণের কাছে আসেন। এই প্রথম সাক্ষাতে, রামকৃষ্ণ এবং গোপাল ঘোষের মধ্যে কোন সংযোগ ছিল বলে মনে হয় না। তার বন্ধু তাকে কিছু বোঝানোর পর তিনি দ্বিতীয়বার দেখা করেন। এই সাক্ষাৎকারে রামকৃষ্ণ তাঁর সাথে বিচ্ছিন্নতার কথা বলেছিলেন। তৃতীয় বারের সাক্ষাতে গোপাল ঘোষ স্মরণ করে বলতেন, "গুরু আমাকে তখনই ধারণ করেছিলেন। আমি দিনরাত তাঁর কথা ভাবতাম। গুরুর কাছ থেকে বিচ্ছেদের যন্ত্রণায় আমার বুকে ব্যথা দিত। আমি যতই চেষ্টা করি না কেন, আমি তার মুখ ভুলতে পারিনি।


রামকৃষ্ণ গোপালকে তাঁর শিষ্য হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁকে "বড় গোপাল" বা "অধ্যক্ষ" বলে সম্বোধন করেছিলেন কারণ তিনি রামকৃষ্ণের চেয়ে আট বছরের বড় ছিলেন। অন্য শিষ্যরা তাকে "গোপাল-দা" বলে ডাকতেন (-দা মানে বড়ভাই)। তিনি শীঘ্রই রামকৃষ্ণের ঘনিষ্ঠ অনুচর এবং পবিত্র মায়ের সহকারী হয়ে ওঠেন। রামকৃষ্ণ গৃহস্থালির বিষয়ে তার ব্যবস্থাপনা এবং মানুষের সাথে তার মিষ্টি আচরণের প্রশংসা করেছিলেন। বেশ কয়েক বছর পরে, গোপালই রামকৃষ্ণকে গেরুয়া কাপড় দিয়েছিলেন যা রামকৃষ্ণ তাঁর বেশ কয়েকজন শিষ্যকে (গোপাল সহ) সন্ন্যাস জীবনে দীক্ষিত করতে ব্যবহার করেছিলেন। ১৮৮৫ সালের সেপ্টেম্বরে, যখন শ্রীরামকৃষ্ণ তার ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য কলকাতার শ্যামপুকুর এবং তারপরে ডিসেম্বরে কাশীপুরে চলে আসেন, তখন গুরুমা সারদামণি দেবীকে সহায়তা করার জন্য গোপাল ও অন্যন্য শিষ্যরাও তার সাথে চলে যান ও যথাসাধ্য সেবা সুশ্রূষা করেন।


১৮৮৬ সালে রামকৃষ্ণের মৃত্যুর পর তিনি সন্ন্যাস ব্রত নেন এবং স্বামী অদ্বৈতানন্দ হন। তার থাকার কোন জায়গা ছিল না বলে রামকৃষ্ণের অপর এক গৃহস্থ শিষ্য সুরেন্দ্রর সহায়তায় তাকে রাখার জন্য এবং অন্যান্য সন্ন্যাসীদের অস্থায়ী বাসস্থান হিসাবে তথা তাকে দেখার জন্য কলকাতা শহরতলির বরানগরে একটি জায়গায় পুরাতন একটি বাড়ী ভাড়া দেওয়া হয়েছিল, যা পরে মঠের রূপ পায়। তিনিই সর্বপ্রথম বরানগর মঠে বসবাস শুরু করেন। ১৮৮৭ সালে তিনি এই বরানগর মঠ ত্যাগ করেন এবং প্রথমে বারাণসী তারপর কেদারনাথ, বদ্রীনাথ এবং বৃন্দাবন যান। ১৮৯০ সালে গুরু মায়ের সাথে তিনি গয়াতে পূর্বপুরুষদের জন্য তর্পণাচার পালন করেন এবং তারপরে মীরাটে গিয়ে কয়েক সপ্তাহ স্বামী বিবেকানন্দ এবং ছয়জন অন্যান্য সন্ন্যাসী গুরুভাইদের সাথে দেখা করেছিলেন।


১৮৮৭ সালে স্বামী অদ্বৈতানন্দ আলমবাজারে এবং তারপর নীলাম্বর বাবুর বাগানবাড়ীতে চলে যান, স্বামী বিবেকানন্দ এবং অন্যান্য সন্ন্যাসীর শিষ্যদের সাথে গঙ্গার তীরে বেলুড়ে নতুন কেনা জায়গাটি নির্মাণ ও উন্নয়নে যোগ দেন। তিনি পুরাতন নদীঘাটের দিকে এলাকা বাঁধাই করা এবং নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নকরণের তদারকির দায়িত্ব নেন। তিনি বাকি শিষ্যদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ ও বৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও একটি সবজি বাগান এবং দুগ্ধ খামার শুরু করেছিলেন।


স্বামী তুরীয়ানন্দ একবার বলেছিলেন, "আমরা গোপালদা-র কাছে যথেষ্ট ঋণী, কারণ আমরা তাঁর কাছ থেকে সব কাজের সূক্ষ্মতা শিখেছি। তিনি বেশ দক্ষ ছিলেন এবং তিনি যা করতেন তা মন দিয়ে সম্পন্ন করতেন। তিনি তাঁর অভ্যাসে খুব কড়া ছিলেন। তাঁর শেষ দিন পর্যন্ত তিনি নিয়মনিষ্ঠ ছিলেন ও প্রত্যহ ধ্যান অনুশীলন করতেন।"


১৯০১ সালে তাকে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের অন্যতম ন্যাসপাল করা হয়, পরে তিনি সহকারী সভাপতি হন। এমনকি তার বৃদ্ধ বয়সেও তিনি ব্যক্তিগত পরনির্ভরশীলতা প্রত্যাখ্যান করতেন, তিনি বিশ্বাস করতেন সন্ন্যাসীদের সবক্ষেত্রে স্বনির্ভর হওয়া উচিত। তিনি প্রতিদিন গীতা পাঠ করতেন এবং অন্যান্য শিষ্যদের গানের সাথে তবলায় সঙ্গদ করতেন।


স্বামী অদ্বৈতানন্দ ১৯০৯ সালে ১৮শে ডিসেম্বর ৮১ বছর বয়সে শ্রী রামকৃষ্ণের নাম জপ করতে করতে মারা যান।

■■■■■■■■■■■■■■■




★★7>স্বামী নির্মলানন্দ:::----


স্বামী নির্মলানন্দ (১৮৬৩-১৯৩৮)

 প্রধানত দক্ষিণ ভারতের কেরল, ব্যাঙ্গালোর ও তামিলনাড়ুতে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্রুকলিন, বর্মা এবং বাংলাদেশে (স্বামী নির্মলানন্দের জীবনযাপন এবং প্রবুদ্ধ ভারত-এর পুরানো বিষয়গুলি) রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন প্রতিষ্ঠায় মূল ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি ১৮৬৩ সালের ২৩ ডিসেম্বর কলকাতার বাগবাজার এলাকার বোসপাড়া লেনে দেবনাথ দত্তের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। পিতৃপ্রদত্ত নাম ছিল তুলসীচরণ দত্ত। বেনারস ও কলকাতায় তার পরিবারের বিষয়াশয় ছিল। পরবর্তীকালে, তিনি বেনারসের বেঙ্গলি টোলা হাইস্কুলে ভর্তি হন এবং হরিপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায়ের সহপাঠী হন যিনি পরবর্তীকালে রামকৃষ্ণ মিশনের আরেকজন মহান সন্ন্যাসী এবং রামকৃষ্ণের সাক্ষাৎশিষ্য হন ও আরো পরে স্বামী বিজ্ঞানানন্দ নামে পরিচিত হন। তিনি ১৮৮৩ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং তালচেরের রাজার কাছ থেকে প্রশংসার সনদ ও একটি পদক পান।


১৮৮২ সালে নির্মলানন্দের বয়স যখন আঠারো বছর, তখন তিনি তাঁর প্রতিবেশী বলরাম বসুর বাড়িতে প্রথম দেখা করেছিলেন। তিনি প্রথমে তার বন্ধু হরিনাথের সাথে এবং পরে একা রামকৃষ্ণের সাথে দেখা করতে দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে গিয়েছিলেন। তিনি মাঝে মাঝে বলরাম বসুর বাড়িতে রামকৃষ্ণের সঙ্গে দেখা করতেন এবং তাঁর কাছ থেকে দীক্ষাশিক্ষা নিতেন।  কাশীপুরের বাগানবাড়িতে তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনের শেষ পর্যায়ে তার সঙ্গে দেখাও করতেন। গুরুর মৃত্যুর পর নরেন্দ্রনাথ তথা স্বামী বিবেকানন্দ বরানগরের রামকৃষ্ণ মঠ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৮৭ সালের শেষের দিকে তিনি বরানগর মঠের স্থায়ী সদস্য হয়ে ওঠেন এবং সন্ন্যাস ধর্ম গ্রহণ করে স্বামী নির্মলানন্দ নাম পান।


১৯০১ সালের ১০ই ফেব্রুয়ারী যখন বিবেকানন্দ রামকৃষ্ণ মঠকে একটি ট্রাস্ট হিসাবে নিবন্ধন করতে চান, তখন নির্মলানন্দ সদ্য প্রতিষ্ঠিত রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের সহকারী সচিব হন। বিবেকানন্দের মৃত্যুর পর, নির্মলানন্দকে স্বামী অভেদানন্দের আহ্বানে ১৯০৩ সালে স্বামী ব্রহ্মানন্দ আমেরিকায় পাঠান। তিনি নিউ ইয়র্কে যোগধ্যানের ক্লাস শিখিয়েছিলেন এবং ব্রুকলিনে একটি বেদান্ত কেন্দ্র চালু করেছিলেন। তিনি বক্তৃতাও দিতেন এবং সংস্কৃত ও উপনিষদ শিক্ষা দিতেন। তিনি আড়াই বছর আমেরিকায় থাকার পর স্বামী ব্রহ্মানন্দের 'মাতৃভূমির পুনর্জন্মের' ডাকে ভারতে ফিরে আসেন, যখন জন্য ডাকেন। নির্মলানন্দ বেঙ্গালুরু এবং কেরলে রামকৃষ্ণ মিশনের কেন্দ্রগুলির বিকাশ ও প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেছিলেন। সারদা দেবীকে ব্যাঙ্গালোর রামকৃষ্ণ মঠে আনার ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। রামকৃষ্ণানন্দ ১৯০৪ সালে ব্যাঙ্গালোর কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠিত করেন এবং তৎকালীন সভাপতি ব্রহ্মানন্দ সেখানে একটি আশ্রম তৈরি করেন। ১৯০৯ সালে নির্মলানন্দকে ব্যাঙ্গালোর আশ্রমের প্রধান করে পাঠানো হয়। ১৯১১ সালে যখন সারদা দেবী রামেশ্বরমে ভ্রমণ করতে যান, নির্মলানন্দ তাকে ব্যাঙ্গালোরে বেড়াতে নিয়ে আসেন। হরিপাড়ের আশ্রমটি ১৯১৩ সালের ৪ঠা মে খোলা হয়। নির্মলানন্দ এই আশ্রমে থাকাকালীন কেরলে সমস্ত বর্ণভিত্তিক বৈষম্যের অবসান কঠোরভাবে আটকেছিলেন।  ১৯১৬ সালে নির্মলানন্দ তিরুবনন্তপুরমের কাছে একটি আশ্রম নির্মাণ শুরু করেন। ২৬শে নভেম্বর নির্মলানন্দ এবং ব্রহ্মানন্দ কেরলে পৌঁছে, ওট্টপালম, কোট্টায়ম, হরিপাড়, কুইলন সহ বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করে ৮ই ডিসেম্বর তিরুবনন্তপুরম যান ও আশ্রমের ভিত্তি স্থাপন করেন।


১৯২৪ সালের মার্চ মাসে তিরুবনন্তপুরমের আশ্রমের মূল ভবনটি সম্পন্ন হলে ৭ই মার্চ রামকৃষ্ণের জন্মবার্ষিকীতে এর সূচনা হয়। ১৯২৫ সালে তিনি প্রায় এক মাস তিরুবনন্তপুরম আশ্রমে অবস্থান করেন এবং নৃসিংহানন্দ, ওজাসানন্দ, উর্জাসানন্দ, পুরঞ্জানন্দ, বালকৃষ্ণানন্দ, অর্জাবানন্দ ও উমেশানন্দ নামে সাত শিষ্যকে সন্ন্যাস দেন।[৬৪] ১৯২৬ সালের ডিসেম্বরে ওট্টপালমে রামকৃষ্ণ নিরঞ্জন আশ্রম খোলা হয়। ১৯২৭ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারি কুর্গে আশ্রমের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিল। এছাড়াও তিনি পল্লাবরম সারদা বিদ্যালয় এবং নিরঞ্জনা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।  তিনি কুমারী পূজা শুরু করেছিলেন এবং সামাজিকভাবে নিপীড়িত নাম্বুদ্রী মহিলাদের উন্নতির জন্য কাজ করেছিলেন।


১৯২৯ সালে রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসী এবং ভক্তদের একটি বিচ্ছিন্ন দল বাগবাজারে রামকৃষ্ণ সারদা মঠ শুরু করলে তিনি তাদের প্রথম সভাপতি হওয়ার গ্রহণের অনুরোধ গ্রহণ করেন। স্বামী নির্মলানন্দ ১৯৩৮ সালের এপ্রিলে কেরলের ওট্টপালমের কাছে রামকৃষ্ণ মঠের শাখা কেন্দ্রে মারা যান।

■■■■■■■■■■■■■■■■■





★★8>স্বামী অখণ্ডানন্দ:::---


স্বামী অখণ্ডানন্দ (১৮৬৪-১৯৩৭)

স্বামী অখণ্ডানন্দ রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন-এর তৃতীয় অধ্যক্ষ ও মিশনের সেবা কার্যের প্রধান উদ্যোক্তা। তার পিতৃপ্রদত্ত নাম গঙ্গাধর ঘটক গঙ্গোপাধ্যায়। ১৮৬৪ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বর আহিরীটোলার শ্রীমন্ত গঙ্গোপাধ্যায়ের বাড়ীতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তা থাকলেও আনুষ্ঠানিক শিক্ষার প্রতি তার তেমন আগ্রহ ছিল না। পরে তিনি গীতা ও উপনিষদ মুখস্ত করেন। শৈশবেও, তিনি স্বভাবগতভাবে সহানুভূতিশীল ছিলেন এবং প্রায়শই বাবা-মাকে না জানিয়ে গোপনে ভিক্ষুকদের খাবার দিতেন।


বারো বছর বয়সে তাকে উপনয়ন দেওয়া হয় এবং তারপর থেকে তিনি প্রতিদিন তিনবার গায়ত্রী মন্ত্র পুনরাবৃত্তি করতেন এবং শিবের মাটির মূর্তি তৈরি করে তাঁর পূজা করতেন। গঙ্গাধর এবং তার বন্ধু হরিনাথ ১৮৭৭ সালে বাগবাজারে দীননাথ বসুর বাড়িতে শ্রী রামকৃষ্ণের সাথে দেখা করেন। রামকৃষ্ণ ঐসময়ে সমাধিতে ছিলেন এবং সম্ভবত একারণেই রামকৃষ্ণের প্রতি তাদের আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষা তীব্র হয়ে ওঠে। ঐ সময়েই তিনি তার বাবা-মাকে না বলে একজন সন্ন্যাসীর সাথে অদৃশ্য হয়ে যান, পরে ঐ সন্ন্যাসী তাকে তার কিশোর বয়সের উল্লেখ করে সুপরামর্শ দিলে উদ্বিগ্ন পিতামাতার কাছে বাড়িতে ফিরে আসেন।


তিনি ১৮৮৩ সালের মে মাসে উনিশ বছর বয়সে দক্ষিণেশ্বরে দ্বিতীয়বার রামকৃষ্ণের সাথে দেখা করেন, রাত্রি যাপন করেন এবং ফিরে আসেন এবং কয়েক দিন পরে আবার রাত্রি যাপন করেন। এর পরে তিনি ভিড় এড়াতে সপ্তাহান্তে নিয়মিত যাওয়া শুরু করেন। পরে রামকৃষ্ণ তাঁর বেশিরভাগ অভ্যাস যেমন শুধুমাত্র নিজের রান্না করা খাবার খাওয়া, নিরামিষভোজী, তপস্যা অনুশীলন করা, এগুলিকে বৃদ্ধসুলভ আখ্যা দিয়েছিলেন। এ বিষয়ে পরে রামকৃষ্ণ কিছু দর্শনার্থীকে বুঝিয়েছিলেন যে পূর্বজন্মে তার অভ্যাসের কারণেই তিনি এমন স্বভাব পেয়েছেন। গঙ্গাধর তার অভ্যাস বজায় রেখেছিলেন।


১৮৮৫ সালের সেপ্টেম্বরে, যখন শ্রীরামকৃষ্ণ তার ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য কলকাতার শ্যামপুকুর এবং তারপরে ডিসেম্বরে কাশীপুরে চলে আসলে তিনিও গুরুসেবায় নিযুক্ত হন। ১৮৮৬ সালে‌ শ্রীরামকৃষ্ণের দেহত্যাগের পর ১৮৮৭ সালে কেদারনাথ এবং বদ্রীনাথ পরিদর্শন করার পর তিনি তিব্বত ভ্রমণে যান ও সেখানে লাসা এবং অন্যান্য জায়গায় তিন বছর বসবাস করেন, 1890 সালে ভারতে ফিরে আসেন।  ঐ মাসেই তিনি সন্ন্যাস গ্রহণ করে স্বামী অখণ্ডানন্দ নাম পান।


১৮৯৪ সালে তিনি গুরুশিক্ষার প্রচার শুরু করেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন দেশের সমস্যার মূল কারণ শিক্ষার অভাব, তাই তিনি রাজস্থানে ক্ষেত্রীতে থাকাকালীন দ্বারে দ্বারে গিয়ে সকলকে তাদের সন্তানদের শিক্ষিত করতে উৎসাহিত করেছিলেন। ফলস্বরূপ স্থানীয় স্কুলে ভর্তির হার মাত্র ৮০ থেকে বেড়ে ২৫৭ তে পৌঁছায়। এরপর তিনি জয়পুর, চিতোরগড়, উদয়পুর প্রভৃতি স্থানে গিয়ে স্থানীয় শাসকদের বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, খাদ্যত্রাণ বিতরণ এবং স্থানীয় কুটির শিল্পকে সহযোগিতা করতে বলেন।


১৮৯৭ সালের ১৫ই মে মাহুলায় তিনি ত্রাণকার্য চালান।  মুর্শিদাবাদের সারগাছিতে দরিদ্রদের জন্য কাজ শুরু করেন। তার কাজ কিছু ধনী ব্যক্তির মধ্যে অসন্তুষ্টি তৈরি করলে তারা তার বিরুদ্ধে বিবেকানন্দের কাছে অভিযোগের চিঠি লেখেন। যদিও জবাবে বিবেকানন্দ তাকে তার কাজ চালিয়ে যেতে বলেছিলেন।


১৯২২ সালে স্বামী ব্রহ্মানন্দ মারা গেলে স্বামী শিবানন্দ মঠের সভাপতি এবং স্বামী অখণ্ডানন্দ সহ সভাপতি পদে নিযুক্ত হন। ১৯৩৪ সালে স্বামী শিবানন্দের মৃত্যু থেকে ১৯৩৭ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারি বেলুড়মঠে ৭২ বছর বয়সে তার মৃত্যু পর্যন্ত স্বামী অখণ্ডানন্দ সভাপতি ছিলেন।

■■■■■■■■■■■■■■■■





★★9>স্বামী ত্রিগুণাতীতানন্দ::--


স্বামী ত্রিগুণাতীতানন্দ (১৮৬৪-১৯৩৭)


 

স্বামী ত্রিগুণাতীতানন্দ ১৮৬৫ সালের ৩০শে জানুয়ারি চব্বিশ পরগনার ভাঙড়ের নিকট নাওড়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পিতৃপ্রদত্ত নাম সারদাপ্রসন্ন মিত্র। সারদাপ্রসন্ন কলকাতার শ্যামপুকুরে মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশনে (বর্তমানে বিদ্যাসাগর কলেজ) ভর্তি হন। সেখানে প্রধান শিক্ষক ছিলেন মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত, যিনি "শ্রীম" নামে বেশি পরিচিত ছিলেন। তিনিই শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনী ও বাণী সংক্রান্ত সংকলন শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃতের লেখক।


১৮৮৪ সালের ২৭ ডিসেম্বর রামকৃষ্ণের সঙ্গে দেখা করার জন্য তার অন্যতম শিষ্য তথা ভক্ত শ্রীম তরুণ সারদাপ্রসন্নকে দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে নিয়ে যায়। খুব অল্প বয়সে সারদাপ্রসন্নর মনে ধর্মীয় মনোভাব দেখিয়েছিলেন তিনি, যা শ্রীরামকৃষ্ণের সাথে যোগাযোগের পরই সম্ভবত আরো শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। তিনি মেট্রোপলিটন কলেজে যোগদানের পর প্রায়ই দক্ষিণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণের সান্নিধ্যে যেতেন। ১৭২ ধীরে ধীরে তিনি রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবকে নিজের গুরু ও পথপ্রদর্শক হিসেবে মানতে শুরু করেন ও তার দেখানো পথে চলার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি গুরু রামকৃষ্ণের শেষ সময়ে কাশীপুরের বাগানবাড়ীতে তার সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন।


১৮৮৬ সালে রামকৃষ্ণের মৃত্যুর পর, তিনি বরানগর মঠে নরেন্দ্রনাথ দত্ত (পরবর্তীকালে স্বামী বিবেকানন্দ) এবং রামকৃষ্ণের সাক্ষাৎ শিষ্যদের সাথে থাকতে শুরু করেন‌ ১৮৮৭ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি ও তার গুরুভাইয়েরা সন্ন্যাসের ব্রত গ্রহণ করেন এবং তিনি ত্রিগুণাতীতানন্দ নামে পরিচিত হন। ১৮৯১ সালে ত্রিগুণাতীতানন্দ বৃন্দাবন, মথুরা, জয়পুর, আজমীর, কাথিয়াবাড় তীর্থযাত্রা শুরু করেন। পোরবন্দরে তিনি বিবেকানন্দের সাথে দেখা করেন ও পরে তিনি বরানগর মঠে ফিরে আসেন। ১৮৯৫ সালে, তিনি পায়ে হেঁটে কৈলাস পর্বত ও মানস সরোবর হ্রদের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। ১৭৬ ১৮৯৭ সালে তৎকালীন বাংলার অবিভক্ত দিনাজপুর জেলায় দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে তিনি সেখানে ত্রাণ কাজের আয়োজন করেন। বিবেকানন্দ বেদান্তের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য একটি পত্রিকার পরিকল্পনা করেছিলেন, এই উদ্দেশ্যে একটি প্রেস কেনা হয় এবং ত্রিগুণাতীতাকে ঐ উদ্বোধন পত্রিকা প্রকাশের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ১৭৮


স্বামী যোগানন্দের মৃত্যুর পর, ত্রিগুণাতীতানন্দ কিছু সময়ের জন্য সারদা দেবীর ব্যক্তিগত পরিচারিক হন। ১৯০২ সালে অসুস্থতার কারণে স্বামী তুরীয়ানন্দ আমেরিকা থেকে সময়পূর্বে ফিরে এলে ত্রিগুণাতীতানন্দকে তার জায়গায় পাঠানো হয়। ১৯০৩ সালে ২রা জানুয়ারি তিনি সান ফ্রান্সিসকোতে পৌঁছান এবং তাকে সানফ্রান্সিসকো বেদান্ত সমাজের সভাপতি টিএইচ লোগানের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। কয়েক সপ্তাহ পর তিনি মিস্টার অ্যান্ড মিসেস সিএফ পিটারসনের বাড়িতে যান, যেখানে তিনি তার কাজের সদর তৈরি করেন। ১৮০ সমাজের কাজ চালনার জন্য অচিরের বড় বাড়ীর দরকারে ৪০, স্টেইনার স্ট্রিটে তিনি কার্যালয় স্থানান্তর করেন। ১৯০৬ সালের জানুয়ারিতে ওয়েবস্টার স্ট্রিটের বাড়ীটি পশ্চিমা বিশ্বের প্রথম হিন্দু মন্দির হিসাবে পরিচিতি পায়।


স্বামী ত্রিগুণাতীতানন্দ দীর্ঘস্থায়ী বাত এবং ব্রাইটস রোগে ভুগছিলেন। ১৯১৪ সালের ২৭শে ডিসেম্বর তিনি একটি রবিবারের সভা করছিলেন, তখনই একজন প্রাক্তন ছাত্র সদস্যের উপর একটি বোমা হামলা হয়। এর ফলে ওই শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয় এবং তিনি মারাত্মকভাবে আহত হয়। ১৯১৫ সালের ১০ই জানুয়ারী তিনি মারা যান।

■■■■■■■■◆◆■■■■■■■




★★10>স্বামী সুবোধানন্দ:::----


স্বামী সুবোধানন্দ (১৮৬৭-১৯৩২)

স্বামী সুবোধানন্দ  ছিলেন রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবে সাক্ষাৎ শিষ্যদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ। শিষ্যমণ্ডলী থেকে শিষ্য পথপ্রদর্শক স্বামী বিবেকানন্দ, প্রত্যেকের কাছেই তিনি "খোকা" নামে পরিচিত ছিলেন। ১৮৬৭ সালের ৮ই নভেম্বর উত্তর কলকাতার ঠনঠনিয়া কালীবাড়ির প্রতিষ্ঠাতা শ্রীশঙ্কর ঘোষের বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন সুবোধচন্দ্র ঘোষ। ছাত্রাবস্থায় তিনি সুরেশচন্দ্র দত্তের "দ্য টিচিংস অফ শ্রীরামকৃষ্ণ" নামে একটি বাংলা বই পড়েছিলেন। এতে মুগ্ধ হয়ে তিনি দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের সেই রামকৃষ্ণের সাথে দেখা করার সিদ্ধান্ত নেন। সেই সাধক তাকে খুব আন্তরিকভাবে স্বাগত জানান। এরপর থেকে তিনি মঙ্গলবার এবং শনিবার রামকৃষ্ণের সাথে দেখা করতে যেতেন। বাবা-মায়ের বাধা সত্ত্বেও সুবোধ তার সান্নিধ্যে আসেন ও রামকৃষ্ণের তত্ত্বাবধানে অনুশীলনের অংশ হিসাবে দক্ষিণেশ্বরেই গভীর ধ্যানে মগ্ন হয়ে তার আধ্যাত্মিক সাধনার বিকাশ ঘটান। সুবোধানন্দ নিজের সম্পর্কে রামকৃষ্ণের দৃষ্টিভঙ্গি জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, "অনেকে আপনার সম্পর্কে অনেক কথা বলে, আমি নিজে প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত সেগুলি বিশ্বাস করি না। ২৭৮ গুরু তাকে মহেন্দ্র গুপ্তের সাথে যোগাযোগ করতে বলেন যিনি পরবর্তীতে "শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত" লেখেন।


১৮৮৬ সালে রামকৃষ্ণের মৃত্যুর পর, সুবোধ তার বাড়ি ছেড়ে চলে যান এবং নরেন্দ্রনাথ দত্তের (যিনি পরে বিবেকানন্দ নামে পরিচিত হন) পরিকল্পিত বরানগর মঠে যোগ দেন। তিনি সন্ন্যাসী ধারণের স্বামী সুবোধানন্দ নামে পরিচিত হন। ২৮০ ১৮৮৯ সালের শেষ দিকে ব্রহ্মান্দার সাথে, সুবোধানন্দ বেনারাসে গিয়েছিলেন, যেখানে তিনি কঠোর তপস্যা অনুশীলন করন। ১৮৯০ সালে তারা একসঙ্গে ওমকার, গিরনার, বোম্বে, দ্বারকা এবং বৃন্দাবন সহ পশ্চিম ও মধ্য ভারতে তীর্থযাত্রার জন্য যান। তিনি আধ্যাত্মিক খোঁজে হিমালয়ের কেদারনাথ ও বদ্রীনাথ পর্যন্ত গিয়েছিলেন। তিনি দক্ষিণ ভারতে কন্যাকুমারীও ভ্রমণ করেন।


স্বামী বিবেকানন্দ পশ্চিমা দেশ থেকে ফিরে আসার পর গুরুভাইদের মানব কল্যাণে কাজ করার জন্য পরামর্শ দেন। সুবোধানন্দ তার সেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং সদ্য প্রতিষ্ঠিত রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশনের জন্য বিভিন্ন পদে ক্ষমতাসীন ছিলেন। ১৮৯৯ সালে তাকে প্রাথমিকভাবে মঠের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। কলকাতায় মহামারী শুরু হলে সুবোধানন্দ, সদানন্দ এবং বোন নিবেদিতার সাথে ত্রাণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার ব্যবস্থা করন। ২৮১ উড়িষ্যার চিল্কা দ্বীপপুঞ্জে 1908 সালের দুর্ভিক্ষের সময় তিনি রামকৃষ্ণ মিশনের সহকর্মী সন্ন্যাসীদের সাথে ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের ত্রাণদানের কাজ করেছিলেন।


পরবর্তী সময়ে সক্রিয় কাজে অপারক হলেও মানুষকে কল্যাণের কাজে তিনি উদ্বুদ্ধ করতেন। বিগত বছরগুলোতে তিনি রামকৃষ্ণ ও বিবেকানন্দের বাণী প্রচারের জন্য বাংলা ও বিহারে ব্যাপক সফর করেন। তিনি শিশুসহ বিপুল সংখ্যক মানুষকে দীক্ষা দেন। শিষ্যদের মধ্যে তিনি সামাজিক অবস্থান, বর্ণ, লিঙ্গ বা বয়সের বাছ-বিচার কখনও করেননি।


সুবোধানন্দ ছিলেন বিবেকানন্দ কর্তৃক নিযুক্ত বেলুড় মঠ-এর প্রথম পর্যায়ের অছিদের একজন, যিনি পরবর্তীতে কোষাধ্যক্ষ হিসেবেও নিযুক্ত হন।


১৮৯৭ সালে মাদ্রাজে ইয়ং মেনস হিন্দু অ্যাসোসিয়েশনের সভায় তিনি তাঁর বহুচর্চিত বক্তৃতা রাখেন, তার মূল বক্তব্য ছিল সন্ন্যাস ও ব্রহ্মচর্য।

■■■■■■■■■■■■■■■■





★★11>স্বামী বিজ্ঞানানন্দ::---


স্বামী বিজ্ঞানানন্দ (১৮৬৮-১৯৩৮)


স্বামী বিজ্ঞানানন্দ একজন ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন এবং ভারতের পূর্ববর্তী রাজ্য ইউনাইটেড প্রভিন্সে জেলা প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করেছিলেন। তিনি সংস্কৃতে পণ্ডিত ও ধর্ম-দার্শনিক কাজে দক্ষ ছিলেন। ১৮৬৮ সালের ৩০শে অক্টোবর তৎকালীন চব্বিশ পরগনায় দক্ষিণেশ্বরের নিকট বেলঘরিয়ায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতৃপ্রদত্ত নাম ছিল হরিপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায়। ১৮৭৯ সালের ১৫ই সেপ্টেম্বর বেলঘরিয়ায় কেশব চন্দ্র সেনের বাড়ীতে তিনি সর্বপ্রথম রামকৃষ্ণকে দেখেন। হাইস্কুলের প্রথম বা দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় দেওয়ান গোবিন্দ মুখার্জির বাড়িতেও তিনি রামকৃষ্ণকে দেখেছিলেন। ১৮৮৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের ছাত্র হরিপ্রসন্ন তার সহযোগী ছাত্র শরৎ, এবং বরদা পালের সঙ্গে দক্ষিণেশ্বরে যান। রামকৃষ্ণ হরিপ্রসন্নের প্রতি অগাধ ভালবাসা এবং স্নেহ দেখান।


কলকাতা থেকে প্রথম কলা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে হরিপ্রসন্ন বিহারের বাঁকিপুর চলে যান। তিনি পাটনা কলেজ থেকে স্নাতক হন এবং পুণেতে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে যান। এই সময়ে শ্রীরামকৃষ্ণ মারা যান এবং কথিত আছে মারা যাবার আগের রাতে তিনি স্বপ্নে তার দেখা পান।


তিনি গাজীপুর, ইটাওয়া, মীরাট, বুলন্দশহরে চাকরি করেন। ইটাওয়ায় স্বামী সুবোধানন্দের সাথে সাক্ষাৎ হলে তিনি আলমবাজার মঠে মাসিক ৬০ টাকা অনুদান দিতে থাকেন। মায়ের পরবর্তী জীবনের জন্য যথেষ্ট অর্থোপার্জন করে তিনি আলমবাজার মঠে যোগ দেন।


১৮৯৬ সালে স্বামী বিবেকানন্দ পশ্চিমের দেশ ভ্রমণ করে ফিরে আসার কিছু আগে হরিপ্রসন্ন আলমবাজার মঠে যোগ দিয়ে সেখানে সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করেন। সন্ন্যাস জীবনে তিনি স্বামী বিজ্ঞানানন্দ নামে পরিচিত হন। স্বামী বিজ্ঞানানন্দ বিবেকানন্দের সাথে রাজপুতানা এবং দেশের অন্যত্র ভারত ভ্রমণে গিয়েছিলেন। ১৮৯৯ সালে প্রকৌশলী হিসাবে তিনি বেলুড় মঠে মঠের ভবন নির্মাণের কাজ তদারকি শুরু করেন।একজন পরিভ্রমণকারী সন্ন্যাসী হিসাবে তিনি অনেক জায়গা পরিদর্শন করে ১৯০০ সালে এলাহাবাদে আসেন। ঐ সময়ে এখানে একদল তরুণ ছাত্র ব্রহ্মবাদীন ক্লাব নামে একটি সংগঠন শুরু করে, তারা এ জন্য স্বামীজি মহারাজের সাহায্য প্রার্থনা করলে তিনি যথাসাধ্য উন্নয়নমূলক কাজ করতে অগ্রসর হন। তিনি এলাহাবাদকে তার স্থায়ী অবস্থান করে তোলেন এবং সেখানে তিনি রামকৃষ্ণ মিশনের একটি কেন্দ্র স্থাপন করেন। ১৯০৮ সালে এলাহাবাদের মুঠিগঞ্জে রামকৃষ্ণ মঠ প্রতিষ্ঠিত হয়। এর পর থেকে এলাহাবাদ এবং তৎ সংলগ্ন এলাহাকায় তিনি বহু উন্নয়নমূলক কাজ করেন এবং তার গুরু শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের বাণী প্রচার করতে থাকেন। তার বেশ‌ কিছু শিষ্য তথা ভক্তও ছিলেন।


১৯৩৪ সালে তিনি রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের সহসভাপতি এবং ১৯৩৭ সালে সভাপতি পদে নিযুক্ত হন। তার শেষ কয়েক বছরে তিনি ব্যাপকভাবে ভ্রমণ করেন, তথা রেঙ্গুন ও কলম্বো সহ রামকৃষ্ণ মঠের অনেক কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। ১৯৩৮ সালের ১৪ই জানুয়ারি স্বামী বিজ্ঞানানন্দ বেলুড় মঠ ও মন্দির নির্মাণ এবং শ্রীরামকৃষ্ণের মার্বেলের মূর্তির তৈরির বিষয়ে মনোনিবেশ করেন। এরপরে শ্রী রামকৃষ্ণের জন্মদিন উপলক্ষে তিনি বেলুড়ে আর মাত্র একবার সফর করেছিলেন। এলাহাবাদে ফিরে আসেন তিনি ১৯৩৮ সালে ২৫শে এপ্রিল মঠেই মারা যান।

■■■■■■■■■■■■■■■■■■





★★12>স্বামী নিরঞ্জনানন্দ::;--


স্বামী নিরঞ্জনানন্দ (১৮৬২-১৯০৪)

নিরঞ্জনানন্দ ছিলেন সেই কয়েকজন শিষ্যদের মধ্যে একজন রামকৃষ্ণ যাদের "নিত্যসিদ্ধ" বা "ঈশ্বরকোটী" বলে অভিহিত করেছেন, যার অর্থ পূর্ণতাপ্রাপ্ত আত্মা। তিনি ১৮৬২ সালে তৎকালীন বাংলা প্রদেশের চব্বিশ পরগনার রাজারহাট-বিষ্ণুপুর নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতৃপ্রদত্ত নাম ছিল নিত্যনিরঞ্জন ঘোষ, তবে তিনি নিরঞ্জন নামেই পরিচিত ছিলেন। তাঁর প্রাথমিক জীবন সম্পর্কে খুব কমই জানা যায়। তিনি তাঁর মামা কালীকৃষ্ণ মিত্রের সঙ্গে কলকাতায় থাকতেন। শৈশবে তিনি একদল আধ্যাত্মবাদীর সাথে যুক্ত হন, যা তার জীবনের পরবর্তী সময়ে সফলতা এনে দেয়। জীবনের এক সময়ে তিনি মুর্শিদাবাদ জেলায় একজন নীলকর সংগ্রাহকের চাকরি নেন।


নিরঞ্জনের বয়স যখন প্রায় আঠারো বছর তখন তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের প্রথমবার সাক্ষাৎ পান। আধ্যাত্মবাদের প্রতি তার ঝোঁক বুঝতে পেরে রামকৃষ্ণ স্পষ্টতই তাকে এই বলে তিরস্কার করেছিলেন যে, যদি তুমি ভূত-প্রেতের কথা ভাব তাহলে তুমি ঐরূপই হয়ে যাবে, আর ঈশ্বরের কথা ভাবলে তোমার জীবনে হবে ঐশ্বরিক ক্ষমতার প্রকাশ ঘটবে। 


একবার নিরঞ্জন একটি নৌকা করে দক্ষিণেশ্বরে যাচ্ছিলেন, তখন তার কিছু সহযাত্রী তার গুরু রামকৃষ্ণ সম্পর্কে খারাপ কথা বলতে শুরু করলে নিরঞ্জন ক্ষুব্ধ হয়ে নৌকাটি ডুবিয়ে দেওয়ার হুমকি দেন। রামকৃষ্ণ ঘটনাটি জানতে পারলে তিনি এ বিষয়ে নিরঞ্জনকে বোঝান, "ক্রোধ হল মারাত্মক পাপ, তুমি কেন এই ক্রোধের অধীন হবে? মূর্খ লোকেরা তাদের অনভিজ্ঞ অজ্ঞতায় অনেক কিছু বলে থাকেন, তাবলে তাদের কথা না ধরে বরং গুরুত্ব না-ই দেওয়া উচিত"।


শ্রীরামকৃষ্ণ নিরঞ্জনের অফিসে কাজ করাটাকে ভালোভাবে নেন নি, কিন্তু তিনি যখন শুনেছিলেন যে নিরঞ্জন তার বয়স্ক মায়ের জন্য এই চাকরি নিয়েছেন, তখন তিনি বিষয়টি বুঝতে পেরে সম্মতি দেন।


রামকৃষ্ণের মৃত্যুর পর নিরঞ্জন ও শশী মহারাজ (পরবর্তীতে রামকৃষ্ণানন্দ) বেশিরভাগ দেহভস্ম একটি পৃথক কলসে সংরক্ষণ করে তারা বলরাম বসুর বাড়িতে রেখেছিলেন, যা পরে বেলুড় মঠে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।


নিরঞ্জন ১৮৮৭ সালে অন্যান্য গুরুভাইদের সাথে সন্ন্যাস ব্রত গ্রহণ করেন এবং রামকৃষ্ণ আদেশের সন্ন্যসের প্রথম আবাস বরানগর মঠে স্থায়ীভাবে থাকতে আসেন। তাকে বিবেকানন্দ সন্ন্যাস নাম স্বামী নিরঞ্জনানন্দ (নিরঞ্জন, অর্থাৎ নির্দোষ) নাম দিয়েছিলেন। শারীরিকভাবে শক্তিশালী হওয়ার দরুন মঠে তিনি বেশিরভাগ শ্রমসাধ্য কাজ করতেন। তিনি পুরীতে ভ্রমণ করেন এবং 1887 সালের এপ্রিল মাসে আবার মঠে ফিরে আসেন। তিনি কাশীপুরে যেখানে রামকৃষ্ণকে দাহ করা হয়েছিল সেখানে গুরুর জন্য একটি বেদী তৈরি করেন ও একই জায়গায় একটি বেল গাছ রোপণ করেন। তিনি ১৮৮৯ সালের নভেম্বর মাসে দেওঘরে তীর্থযাত্রা করতে যান এবং বংশী দত্তের বাগানবাড়িতে থেকে ভিক্ষাবৃত্তির মাধ্যমে জীবনযাপন করেন। তিনি প্রয়াগ (এলাহাবাদ) যান ও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে শ্রীলঙ্কার কলম্বোতে ভ্রমণ করেন। কিছুকাল তিনি সেখানে ধর্মপ্রচারক হিসেবে বসবাস করে তাঁর প্রভুর আদর্শ শিক্ষা দেন। ১৮৯৭ সালে বিবেকানন্দ ভারতে ফিরে এলে তিনি তার সাথে সমগ্র উত্তর ও দক্ষিণ ভারত ভ্রমণ করেন। ১৮৯৮ সালে তিনি আলমোড়া যান এবং সেখানে তিনি শুদ্ধানন্দ (সুধীর মহারাজ)-কে দীক্ষা নেন। এরপর তিনি বারাণসীতে গিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবনযাপন করেন। সেখানে তিনি একদল যুবককে সেবা ও ত্যাগের পথে অনুপ্রাণিত করেছিলেন।


পরে তিনি হরিদ্বারের কাছে কনখলে গিয়ে অসুস্থ হয়ে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় ফিরে আসেন। সুস্থ হওয়ার পর, তিনি বারাণসীতে ফিরে যান ও সেখানে বিবেকানন্দের সাথে দেখা করেন। বিবেকানন্দ অসুস্থ থাকাকালীন তিনি আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন এবং তাঁর দারোয়ান হয়ে লোকের ভিড় থেকে তাকে বিরত রাখতেন। বিবেকানন্দের মৃত্যুর পর তিনি হরিদ্বারে ফিরে আসেন। তার শেষ জীবনকালে তিনি দীর্ঘস্থায়ী আমাশয়ে ভুগছিলেন। ১৯০৪ সালে ৯ই মে হরিদ্বারে মারা যান।

■◆◆■■■■◆◆■■■◆■■■■■





★★13>স্বামী প্রেমানন্দ:::---


স্বামী প্রেমানন্দ (১৮৬১-১৯১৮)

স্বামী প্রেমানন্দ ১৮৬১ সালে ১০ই ডিসেম্বর হুগলি জেলার আঁটপুর গ্রামে তারাপ্রসন্ন ঘোষ ও মাতঙ্গিনী দেবীর ঘরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতৃপ্রদত্ত নাম ছিল বাবুরাম ঘোষ। ভগিনী কৃষ্ণভামিনী ছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণের এক গৃহস্থ শিষ্য বলরাম বসুর স্ত্রী। ছোট থেকেই তিনি সংসার থেকে বিমুখ বৈরাগী পুরুষ ছিলেন। গ্রামের ভিতরে থেকে পাশ করে তিনি কলকাতায় পড়তে আসেন, সেখানে তার সাথে দেখা হয় মহেন্দ্র গুপ্ত তথা শ্রী"ম"-এর। শ্রীম ও তার সহপাঠী রাখালের সহযোগিতায় তিনি শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের সান্নিধ্য পান।


বাবুরাম রাখালকে সাথে নিয়ে রামকৃষ্ণের সাথে দেখা করতে দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের যাতায়াত শুরু করেন। তিনি বিবেকানন্দ তথা নরেন্দ্রনাথ দত্তের সাথেও সাক্ষাৎ করেছিলেন। কয়েকবার দক্ষিণেশ্বরে যাবার পর তিনি সরাসরি রামকৃষ্ণের প্রভাবের অধীনে আসেন যিনি তাকে গূঢ় শিক্ষা দিয়েছিলেন। এই সময় বাবুরামের বছর ছিল মাত্র ২০। রামকৃষ্ণ একবার তাঁর শিষ্যদের বলেছিলেন, বাবুরাম তার অন্তর থেকে বিশুদ্ধ, কোন অশুচি চিন্তাধারা কখনও তার মনে প্রবেশ করতে পারে না।


১৮৮৬ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত শ্রীরামকৃষ্ণের চিকিৎসা ও সেবায় তিনি বাকি গুরুভাইদের সাথে হাত মেলান। এর ফলে গুরুভাইয়েরা এক হয়ে তাদের লক্ষ্যের প্রতি অগ্রসর হন এবং নরেন্দ্রনাথের নেতৃত্বে বরানগরে প্রথম মঠ প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত হয়। ঐ বছর ডিসেম্বরে সমস্ত গুরুভাই আঁটপুরে তার পৈতৃক ভিটায় একত্রিত হয়ে সন্ন্যাস নেন ও বাবু মহারাজে স্বামী প্রেমানন্দ নাম পান। রামকৃষ্ণানন্দ মাদ্রাজ চলে যাওয়ার পর প্রেমানন্দ গুরুর নিত্যপূজার দায়িত্ব নেন।


১৯০২ সালে বিবেকানন্দের দেহত্যাগের পর রামকৃষ্ণ মিশনের তৎকালীন সভাপতি স্বামী ব্রহ্মানন্দ প্রেমানন্দকে বেলুড়ে মঠের দৈনন্দিন বিষয় তথা দৈনিক পূজা, প্রবর্তন, যুবক ব্রহ্মচারী ও সন্ন্যাসী, ভক্ত ও অতিথি আপ্যায়ন, বিভিন্ন প্রশাসনিক এবং দীক্ষা পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করেন। তিনি নিজে অসময়ে মঠে আসা ভক্তদের জন্য রান্না করতেন এবং তাদের আরামের সমস্ত দায় নিতেন। এ জন্য তিনি ‘মঠের মা’ পরিচিতি লাভ করে ছিলেন।


প্রেমানন্দ দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ করে বেলুড় মঠে সংস্কৃত শিক্ষার পরিবেশ চালু করেছিলেন। তিনি পাশ্চাত্য দর্শনের মতো অন্যান্য বিষয়ের অধ্যয়নকেও উৎসাহিত করতেন। তিনি নারী শিক্ষার উপরও খুব জোর দিয়েছিলেন এবং এ প্রসঙ্গে একজন ভদ্রমহিলাকে লিখেছিলেন, "বাংলা থেকে হাজার হাজার নিবেদিতা বেরিয়ে আসুক... গার্গী, লীলাবতী, সীতা ও সাবিত্রীরা এই ভূমিতে নতুন করে উদিত হউক।" 


দেওঘরে রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যাপীঠে তাঁর সম্মানে প্রেমানন্দ ধাম নামে একটি ছাত্রাবাস রয়েছে।


মঠে প্রায় ৬ বছর কাজ করার পর তিনি শিবানন্দ এবং তুরীয়ানন্দর সাথে ১৯১০ সালে অমরনাথের তীর্থযাত্রার করেন। ফিরে এসে তিনি রামকৃষ্ণের বাণী বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচার করেন। তিনি পূর্ববঙ্গে বিশেষভাবে জনপ্রিয় ছিলেন এবং সেখানকার যুবকদের সামাজিক ও দাতব্য কাজের জন্য অনুপ্রাণিত করেছিলেন। দীর্ঘ এবং কঠিন ভ্রমণ তার স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলে এবং তিনি একটি মারাত্মক কালাজ্বরের শিকার হন। পরে তিনি ইনফ্লুয়েঞ্জায় ভুগে ১৯১৮ সালে ৩০ জুলাই শরীর ত্যাগ করেন।

■■■■■■■■■■■■■■■■■■





★★14>স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ::--


স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ (১৮৬৩-১৯১১)

স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ ১৮৬৩ সালে ১৩ই জুলাই হুগলি জেলার খানাকুলের নিকট ইছাপুর গ্রামে ঈশ্বরচন্দ্র চক্রবর্তীর ঘরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পিতৃপ্রদত্ত নাম ছিল শশীভূষণ চক্রবর্তী। তার বাবার দরুন ছোটবেলা থেকে আচার-উপাসনার প্রতি আগ্রহ জন্মায়। উচ্চ শিক্ষার জন্য কলকাতায় গিয়ে তিনি তার খুড়তুতো ভাই শরতের (পরবর্তীতে স্বামী সারদানন্দ) সাথে থাকা শুরু করেন।


কলকাতার একটি কলেজে পড়ার সময়, শশী এবং শরৎ ব্রাহ্মসমাজে যোগ দেন এবং কেশবচন্দ্র সেনের কাছ থেকে রামকৃষ্ণের কথা শোনেন। ১৮৮৩ সালের অক্টোবরে তারা দক্ষিণেশ্বর যান এবং রামকৃষ্ণের আধ্যাত্মিকতার প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হন। শশী কলেজে তার পড়াশোনা বাদ দিয়ে শ্যামপুকুর এবং কাশীপুরে তাঁর গুরু রামকৃষ্ণ পরমহংসের শেষ সময়ে তার সেবা কাজে নিজেকে নিযুক্ত করেছিলেন। গুরুর দেহত্যাগের পর তিনি বরানগর মঠে যোগ দেন। পরে আঁটপুরে সন্ন্যাস গ্রহণ করে রামকৃষ্ণানন্দ নাম ধারণ করেন। স্বামী রামকৃষ্ণানন্দই রামকৃষ্ণের প্রতিদিনের আচার-অনুষ্ঠান পূজার পদ্ধতি প্রণয়ন ও প্রবর্তন করেছিলেন।


বাংলায় ১৮৯৭ সালের দুর্ভিক্ষের ত্রাণ কাজের জন্য তিনি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ত্রাণসাহায্য সংগ্রহ করেন। সরাসরি সেই ত্রাণের কাজে জড়িত থাকা অখণ্ডানন্দকে তিনি সংগৃহীত এই ত্রাণ সাধারণকে বিতরণের জন্য দেন।


তিনি বিশেষ তীর্থযাত্রা না করে প্রথমদিকে মঠের কাজেই মনোনিবেশ করেছিলেন। কিন্তু বিবেকানন্দ পশ্চিমা দেশ ভ্রমণ করে ফিরে এসে কাকে দক্ষিণ ভারতের চেন্নাইয়ের রামকৃষ্ণ মঠের একটি শাখা প্রবর্তন করতে বললে তিনি নির্দিষ্টতা পালন করতে চেন্নাই গমন করেন।‌‌ তিনি সেখানে চেন্নাই শ্রীরামকৃষ্ণ মঠ, ব্যাঙ্গালোর শ্রীরামকৃষ্ণ মঠ, চেন্নাইয়ের ময়িলাপুরে রামকৃষ্ণ মিশন ছাত্রাবাসিক, জর্জ টাউনে ন্যাশনাল স্কুল ফর গার্লস, মাদ্রাজ থেকে রামকৃষ্ণ–বিবেকানন্দের উপর বিভিন্ন বই প্রকাশ করা শুরু করেন। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ১৪ বছর ধরে রামকৃষ্ণ ও বিবেকানন্দের বাণী প্রচার করতে গিয়ে তিনি যে ত্যাগ ও কষ্টের কাহিনী সঙ্গী করেছিলেন তা রামকৃষ্ণ বাণীপ্রচারের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ হয়েছে। এরপর থেকে দক্ষিণ ভারতে তিনি ব্যাপকভাবে ভ্রমণ করেছিলেন। তিরুবনন্তপুরম, মহীশূর, বেঙ্গালুরু এবং মুম্বাইতে কেন্দ্রের সূচনা তার অগ্রণী প্রচেষ্টার জন্য অনেক বেশি ঋণী। এছাড়াও তিনি আলেপ্পি, এর্নাকুলাম, মসুলিপত্তনম, তিরুনেলবেলি ও দেশের বাইরে বর্মায় রেঙ্গুন ভ্রমণ করেন। তাঁর শেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ কৃতিত্ব ছিল ১৯১১ সালে সারদা দেবীর দক্ষিণ ভারত সফরের ব্যবস্থা করা যে ঘটনাটি সমগ্র ভারতে এবং বিশেষ করে দক্ষিণ ভারত জুড়ে রামকৃষ্ণ বাণীপ্রচার বৃদ্ধিতে ব্যাপক প্রেরণা দেয়। তিনি তার সহকর্মী স্বামী নির্মলানন্দকে দক্ষিণ ভারতের রামকৃষ্ণ মিশনের সহচরদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। এর ফলে বিশেষ করে বেঙ্গালুরু এবং কেরালায় নির্মলানন্দ মিশনের দায়িত্ব গ্রহণ করতে অগ্রসর হন এবং ১৯৩৮ সালে আমৃত্যু রামকৃষ্ণানন্দের শুরু করা কাজগুলিকে সম্প্রসারণে চালিয়ে যান।


সারদা দেবীর দক্ষিণ ভারতে ভ্রমণের সময় অবিরাম কাজ ও তাঁর সেবা করার কিছুদিন পর তিনি যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হন। তার গুরুভাই নির্মলানন্দের তত্ত্বাবধানে স্বাস্থ্যকর আবহাওয়ায় স্বাস্থ্য ভাল হওয়ার আশা নিয়ে বেঙ্গালুরুতে তিনি কয়েক সপ্তাহ কাটান। কিন্তু শারীরিক অবনতি অব্যাহত থাকায় তাকে কলকাতায় পাঠানো হয়। ১৯১১ সালের ২১শে আগস্ট কলকাতায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। 

■■■■■■■■■■■■■■■■■




★★15>স্বামী সারদানন্দ:::---


স্বামী সারদানন্দ (১৮৬৫-১৯২৭)

স্বামী সারদানন্দ ১৮৬৫ সালের ২৩শে ডিসেম্বর কলকাতার আমহার্স্ট স্ট্রিটে একটি ধনী ও গোঁড়া ব্রাহ্মণ পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পিতৃপ্রদত্ত নাম ছিল শরৎচন্দ্র চক্রবর্তী। বড় হওয়ার সাথে সাথে তিনি ব্রাহ্ম নেতা কেশবচন্দ্র সেনের প্রভাবে আসেন এবং ব্রাহ্মসমাজের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হতে শুরু করেন। ১৮৮২ সালে তিনি স্কুলের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ভর্তি হন।


১৮৮৩ সালে অক্টোবর মাসে তার ভাই শশীকে নিয়ে রামকৃষ্ণের সাথে দেখা করতে দক্ষিণেশ্বর যান। এরপর থেকে প্রতি বৃহস্পতিবার রামকৃষ্ণের সাথে দেখা করার জন্য দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে যেতেন। শ্রীরামকৃষ্ণের সাথে আরও ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হওয়ার সাথে সাথে তিনি আধ্যাত্মিক অনুশীলনের দিকনির্দেশ পেতে শুরু করেন।


১৮৮৫ সালে গুরু শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের মৃত্যুর পর তিনি এবং তার অন্যান্য গুরুভাইয়েরা বরানগর মঠে কঠোর ও অভাবী জীবন অতিবাহিত করেন। আঁটপুরে তারা সন্ন্যাস গ্রহণ করলে তিনি স্বামী সারদানন্দ নামে পরিচিত হন।


সারদানন্দ পুরী, কাশী, অযোধ্যা ও ঋষিকেশ সহ উত্তর ভারতের অনেক স্থানে ভ্রমণ করেন। এছাড়াও তিনি হিমালয়ে গঙ্গোত্রী, কেদারনাথ এবং বদ্রীনাথ ভ্রমণ করেন। ১৮৯০ সালে সারদানন্দ আলমোড়ায় আসেন। সেখানে তিনি বিবেকানন্দের সাথে দেখা করেন এবং তারা একসাথে গাড়োয়ালের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। সেখান থেকে মুসৌরির কাছে রাজপুরে এসে তুরীয়ানন্দের সঙ্গে দেখা করেন। এরপর তিনি ঋষিকেশে যান এবং সেখানে কনখলে ব্রহ্মানন্দের সঙ্গে দেখা করেন।‌‌ দিল্লি থেকে তিনি কাশী যান এবং সেখানে কিছুকাল অবস্থান করে স্বামী অভেদানন্দের সঙ্গে দেখা করেন। সেখানে তিনি রক্ত ​​আমাশয়ে ভোগেন এবং ১৮৯১ সালে বরানগর মঠে ফিরে আসেন। পরবর্তীকালে, সুস্থ হওয়ার পর তিনি শ্রী সারদা দেবীর জন্মস্থান জয়রামবাটীতে যান। পরে ১৮৯২ সালে তিনি কলকাতায় ফিরে আসেন এবং রামকৃষ্ণ মঠ আলমবাজারে স্থানান্তরিত করা হয়। ১৮৯৬ সালে বিবেকানন্দের ডাকে সারদানন্দ বেদান্ত প্রচারের জন্য লন্ডনও পারি দেন।


১৮৯৯ সালে কলকাতায় প্লেগ মহামারী আকার ধারণ টরলে রামকৃষ্ণ মিশন ত্রাণের আয়োজন করে। সারদানন্দ, ভগিনী নিবেদিতা এবং অন্যান্য গুরুভাইরাও ত্রাণ কাজে জড়িত ছিলেন। ঐ বছর তিনি মিশনের তহবিল সংগ্রহের জন্য স্বামী তুরীয়ানন্দের সাথে গুজরাট ভ্রমণ করেন এবং আমেদাবাদ, জুনাগড়, ভাবনগর ইত্যাদি অঞ্চলে ব্যাপকভাবে ভ্রমণ করে হিন্দিতে বক্তৃতা দেন। বিবেকানন্দের দ্বিতীয়বার পশ্চিমে প্রস্থানের পর, তিনি তরুণ সন্ন্যাসীদের প্রশিক্ষণও শুরু করেন। এরপর ডিসেম্বর মাসে তিনি আমন্ত্রণ পেয়ে ঢাকা, বরিশাল ও নারায়ণগঞ্জ যান এবং সেখানে অশ্বিনীকুমার দত্তের বাড়িতে অবস্থান করেন।


কলকাতায় ফিরে আসার পর, তিনি তাঁর কাকা ঈশ্বরচন্দ্র চক্রবর্তীর নির্দেশনায় তান্ত্রিক উপাসনার প্রতি আগ্রহী হন। এই অভিজ্ঞতার পর তিনি "ভারতে শক্তি পূজা" নামে একটি বই লেখেন। ১৯০২ সালে বিবেকানন্দের মৃত্যুর পর তিনি বেলুড় মঠের দৈনন্দিন কাজ পরিচালনা শুরু করেন এবং আগেই শুরু করা বাংলা পত্রিকা "উদ্বোধন" সম্পাদনা ও প্রকাশের কাজটিও গ্রহণ করেন।


১৯১৩ সালে বর্ধমানে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে তাঁর অধীনে রামকৃষ্ণ মিশন তহবিল সংগ্রহ করে ত্রাণ শুরু করে। ১৯১৬ সালে তিনি গয়া, কাশী, বৃন্দাবনে তীর্থযাত্রার জন্য যান এবং দুইমাস পর ফিরে আসেন। ১৯২০ সালে সারদা দেবীর এবং ১৯২২ সালে ব্রহ্মানন্দের মৃত্যুর পর, সারদানন্দ ধীরে ধীরে সক্রিয় কাজ থেকে সরে আসেন।


১৯২৭ সালের ৬ই আগস্ট তার বৃক্ক সংক্রান্ত রোগসহ অ্যাপোপ্লেক্সি ধরা পড়ে। ১৯ শে আগস্ট তিনি মারা যান।

■■■■■■■■■■■■■■■■■■





★★16>স্বামী শিবানন্দ::--


স্বামী শিবানন্দ (১৮৫৪-১৯৩৪)


স্বামী শিবানন্দের ভক্ত ও শিষ্যরা তাকে মহাপুরুষ মহারাজ বলে অভিহিত করতেন। ১৮৫৪ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারি চব্বিশ পরগনার বারাসাতের নিকট একটি গ্রামে বাঙালি উকিল ব্রাহ্মণ রামকানাই ঘোষালের বাড়ীতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পিতৃপ্রদত্ত নাম ছিল তারকনাথ ঘোষাল।


১৮৮০ সালের মে মাসে রামচন্দ্র দত্তের বাড়িতে তিনি প্রথমবার রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবকে দেখেন। এর কয়েক দিন পরে তিনি দক্ষিণেশ্বরে কালী মন্দির দেখতে যান। কিছুদিন পরমহংসের সঙ্গ পাওয়ার পর তিনি তার নির্দেশনায় সাধনা ও ধ্যান অনুশীলন করতে শুরু করেন। তার বোনের বিয়ের জন্য যথেষ্ট যৌতুক না দিতে পেরে তিনি হবু ভগ্নীপতির বাড়ীর এক কন্যাকে বিবাহ করতে বাধ্য হন। ১৮৮১-৮২ সালে তার বিয়ে হয়। বিয়ের তিন বছর পর তার স্ত্রী মারা গেলে বরানগর মঠ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত কখনও ভক্তের বাড়ীতে বা কখনও একাকী জায়গায় থাকা শুরু করেন।


১৮৮৬ সালে তার গুরু রামকৃষ্ণের মৃত্যুর পর তার সাক্ষাৎশিষ্য তথা গুরুভাইদের একটি ছোট দল আঁটপুরে মিলিত হয়ে সন্ন্যাস জীবন গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং তারকনাথ ঘোষালের নামকরণ হয় স্বামী শিবানন্দ। তারা বরানগরের একটি জরাজীর্ণ বাড়িতে থাকা শুরু করেন। এভাবে রামকৃষ্ণ আদর্শের বরানগর মঠের সূচনা হয়।


সন্ন্যাস পরবর্তী কালে গুরু শিক্ষা প্রচারে শিবানন্দ উত্তর ভারতে ভ্রমণ করেছিলেন। তিনি আলমোড়ায় যান, যেখানে তিনি একজন স্থানীয় ধনী ব্যক্তি লালা বদ্রীলাল শাহের সাথে পরিচিত হন, তিনিও রামকৃষ্ণের শিষ্যদের একজন ভক্ত ছিলেন। ১৮৯৩ সালের শেষের দিকে তিনি ই.টি. স্টার্ডি নামে একজন ধর্মতত্ত্বে আগ্রহী ইংরেজের সাথে দেখা করেন, যিনি পরে ইংল্যান্ডে বিবেকানন্দের সাথে দেখা করার পর তার ভক্ত ও অনুসারী হয়ে ওঠেন। তার মননশীল জীবনযাপনের দিকে বেশি ঝোঁক ছিল এবং বেশ কয়েকবার হিমালয়ে যাত্রা করেন। তিনি স্বামী তুরীয়ানন্দের সাথে ১৯০৯ সালে অমরনাথেও যান।


১৮৯৭ সালে বিবেকানন্দ পশ্চিমা দেশগুলি থেকে ভারতে ফিরে আসার পর শিবানন্দের ভ্রমণ জীবনের সমাপ্তি ঘটে। তিনি বিবেকানন্দকে স্বাগত জানাতে মাদ্রাজে যান এবং তাকে সাথে নিয়ে কলকাতায় ফিরে আসেন। বিবেকানন্দ শিবানন্দকে বেদান্তের জ্ঞান প্রচারে শ্রীলঙ্কায় পাঠান। সেখানে তিনি গীতা ও রাজযোগের উপর পাঠ দেন। ১৮৯৮ সালে বেলুড়ে নতুন প্রতিষ্ঠিত রামকৃষ্ণ মঠে ফিরে আসেন। ১৮৯৯ সালে কলকাতায় প্লেগ শুরু হলে শিবানন্দ বিবেকানন্দের অনুরোধে ত্রাণ কার্যক্রম সংগঠিত করতে সাহায্য করেন। ১৯০০ সালে তিনি বিবেকানন্দের সাথে চম্পাবতের মায়াবতী অদ্বৈত আশ্রমে যান। দেওঘরের রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যাপীঠে তাঁর সম্মানে "শিবানন্দ ধাম" নামে একটি ছাত্রাবাস রয়েছে।


১৯০২ সালে, বিবেকানন্দের মৃত্যুর ঠিক আগে ভিঙ্গার রাজার স্বামী বিবেকানন্দকে দান ব্যবহার করা সম্পত্তিতে অদ্বৈত আশ্রম শুরু করতে বারাণসীতে যান। সেখানে তিনি সাত বছর আশ্রমপ্রধান ছিলেন।। এই সময়ে তিনি বিবেকানন্দের শিকাগো বক্তৃতা স্থানীয় হিন্দিতে অনুবাদ করেন।


১৯১০ সালে তিনি রামকৃষ্ণ মিশনের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯১৭ সালে যখন বাবুরাম মহারাজ (স্বামী প্রেমানন্দ) অসুস্থ হয়ে মারা গেলে মঠ ও মিশনের পরিচালনার দায়িত্ব শিবানন্দের উপর পড়ে। ১৯২২ সালে স্বামী ব্রহ্মানন্দের মৃত্যুর পর তিনি রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের দ্বিতীয় সভাপতি হন। ব্রহ্মানন্দের মতো তিনি তার দৈনন্দিন কাজের পাশাপাশি ধ্যান অনুশীলন করতেন। তিনি পূর্ববঙ্গের ঢাকা ও মৈমনসিংহে যান ও বেশ কিছু আধ্যাত্মিক সাধককে দীক্ষা দেন। ১৯২৪ এবং ১৯২৭ সালে তিনি দক্ষিণ ভারতে দুটি দীর্ঘ সফরে যান এবং উটি, বোম্বে ও নাগপুরে রামকৃষ্ণ মঠ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯২৫ সালে তিনি দেওঘরে যান এবং রামকৃষ্ণ মিশনের স্থানীয়দের জন্য একটি নতুন ভবন খোলেন।


১৯৩০ সাল থেকে শিবানন্দের স্বাস্থ্য দ্রুত ভেঙে পড়ে। ১৯৩৩ সালের এপ্রিল মাসে তার স্ট্রোক হয় এবং একদিক পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে। ১৯৩৪ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারি গুরু রামকৃষ্ণের জন্মদিনের কয়েকদিন পর শিবানন্দ মারা যান। পরে বেলুড় মঠের পুরাতন মন্দির সংলগ্ন ছোট কক্ষটি 'শিবানন্দের ঘর' নামে পরিচিতি লাভ করে।

■■■■■■■■■■■■■■■■■■






★★17>স্বামী যোগানন্দ::::---


স্বামী যোগানন্দ (১৮৬১-১৮৯৯)

স্বামী যোগানন্দ ১৮৬১ সালের ৩০ শে মার্চ দক্ষিণেশ্বরের নিকট নবীনচন্দ্র রায় চৌধুরীর বাড়িতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পিতৃ প্রযুক্ত নাম ছিল যোগীন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী। তার পরিবার ছিল কলকাতার স্বনামধন্য সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের অংশ।  যোগীন্দ্রনাথ শৈশব থেকেই মননশীল প্রকৃতির ছিলেন এবং দিনের বেশকিছু সময় ধ্যান করতেন। সতের বছর বয়সে যোগিন রামকৃষ্ণের সঙ্গে দেখা করেন। সেই সময়ে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানে স্কুল ফাইনাল পরীক্ষার জন্য অধ্যয়ন করছিলেন। রামকৃষ্ণ যোগিনের আধ্যাত্মিক সম্ভাবনাকে বুঝে তা পরিপুষ্ট করার জন্য বারবার দক্ষিণেশ্বরে আমন্ত্রণ পাঠাতেন। এর প্রভাব তার পড়াশোনার উপর পড়ে। তাকে নিয়ে তার পিতামাতার উচ্চাকাঙ্ক্ষা তাদের উদ্বিগ্ন করে তোলে। বাবা মায়ের কথায় তিনি চাকরির সন্ধানে কানপুরে এক আত্মীয়ের কাছে যান। কর্মসংস্থান পেতে ব্যর্থ হয়ে ধ্যান করে সময় অতিবাহিত করা শুরু করেন। ছেলেকে গৃহস্থ করতে তার বাবা-মা তাকে বিয়ে প্রস্তাব দেন।


বিয়ের পর যোগিন আবার রামকৃষ্ণের সাথে দেখা করেন এবং আবার তার আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষাকে এগিয়ে নিতে ঘন ঘন দক্ষিণেশ্বরে যেতে শুরু করেন। বিয়ের পরেও যোগিন জাগতিক বিষয়ে উদাসীন ছিলেন যা তাকে রামকৃষ্ণের শিক্ষার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু করে তোলে। তিনি যোগিনকে প্রায়শই বলতেন, "একজন মানুষ ধার্মিক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করতেই পারেন তা'বলে তার বোকামি করার দরকার নেই।"


১৮৮৭ সালে স্বামী বিবেকানন্দের নেতৃত্বে গুরুভাইয়েরা সন্ন্যাস ব্রত গ্রহণ করেন এবং যোগিন স্বামী যোগানন্দ নাম পান। তিনি ১৮৯১ সালে বারাণসী ভ্রমণ করতে গিয়ে একটি নির্জন বাগানবাড়ীতে থেকে কঠোর জীবনযাপন করেন। তপস্যা এবং আধ্যাত্মিক অনুশীলনের কারণে তাঁর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে এবং তিনি কলকাতায়, নবগঠিত বরানগর মঠে ফিরে আসেন। কলকাতায় ফিরে তিনি এবং সারদা দেবী বলরাম বসুর বাড়ীতে থাকা শুরু করেন। এসময়ে তিনি তার গুরুমায়ের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন।


যোগানন্দই সর্বপ্রথম দক্ষিণেশ্বর মন্দির প্রাঙ্গণে রামকৃষ্ণের জন্মবার্ষিকীর সার্বজনীন উদযাপনের আয়োজন করেছিলেন। ১৮৯৭ সালে তিনি কলকাতায় ফিরে আসার সময় স্বামী বিবেকানন্দকে প্রবেশ অভ্যর্থনা দেন। উভয় অনুষ্ঠানেই তিনি অনেক যুবককে রামকৃষ্ণ ভাবধারায় প্রভাবিত করেছিলেন এবং একাধিক কার্যক্রম সংগঠন ও সমন্বয় করেছিলেন। ১৮৯৭ সালে রামকৃষ্ণ মিশনের গঠনের পর যোগানন্দ তার সহসম্পাদক নির্বাচিত হন এবং সফলভাবে সংগঠনের গঠনমূলক পরিচালনা করেন। ১৮৯৮ সালে যোগানন্দ নবগঠিত বেলুড় মঠ-এ রামকৃষ্ণের জন্মবার্ষিকীর আয়োজন করেন। ১৮৯৯ সালে তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি কার্যালয়ের দায়িত্ব পালন করেন।


যোগানন্দ দীর্ঘ অসুস্থতার পর ১৮৯৯ সালে ২৮শে মার্চ মারা যান। রামকৃষ্ণ ও সারদা দেবীর সাক্ষাৎশিষ্যদের মধ্যে যারা সন্ন্যাস গ্রহণ করেছিলেন তাদের মধ্যে তিনিই প্রথম মৃত্যুবরণ করেন। অসুস্থতার সময় বিবেকানন্দের শিষ্য কল্যাণানন্দ তার সেবা করেছিলেন। তার জীবনের শেষ দিনগুলিতে যোগীন মা কিছুদিন তার পরিচর্যা করেন। তাঁর মৃত্যুতে সারদা দেবী মর্মাহত হয়েছিলেন।

============================■■■■■■◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆■■■■■

======+======================

           ★★★★★★★★★★★



★★শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ দেবের গৃহস্থ শিষ্য গণের নাম।( সংক্ষিপ্ত)

               ( 1 to 36)


●1>রাণী রাসমণি

●2>মথুরমোহন বিশ্বাস

●3>হৃদয়রাম মুখোপাধ্যায়

●4>লক্ষ্মী দেবী

●5>শম্ভুচরণ মল্লিক - ঠাকুরের দ্বিতীয় রসদদার।

●6>পূর্ণচন্দ্র ঘোষ - কথামৃতের প্রকাশক শ্রী মহেন্দ্র গুপ্ত কর্তৃক শ্রীরামকৃষ্ণের সাথে তার পরিচয়।

●7>অক্ষয়কুমার সেন

●8>অধরলাল সেন — ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা বিভাগের সদস্য।

●9>অঘোর ভাদুড়ী

●10>অতুলচন্দ্র ঘোষ

●11>অশ্বিনীকুমার দত্ত

●12>বৈদ্যনাথ — কলকাতা উচ্চ আদালতের বিচারপতি

●13>রামচন্দ্র দত্ত - কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের রাসায়নিক পরীক্ষক এবং সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশনের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক।

●14>মনমোহন মিত্র

●15>মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত ("শ্রীম")

●16>গিরিশচন্দ্র ঘোষ

●17>যোগীন মা - যোগীন্দ্রমোহিনী বিশ্বাস

●18>গৌরী মা

●19>গোলাপ মা

●20>গোলাপ মা

●21>প্রতাপচন্দ্র মজুমদার

●22শিবনাথ শাস্ত্রী

●23>গিরিশ চন্দ্র সেন

●24>ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়

●25বলরাম বসু

●26>সুরেন্দ্রনাথ মিত্র

●27>দুর্গাচরণ নাগ

●28অক্ষয় কুমার সেন

●29>বিশ্বনাথ উপাধ্যায় — ভারত সরকারের ভাইসরয়ের কাছে নেপাল সরকারের রাষ্ট্রদূত।

●30>ঈশানচন্দ্র মুখোপাধ্যায় — সুপারিনটেনডেন্ট অফ একাউন্টেন্ট জেনারেল অফিস, বাংলা।

●31>চুনীলাল বসু

●32>প্রতাপচন্দ্র হাজরা

●33>নবগোপাল ঘোষ ও নিস্তারিণী দেবী

●34>দেবেন্দ্রনাথ  মজুমদার

●35>তেজচন্দ্র মিত্র

●36>মণীন্দ্রকৃষ্ণ গুপ্ত

==========================


31>)শ্রীরামকৃষ্ণকথামৃতের ব্যক্তিবৃন্দ।(1)

 31>)শ্রীরামকৃষ্ণকথামৃতের ব্যক্তিবৃন্দ।(1)

          (1 to 150) /(1)

        (প্রথম ভাগ )

●1>অক্ষয়কুমার সেন (১৮৫৮ - ১৯২৩) — বাঁকুড়া জেলার ময়নাপুর গ্রামে জন্ম। পিতা হলধর সেন। মাতা বিধুমুখী দেবী।

ঘণ কৃষ্ণবর্ণ, রুগ্ন শরীর এবং মন্দ আকৃতির জন্য স্বামী বিবেকানন্দ রহস্যচ্ছলে তাঁহাকে ‘শাঁকচুন্নী’ বলিয়া ডাকিতেন। প্রথম জীবনে অক্ষয়কুমার কলিকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে ছেলেদের পড়াইতেন বলিয়া তাঁহাকে ‘অক্ষয় মাস্টার’ বলিয়া ডাকিতেন। প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি দ্বিতীয় বার বিবাহ করেন। তিনি তাঁহার পরবর্তী জীবনে বসুমতী পত্রিকার অফিসে চাকুরী গ্রহণ করেন। অক্ষয়কুমার ঠাকুরের গৃহী ভক্ত, দেবেন্দ্রনাথ মজুমদার সহ কাশীপুরে ঠাকুরের অপর ভক্ত মহিমাচরণ চক্রবর্তীর বাড়িতে প্রথম শ্রীরামকৃষ্ণকে দর্শন করেন এবং তঁহার কৃপাদৃষ্টি লাভ করেন। অতঃপর তিনি দক্ষিণেশ্বরে যাতায়াত শুরু করেন এবং বহুবার ঠাকুরের পবিত্রসঙ্গ লাভ করেন। কাশীপুরে শ্রীরামকৃষ্ণের কল্পতরু হওয়ার দিনও অক্ষয়কুমার উপস্থিত ছিলেন। ঠাকুর সেদিন অক্ষয়কুমারকে নিজের কাছে ডাকিয়া তাঁহার বক্ষ স্পর্শ করিয়া কানে ‘মহামন্ত্র’ দান করিয়াছিলেন। পরবর্তী কালে দেবেন্দ্রনাথ মজুমদারের পরামর্শে, স্বামী বিবেকানন্দের উৎসাহে এবং সর্বোপরি শ্রীশ্রীমায়ের আশীর্বাদে ঠাকুরের লীলা সম্বলিত ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পুঁথি’ পদ্যাকারে রচনা করেন। এইটি তাঁহার জীবনের ক্ষয়কীর্তি। তাঁহার প্রণীত অপর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘শ্রীরামকৃষ্ণ মহিমা’। এই দুইখানি গ্রন্থের জন্য শ্রীরামকৃষ্ণ পরিমণ্ডলে তিনি বিশেষ সুপরিচিত। শ্রীশ্রীঠাকুরের মহাসমাধির মুহূর্তে অক্ষয় সেখানে উপস্থিত ছিলেন। অক্ষয়কুমারের শেষ জীবন স্বগ্রামে অতিবাহিত হয়।


●2>অঘোড় ভাদুড়ী — শ্রীরামকৃষ্ণের গৃহীভক্ত। তাঁহার পিতা ডা: বিহারীভাদুড়ী। কলিকাতা সিমলা অঞ্চলে ১১, মধু রায় লেনে ঠাকুরের সহিত প্রথম সাক্ষাৎ হয়। রামচন্দ্র দত্তের গৃহে শ্রীরামকৃষ্ণের দর্শনলাভে তিনি ধন্য হন। ঠাকুরের কণ্ঠে গান এবং ধর্মপ্রসঙ্গ শুনিয়া তিনি অভিভূত হইয়া যাইতেন। নরেন্দ্রনাথের সহিত তাঁহার পরিচয় ছিল।


●3>অচলানন্দ তীর্থাবধূত — তান্ত্রিক বীরভাবের সাধক। পূর্বনাম রামকুমার, মতান্তরে — রাজকুমার। বাড়ি হুগলী জেলার কোতরং। ঠাকুরের সহিত তাঁহার প্রথম সাক্ষাৎ দক্ষিণেশ্বরে। মাঝে মাঝে তিনি দক্ষিণেশ্বরে আসিয়া বাস করিতেন। কখনো কখনো সশিষ্য পঞ্চবটীতে সাধনায় বসিতেন। কারণবারি পান করিয়া স্ত্রীলোকসহ বীরভাবের সাধনা করিতেন। এই বীরভাবের সাধনা বিষয়ে ঠাকুরের সহিত তাঁহার বিতর্ক হইত। ঠাকুর তাঁহার বীরভাবের সাধনা সমর্থন করিতেন না। ঠাকুর বলিতেন — সব স্ত্রীলোক-ই তাঁহার নিকট মায়ের বিভিন্ন রূপ। অচলানন্দ বিবাহ করিয়াছিলেন — স্ত্রী পুত্র ছিল, কিন্তু তাহাদের খবর রাখিতেন না। বলিতেন — ঈশ্বর দেখিবেন। কিন্তু নাম, যশ, অর্থের প্রতি তাঁহার আকর্ষণ ছিল।


●4>অতুলচন্দ্র ঘোষ — নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘোষের কনিষ্ঠ ভ্রাতা। কলিকাতা হাইকোর্টের উকিল। কলিকাতা বাগবাজার অঞ্চলের অধিবাসী। ঠাকুরের ভক্ত। প্রথম দর্শন বাগবাজার দীননাথ বসুর বাড়িতে। প্রথম দিকে তিনি ঠাকুরের কাছ হইতে দূরে থাকিতেন এবং পরিহাস করিয়া ঠাকুরকে রাজহংস বলিতেন। ঠাকুর সেকথা শুনিয়া সস্নেহে তাঁহার এই উক্তির সমর্থন করেন অতুল তাহাতে অভিভূত হন এবং ঠাকুরের কৃপালাভে ধন্য হন। কল্পতরু অবস্থায় ঠাকুরকে দর্শন করিবার সৌভাগ্য তাঁহার হইয়াছিল।


●5>অধরলাল সেন (১৮৫৫ - ৮৫) — শ্রীরামকৃষ্ণের প্রিয় গৃহীভক্তদের অন্যতম। ঠাকুরের সহিত প্রথম সাক্ষাৎ দক্ষিণেশ্বরে, ১৮৮৩ খ্রীষ্টাব্দে। পিতা রামগোপাল সেন পরম বৈষ্ণব ভক্ত। তিনি ধনী ব্যবসায়ী ছিলেন । পূর্বপুরুষের আদি নিবাস হুগলী জেলার সিঙ্গুর গ্রামে। অধরের জন্মস্থান — ২৯, শঙ্কর হালদার লেন, আহিরীটোলা, কলিকাতা। বাসস্থান — কলিকাতার বেনিয়াটোলা। প্রতিভাবান, কৃতীছাত্র অধর ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের fellow এবং Faculty of Arts-এর সদস্য। পাঁচখানি বাংলা কাব্যগ্রন্থের প্রণেতা। প্রথম জীবনে নাস্তিক অধর, আঠাস বৎসর বয়সে প্রথম ঠাকুরকে দর্শন করিয়া ঠাকুরের প্রমভক্ত হন। প্রথম সাক্ষাতেই ঠাকুর অধরকে কাছে টানিয়া নেন। একদিন ঠাকুর অধরের জিহ্বায় ইষ্টমন্ত্র লিখিয়া দেন এবং ভাবাবিষ্ট অবস্থায় অধরের বক্ষ ও মস্তক স্পর্শ করিয়া আশীর্বাদ করেন। ধীরে ধীরে অধর দিব্যানন্দে ও আধ্যাত্মিক অনুভূতিতে পূর্ণ হইতে থাকেন। ঠাকুর বহুবার অধরের বাড়িতে শুভাগমন করিয়া কীর্তনানন্দে সমাধিস্থ হইয়াছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণ অধরকে নারায়ণ জ্ঞান করিতেন। অধর নানাবিধ কাজের সহিত যুক্ত ছিলেন। প্রায় প্রতিদিনই কঠোর পরিশ্রমের পর দিনান্তে দক্ষিণেশ্বরে আসিয়া ঠাকুরকে প্রণাম করিয়া যাইতেন। অধরের বাড়িতেই শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্রের সাক্ষাৎ হয়। সরকারী কাজে অধরকে ঘোড়ায় চড়িতে হইত। এই ব্যাপারে শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁহাকে একাধিকবার সাবধান করিয়াছিলেন। কিন্তু ত্রিশ বৎসর বয়সে হঠাৎ একদিন ঘোড়ার পিঠ হইতে পড়িয়া যাওয়াতেই তাঁহার মৃত্যু হয়। সেই সময়েও শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁহাকে দেখিতে আসিয়া অশ্রুপূর্ণ নেত্রে তাঁহাকে স্পর্শ করেন।


●6>অন্নদা গুহ — নরেন্দ্রনাথের বিশেষ বন্ধু। তিনি বরাহনগর নিবাসী ছিলেন। প্রথম জীবনে অন্নদা অসৎসঙ্গে কাটাইতেন। একদা নরেন্দ্রনাথের উপরেও অন্নদার প্রভাব পড়ে। অন্নদা শ্রীরামকৃষ্ণের দর্শনলাভে ধন্য হন। পরবর্তীকালে শ্রীরামকৃষ্ণের উপদেশ অনুসরণ করিয়া নিজের জীবনধারাকে পরিচালিত করিতে সক্ষম হইয়াছিলেন। কেহ কেহ অন্নদাকে অহঙ্কারী মনে করিলেও ঠাকুর তাহা অস্বীকার করিয়াছিলেন।


●7>অন্নদা বাগচী (১৮৪৯ - ১৯০৫) — ২৪ পরগণার অন্তর্গত শিখরবালি গ্রামে জন্ম। পিতা চন্দ্রকান্ত বাগচী। শৈশব হইতেই অন্নদাপ্রসাদের শিল্পচর্চার প্রতি আকর্ষণ ছিল। ১৮৬৫ খ্রীষ্টাব্দে নব প্রতিষ্ঠিত স্কুল অব ইণ্ডাস্ট্রিয়াল আর্টস-এর এনগ্রেভিং ক্লাশে ভর্তি হন। পরে তিনি পাশ্চাত্য রীতির চিত্রাঙ্কন বিদ্যা শিক্ষা করেন। কর্মজীবনে প্রবেশ করিয়াও তিনি পূর্বোক্ত স্কুলের শিক্ষকও পরে প্রধান শিক্ষকের পদলাভ করেন। পাশ্চাত্য রীতিতে প্রতিকৃতি অঙ্কন করিয়া ইনি প্রভূত যশোলাভ করেন। শিল্পবিষয়ক প্রথম বাংলা পত্রিকা “শিল্পপুষ্পাঞ্জলি” (১২৯২) প্রকাশনার ব্যাপারে তিনি একজন উদ্যোক্তা ছিলেন। তঁহার অন্যতম প্রধান কীর্তি ‘আর্ট স্টুডিও’, প্রতিষ্ঠা (১৮৭৮)। এই আর্ট স্টুডিও হইতে লিথোগ্রাফি পদ্ধতিতে ছাপা বহু পৌরাণিক বিষয়ক চিত্র সেকালে বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করিয়াছিল। ১৮৮৫ খ্রীষ্টাব্দে ঠাকুরের বিষয়ক চিত্র সেকালে বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করিয়াছিল। পরে শ্যামপুকুরে শ্রীরামকৃষ্ণের সহিত সাক্ষাতের সময় তিনি তাঁহার অঙ্কিত কিছু চিত্র শ্রীরামকৃষ্ণকে উপহার দিয়াছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণ অত্যন্ত আনন্দের সহিত এই চিত্রগুলি দেখিয়াছিলেন। ১৯০৫ খ্রীষ্টাব্দে কলিকাতার বঙ্গীয় কলাসংসদ স্থাপিত হইলে অন্নদাপ্রসাদ তাহার সভাপতি নির্বাচিত হন। রাজা রাজেন্দ্রলাল মিত্র রচিত ‘The Antiquities of Orissa’ এবং ‘বুদ্ধগয়া’ নামক গ্রন্থ দুইটিতে অন্নদাপ্রসাদের অঙ্কিত ছবিগুলি বিশেষ প্রশংসা লাভ করে।


●8>অমৃতলাল বসু (১৮৩৯ - ১৯১৩) — কেশব সেনের অনুগামী। শ্রীরামকৃষ্ণের অনুরাগী গৃহী ব্রাহ্মভক্ত। জন্মস্থান কলিকাতার হাটখোলায়। স্ত্রী বিধুমুখী দেবী। শ্রীরামকৃষ্ণের সান্নিধ্যে আসিয়া অমৃতলালের জীবনধারার উন্নতি ঘটে। শ্রীরামকৃষ্ণের চারিত্রিক মহত্ত্ব, বৈশিষ্ট্য এবং উদারমনোভাব অমৃতকে মুগ্ধ করে। ঠাকুর অমৃতকে অত্যন্ত স্নেহ করিতেন। ১৮৮৩ সালে ঠাকুর যখন অসুস্থ কেশব সেনকে দেখিতে আসেন তখন অমৃতলাল তথায় উপস্থিত ছিলেন। কাশীপুরে থাকাকালে ঠাকুর অমৃতকে দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করিলে অমৃত ঠাকুরকে দেখিতে আসেন। সেই সময়ে অমৃতলালের সহিত ঠাকুরের দীর্ঘসময় ধরিয়া কথাবার্তা হয়। পরবর্তী কালে ঠাকুরের প্রতি অমৃতলালের শ্রদ্ধাভক্তির পরিচয় পাইয়া স্বামীজীও খুব আনন্দিত হইয়াছিলেন।


●9>অমৃতলাল সরকার — কলকাতায় ১৮৬০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ডা: মহেন্দ্রলাল সরকার শ্রীরামকৃষ্ণের চিকিৎসক এবং বিশেষ অনুরাগী। অমৃতলালও চিকিৎসক হন। পিতার মৃত্যুর পর তাঁহারই প্রতিষ্ঠিত The Indian Association for Cultivation of Science-এর সম্পাদক নিযুক্ত হন এবং শেষ পর্যন্ত সেই দায়িত্ব পালন করেন। অমৃত ঠাকুরের স্নেহলাভে ধন্য হন। অমৃতলাল ঈশ্বরের অবতারে বিশ্বাসী ছিলেন না। ঠাকুর কথা প্রসঙ্গে মহেন্দ্রলালের নিকট সস্নেহে ইহা উল্লেখ করেন। তিনি অমৃতলালের সরলাতার প্রশংসা করেন। উত্তরে মহেন্দ্রলাল ঠাকুরের প্রতি অমৃতের শ্রদ্ধা ও আনুগত্যের কথা বলেন এবং অমৃত যে শ্রীরামকৃষ্ণের অনুরাগী সেকথাও জানান।


●10>অলকট, কর্ণেল — প্রসিদ্ধ থিয়োসফিস্ট নেতা। কলিকাতা থিয়োসফিক্যাল সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা। তিনি আমেরিকার একজন শিক্ষাবিদ ছিলেন। আধুনিক শিক্ষাপ্রচারের উদ্দেশ্য তিনি একটিবিদ্যালয়ের স্থাপনের চেষ্টা করেন। পরে কনকর্ড স্কুলের সুপারিনটেনডেন্ট নিযুক্ত হন। শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃতে অলকটের উল্লেখ আছে।


●11>অশ্বিণীকুমার দত্ত (১৮৫৬ - ১৯২৩) — ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশের বিখ্যাত দেশনেতা ও মনীষী। জন্ম অবিভক্ত বাংলার বরিশাল শহরে। তাঁহার প্রণীত বিখ্যাত গ্রন্থ ভক্তিযোগ, কর্মযোগ ও প্রেম। ১৮৮১ খ্রীষ্টাব্দে দক্ষিণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণকে প্রথম দর্শন করেন। এরপর আরও কয়েকবার সাক্ষাৎ হয়। অশ্বিনীকুমার যেদিন দক্ষিণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে যান, সেদিনকেশব সেনেরও সেখানে আসিবার কথা ছিল। কেশব ভক্তবৃন্দের সাথে সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সেদিন অনেক ঈশ্বরীয় প্রসঙ্গ হয় এবং ঠাকুর — সমাধিস্থ হন। অশ্বিনীকুমার এইভাবে প্রথম দর্শনেই উপলব্ধি করেন যে শ্রীরামকৃষ্ণদেব, ‘প্রকৃত পরমহংস’। ঠাকুরের সহিত তাঁহার চার-পাঁচবার সাক্ষাৎ হইয়াছিল। কিন্তু এই অল্পসময়ের মধ্যে তিনি ঠাকুরের ঘনিষ্ঠ হইয়া উঠেন। এই কয়েকবারের সাক্ষাতের অনুভূতি তাঁহার জীবনকে মধুর করিয়া তোলে। অশ্বিনীকুমারের পিতাও ঠাকুরকে দর্শন করিয়াছিলেন। ঠাকুরের ইচ্ছা ছিল নরেন্দ্রের সহিত যেন অশ্বিনীকুমারের পরিচয় হয়। ঠাকুরের এই ইচ্ছা বারো বৎসর পর আলমোড়ায় পূর্ণ হইয়াছিল। কলিকাতাতে তিনি দেহত্যাগ করেন।


●12>আন্দি — মথুরবাবুর জানবাজারের বাড়ির এক মহিলা। সখিভাবে সাধনকালে জানবাজারের বাড়ির মহিলাবৃন্দ শ্রীশ্রীঠাকুরের সহিত কিরূপ অসঙ্কোচ ব্যবহার করিতেন তাহার দৃষ্টান্তরূপে তিনি ইঁহার উল্লেখ করিয়াছেন।


●13>আশু — শ্রীরামকৃষ্ণের ভক্ত আশুতোষ বন্দ্যোপাধ্যায় আগরপাড়ার অধিবাসী ছিলেন। ২২ বৎসর বয়সে ঠাকুরের সহিত তাঁহার প্রথম সাক্ষাৎ হয়। দক্ষিণেশ্বরে গিয়া তিনি একান্তে ঠাকুরের কাছে নিজের মনের ভাব ব্যক্ত করিতেন। আশুতোষ বৃদ্ধ বয়সে মাস্টারমহাশয়ের কাছে যাইতেন এবং ঠাকুরের সহিত নিজ সাক্ষাতের বিষয়ে আলোচনা করিতেন। আশুতোষ ঠাকুরের ভাবাবিষ্ট অবস্থা দেখিয়া বিশেষ আকৃষ্ট হইতেন। তিনি ধীরে ধীরে শ্রীরামকৃষ্ণের চরণে পরিপূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করেন।


●14>ঈশ্বর ঘোষাল — ডেপুটি। শ্রীশ্রীঠাকুর ছেলেবেলায় কামারপুকুরে তাঁহাকে দেখিয়াছিলেন। তাঁহার সাজ-পোশাকে ও ব্যক্তিত্বে সাধারণ লোকে ভীত হইত। অধরের সহিত কথাপ্রসঙ্গে ঠাকুর তাঁহার সম্পর্কে বলিয়াছিলেন।


●15>ঈশ্বর চক্রবর্তী — হুগলী জেলার ময়াল-ইছাপুর গ্রামের রাজচন্দ্র চক্রবর্তীর পুত্র ঈশ্বরচন্দ্র চক্রবর্তী অতি উন্নত তান্ত্রিক সাধক ছিলেন। ইঁহার পুত্র শশী শ্রীরামকৃষ্ণের ১৬ জন ত্যাগী সন্তানদের মধ্যে একজন। পুত্র শশী পরবর্তী কালে স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ নামে শ্রীরামকৃষ্ণ সংঘে পরিচিত। ঈশ্বরচন্দ্র পাইকপাড়ার রাজা ইন্দ্রনারায়ণ সিংহের সভাপণ্ডিত ছিলেন। তিনি বিভিন্ন শ্মশানে পঞ্চমুন্ডীর আসনে বসিয়া দীর্ঘকাল দর্শন লাভ করিয়াছিলেন। তাঁহার গৃহে শক্তিরূপী দেবীর নিত্য পূজার্চনা হইত। পরবর্তী কালে বেলুড় মঠে প্রথমবার দুর্গাপূজার সময় তিনি তন্ত্রধারক ছিলেন। মঠের সহিত তাঁহার আন্তরিক যোগ ছিল।


●16>ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০ - ১৮৯১) — মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে জন্ম। পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মাতা ভগবতী দেবী। অত্যন্ত দারিদ্রের মধ্যে তাঁহার বাল্যজীবন অতিবাহিত হয়। কিন্তু দরিদ্রতা তাঁহার বিদ্যর্জনের পক্ষে বাধাস্বরূপ হয় নাই। বাল্যকাল হইতেই তিনি অসাধারণ মেধাবী হিসাবে পরিগণিত হন। কাব্য, ব্যাকরণ, অলঙ্কার, বেদান্ত, সমৃতি ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে তাঁহার গভীর জ্ঞান ছিল। অসাধারণ পাণ্ডিত্যের জন্য সংস্কৃত বলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁহাকে ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধিতে ভূষিত করেন। ঈশ্বরচন্দ্রের কর্মজীবন বহুধাবিস্তৃত। ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলার নবজাগরণের ইতিহাসে তাঁহার অবদান অবিস্মরণীয়। পিতামাতার প্রতি ভক্তি, জনগণের প্রতি অসীম দয়া, মনুষ্যত্ববোধ, অজেয় পৌরুষ, অগাধ-পাণ্ডিত্য প্রভৃতি বহুবিধ গুণাবলীর জন্য বিদ্যাসাগর মহাশয় বাংলার ইতিহাসে বিশিষ্ট স্থানের অধিকারী। তাঁহাকে আধুনিক বাংলা গদ্যসাহিত্যের জনক আখ্যা দেওয়া হয়। সীতার বনবাস, কথামালা, বর্ণপরিচয় প্রভৃতি নানা সংস্কারমূলক কার্যে তাঁহার অবদান অনস্বীকার্য। সংস্কৃত কলেজের প্রধান অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন ছাড়াও শিক্ষাজগতের বিভিন্ন ধারার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। শিক্ষার শ্রীবৃদ্ধি কল্পে তিনি “মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশন” প্রতিষ্ঠা করেন। পরে উক্ত বিদ্যালয়কে তিনি কলেজে পরিণত করেন। ঠাকুরের ইচ্ছানুসারে ১৮৮২ খ্রীষ্টাব্দের ৫ই আগস্ট কথামৃত প্রণেতা শ্রীমহেন্দ্রনাথ গুপ্তের সহায়তা বিদ্যাসাগরের সহিত ঠাকুরের যোগাযোগ ঘটে। ঠাকুর স্বয়ং বিদ্যাসাগরের বাড়ি যাইয়া তাঁহার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। কথামৃতে এই সাক্ষাতের বিবরণ বিস্তৃতভাবে লিপিবদ্ধ আছে। এই প্রসঙ্গে বলা আবশ্যক যে বিদ্যাসাগর শ্রীরামকৃষ্ণকে শ্রদ্ধা করিতেন এবং ঠাকুরও বিদ্যাসাগরকে দয়ার সাগর হিসাবে জ্ঞান করিতেন। বিদ্যাসাগর প্রতিষ্ঠিত “মেট্রোপলিটান স্কুলের” বউবাজার শাখায় শ্রীনরেন্দ্রনাথ দত্ত (পরবর্তী কালে স্বামী বিবেকানন্দ) কিছুকাল প্রধান শিক্ষকের পদ অলঙ্কৃত করিয়াছিলেন।


●17>ঈশান কবিরাজ (ঈশানচন্দ্র মজুমদার) — শ্রীরামকৃষ্ণের অনুরাগীভক্ত। বরাহনগরে বাড়ি। শ্রী-মর বড়দিদির বিবাহ হয় এই বাড়িতে। মাস্টারমহাশয় এই বাড়ি হইতে দক্ষিণেশ্বরে যাইয়া ঠাকুরকে প্রথম দর্শন করেন। কবিরাজ মহাশয় ঠাকুরের পূর্বপরিচিত ছিলেন। তিনি কবিরাজীমতে ঠাকুরকে চিকিৎসা করিতেন। ঠাকুরের সহিত ঈশানচন্দ্রের হৃদ্যতা থাকায় ঠাকুর বরাহনগরে তাঁহার বাড়িতেও শুভাগমন করিয়াছিলেন।


●18>ঈশানচন্দ্র মুখোপাধ্যায় — শ্রীরামকৃষ্ণের বিশেষ কৃপাপ্রাপ্ত গৃহী ভক্ত। বর্তমান ১৯ নং কেশবচন্দ্র স্ট্রীটে তাঁহার বাড়ি ছিল। আদি নিবাস ২৪ পরগণা জেলার হরিনাভি গ্রাম। A. G. Bengal-এর সুপারিনটেনডেন্ট ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে ঈশানচন্দ্র পরম দয়ালু, দানবীর এবং ভক্ত হিসাবে সুপ্রসিদ্ধ। দক্ষিণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে নিয়মিত যাতায়াতের ফলে ঈশানচন্দ্র ঠাকুরের আশ্রিতরূপে পরিগণিত হন। ঠাকুর পরম ভক্তি-পরায়ণ ঈশানচন্দ্রের বাড়িতে কয়েকবার শুভাগমন করিয়া তাঁহার সেবা গ্রহণ করিয়াছিলেন। ঈশানচন্দ্রের শেষ জীবন ভাটপাড়াতে সাধন-ভজনে অতিবাহিত হয়। ১৮৯৮ খ্রীষ্টাব্দে ৭৩ বৎসর বয়সে তিনি ভাটপাড়াতেই শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ইঁহার পুত্রগণ শ্রীশচন্দ্র, সতীশচন্দ্র প্রভৃতি সকলেই কৃতী ছিলেন। শ্রীশচন্দ্র শ্রীমর সহপাঠী, বন্ধু ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্র ছিলেন। সতীশচন্দ্ সহপাঠী ও বন্ধু ছিলেন। পরিব্রাজক অবস্থায় স্বামীজী গাজিপুরে সতীশচন্দ্রের গৃহে কিছুকাল অবস্থান করিয়াছিলেন।


●19>উপেন — (উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়) (১৮৬৮ - ১৯১৯) — জন্ম কলিকতার আহিরীটোলায়। পিতা পূর্ণচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। উপেন্দ্রনাথ ‘সাপ্তাহিক বসুমতী’ এবং ‘দৈনিক বসুমতী’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা। তাঁহার প্রধান কৃতিত্ব ‘বসুমতী সাহিত্য মন্দির’ এর প্রতিষ্ঠা এবং সেই সংস্থার মাধ্যমে প্রসিদ্ধ গ্রন্থকারগণের গ্রন্থাবলীর সুলভ সংস্করণের প্রকাশনা। তিনি ‘সাহিত্য পত্রিকা’র সহিত যুক্ত ছিলেন। রাজভাষা, পাতঞ্জল দর্শন, কালিদাসের গ্রন্থাবলী প্রভৃতি পুস্তকসমূহের সম্পাদক। ১৮৮৪ খ্রীষ্টাব্দে অধর সেনের বাড়িতে ঠাকুরকে প্রথম দর্শন করেন। প্রথম জীবনে তিনি অত্যন্ত দরিদ্র ছিলেন, তবে পরবর্তী কালে তিনি প্রভূত সম্পত্তির অধিকারী হন। ঠাকুরের দেহত্যাগের পর তিনি নানাভাবে শ্রীরামকৃষ্ণ মঠের সন্ন্যাসীদের সেবা করিয়াছিলেন। কৃপাধন্য উপেন্দ্রনাথ জীবনের অধিকাংশ সময়ই শ্রীরামকৃষ্ণ ও তাঁর অনুরাগীদের সেবায় অতিবাহিত করেন।


●20>উপেন ডাক্তার — কলিকাতার জনৈক চিকিৎসক। ঠাকুরের চিকিৎসার জন্য তিনি ঠাকুরের কাছে আসিবার সুযোগ লাভ করিয়াছিলেন। কাশীপুরে একবার ঠাকুরের অসুখ বাড়াবাড়ি হওয়ার সংবাদ শোনামাত্রই ঠাকুরের পরমভক্ত নাট্যাচার্য গিরিশচন্দ্র ঘোষ সেদিন গভীর রাত্রে উপেন ডাক্তারকে সঙ্গে লইয়া ঠাকুরের কাছে উপস্থিত হন এবং উপেন ডাক্তার সেদিন ঠাকুরের সাময়িক চিকিৎসার ভার গ্রহণ করেন।


●21>উমানাথ গুপ্ত (১৫.১১.১৮৩৯ — ১.১২.১৯১৮) — চব্বিশ-পরগণার হালিশহরে জন্ম। তিনি সাংবাদিক ছিলেন। উমানাথ গুপ্ত কেশবচন্দ্র সেনের অনুগামী ব্রাহ্মভক্ত এবং তাঁর একজন বিশিষ্ট বন্ধুও ছিলেন। ১৮৮৩ সালের ২৮শে নভেম্বর কেশবচন্দ্র সেনের বাড়ি ‘কমল-কুটীর’-এ শ্রীরামকৃষ্ণের দর্শন লাভ করেন। অসুস্থ কেশবচন্দ্র সেনকে দেখিবার উদ্দেশ্যে ঠাকুর একদা ‘কমল-কুটীর’-এ আসেন। সেদিনও উমানাথ গুপ্ত সেখানে উপস্থিত ছিলেন।


●22>উলোর বামনদাস (শ্রীবামনদাস মুখোপাধ্যায়) — নিবাস নদীয়া জেলার বীরনগর বা উলোতে। উত্তর কলিকাতার কাশীপুরে তিনি মা-কালীর এক বৃহৎ মন্দির প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন। একদা দক্ষিণেশ্বরে জনৈক বিশ্বাসদের বাড়িতে অবস্থানকালে ঠাকুর হৃদয়কে সঙ্গেলইয়া তাঁহার সহিত দেখা করিতে যান। সেদিন ঠাকুরের কণ্ঠে শ্যামাসংগীত শুনিয়া বামনদাস মুগ্ধ হন এবং অপ্রত্যাশিতভাবে ঠাকুরের দর্শন লাভ হওয়াতে তিনি নিজেকে ধন্য মনে করেন।


●23>কাপ্তেন (বিশ্বনাথ উপাধ্যায়) — শ্রীরামকৃষ্ণের নেপালী গৃহীশিষ্য। নৈতিক শাস্ত্রজ্ঞ, সুপণ্ডিত কর্মযোগী ব্রাহ্মণ। পিতা ভারতীয় সেনাবাহিনীর সুবাদার এবং নৈষ্ঠিক শৈব। ধর্মপরায়ণ, সাহসী এবং দেশপ্রেমিক বলিয়া তাঁহার পূর্বপু রুষগণের খ্যাতি ছিল। তাঁহার স্ত্রী ‘গোপাল’-এর উপাসক এবং ভক্তিমতী মহিলা ছিলেন। বিশ্বনাথ শ্রীরামকৃষ্ণের সহিত মিলিত হইবার পূর্বেই স্বপ্নে তাঁহাকে দর্শন করিয়াছিলেন। সেইহেতু তাঁহাকে দর্শন করা মাত্রই তিনি চিনিতে পারেন। কর্মজীবনে বিশ্বনাথ কলিকাতার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে নেপাল রাজ সরকারের ভারপ্রাপ্ত কর্মচারী ছিলেন। পরবর্তী কালে কর্মকুশলতা এবং সততার জোরে তিনি অধিকতর উচ্চপদে উন্নীত হইয়াছিলেন। নেপাল সরকার তাঁহাকে ‘ক্যাপ্টেন’ উপাধিতে ভূষিত করেন। এই কারণে ঠাকুর সস্নেহে তাঁহাকে ‘কাপ্তেন’ বলিয়া উল্লেখ করিতেন এবগ তাঁহার একনিষ্ঠ ভক্তিমত্তার প্রশংসা করিতেন। ঠাকুরের সহিত বেদ-বেদান্ত, ভাগবত-গীতা প্রভৃতি বিষয়ে তাঁহার গূঢ় আলোচনা হইত। প্রায়ঃশই তিনি ঠাকুরকে স্বগৃহে নিমন্ত্রণ করিয়া খাওয়াইতেন। ঠাকুরের প্রতি তাঁহার গভীর শ্রদ্ধা এবং নিশ্চল বিশ্বাস ছিল। কিন্তু গোঁড়ামির জন্য তিনি কেশবচন্দ্র সেনের নিকট ঠাকুরের যাতায়াত পছন্দ করিতেন না। কর্ম এবং ধর্ম তাঁহার জীবনে সমান্তরাল ভাবে চলিয়াছিল।


●24>কালিদাস সরকার — ইনি জনৈক ব্রাহ্মভক্ত এবং কেশবচন্দ্র সেনের অনুগামী ছিলেন। ইনি ব্রাহ্মসমাজে ঠাকুরকে দর্শন করেন।


●25>কালী [কালীপ্রসাদ চন্দ্র] (২.১০.১৮৬৬ — ৮.৯.১৯৩৯) — কালীপ্রসাদ পরবর্তী কালে স্বামী অভেদানন্দ হিসাবে পরিচিত। শ্রীরামকৃষ্ণের ত্যাগী সন্ন্যাসীদের মধ্যে কালীপ্রসাদ অন্যতম। জন্ম উত্তর কলিকাতার নিমু গোস্বামী লেনে, মাতা নয়নতারা দেবী। পিতা রসিকলাল চন্দ্র “ওরিয়েন্টাল সেমিনারী” স্কুলের ইংরাজীর শিক্ষক ছিলেন। কালীপ্রসাদ রচিত কয়েকটি গ্রন্থ: আমার জীবনকথা, কাশ্মীর ও তিব্বতে, পুনর্জন্মবাদ, বেদান্তবাণী, ব্রহ্মবিজ্ঞান, মরণের পারে, যোগশিক্ষা, সমাজ ও ধর্ম, হিন্দু ধর্মে নারীর স্থান, শ্রীরামকৃষ্ণ স্তোত্র রত্নাকর ইত্যাদি। কালীপ্রসাদ মেধাবী ছাত্র ছিলেন। বাল্যকাল হইতেই ধর্মের প্রতি বিশেষ অনুরাগ থাকাতে এন্ট্রান্স ক্লাশ অবধি পড়াশোনা করিয়া আধ্যাত্মিক প্রেরণায় লেখাপড়া ত্যাগ করেন। যৌবনের প্রারম্ভেই হিন্দু শাস্ত্রাদি অধ্যয়ন করেন এবং প্রকৃত গুরুর সন্ধান করিতে থাকেন। ১৮৮৪ সালের মাঝামাঝি এক বন্ধুর পরামর্শে তিনি দক্ষিণেশ্বরে রামকৃষ্ণ সকাশে যান। ইহার পর কালীপ্রসাদ বহুবার রামকৃষ্ণ সংস্পর্শে আসেন। নিজ অভিপ্রায় অনুযায়ী যোগচর্চা, ধ্যানধারণা প্রভৃতিতে আত্মনিয়োগ করেন এবং ঠাকুরের শেষদিন পর্যন্ত সেবা করেন। ঠাকুরের দেহত্যাগের পর যে সকল ব্যক্তি স্বামী বিবেকানন্দের নেতৃত্বে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন, তিনি তাঁহাদের মধ্যে একজন। তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠা এবং কঠোরতার সহিত ধ্যান এবং আধ্যাত্মিক পঠন-পাঠনে নিমগ্ন থাকিতেন। গুরুভ্রাতাগণের নিকট তিনি ছিলেন ‘কালী তপস্বী’। কালীপ্রসাদ ভারতের সমস্ত তীর্থক্ষেত্র পদব্রজে পরিদর্শন করেন। ১৮৯৬ খ্রীষ্টাব্দে তিনি ইংল্যাণ্ডের Christo-Theosophical Society-তে ধর্মবিষয়ে বক্তৃতা দেন। ১৮৯৭ খ্রীস্টাব্দে তিনি আমেরিকায় ‘বেদান্ত সোসাইটি’ স্থাপন করেন এবং ১৯২১ সাল পর্যন্ত সেখানে বেদান্ত প্রচার করিতে থাকেন। এইসময় তিনি পাশ্চাত্যের বহুদেশে যান এবং বহু খ্যাতিমান লোকের সহিত মতবিনিময় করেন। প্রেততত্ত্ববিদ হিসাবেও তিনি বিদেশে খ্যাতিলাভ করেন। ১৯২১ খ্রীষ্টাব্দে কলিকাতায় ফিরিয়া তিনি ‘রামকৃষ্ণ বেদান্ত সোসাইটি’ স্থাপন করেন। এই ‘সোসাইটি’র মাধ্যমে এবং তাঁহার প্রকাশিত “বিশ্ববাণী” পত্রিকার মাধ্যমে শ্রীরামকৃষ্ণের বাণী ও ভাবদারাকে দিকে দিকে প্রচার করেন । ১৯২৫ খ্রীষ্টাব্দে তিনি দার্জিলিঙ-এ ‘রামকৃষ্ণ বেদান্ত আশ্রম’ প্রতিষ্ঠা করেন । ১৯৩৭ সালে ঠাকুরের জন্মশতবার্শিকী উপলক্ষে কলিকাতা টাউন হলে আয়োজিত ধর্মসভায় তিনি সভাপতিত্ব করেন। ১৯৩৯ খ্রীষ্টাব্দে ৭৩ বৎসর বয়সে কলিকাতার বেদান্ত আশ্রমে তাঁর দেহান্ত হয়।


●26>কালীকিঙ্কর — ইনি একজন তান্ত্রিক সাধক ছিলেন। অচলানন্দের প্রসঙ্গে (৯-৯-৮৩) শ্রীশ্রীঠাকুর ইঁহাদের সাধনার কথা উল্লেখ করিয়াছেন।


●27>কালীকৃষ্ণ — ভবনাথের বন্ধু। দক্ষিণেশ্বরে শ্রীশ্রীঠাকুরের জন্মমহোৎসব দিবসে গান গাহিয়াছিলেন (১১-৩-৮৩)।


●28>কালীকৃষ্ণ ভট্টাচার্য — কথামৃত-প্রণেতা মাস্টারমশাই — মহেন্দ্রনাথ গুপ্তের বিশেষ বন্ধু। বিদ্যাসাগর কলেজের সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যের প্রধান অধ্যাপক। ঠাকুরের সহিত প্রথম সাক্ষাৎ হয় ১৮৮২-তে দক্ষিণেশ্বরে। মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত তাঁহাকে শুঁড়ির দো কান দেখাইবার অছিলায় দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুরের কাছে হাজির করেন এবং ঠাকুরকে বন্ধুটির বিষয়ে উপরোক্ত ঘটনা জানান। ঠাকুর সহাস্যে কালীকৃষ্ণকে ভজনানন্দ ও ব্রহ্মানন্দের সুরার বিষয়ে কিছু উপদেশ দেন। কালীকৃষ্ণের সেইদিন ঠাকুরের মুখে একটি গান শুনিবার সৌভাগ্য হইয়াছিল।


●29>কালীপদ ঘোষ (১৮৪৯ - ১৯০৫) — ‘দানা-কালী’ নামে শ্রীরামকৃষ্ণ সঙ্ঘে পরিচিত । ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের বিশেষ কৃপাপ্রাপ্ত গৃহীশিষ্য। উত্তর কলিকাতার শ্যামপুকুরে প্রসিদ্ধ ঘোষ কোম্পানীতে চাকুরী করিতেন। প্রথম দর্শন ১৮৮৪ খ্রীষ্টাব্দে দক্ষিণেশ্বরে। ন্যাট্যাচার্য গিরিশচ ন্দ্র ঘোষের সহিত তাঁহার খুব হৃদ্যতা ছিল। ভক্তগণ ইঁহাদের দুইজনকে একত্রে জগাই মাধাই বলিতেন। তিনি বহু গান লিখিয়াছিলেন যাহা “রামকৃষ্ণ সঙ্গীত” নামে প্রকাশিত হয়। স্বামী বিবেকানন্দ তাঁহাকে ‘দানা’ বলিয়া সম্বোধন করিয়াছিলেন। ভাগ্যবান কালীপদর জিহ্বায় ঠাকুর “কালী” নাম লিখিয়া দিয়াছিলেন এবং ঠাকুর তঁহাকে বিশেষ কৃপাদান করেন। সেইদিনই অযাচিতভাবে কালীপদর শ্যামপুকুরের বাড়িতে ঠাকুর প্রথম শুভাগমন করিয়া পুনরায় দক্ষিণেশ্বরে ফিরিয়া আসেন। কালীপদর বাড়িতে ঠাকুর আরও কয়েকবার শুভাগমন করেন এবং কাশীপুরে “কল্পতরু” হওয়ার দিনেও কালীপদর বক্ষঃস্পর্শ করিয়া তাঁহাকে আশীর্বাদ করেন। সুগায়ক, বেহালা ও বংশীবাদক কালীপদর বাঁশী শুনিয়া একদা ঠাকুর সমাধিস্থ হইয়াছিলেন। পরবর্তী কালে বোম্বাইতে অবস্থানকালে শ্রীরামকৃষ্ণের ত্যাগী সন্তানগণ তাঁহার গৃহে অতিথি হইতেন । ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের একনিষ্ঠ ভক্ত কালীপদ ঘোষ কলিকাতাতেই দেহত্যাগ করেন।


●30>‘কিরণ্ময়ী’ লেখক — রাজকৃষ্ণ রায়, নরেন্দ্রনাথের বন্ধু। শ্যামপুকুরে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের সহিত রাধাকৃষ্ণ বিষয়ে আলোচনা করেন।


●31>কিশোরী (১৮৫৯ - ১৯৩১) — [কিশোরীমোহন গুপ্ত] শ্রীম’র ছোট ভাই, কলিকাতায় জন্ম। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের গৃহীভক্ত। ঠাকুরের সহিত প্রথম সাক্ষাৎ দক্ষিণেশ্বরে (১৮৮২-৮৩)। বাসস্থান ১৩, গুরুপ্রসাদ চৌধুরী লেন, কলিকাতা-৬। ঠাকুরের প্রতি বিশেষ অনুরাগবশতঃ নিয়মিত দক্ষিণেশ্বরে যাতায়াত করিতেন এবং সুযোগ পাইলেই ঠাকুরের সেবা করিতেন। সুগায়ক এবং সুকণ্ঠের অধিকারী। ঠাকুরের সম্মুখে গান করিতেন। ঠাকুরও তাঁহার গান পছন্দ করিতেন। ব্রাহ্মসমাজের সহিত তাঁহার ঘনিষ্ঠতা ছিল। কলিকাতাস্থ দর্জিপাড়ার ডাক্তার বিশ্বনাথ গুপ্তের কন্যা রাধারাণীকে তিনি বিবাহ করিয়াছিলেন। কিশোরী আজীবন ঠাকুরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। শেষ বয়সে তিনি একাকী কলিকাতার বাড়িতে বাস করিতেন এবং তপস্যায় নিযুক্ত থাকিতেন। সেইখানেই তিনি দেহত্যাগ করেন।


●32>কুইন [মহারানী ভিক্টোরিয়া] (১৮১৯ - ১৯০১) — ১৮১৯ খ্রীষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা এড্‌ওয়ার্ড ইংল্যাণ্ডের রাজা তৃতীয় জর্জের চতুর্থ পুত্র ডিউক অব কেন্ট নামে পরিচিত এবং মাতা স্যাকস্‌ কোবার্গের ডিউক তনয়া মেরিয়া লুইসা। ১৮৩৭ খ্রীষ্টাব্দে ২৮শে জুন “গ্রেট ব্রিটেন ও আয়ার্ল্যাণ্ডের রানী” উপাধি লইয়া তিনি ইংল্যাণ্ডের সিংহাসনে আরোহন করেন। তাঁহার রাজত্বকালে দেশে শান্তি ও শৃঙ্খলা স্থাপিত হইয়া গ্রেট ব্রিটেন ক্ষমতার সর্ব্বোচ্চ শিখরে উন্নীত হয়। এই সময় ইংলণ্ডে শিল্পবিপ্লব সম্পন্ন হয় এবং সাম্রাজ্যের প্রসার ঘটে। শিল্প, বিজ্ঞান ও সাহিত্য প্রভূত উন্নতি হওয়ায় ১৮৮০-র দশক ইতিহাস ও সাহিত্যে ‘ভিক্টোরিয়ান যুগ’ নামে অভিহিত হয়। ১৮৫৮ খ্রীষ্টাব্দে রানী ভিক্টোরিয়ার ঘোষণানুসারে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির নিকট হইতে ভারতে শাসনভার ইংলণ্ডেশ্বীর হস্তে হস্তান্তরিত হয়। ১৮৮৭ খ্রীষ্টাব্দে ভিক্টোরিয়া ‘ভারতসম্রাজ্ঞী’ উপাধিতে ভূষিত হন। কেশবচন্দ্র সেন মহারানীর সহিত সাক্ষাৎ করিয়া তাঁহার সমাদর লাভ করেন — শ্রীশ্রীঠাকুর কথামৃতে ইহা উল্লেখ করিয়াছেন ।


●33>কুক সাহেব [রেভারেণ্ড জোসেফ কোক] (১৮৩৮-১৯০১) — আমেরিকার নিউ ইংল্যাণ্ডের প্রোটেস্ট্যান্ট সম্প্রদায়ের ধর্ম প্রচারক। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে আমেরিকায় যে উদারপন্থী ধর্মমত প্রচলিত ছিল তিনি সেই ধর্মমতের প্রচারক। তিনি ইয়েল, হারভার্ড এবং জার্মানীতে শিক্ষাপ্রাপ্ত হন। কর্মসূত্রে অধ্যাপক ছিলেন। বাগ্মী হিসাবেও পরিচিত। ‘ওরিয়েন্ট’ নামক পুস্তক প্রণেতা। তিনি ‘ট্রিমন্ট টেম্পল’ (Tremont Temple) এবং ‘ওল্ড সাউথ মিটিং হাউস’ (Old South Meeting House) এ দীর্ঘ পঁচিশ বৎসর কাল যে বক্তৃতা দেন তা পরবর্তী কালে Monday Lectures নামে ১১ খণ্ডে প্রকাশিত হয়। ভারতবর্ষ ভ্রমণের সময় ব্রাহ্মনেতা কেশবচন্দ্র সেনের সহিত পরিচয় ঘটে। ১৮৯৩ খ্রীষ্টাব্দে বিবেকানন্দ আমেরিকা ভ্রমণকালে যে সমস্ত ব্যক্তিদের সহিত পরিচিত হইয়াছিলেন জোসেফ কুক তাঁহাদের মধ্যে অন্যতম। একমাত্র জোসেফ কুকুই স্বামীজীর গুরু শ্রীরামকৃষ্ণদেবের দর্শন লাভ করেন। কিন্তু তঁহারা পরস্পর কেহই কাহাকেও একথা বলেন নাই। ১৮৮২ খ্রীষ্টাব্দে জোসেফ কুক প্রাচ্য পরিভ্রমণে আসেন। ভারতবর্ষ ভ্রমণের সময় ব্রাহ্মনেতা কেশবচন্দ্র সেনের সহিত পরিচয় হয় এবং সেই পরিচয় ক্রমশঃ হৃদ্যতায় পরিণত হয়। কেশবচন্দ্র স্টীমারে করিয়া দক্ষিণেশ্বরে ১৮৮২ খ্রীষ্টাব্দে ২৩শে ফেব্রুয়ারি ঠাকুরকে দর্শন করিতে আসার সময় রেভারেণ্ড কুক এবং আমেরিকার পাদ্রী মিস পিগটকে সঙ্গে লিয়া আসেন। সেদিন ঠাকুরকে স্টীমারে লিয়া গঙ্গাবক্ষে ভ্রমণ করার সময় কুকসাহেবও উপস্থিত ছিলেন। কুকসাহেব সেখানে ঠাকুরের ধর্মবিষয়ক প্রসঙ্গের এবং তাঁহার সমাধিস্থ হওয়ার স্বর্গীয় দৃশ্যের সাক্ষী ছিলেন। খ্রীষ্টমতাবলম্বী যুবক জোসেফ কুকের কাছে এই মহাপুরুষের সমাধি দর্শন অভাবনীয় ছিল। রেভারেণ্ড কুক ইহাতে যারপরনাই অভিভূত ও বিস্মিত হইয়াছিলেন। তাঁহার এই অপূর্ব অনুভূতির কথা ১৮৮৬ খ্রীষ্টাব্দে প্রকাশিত ‘দি ইণ্ডিয়ান মিরর’ পত্রিকাতে লিপিবদ্ধ আছে। শিকাগো ধর্মমহাসভায় কুকসাহেবের বক্তৃতার মধ্যে প্রসঙ্গক্রমে লেডি ম্যাকবেথের জঘন্য পাপ ক্ষালন একমাত্র খ্রীষ্ট ধর্মেই সম্ভব — এই কথার উত্তরস্বরূপ স্বামিজীর বিখ্যাত উক্তি: — “Ye are the children of God .... Sinners! It is a sin to call a man so.”


●34>কুঞ্জবাবু — ইনি একজন সৌখীন অভিনেতা ছিলেন। ‘নববৃন্দাবন’ নাটকে ঠাকুর ইঁহার পাপপুরুষের অভিনয় দেখিয়াছিলেন এবং পাপের অভিনয় করা ভাল নয় — ইহাও মন্তব্য করিয়াছিলেন।


●35>কুমার গজেন্দ্রনারায়ণ (কুমার গজেন্দ্রনারায়ণ ভূপ) — ইনি কুচবিহার-রাজপরিবারের সন্তান। কেশবচন্দ্র সেনের জামাতা কুমার নৃপেন্দ্রনারায়ণ ভূপের আত্মীয়। পরবর্তী কালে কেশবচন্দ্র সেনের দ্বিতিয়া কন্যা সাবিত্রী দেবীর সহিত বিবাহ হয়। ১১৮১ খ্রীষ্টাব্দে নৃপেন্দ্রনারায়ণের জাহাজে করিয়া তিনি কেশবচন্দ্র এবং তঁহার সঙ্গীদের সহিত দক্ষিণেশ্বরে যান এবং ঠাকুরের পূতসঙ্গ লাভ করেন। তাঁহার সাহেবী পোষাক শ্রীরামকৃষ্ণের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছিল।


●36>কুমার সিং (কুঁয়ার সিং) — শ্রীরামকৃষ্ণের বিশেষ অনুরাগী নানকপন্থী শিখভক্ত। দক্ষিণেশ্বর-কালীবাড়ির উত্তর পাশে সরকারী বারুদখানায় শিখসৈন্যগণের হাবিলদার ছিলেন। কুঁয়ার সিং শ্রীরামকৃষ্ণকে ‘গুরু নানাক’ জ্ঞানে ভক্তি করিতেন এবং প্রায়ই ঠাকুরের পূতসঙ্গ লাভ করিতে আসিতেন। ঠাকুরও তাঁহাকে বিশেষ স্নেহ করিতেন। কুঁয়ার সিং সাধুভোজন করাইবার সময় ঠাকুরকে নিমন্ত্রণ করিতেন, ঠাকুরও সানন্দে তাহা স্বীকার করিতেন।


●37>কৃষ্ণকিশোর (কৃষ্ণকিশোর ভট্টাচার্য) — ইনি আড়িয়াদেহ নিবাসী সদাচারনিষ্ঠ রামভক্ত সাধক ও শ্রীশ্রীঠাকুরের গৃহীভক্ত ছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণ তঁহার বাড়িতে অধ্যাত্মনারায়ণ পাঠ শুনিতে যাইতেন। তাঁহার “রামনাম ও শিবনামে” গভীর বিশ্বাস ছিল। বৃদ্ধবয়সে পুত্রশোকে কাতর হইলেও তাঁহার ভগবৎ বিশ্বাস অটুট ছিল ।


●38>কৃষ্ণদাস পাল (১৮৩৮ - ১৮৮৪) — ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ পত্রিকার সম্পাদক, খ্যাতনামা বাগ্মী এবং রাজনীতিবিদ। জন্ম কলিকতার কাঁসারীপাড়ায়। পিতা ঈশ্বরচন্দ্র পাল। কৃষ্ণদাস দক্ষিণেশ্বর-কালীবাড়িতে ঠাকুরকে দর্শন করিয়াছিলেন।


●39>কৃষ্ণধন — ইনি একজন রসিক ব্রাহ্মণ ছিলেন। ইনি বলরাম-মন্দিরে ঠাকুরের সংস্পর্শে আসিলে ঠাকুর ইঁহাকে রসিকতা ছাড়িয়া ঈশ্বরের পথে অগ্রসর হইতে উপদেশ দেন।


●40>কৃষ্ণময়ী (কৃষ্ণময়ী বসু) — বলরাম বসুর বালিকা কন্যা। সাধনার সময়ে পাপপুরুষ শ্রীশ্রীঠাকুরকে নানাপ্রকার প্রলোভন দেখাইয়াছিল। শ্রীশ্রীঠাকুর মাকে ডাকিতে থাকায় মা ভুবনমোহিনীরূপে দেখা দেন। তাঁহার রূপ কৃষ্ণময়ীর রূপের মতো বলিয়া ঠাকুর উল্লখ করিয়াছেন। কৃষ্ণময়ী পিতৃগৃহে বহুবার শ্রীরামকৃষ্ণের শুভাগমন হওয়াতে কৃষ্ণময়ীর ঠাকুরের সংস্পর্শে আসার সৌভাগ্য হয়। ঠাকুর কৃষ্ণময়ীকে বিশেষ স্নেহ করিতেন।


●41>কেদার (কেদারনাথ চট্টোপাধ্যায়) — ঠাকুরের বিশেষ কৃপাপ্রাপ্ত গৃহীশিষ্য। হালিশহর বাসী কেদারনাথের আদি নিবাস ঢাকায়। তিনি ঢাকাতে সরকারী অফিসে অ্যাকাউটেন্টের কাজ করিতেন। ১৮৮০ খ্রীষ্টাব্দে ঠাকুরের দর্শন লাভ করেন। কেদারনাথ প্রথমজীবনে ব্রাহ্মসমাজ, কর্তাভজা, নবসরিক প্রভৃতি বিভিন্ন সম্প্রদায়ে যোগদান করেন এবং অবশেষে দক্ষিণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণের শরণাগত হন। ঢাকায় থাকাকালে শ্রীশ্রীবিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর সহিত শ্রীরামকৃষ্ণ বিষয়ে তঁহার আলোচনা হইত। কর্মস্থল ঢাকা হইতে কলিকাতায় আসিলেই তিনি দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুরের নিকট যাইতেন। ঠাকুর নরেন্দ্রনাথের সহিত কেদারনাথের নানাবিষয়ে তর্ক বাধাইয়া বেশ আনন্দ উপভোগ করিতেন।


●42>কেশব কীর্তনীয়া — ঈশান মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের সহিত ইঁহার প্রথম সাক্ষাৎ হয়। এইদিন শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে কীর্তন শুনাইয়াছিলেন।


●43>কেশবচন্দ্র সেন (১৮৩৮ - ১৮৮৪) — কলিকাতার কলুটোলায় সেনবংশে জন্ম। পিতা প্যারীমোহন সেন। মাতা সারদাসুন্দরী দেবী। ১৮৫৭ খ্রীষ্টাব্দে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের নিকট দীক্ষাগ্রহণ, পরবর্তীকালে ব্রাহ্মসমাজের নেতা এবং নববিধান ব্রাহ্মসমাজের প্রতিষ্ঠাতা। কেশবচন্দ্র সেন প্রণিত গ্রন্থ — সত্যবিশ্বাস, জীবনবেদ, সাধু-সমাগম, দৈনিক প্রার্থনা, মাঘোৎসব, ইংলণ্ডে কেশবচন্দ্র সেন, নবসংহিতা ইত্যাদি। ‘পরমহংসের উক্তি’ নামক গ্রন্থের সংকলক। শ্রীরামকৃষ্ণের বিশেষ স্নেহধন্য। কেশব সম্পর্কে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের বিখ্যাত উক্তি: একমাত্র কেশবেরই ফাতনা ডুবিয়াছে। ঠাকুরের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ ১৮৭৫ খ্রীষ্টাব্দে জয়গোপাল সেনের বাগান বাড়িতে। এই সময় হইতে উভয়ের মধ্যে গভীর অন্তরঙ্গতার সূচনা। ১৮৭৫ খ্রীষ্টাব্দে ‘ইণ্ডিয়ান মিরার’ পত্রিকাতে তিনি প্রথম ঠাকুরের কথা প্রকাশ করেন। ইহাই জনসাধারণের নিকট শ্রীরামকৃষ্ণদেব সম্বন্ধে প্রথম প্রচার। কেশবের “কমল-কুটীর” নামক বাটীতে (বর্তমানে ভিক্টোরিয়া ইন্‌স্‌টিটিউশন) ঠাকুর কয়েকবার শুভাগমন করিয়াছিলেন এবং এইখানেই শ্রীরামকৃষ্ণের প্রথম ফোটো তোলা হয়। অত্যধিক পরিশ্রমে তিনি ভগ্নস্বাস্থ্য হন। তাঁহার অসুস্থতার সংবাদ পাইয়া ঠাকুর তাঁহার বাড়িতে গিয়াছিলেন। কেশবচন্দ্রের মৃত্যুসংবাদ শুনিয়া ঠাকুর মর্মাহত হইয়াছিলেন।


●44>কেশব সেনের মা [শ্রীমতি সারদাসুন্দরী দেবী (সেন)] — ১৮০৯ সালে গরিফায় জন্ম। বাসস্থান কলিকাতার কলুটোলায়, ১৮৮৩ সালে সারকুলার রোডে অবস্থিত “কমল-কুটীর”-এ (বর্তমানে ভিক্টোরিয়া ইন্‌স্টিটিউশন) ঠাকুরের দর্শন লাভ করেন। পরবর্তী কালে তিনি দক্ষিণেশ্বরে কয়েকবার ঠাকুরকে দর্শন করিয়াছিলেন। কেশবের মৃত্যুর শোকাতুরা সারদাসুন্দরীকে ঠাকুর নানা উপদেশ দানে এবং সঙ্গীতাদিতে সান্ত্বনা দিতেন। সারদাসুন্দরী দেবী ঠাকুরকে অতিশয় ভক্তি করিতেন এবং ঠাকুরও তাঁর ভক্তির প্রশংসা করিতেন।


●45>কোন্নগরের গায়ক — হুগলী জেলার কোন্নগর নিবাসী জনৈক উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের গায়ক। দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুরকে নানাপ্রকার কালোয়াতি গান শুনাইয়া মুগ্ধ করিয়াছিলেন।


●46>ক্ষীরোদ (ক্ষীরোদচন্দ্র মিত্র) — শ্রীরামকৃষ্ণের বালক ভক্ত। কথামৃত প্রণেতা মহেন্দ্রনাথ গুপ্তের ছাত্র। ঠাকুরের ত্যাগী সন্তান স্বামী সুবোধানন্দের সহপাঠী। ক্ষীরোদ সম্পর্কে ঠাকুর খুব উচ্চ ধারণা পোষণ করিতেন এবং তাঁহাকে অত্যন্ত স্নেহ করিতেন। ক্ষীরোদের প্রতি যত্ন নেওয়ার জন্য তিনি মাস্টারমশাইকে নির্দেশও দিতেন। ক্ষীরোদ বরাবরই ঠাকুরের বিশেষ অনুরাগী ভক্ত ছিলেন। অসুস্থ অবস্থায় ঠাকুর যখন কাশীপুরে অবস্থান করেন সেই সময়ও ক্ষীরোদ ঠাকুরের কাছে নিয়মিত যাতায়াত করিতেন।


●47>ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায় (১৭৭৫ - ১৮৪৩) — ইনি শ্রীযুক্ত মাণিকরাম চট্টোপাধ্যায়ের জ্যেষ্ঠ পুত্র; এবং শ্রীরামকৃষ্ণদেবের পিতা। বাসস্থান দেরে গ্রাম। ক্ষুদিরামের স্ত্রী চন্দ্রমণি দেবী। ক্ষুদিরাম অতিশয় ধর্মপরায়ণ, নির্ভীক সত্যপ্রিয় ছিলেন। শ্রীযুক্ত ক্ষুদিরাম বয়ঃপ্রাপ্তির সহিত অর্থকারী কোনরূপ বিদ্যায় পারদর্শিতা লাভ করিয়াছিলেন কিনা জানা যায় না। কিন্তু সত্যনিষ্ঠা, সন্তোষ, ক্ষমা, ত্যাগ প্রভৃতি যে গুণসমূহ সদ্‌ব্রাহ্মণের স্বভাবসিদ্ধ হওয়া কর্তব্য বলিয়া কথিত আছে, তিনি ওই সকল গুণের অধিকারী ছিলেন। শ্রীরামচন্দ্রের প্রতি ভক্তি তাঁহাতে বিশেষ প্রকাশ ছিল এবং তিনি নিত্যকৃত্য সন্ধ্যাবন্দনাদি সমাপন করিয়া প্রতিদিন পুষ্পচয়নপূর্বক রঘুবীরের পূজান্তে জলগ্রহণ করিতেন। নিষ্ঠা ও সদাচারের জন্য গ্রামবাসীরা তাঁহাকে বিশেষ ভক্তি ও সম্মান করিত। কথিত আছে যে, সত্যনিষ্ঠার জন্য প্রজাপীড়ক জমিদার ক্ষুদিরামকে সর্বস্বান্ত করিয়া স্বগ্রাম হইতে বিতাড়িত করেন। সত্যরক্ষার জন্য ক্ষতি স্বীকার করিয়াও এই অত্যাচার অবিচার ক্ষুদিরাম স্বীকার করেন। শ্রীশ্রীঠাকুরের জন্মের পূর্বে ১২৮১ সালে, গয়াক্ষেত্রে পিতৃপুরুষদের পিণ্ডদানের পরে ক্ষুদিরাম নবদূর্বাদল শ্যাম জ্যোতির্ময়তনু এক পুরুষকে স্বপ্নে দর্শন করেন এবং পুত্ররূপে ক্ষুদিরামের গৃহে তাঁহার জন্মগ্রহণপূর্বক তাঁহার সেবা গ্রহণ করার কথা জানিতে পারেন। ক্ষুদিরামের জীবনের বহু ঘটনায় তাঁহার গভীর ধর্মবিশ্বাস ও ভগবৎ পরিচয় পাওয়া যায়। একবার অভীষ্টদেব শ্রীরামচন্দ্ররূপে তাঁহাকে দেখা দেন এবং তাঁহার সেবাগ্রহণের অভিলাষ জানান। স্বপ্নের নির্দেশ অনুযায়ী ক্ষুদিরাম ‘রঘুবীর’ শালগ্রামশিলা লাভ করেন এবং গৃহদেবতারূপে প্রতিষ্ঠাপূর্বক নিত্যপূজা করিতে লাগিলেন। ক্রমশঃ ক্ষুদিরামের হৃদয়ে শান্তি, সন্তোষ ও ঈশ্বর নির্ভরতা নিরন্তর প্রবাহিত হইতে থাকে এবং তাঁহার সৌম্য শান্ত মুখদর্শনে গ্রামবাসীরা ঋষির ন্যায় তাঁহাকে ভক্তি শ্রদ্ধা করিতে থাকেন। তাঁহার দেবভক্তি এত গভীর ছিল যে একবার তিনি বহুদূর পথ অতিক্রম করার পর অসময়ে নূতন বিল্বপত্র দর্শনে গন্তব্যস্থলে যাওয়া স্থগিত রাখিয়া গৃহে প্রত্যাবর্তন করেন এবং বিল্বপত্র দিয়া শিবপূজা করিয়া পরম তৃপ্তি লাভ করেন। বালক গদাধর যখন সাতবৎসরের তখন বিজয়া দশমীর দিন ক্ষুদিরাম দেহত্যাগ করেন। পরিণত বয়সেও ঠাকুর ভক্তদের নিকট মাঝে মাঝে পিতা ক্ষুদিরামের ধর্মনিষ্ঠার কথা স্ম রণ করিতেন।


●48>খড়দহের নিত্যানন্দবংশীয় গোস্বামী — স্টার থিয়েটারে চৈতন্যলীলা দর্শনকালে তিনি ঠাকুরের সঙ্গে দেখা করিয়াছিলেন। ঠাকুর তঁহার সহিত সস্নেহ ব্যবহার করিয়াছিলেন। ইনি খুব বড় পণ্ডিত এবং ইঁহার পিতাও বড় ভক্ত ছিলেন। পিতা শ্যামসুন্দরের প্রসাদ দিয়া ঠাকুরের সেবা করিয়াছিলেন।


●49>খেলাৎচন্দ্র ঘোষ (রামখেলাৎ ঘোষ) — জন্ম কলিকাতার পাথুরিয়াঘাটায়। বিশিষ্ট দানশীল জমিদার। দীর্ঘদিন কলিকতার অবৈতনিক বিচারক, জাস্টিস অফ দি পিস এবং সনাতন ধর্মরক্ষিণী সভার বিশিষ্ট সদস্য ছিলেন। কলিকাতার ধর্মতলা অঞ্চলে তাঁর নামে একটি উচ্চ ইংরাজী বিদ্যালয় আছে। খেলাৎ ঘোষের সম্বন্ধীর আমন্ত্রণে ১৮৮৩ খ্রীষ্টাব্দের ২১শে জুলাই ঠাকুর কয়েকজন ভক্তসহ খেলাৎ ঘোষের বাড়িতে পদার্পণ করেন এবং ভগবৎ প্রসঙ্গ করেন।


●50>গঙ্গাধর [গঙ্গাধর গঙ্গোপাধ্যায়] (৩০।৯।১৮৬৪ — ৭।২।১৯৩৭) — গঙ্গাধরের জন্ম কলিকতার আহিরীটোলায়। পিতা শ্রীমন্ত গঙ্গোপাধ্যায়। গঙ্গাধর পরবর্তী-জীবনে স্বামী অখণ্ডানন্দ নামে শ্রীরামকৃষ্ণ সঙ্ঘে সুপরিচিত। শ্রীরামকৃষ্ণের ত্যাগীশিষ্যদের অনত্যম। সম্ভবত ১৮৭৭ খ্রী: বাগবাজারে দীননাথ বসুর গৃহে তিনি প্রথম শ্রীরামকৃষ্ণকে দর্শন করেন । সঙ্গে বাল্যবন্ধু হরিনাথ ছিলেন। এই হরিনাথ পরবর্তী কালে শ্রীরামকৃষ্ণ সঙ্ঘে স্বামী তুরীয়ানন্দ নামে রিচিত। ইহার পরে ১৮৮২ অথবা ১৮৮৪ খ্রীষ্টাব্দে দক্ষিণেশ্বরে তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের সংস্পর্শে আসেন। স্বামী অখণ্ডানন্দের রচিত গ্রন্থের মধ্যে ‘তিব্বতের পথে হিমালয়ে’ এবং ‘স্মৃতিকথা’ উল্লেখযোগ্য। তাঁহার লেখা সজীব, সতেজ ও সাবলীল। ১৯২৫ সালে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের সহ-অধ্যক্ষ এবং ১৯৩৪ সালে অধ্যক্ষ রূপে গুরু দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত এই পদে আসীন ছিলেন।


●51>গঙ্গাপ্রসাদ (গঙ্গাপ্রসাদ সেন) (১২৩১-১৩০২ বঙ্গাব্দ) — ঢাকা জেলার উত্তরপাড় কোমরপুকুর গ্রামে গঙ্গাপ্রসাদ সেনের জন্ম। পিতার নাম নীলাম্বর সেন। পিতার নিকট আয়ুর্বেদ শাস্ত্র অধ্যয়ন করিয়া ১২৪৯ বঙ্গাব্দে কলিকাতার কুমারটুলীতে চিকিৎসা আরম্ভ করেন। তৎকালীন ভারতের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিগণের মধ্যে রামকৃষ্ণদেবও তাঁহার চিকিৎসাধীনে ছিলেন। ইনি প্রায় পঞ্চাস বৎসরের উপর আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা করিয়া বাংলাদেশে কবিরাজী চিকিৎসার ধারা প্রচলন করেন । ১৮৫৮ খ্রীষ্টাব্দে দক্ষিণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণকে তিনি প্রথম দেখিতে আসেন। দক্ষিণেশ্বরে সাধনকালের প্রথম অবস্থায় রানীরাসমণির জামাতা মথুরবাবুর আহ্বানে ইনি ঠাকুরের চিকিৎসার ভার গ্রহণ করেন। চিকিৎসাশাস্ত্রের আয়ত্তের বাহিরে ঠাকুরের অলৌকিক লক্ষণগুলি নিরাময় করিতে ব্যর্থ হইয়া ভ্রাতা দুর্গাপ্রসাদের মত অনুযায়ী এই ব্যাধিকে ‘যোগজ ব্যাধি’ বলিয়া অভিহিত করেন। অন্য সময়ে গঙ্গাপ্রসাদ ঠাকুরের রক্ত আমাশয় রোগের চিকিৎসা করিয়াছিলেন এবং গঙ্গাপ্রসাদের বাড়িতেও ঠাকুরের শুভাগমন হইয়াছিল। পরবর্তীকালে, ঠাকুর যখন কঠিন কণ্ঠরোগে পীড়িত হইয়া কলিকাতায় ভক্ত বলরাম বসুর বাড়িতে চিকিৎসার জন্য অবস্থান করিতেছিলেন, তখন ভক্তদের প্রচেষ্টায় পুনরায় গঙ্গাপ্রসাদকে ঠাকুরের চিকিৎসা করিবার জন্য আনা হয়। কিন্তু গঙ্গাপ্রসাদ অন্যান্য অভিজ্ঞ কবিরাজগণের সহিত পরামর্শ করিয়া জানিতে পারেন যে, রোগটি দুরারোগ্য, সারিবার নহে।


●52>গঙ্গামায়ী — ইনি বৃন্দাবনের নিকট বর্ষানা নামক স্থানে তপস্যা করতেন। বিশেষ উচ্চ অবস্থাসম্পন্না সাধিকা ছিলেন। সাধারণে তাঁহাকে শ্রীরাধার সঙ্গিনী ললিতা সখীর অবতার বলিয়া মনে করিতেন। ১৮৬৪ খ্রীষ্টাব্দে বৃন্দাবনে ঠাকুরের সহিত প্রথম সাক্ষাৎ হয়। ইনি ঠাকুরকে শ্রীরাধার মত ভাবময়ী দেখিয়া তাঁহাকে ‘দুলালী’ বলিয়া সম্বোধন করিতেন। ঠাকুর গঙ্গামায়ীর সেবাযত্নে মুগ্ধ হইয়া বৃন্দাবনে থাকিতে ইচ্ছাপ্রকাশ করিয়াছিলেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাহা ঘটিয়া ওঠে নাই।


●53>গণুর মা — [যোগীন্দ্রমোহিনী বিশ্বাস] (১৬।১।১৮৫১ — ৪।৬।১৯২৪) — যোগীন্দ্র মোহিনী বিশ্বাস শ্রীরামকৃষ্ণ সঙ্ঘে যোগীন-মা নামে পরিচিত। শ্রীরামকৃষ্ণের কৃপাধন্যা। পিতা প্রসন্নকুমার মিত্র। ভক্ত বলরাম বসুর বাড়িতে ১৮৮৩ খ্রীষ্টাব্দে তিনি প্রথম ঠাকুরকে দর্শন করেন। মেয়ের নাম গণু বলিয়া তাঁহাকে ‘গণুর মা’ বলা হইত। শ্রীসারদা দেবীর সঙ্গিনী, সেবিকা ও অসামান্যা সাধিকা যোগীন-মাকে মায়ের ‘জয়া’ বলা হইয়াছে। ইনি শ্রীশ্রীঠাকুরেরও কিছু সেবা করিয়াছিললেন। শ্রীশ্রীমায়ের পঞ্চতপা ব্রত সাধনাতেও তিনি অংশ গ্রহণ করেন। যোগীন-মা উচ্চস্তরের সাধিকা ছিলেন — একাধিবার তাঁহার সমাধি হয়। যোগীন-মার অবিরাম তপশ্চর্যার বহু দৃষ্টান্ত আছে। বৃদ্ধাবয়সেও তাঁ হার জপধ্যানে প্রবল অনুরাগ ছিল। তাঁহার সূক্ষ্ম বুদ্ধি ও অন্তর্দৃষ্টির প্রমাণ প্রদর্শনের জন্য যেন শ্রীশ্রীমা অনেক সময় তাঁহার সহিত দীক্ষার্থীদের মন্ত্রাদি সম্বন্ধে আলোচনা করিতেন। দীন দুঃখীদের প্রতি তঁহার গভীর মমতা ছিল। জয়রামবাটী প্রভৃতি স্থানে মায়ের জনগণের সেবাদিতেও তিনি যথাসাধ্য অর্থব্যয় করিতেন। শ্রী শ্রীঠাকুরের নিকট তাঁহার ভগবৎ প্রসঙ্গাদি শ্রবণ করার সোভাগ্য হইয়াছিল। তাহার ফলে শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনী রচনাকালে তিনি স্বামী সারদানন্দজীকে প্রভূত সাহায্য করিয়াছিলেন। স্ত্রীভক্তদের সহিত শ্রীরামকৃষ্ণের আলাপ ও ব্যবহারাদির ইতিহাস তাঁহার স্মৃতিশক্তিবলে অবিকৃতভাবে সংরক্ষিত হইয়াছিল — প্রয়োজনস্থলে হুবুহু পুনরুজ্জীবিত হইত।


●54>গণেশ উকিল — মথুরবাবুদের উকিল। তাঁহাদের বিষয় সংক্রান্ত কাজ উপলক্ষে আসিয়া দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুরকে দর্শন করেন।


●55>গিরিধারি দাস — গরাণহাটার (নিমতলা স্ট্রীট) বৈষ্ণব সাধুদের আখড়ার মোহন্ত। ষড়ভুজ মহাপ্রভু দর্শন করিতে ঠাকুর এই আখড়ায় আসিয়াছিলেন।


●56>গিরিশ [গিরিশচন্দ্র ঘোষ] (২৮.২.১৮৪৪ — ১৮.২.১৯১২) — ইনি বঙ্গসমাজে প্রধানতঃ মহাকবি, নাট্যকার ও নট বলিয়া প্রসিদ্ধ; কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণ-ভক্তমণ্ডলীতে তিনি একনিষ্ঠ ভক্তি ও বিশ্বাসের মূর্তি এবং ঠাকুরের অহৈতুকী কৃপার অপূর্ব নিদর্শন। কলিকাতা বাগবাজার নিবাসী গিরিশচন্দ্র ঘোষ বাল্যাবস্থায় পিতৃমাতৃহীন হওয়ায় উচ্ছৃঙ্খল হয়ে পড়েন । প্রথমে পাঠশালায়, পরে গৌরমোহন আঢ্যের স্কুলে ও হেয়ার স্কুলে পড়াশুনা করেন। ১৮৬২ খ্রীষ্টাব্দে পাইকপাড়া স্কুল হইতে এন্ট্রান্স পরীক্ষা দেন। বাল্যকাল হইতে পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারত অত্যন্ত আগ্রহের সহিত পঠনের ফলে ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁহার গভীর অন্তর্দৃষ্টি গড়িয়া ওঠে। পরবর্তী কালে নিজের অদ্যবসায় ও নিষ্ঠার গু ণে প্রখ্যাত নট, নাট্যকার ও কবিরূপে প্রতিষ্ঠিত হন এবং “মহাকবি” উপাধি অর্জন করেন। তিনি দেশপ্রেমিক এবং সমাজসংস্কারক ছিলেন। বাংলা নাট্য আন্দোলনের পুরোধা গিরিশচন্দ্র বাংলা নাটকের এক নূতন দিগন্ত উন্মোচন করেন। সারা জীবনে প্রায় ৮০টি পৌরাণিক, ঐতিহাসিক, সামাজিক নাটক রচনা করেন। ইহার মধ্যে উল্লখযোগ্য চৈতন্যলীলা, বিল্বমঙ্গল, প্রফুল্ল, দক্ষযজ্ঞ, পাণ্ডবের অজ্ঞাতবাস, পাণ্ডবগৌরব, জনা, সিরাজদ্দৌলা প্রভৃতি। গিরিশচন্দ্র দীননাথ বসুর গৃহে শ্রীরামকৃষ্ণকে প্রথম দর্শন করেন। প্রথমে তিনি কৌতূহলবশতঃ তাঁহাকে দেখিতে যান। একজন বিপথগামী ব্যক্তি সাধুলোকের সংস্পর্শে আসিয়া কিভাবে পবিত্র হইতে পারে — গিরিশচন্দ্র তাহার জ্বলন্ত উদাহরণ। ঠাকুরের অত্যধিক স্নেহ অশেষ কৃপা এবং সুমধুর প্রশ্রয় তাঁহার ক্লেদাক্ত জীবনের মোড় সম্পূর্ণ ঘুরাইয়া দিয়াছিল। শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁহাকে ‘ভৈরব’ আখ্যা দিয়াছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণের অবতারত্বে তাঁহার জ্বলন্ত বিশ্বাস ছিল এবং তিনি যে জীবের মুক্তিকল্পে ধরায় অবতীর্ণ হইয়াছেন একথা প্রচার করিতেন। শ্রীরামকৃষ্ণ বলিতেন যে, গিরিশের পাঁচসিকে পাঁচ আনা বিশ্বাস। শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁহার রচিত ‘চৈতন্যলীলা’ নাটক দেখিয়া ভাবাবিষ্ট হন এবং শ্রীচৈতন্যের ভূমিকায় অভিনেত্রী বিনোদিনীকে আশীর্বাদ করেন। ইহা ছাড়া গিরিশের অন্য কয়েকটি নাটকও তিনি দেখেন। জীবনের অন্তিম পর্বে গিরিশ সর্বদা ঠাকুরের নাম গুণকীর্তন করিতেন। তাঁ হার ব্যক্তিত্বের চৌম্বকস্পর্শে সকলেই অভিভূত হইয়া যাইতেন। গিরিশের জীবন বুঝিতে গেলে যেমন শ্রীরামকৃষ্ণকে বাদ দেওয়া চলে না, শ্রীরামকৃষ্ণের অপার করুণা বুঝিতে হইলে গিরিশের জীবনও তেমনি অপরিহার্য।


●57>গিরীন্দ্র (গিরীন্দ্রনাথ মিত্র) — কলিকাতা সিমুলিয়াবাসী গিরীন্দ্র মিত্র শ্রীরামকৃষ্ণের অন্যতম গৃহীভক্ত সুরেন্দ্রনাথ মিত্রের ভ্রাতা। ১৮৮১ সালে ইনি দক্ষিণেশ্বরে প্রথম ঠাকুরকে দর্শন করেন। প্রথম দর্শনেই শ্রী রামকৃষ্ণকে শঙ্কর, বুদ্ধ এবং চৈতন্যদেবের সমকক্ষ হিসাবে অনুভব করেন। তিনি প্রথমে ব্রাহ্মধর্মে এবং নিরাকার সাধনায় বিশ্বাসী ছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণের সংস্পর্শে আসিয়া হিন্দু ধর্মের গূঢ় তত্ত্ব সম্পর্কে অবহিত হন। গিরীন্দ্র সুরেন্দ্রনাথের সহিত বহুবার শ্রীরামকৃষ্ণের সান্নিধ্যে আসেন।


●58>গিরীন্দ্র ঘোষ — পাথুরিয়াঘাটায় বাড়ি। ষড়রিপু দমনের জন্য ওইগুলিকে ভগবৎমুখী করিয়া দেওয়ার কথা গিরীন্দ্র বলিয়াছিলেন। এই প্রসঙ্গে ঠাকুর গিরীন্দ্রের কথা উল্লেখ করিয়াছেন।


●59>গোপাল মিত্রe — রামচন্দ্র দত্ত ও মনোমোহন মিত্রের সঙ্গে তিনি শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে দক্ষিণেশ্বরে প্রথম দর্শন করেন ১৩ই নভেম্বর ১৮৭৯। ঠাকুরের দর্শন পাইয়া তিনি মুগ্ধ হইয়াছিলেন। প্রতি রবিবারে গোপাল ঠাকুরকে দর্শন করিতে যাইতেন।


●60>গোপাল সেন — বরাহনগরবাসী ভগবৎভক্ত যুবক। ঠাকুরের সহিত প্রথম দর্শন ১৮৬৪ খ্রীষ্টাব্দে দক্ষিণেশ্বরে। তিনি দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুরের কাছে যা তায়াত করিতেন এবং ঈশ্বরীয় ভাবে আবিষ্ট হইতেন। ভাবাবস্থায় ইঁহাকে ঠাকুর স্পর্শ করিয়াছিলেন। জীবনমুক্ত অবস্থায় সংসার বিষবৎ মনে হওয়ায় আত্মহত্যা করিয়া দেহত্যাগ করেন। গোপাল সেনের আত্মহত্যার সংবাদে ঠাকুর বলিয়াছিলেন যে, ঈশ্বর দর্শন করিবার পর যদি কেউ স্বেচ্ছায় শরীর ত্যাগ করে, তবে তাহাকে আত্মহত্যা বলে না।


●61>গোপালের মা — [অঘোরমণি দেবী] (১৮২২ - ১৯০৬) — ২৪ পরগণা জেলার কামারহাটিতে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণের ঘরে জন্ম। পিতার নাম কাশীনাথ ঘোষাল। নয়-দশ বৎসর বয়সে তাঁহার বিবাহ হয়। অল্প বয়সে নিঃসন্তান অবস্থায় বিধবা হইবার পর কুলগুরুর দ্বারা ‘গোপাল মন্ত্রে’ দীক্ষিতা হন। মুণ্ডিত মস্তকে সাধিকা অবস্থায় কামারহাটি গ্রামে দত্তদের ঠাকুর বাড়িতে বাস করিতেন। ১৮৫২ খ্রীষ্টাব্দ হইতে দীর্ঘ ৩০ বৎসর এই সাধিকা জপতপের সাহায্যে সিদ্ধা হন। ১৮৮৪ খ্রীষ্টাব্দে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের সহিত তাঁহার প্রথম সাক্ষাৎ হয়। একদিন গভীর রাত্রে জপের সময় অঘোরমণি সহসা শ্রীরামকৃষ্ণের দর্শন পান এবং তাঁহার হাতটি ধরিবার সঙ্গে সঙ্গেই তঁহার স্থানে গোপালের ন্যায় বালক মূর্তি দর্শন করেন। ইহার পর তিনি দক্ষিণেশ্বরে বহুবার আসিয়া ঠাকুরকে দর্শন করেন। তিনি ঠাকুরের মধ্যে গোপালের মূর্তি দর্শন করেন । শ্রীশ্রীঠাকুরও তাঁহাকে যশোদাজ্ঞানে সম্মান করিতেন। তখন হইতেই তিনি ‘গোপালের মা’ নামে অভিহিত হন। অঘোরমণি ভগিনী নিবেদিতাকে ‘নরেনের মেয়ে’ বলিয়া ডাকিতেন। অন্তিমাকালে নিবেদিতা তাঁহার অনেক সেবা করিয়াছিলেন।


●62>গোপী দাস — খোল বাদক। শ্রীশ্রীঠাকুরের গানের সঙ্গে সংকীর্তনে খোল বাজাইয়াছিলেন।


●63>গোবিন্দ চাটুয্যে — ঠাকুর প্রথম কলিকাতায় আসিয়া ঝামাপুকুরে ইঁহাদের বাড়িতে ছিলেন।


●64>গোবিন্দ পাল — ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের বরাহনগর নিবাসী তরুণ ভক্ত। ঠাকুরের সহিত প্রথম সাক্ষাৎ ১৮৬৪-তে, দক্ষিণেশ্বরে। শ্রীশ্রী ঠাকুরের নিকট দক্ষিণেশ্বরে আসিতেন। ইনি ভগবৎ ভক্ত ছিলেন এবং অল্প বয়সে দেহরক্ষা করেন।


●65>গোবিন্দ মুখোপাধ্যায় — ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের স্নেহধন্য পরমভক্ত। ইনি চব্বিশ পরগণা জেলার বেলঘরিয়ার অধিবাসী। দেওয়ানের পদে নিযুক্ত এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ছিলেন। ভক্তিমান গোবিন্দ ঠাকুরের প্রতি অতীব আকর্ষণে দক্ষিণেশ্বরে আসিতেন। ঠাকুরও তাঁহাকে অতিশয় স্নেহ করিতেন। ১৮৮৩ খ্রীষ্টাব্দে ঠাকুর তাঁহার বেলঘরিয়ার বাড়িতে শুভাগমন করেন এবং সংকীর্তনে নৃত্য করিয়া প্রসাদ গ্রহণ করিয়াছিলেন। কীর্তনের সময় ঠাকুর সমাধিস্থ হইয়াছিলেন।


●66>গোবিন্দ রায় — সুফী সম্প্রদায়ভুক্ত গোবিন্দ রায় আরবী পারসী ভাষায় সুপণ্ডিত ছিলেন। নানাধর্মের বহু শাস্ত্রগ্রন্থ পাঠ করিয়া তিনি অবশেষে ইসলাম ধর্মের উদার মতবাদে আকৃষ্ট হন এবং তাহাতেই আত্মনিয়োগ করেন। তিনি কোরাণ পাঠে নিমগ্ন থাকিতেন এবং কঠোর নিয়মানুবর্তিতার সহিত ধর্মচর্চা করিয়া সিদ্ধি লাভের পথে অগ্রসর হইয়াছিলেন। ১৮৬৬ খ্রীষ্টাব্দে দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুরের সঙ্গে তাঁহার প্রথম সাক্ষাৎ হয়। তিনি একদা দক্ষিণেশ্বরের পঞ্চবটীর নিকট সাধনার স্থান নির্বাচন করেন। সেই সময় ঠাকুর তাঁহার ধর্মনিষ্ঠা এবং ভগবৎপ্রেমে আকৃষ্ট হন। তাঁহার সহিত ধর্মালোচনা করিয়া তিনি মোহিত হন এবং তাঁহার নিকট দীক্ষা গ্রহণ করিয়া ইসলাম ধর্ম সাধন করিয়া মহম্মদের দর্শন লাভ করেন ।


●67>গোষ্ঠ — খোলবাদক। ইঁহার বাহনা শুনিয়া শ্রীশ্রীঠাকুরের রোমাঞ্চ হইয়াছিল। সুরেন্দ্রের বাড়িতে তিনি খোল বাজাইয়াছিলেন।


●68>গৌরী পণ্ডিত (গৌরীকান্ত ভট্টাচার্য) — বাঁকুড়া জেলার ইন্দাস গ্রামের বাসিন্দা। বীরাচারী তান্ত্রিক সাধক, তাঁহার কিছু সিদ্ধাই ছিল। ১৮৬৫ খ্রীষ্টাব্দে দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুরের সঙ্গে তাঁহার প্রথম সাক্ষাৎ হয়। শাস্ত্রীয় প্রমাণের ভিত্তিতে শ্রীশ্রীঠাকুরের আধ্যাত্মিক অবস্থা নির্ধারণের উদ্দেশ্যে মথুরবাবু দক্ষিণেশ্বরে একটি সভা আহ্বান করেন। এই সময়ে গৌরী পণ্ডিত ঠাকুরকে অবতারগণের উৎসস্থল বলিয়া ঘোষণা করেন (১৮৭০)। শ্রীশ্রীঠাকুরের সান্নিধ্যে দিন দিন তাঁহার মন পাণ্ডিত্য, লোকমান্য, সিদ্ধাই প্রভৃতি সকল বস্তুর প্রতি বীতরাগ হইয়া ঈশ্বরের শ্রীপাদপদ্ম অভিমুখী হইতে থাকে। গৌরী দিন দিন ঠাকুরের ভাবে মোহিত হইয়া তাঁহার সম্পূর্ণ অনুরাগী হইয়াছিলেন। ধীরে ধীরে ঠাকুরের দিব্যসঙ্গলাভে তাঁহার তীব্র বৈরাগ্য হয়। একদা তিনি সজল নয়নে শ্রীশ্রীঠাকুরের নিকট বিদায় গ্রহন করিয়া চিরতরে গৃহত্যাগ করেন। বহু অনুসন্ধানেও ইহার পর গৌরী পণ্ডিতের সাক্ষাৎ পাওয়া যায় নাই।


●69>গৌরী মা (১৮৫৭ - ১৯৩৮) — ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের কৃপাধন্যা স্ত্রীভক্ত। প্রকৃত নাম মৃড়ানী বা রুদ্রাণী। পিতা পার্বতীচরণ চট্টোপাধ্যায়। মাতা গিরিবালা দেবী। তঁহার পিতৃগৃহ ছিল হাওড়ার শিবপুর অঞ্চলে। কিন্তু তিনি মাতুলালয় ভবানীপুরে জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তী জীবনে ‘সন্ন্যাস’ গ্রহণের পর মৃড়ানীর নাম “গৌরীপুরী” হওয়ায় ভক্তসমাজে তিনি ‘গৌরী-মা’ নামে পরিচিতা হন। কিন্তু ঠাকুর ও শ্রীশ্রীমায়ের কাছে তিনি ছিলেন ‘গৌর দাসী’। গৌরী-মার ব্যক্তিত্ব ছিল অতুলনীয়। তাঁহার একনিষ্ঠতা, সাহস এবং শক্তি সকলের শ্রদ্ধার যোগ্য বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গেই আত্মীয়েরা তাঁহার বিবাহের ব্যবস্থা করায় তিনি ইহাতে প্রবল আপত্তি জানান এবং বিবাহের রাত্রে বাড়ি হইতে পলায়ন করেন। অতঃপর তিনি গলায় দামোদর শিলা লইয়া পাগলিনীর ন্যায় দীর্ঘ উনিশ বৎসর নানাতীর্থস্থানে ঘুরিয়া তপস্যা করিতে থাকেন। নানা তীর্থ ভ্রমণ কালে হরিদ্বারের পথে একদল সন্ন্যাসী ও সন্ন্যাসিনীর সহিত মিলিত হন, এই সাধুসঙ্গেই তিনি “গৌরী-মায়ী” নামে অভিহিতা হন। ১৮৮২ সালে দক্ষিণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণের সহিত তাঁহার প্রথম সাক্ষাৎ হয়। ঠাকুরকে দর্শন করিয়া ও তাঁহার কথা শুনিয়া গৌরী-মা অভিভূত হন। পরম ভাগ্যবতী গৌরী-মা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে শ্রীশ্রীঠাকুরের সান্নিধ্যলাভের এবং সেবার অধিকারী হন। কিছুকাল তিনি দক্ষিণেশ্বরে শ্রীমা সারদাদেবীর সঙ্গেও বাস করেন। শ্রীশ্রী ঠাকুর এ দেশের মায়েদের জন্য দুঃখপ্রকাশ করিয়া গৌরী-মাকে তাহাদের সেবাকার্যে আত্মনিয়োগের কথা বলেন। পরবর্তী কালে গৌরী-মা মাতাঠাকুরানীর অনুমতিক্রমে প্রথমে বারাকপুরে গঙ্গাতীরে পরে বাগবাজারে শ্রীশ্রীসারদেশ্বরী আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। গৌরী-মার গান শুনিয়া ঠাকুরের সমাধি হইত। ঠাকুর তাঁহাকে মহাতপস্বিনী ভাগ্যবতী ও পুণ্যবতী বলিয়া নির্দেশ করিতেন। অপরপক্ষে গৌরী-মাও ঠাকুরকে অবতার রূপে ও মাতাঠাকুরানীকে ভগবতীরূপে ভক্তি করিতেন।


●70>চন্দ্র চাটুজ্যে (চন্দ্র চ্যাটার্জী) — ঠাকুরের তন্ত্রসাধনার গুরু ভৈরবী ব্রাহ্মণির নিকট ইনি দীক্ষা গ্রহণ করেন। এইজন্য ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের গুরুভ্রাতা রূপে পরিচিত। ভৈরবীর সহায়তায় চন্দ্র দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুরের সহিত মিলিত হন। তিনি উচ্চদরের সাধক ছিলেন। কিন্তু বিশেষ সিদ্ধাইলাভের ফলে সাধনপথ হইতে ভ্রষ্ট হন। পরে ঠাকুরের পূত সান্নিধ্যে তাঁহার সিদ্ধাইশক্তি নষ্ট হয় এবং ঠাকুরের দিব্যশক্তির প্রভাবে তিনি সঠিক পথে অগ্রসর হন। চন্দ্র ঠাকুরের অনুগত ছিলেন এবং ঠাকুরও তাঁহাকে অত্যন্ত স্নেহ করিতেন। ঠাকুর চন্দ্রকে ঘনিষ্ঠ ঈশ্বর প্রেমী বলিয়া বর্ণনা করিতেন। ঠাকুরের দেহরক্ষার দীর্ঘকাল পরে ১৮৯৯ খ্রীষ্টাব্দে চন্দ্র অকস্মাৎ বেলুড়মঠে উপস্থিত হন এবং মাসাধিককাল সেখানে বাস করেন। তিনি নিত্য জপ-ধ্যানে নিরত থাকিতেন।


●71>চন্দ্র হালদার — কালীঘাটের হালদার বংশীয়, মথুরবাবুদের পুরোহিত। মথুরবাবুর উপর রামকৃষ্ণের প্রভাব এবং মথুরবাবুর ঠাকুরের উপর প্রশয়পূর্ণ ব্যবহার ও পক্ষপাতিত্বের জন্য ঠাকুরের প্রতি সে অত্যন্ত ঈর্ষান্বিত ছিল। সে ধূর্ত ও খল প্রকৃতির ছিল। ঠাকুরের ভাবাবিষ্ট অবস্থাকে এবং সরলতাকে ধূর্ততার ভান বলিয়া প্রতিপন্ন করিতে চেষ্টা করে। নানা মিথ্যা কথা বলিয়া মথুরবাবুর আস্থাভঞ্জন হইবার চেষ্টা করে কিন্তু তাহাতে বিফল মনোরথ হয়। একদিন সন্ধ্যার সময় ঠাকুর যখন ভাবসমাধির ফলে অর্ধবাহ্যদশা প্রাপ্ত হইয়া মথুরবাবুর জানবাজারের বাড়িতে পড়িয়া আছেন, তখন সে তাঁহাকে পদাঘাত করে এবং অত্যন্ত কটুবাক্য প্রয়োগ করিয়া চলিয়া যায়। কিন্তু তাহার কঠোর শাস্তি বিধানের আশঙ্কায় ঠাকুর এই ঘটনা মধুরবাবুর কর্ণগোচর করেন নাই। পরে অন্য কোন অপরাধের ফলে চন্দ্র হালদার কর্মচ্যুত হইলে ঠাকুর মথুরবাবুর নিকট ওই ঘটনার উল্লেখ করেন।


●72>চন্দ্রমণি (চন্দ্রমণিদেবী) (১৭৯১ - ১৮৭৬ খ্রী:) — ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায়ের স্ত্রী এবং ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেবের পরম ভাগ্যবতী জননী। চন্দ্রমণিদেবীর জন্ম সরাটি মায়াপুর গ্রামে। তাঁহার সরলতা, দেবদ্বিজে ভক্তি এবং সর্বপরি সততা সকলকে মুগ্ধ করিত। শ্রীমতী চন্দ্রাদেবী ছিলেন স্নেহ ও সরলতার মূর্তি — প্রতিবেশীগণ সম্পদে-বিপদে তাঁহার ন্যায় হৃদয়ের সহানুভূতি আর কোথাও পাইত না। দরিদ্ররা জানিত চন্দ্রাদেবীর নিকট তাহারা যখনই উপস্থিত হইবে, তখনই অন্নের সহিত অকৃত্রিম যত্ন ও ভালবাসায় তাহারা পরিতৃপ্ত হইবে, ভিক্ষুক সাধুদের জন্য তাঁহার দ্বার সর্বদা উন্মুক্ত ছিল এবং প্রতিবেশী বালক-বালিকাদের সমস্ত আবদার তিনি পূর্ণ করিতেন। চন্দ্রমণি জাগ্রত অবস্থায় অথবা নিদ্রিত অবস্থায় প্রায়ই নানাপ্রকার অলৌকিক ঘটনা দেখিতে পাইতেন। ইহাতে তিনি কখনও কখনও অতিশয় ভীত হইতেন আবার কখনও-বা বিস্মিত হইতেন। একবার কোজাগরী পূর্ণিমার রাত্রে তিনি মা লক্ষ্মীকে দর্শন করিয়াছিলেন। চন্দ্রমণির ৪৫ বৎসর বয়সে গদাধরের আবির্ভাবের পূর্বেও তিনি এইরূপ অলৌকিক এক জ্যোতির দর্শন পাইয়াছিলেন। গদাধর শৈশব হইতেই দেবদ্বিজে ভক্তির ভাব তাঁহার মাতার নিকট হইতে পাইয়াছিলেন। চন্দ্রমণি দেখিয়াছিলেন বাড়ির নিকট যুগীদের মন্দিরের মহাদেবের শ্রীঅঙ্গ হইতে দিব্যজ্যোতি নির্গত হইয়া তরঙ্গাকারে ছুটিয়া আসিয়া তাঁহার ভিতরে প্রবেশ করিতেছে। গদাধরের জন্মের পূর্বে তিনি প্রায় নিত্যই দেবদেবীসকলের দর্শনলাভ করিতেন এবং সকল দেবদেবীর উপরেই এইকালে তাঁহার মাতৃস্নেহ যেন উদ্বেলিত হইয়া উঠিয়াছিল। পরবর্তী কালে শ্রীরামকৃষ্ণ বহুবার এইকথা স্মরণ করিয়াছিলেন। শেষজীবনে প্রায় ১২ বৎসর চন্দ্রমণি দক্ষিণেশ্বরে কাটিয়াছিলেন। প্রথমে মথুরবাবুদের কুঠিবাড়িতে এবং শেষে নহবতের দ্বিতলে তাঁহার থাকিবার ব্যবস্থা হয়। মায়ের কথা মনে হওয়ায় শ্রীরামকৃষ্ণ বৃন্দাবনে গঙ্গামায়ীর নিকট থাকেন নাই। ৮৫ বৎসর বয়সে তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। শেষ মুহূর্তে তাঁহার দেহ গঙ্গাতীরে আনা হয় এবং ঠাকুর তাঁহার গর্ভধারিণীর চরণে অঞ্জলি প্রদান করেন।


●73>চিনে শাঁখারি (শ্রীনিবাস শাঁখারি) — শ্রীনিবাস বা চিনু নামে অভিহিত কামারপুকুর নিবাসী ধার্মিক ব্যক্তি। চিনে শাঁখারি খুব উঁচুদরের বৈষ্ণব সাধক ছিলেন। গদাধরের শৈশবেই চিনু তাঁহার দৈবী স্বরূপ বুঝিয়াছিলেন। তাঁহার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে স্বয়ং চৈতন্যদেব গদাধররূপে আবির্ভূত হইয়াছেন। তিনি তাঁহাকে ইষ্টদেবতারূপে পূজা করিতেন ও তাঁহার বাল্যলীলার সঙ্গী ছিলেন। তিনি প্রত্যহ শ্রীমদ্ভগবদ্‌ গীতা ও অন্যান্য ধর্মগ্রন্থ পাঠ করিতেন। পরবর্তী কালে শ্রীরামকৃষ্ণরূপে ঠাকুর যখন কামারপুকুরে আসিতেন তখনও তিনি তাঁহার চিনুদাদার সহিত পূর্ববর্তী সম্পর্ক বজায় রাখিতেন। চিনু দীর্ঘজীবী ছিলেন এবং জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ঠাকুরের প্রতি ভক্তিশ্রদ্ধা করিয়া গিয়াছেন।


●74>চুনীলাল [চুনীলাল বসু] (১৮৪৯-১৯৩৬) — চুনীলাল বসু ঠাকুরের কৃপাপ্রাপ্ত গৃহীভক্ত, কলিকতার বাগবাজারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি হিন্দুস্কুলের ছাত্র ছিলেনএবং কলিকাতা কর্পোরেশনে চাকুরী করিতেন। চুনীলাল সাধুদর্শনের ইচ্ছায় দক্ষিণেশ্বরে যান এবং ঠাকুরের দর্শনলাভ করিয়া ধন্য হন। পরে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের উপদেশমত চলিয়া ইনি যোগাভ্যাসজনিত হাঁপানি রোগ হইতে মুক্তিলাভ করেন। ঠাকুরের প্রতি তাঁহার প্রগাঢ় ভক্তি বাড়িতে থাকে এবং ক্রমে তিনি ঠাকুরকে অবতার বলিয়া বুঝিতে পারেন। কাশীপুরে “কল্পতরু” দিবসে তিনি ঠাকুরের বিশেষ কৃপালাভ করেন। স্বামী বিবেকানন্দ চুনীলালকে “নারায়ণ” বলিয়া ডাকিতেন। পরবর্তী কালে শ্রীরামকৃষ্ণ মঠের সন্ন্যাসীদের সহিত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল ও মঠের বিভিন্ন কাজে সাহায্যে করিতেন।


●75>ছোট গোপাল (গোপালচন্দ্র ঘোষ) — বাসস্থান কলিকাতার সিমলা অঞ্চল। ঠাকুরের সহিত প্রথম সাক্ষাৎ দক্ষিণেশ্বরে। মাঝে মাঝে ঠাকুরের সান্নিধ্যলাভ করিয়াছেন। ইনি হঠাৎ হঠাৎ ঠাকুরের নিকট যাইতেন বলিয়া তাঁহাকে ‘হুট্‌কো’ গোপাল বলা হইত। ঠাকুরের গোপাল নামক কয়েকজন ভক্ত থাকায় তাঁহাকে ‘ছোট গোপাল’ নামে অভিহিত করা হয়। তিনি ঠাকুরের নিকট হইতে বিশেষ কৃপালাভ করেন এবং ঠাকুরকে গুরু-রূপে বরণ করেন। তিনি কাশীপুরে অসুস্থ ঠাকুরকে সেবা করিয়াছিলেন। বরাহনগর মঠে তিনি সাধুদের সেবাদি করিয়াছিলেন। পরে তিনি বিবাহ করিয়া সংসারী হন এবং একটি কন্যা রাখিয়া পরলোক গমন করেন।


●76>ছোট নরেন (নরেন্দ্রনাথ মিত্র) — শ্যামপুকুর বাসিন্দা ও শ্রীম-র ছাত্র। শ্রীরামকৃষ্ণের কৃপাপ্রাপ্ত, শুদ্ধাত্মা ভক্ত। স্বামী বিবেকানন্দের নাম “নরেন” হওয়ায়, ঠাকুর একই নামের এই ভক্তটিকে “ছোট নরেন” বলিতেন। ঠাকুরের প্রতি প্রবল আকর্ষণে সকল বাধা বিপদ তুচ্ছ করিয়া তিনি প্রায়ই দক্ষিণেশ্বরে যাইতেন। ঠাকুরও তাঁহাকে দেখিবার জন্য ব্যাকুল হইয়া পড়িতেন — এবং তাঁহাকে দেখিয়া প্রায়ই সমাধিস্থ হইতেন। ঠাকুরের সংস্পর্শে ছোট নরেনেরও মাঝে মাঝে ভাব সমাধি হইত। পরবর্তী কালে ইনি হাইকোর্টের এ্যটর্নী হন — রামকৃষ্ণ মিশনের আইন বিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তাঁহার সাংসারিক জীবন সুখের হয় নাই।


●77>জজ (সদরওয়ালা) — সুরেন্দ্রের মেজোভাই। সুরেন্দ্রের বাড়িতে ঠাকুরের সঙ্গে কথাবার্তা বলেন। (১৯-১১-১৮৮২)


●78>জয়গোপাল সেন — প্রাচীন ব্রাহ্মভক্ত। ১৮৭৫ খ্রীষ্টাব্দে বেলঘরিয়ায় (৮ নং বি.টি. রোড) তাঁহার বাগানবাড়িতে কেশব সেনের সহিত শ্রীরামকৃষ্ণ দেখা করিতে গিয়াছিলেন। তাঁহার কলিকাতার বাসা ছিল মাথা ঘষা গলিতে। সেখানেও শ্রীশ্রীঠাকুর পদার্পণ করিয়াছিলেন। জয়গোপাল সেন ঠাকুরের একান্ত অনুগত। জয়গোপালের বাড়িতে ঠাকুর প্রায়ই যাইতেন, ধর্মীয় বিষয়ে বিষয়ে আলোচনা করিতেন এবং ভক্তগণকে উপদেশ দিতেন। জয়গোপাল নিজেও মধ্যে মধ্যে দক্ষিণেশ্বরে আসিতেন। জয়গোপাল সেন ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত ছিলেন এবং ঠাকুরের ব্রাহ্মভক্তদের মধ্যে জয়গোপাল সেন ছিলেন অন্যতম।


●79>জয়নারায়ণ পণ্ডিত [তর্কালঙ্কার] (১৮০৮-১৮৭৩) — দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার মুচাদিপুর গ্রামে জন্ম। পিতা শ্রীহরিশচন্দ্র বিদ্যাসাগর। চৌদ্দ বৎসর বয়সে ব্যাকরণ অমরকোষ ও কাব্যশাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি অর্জন করিয়া ভবানীপুরের রামতোষণ বিদ্যালঙ্কার এবং জগন্মোহন তর্কসিদ্ধান্তের নিকট ন্যায়শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। শিক্ষাশেষে হাওড়ায় চতুষ্পাঠী স্থাপন করিয়া অধ্যাপনা শুরু করেন। তিনি সংস্কৃত কলেজে ন্যায়শাস্ত্রের অধ্যাপকের পদেও নিযুক্ত হইয়াছিলেন। তাঁহার রচিত সংস্কৃত শাস্ত্রগ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ১১টি। অসাধারণ পাণ্ডিত্যের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তিনি উদার মনোভাবাপন্ন, প্রকৃত নিরহঙ্কার এবং পরম ভক্ত ছিলেন। ১৮৬৯ খ্রীষ্টাব্দে দক্ষিণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণের সহিত তাঁহার প্রথম সাক্ষাৎ হয়। শ্রীশ্রী ঠাকুর স্বয়ং কলিকাতায় জয়নারায়ণকে দেখিতে যান। তিনি ইঁহাকে অতিশয় স্নেহ করিতেন। পণ্ডিত মহাশয়ের কাশীতে দেহত্যাগ হয়।


●80>জয় মুখুজ্জে (জয়নারায়ণ মুখোপাধ্যায়) — বরাহনগরবাসী জয়নারায়ণ মুখোপাধ্যায় শ্রীরামকৃষ্ণের ভক্ত। দিব্যোন্মাদ অবস্থায় বিচরণ কালে শ্রীরামকৃষ্ণ একদা বরাহনগরে গঙ্গার ঘাটে ইঁহাকে অন্যমনস্কভাবে জপ করিতে দেখিয়া দুই চাপড় মারিয়াছিলেন।


●81>জানকীনাথ ঘোষাল (১৮০৪ - ১৯১৩) — আদি ব্রাহ্মসমাজের একজন ভক্ত। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের জামাতা। জানকীনাথ ২রা মে ১৮৮৩ সালে নন্দনবাগানে ব্রাহ্মসমাজ মন্দিরে শ্রীরামকৃষ্ণকে দর্শন করেন। তিনি উপাসনা মন্দিরে ঠাকুরের নিকটেই বসিয়াছিলেন। ঠাকুর সেদিন কৃষ্ণপ্রেমে উন্মত্তা রাধিকার আকুলতার উদাহরণ দিয়াছিলেন। তাহাতে জানকীনাথ এই উন্মত্ততা অভিপ্রেত কিনা জানিতে চাহেন। ঠাকুর তখন প্রেমোন্মাদ জ্ঞানোন্মাদের মতনই ভগবৎপ্রেমেও যে উন্মাদ হওয়া যায় তাহা ব্যক্ত করিয়াছিলেন।


●82>জ্ঞান চৌধুরী — সিমুলিয়া নিবাসী জ্ঞান চৌধুরী ব্রাহ্মভক্ত এবং উচ্চশিক্ষিত সরকারী কর্মচারী ছিলেন। পত্নী বিয়োগের পর সাময়িকভাবে তাঁহার মনে বৈরাগ্য আসে এবং তিনি দক্ষিণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণ সকাশে আসেন। তাঁহার একটি তাচ্ছিল্যপূর্ণ উক্তিতে ক্ষুব্ধ হইয়া ঠাকুর তাঁহাকে বিদ্যার অহংকার ত্যাগ করিয়া ভক্তিপথে থাকার নির্দেশ দেন; এবং তিনি পরবর্তী কালে ঠাকুরের নির্দেশ পালন করেন। জ্ঞান চৌধুরীর বাটীতে আয়োজিত ব্রাহ্মসমাজের উৎসব উপলক্ষে ঠাকুর শুভাগমন করিয়াছিলেন এবং জ্ঞান চৌধুরী সেদিন ঠাকুর সহ সকলকে জলযোগে আপ্যায়িত করেন।


●83>ঠাকুরদাদা (নারায়ণদাস বন্দ্যোপাধ্যায়) — বরাহনগরনিবাসী ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের পুত্র। তিনি কথকতা অভ্যাস করিতেন। সাধারণতঃ “ঠাকুরদা” বলিয়া তিনি পরিচিত। তিনি নিয়মিত সাধন-ভজন করিতেন। ২৭/২৮ বৎসর বয়সে বরাহনগর হইতে পদব্রজে ঠাকুরকে দর্শন করিতে আসেন। ২৩/৩/১৮৮৪-তে ঠাকুরের সহিত দক্ষিণেশ্বরে তাঁহার প্রথম সাক্ষাৎ হয়। তিনি ঠাকুরের কাছে সাধন-ভজন করা সত্ত্বেও মনের অশান্তির কথা জানাইলে এবং তাহা হইতে নিষ্কৃতির উপায় জানিতে চাহিলে ঠাকুর তাঁহাকে সকাল বিকাল হাততালি দিয়া “হরিনাম” করিতে বলেন। ঠাকুরদাদা সেইদিন ঠাকুরকে কতিপয় গান শুনাইয়া বিশেষভাবে প্রীত করেন। ইহা ছাড়া ঠাকুরের উপদেশামৃতশুনিবার সৌভাগ্য তাঁহার হইয়াছিল।


●84>ঠাকুরদাস সেন — ব্রাহ্মভক্তদের অন্যতম। দক্ষিণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণের দর্শনলাভে তিনি ধন্য হন। ঠাকুরদাস কেশবচন্দ্র সেনের অনুগামী ছিলেন। কেশব সেন একদা যীশুখ্রীষ্ট বিষয়ে একটি বক্তৃতা করেন। সেই বক্তৃতায় খ্রীষ্টধর্ম বিষয়ে কেশবের মতের পরিচয় পাইয়া ঠাকুরদাস বিস্মিত হন এবং কেশবের নিকট হইতে দূরে সরিয়া যান।


●85>তারক [তারকনাথ ঘোষাল, পরে স্বামী শিবানন্দ] (১৮৫৪ - ১৯৩৪) — তারকনাথের আদি নিবাস চব্বিশ পরগণার বারাসত গ্রামে। জন্ম রানী রাসমণির কাছারী বাড়িতে। পিতা শক্তিসাধক রামকানাই ঘোষাল রানী রাসমণির মোক্তার নিযুক্ত হইয়া তাঁহারই কাছারী বাড়িতে বসবাস করিতেন। মাতা বামাসুন্দরী তারকেশ্বরের বরে পুত্র লাভ করেন। তারকনাথের ৯ বৎসর বয়সে মাতৃবিয়োগ হয়। তারকের পিতা ঘোষাল মহাশয় একদিকে যেমন প্রচুর অর্থ উপার্জন করিতেন, অপরদিকে তেমনই মুক্ত হস্তে ব্যায় করিতেন। মাতা বামাসুন্দরী খুবই ধর্মপ্রাণা ছিলেন। এই তারকনাথ শ্রীরামকৃষ্ণ সঙ্ঘে স্বা মী শিবানন্দ নামে পরিচিত। শ্রীরামকৃষ্ণের ১৬ জন ত্যাগী সন্তানের মধ্যে শিবানন্দ অন্যতম। তিনি শ্রীরামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের দ্বিতীয় অধ্যক্ষ ছিলেন। ১৮৮০ খ্রীষ্টাব্দে ভক্ত রামচন্দ্র দত্তের বাড়িতে প্রথম শ্রীরামকৃষ্ণকে দর্শন করেন। প্রথম দর্শনেই তারকনাথের মন-প্রাণ শ্রীরামকৃষ্ণ-চরণে অর্পিত হইল। ইতিমধ্যে তারকনাথ ব্রাহ্মসমাজের প্রভাবে প্রভাবিত হইয়াছিলেন। দ্বিতীয় দর্শনে সাক্ষাৎ জননীজ্ঞানে ঠাকুরের কোলে মাথা রাখিয়া প্রণাম করিলেন। ঠাকুরও তাঁহার মাথায় হাত বুলাইয়া দিতে লাগিলেন। ঠাকুরের চোখে করুণা ঝরিয়া পড়িতেছে। ক্রমে ক্রমে তারকনাথ তাঁহার নিজের স্থান বুঝিয়া নিয়া দক্ষিণেশ্বরে রাত্রিবাসও করিতে কাগিলেন। তারকনাথ দেখেন আর শেখেন। একসময়ে ঠাকুরের কথা টুকিয়া রাখিতে আরম্ভ করেন, হঠাৎ একদিন ঠাকুর বলিলেন, “তোর ওসব কিছু করতে হবে না — তোদের জীবন আলাদা।” সেদিন হইতে এই সঙ্কল্প বিদায় দিলেন। শিবানন্দ বাণী, শ্রীশ্রীমহাপুরুষ মহারাজের স্মৃতিকথা, মহাপুরুষজীর পত্রাবলী প্রভৃতি গ্রন্থে স্বামী শিবানন্দের বানী সঙ্কলিত হইয়াছে।


●86>তারক (তারক মুখার্জী) — বেলঘরিয়ার অধিবাসী। শ্রীরামকৃষ্ণের আশ্রিত ভক্ত। তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের অশেষ কৃপালাভ করিয়াছিলেন। ঠাকুর তাঁহার সম্বন্ধে বলিয়াছিলেন, “মাছের মধ্যে নরেন্দ্র রাঙাচক্ষু বড় রুই, আর বেলঘোরের তারককে মৃগেল বলা যায়।” কথাপ্রসঙ্গে একদিন ১৮৮৫ খ্রীষ্টাব্দে ঠাকুর তাঁহার নিজের ভিতর হইতে এক উজ্জ্বল আলোক শিখা নির্গত হইয়া দক্ষিণেশ্বর হইতে তারকের অনুসরণ করিতেছে এ কথা মাস্টার মহাশয়কে বলিয়াছিলেন। তিনি তারককে কামিনী-কাঞ্চন হইতে সাবধান থাকিতে বলেন এবং তাঁহার নিকট আসিলে তাহার সাধনার বাধা শীঘ্রই দূর হইয়া যাইবে বলিয়া আশ্বাস দেন। কয়েকদিন পরে তারক আসিলে তিনি সমাধিস্থ হইয়া তাহার বক্ষে শ্রীচরণ স্থাপন করেন। ঠাকুর তাহাকে বলিয়াছিলেন, ঈশ্বর সাধনার জন্য বাপ-মার আদেশ লঙ্ঘনে কোন দোষ নাই।


●87>তারাপদ — ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের সান্নিধ্যে আগত সুপ্রসিদ্ধ গায়ক। বলরাম বসুর গৃহে গিরিশচন্দ্র ঘোষ প্রমুখ ভক্তদের সহিত তিনি ঠাকুরের দর্শনলাভে ধন্য হন। সেই সময়ে গায়ক হিসাবে তাঁহার পরিচয় জানিতে পারিয়া ঠাকুর তাঁহার গান শুনিবার আগ্রহ প্রকাশ করেন। তারাপদ গিরিশ ঘোষের “কেশব কুরু করুণা দীনে” গানটি শুনাইলে ঠাকুর সন্তুষ্ট হন এবং ঠাকুরের অনুরোধে তিনি আরও কতকগুলি ভজন ও কীর্তন গাহিয়া শুনাইয়াছিলেন।


●88>তুলসী [শ্রীতুলসীচরণ দত্ত] (১৮৬৩ - ১৯৩৮) — শ্রীশ্রীঠাকুরের অনুরাগী বালক ভক্ত — বাগবাজার লেনে দত্ত পরিবারে জন্ম। তাঁহার বাল্যবন্ধু স্বামী তুরীয়ানন্দ ও স্বামী অখণ্ডানন্দ। ১৮৮৩ খ্রীষ্টাব্দে তিনি ক্যলকাটা স্কুল হইতে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর কিছুকাল কলেজে পড়াশুনা করেন। ১৭/১৮ বৎসর বয়সে বলরাম বসুর গৃহে শ্রীশ্রীঠাকুরকে তিনি প্রথম দর্শন করেন। তখন হইতে তিনি প্রায়ই দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুরের কাছে যাতায়াত করিতেন। ঠাকুরের তিরোধানের পর তিনি বরাহনগর মঠে যোগ দেন এবং পরবর্তী কালে স্বামী নির্মলানন্দ রূপে পরিচিত হন।


●89>তুলসীরাম [তুলসীরাম ঘোষ] (১২৬৫ - ১৩৫২ বঙ্গাব্দ) — আঁটপুর নিবাসী তুলসীরাম শ্রীশ্রীঠাকুরকে দর্শন করিয়াছিলেন। ইনি শ্রীরামকৃষ্ণের অন্যতম অন্তরঙ্গ ভক্ত বাবুরাম মহারাজ তথা স্বামী প্রেমানন্দের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা এবং বলরাম বসুর শ্যালক। তুলসীরাম তাঁহার ভগ্নীপতি ঠাকুরের গৃহীভক্ত বলরাম বসুর সহয়তায় ঠাকুরের সংস্পর্শে আসিয়া তাঁহর ভক্তে পরিণত হইয়াছিলেন। বাবুরাম মহারাজ যখন প্রথম জীবনে সাধুর অন্বেষণে ঘুরিয়া বেড়াইতেছেন তখন তুলসীরামই তাঁহাকে ঠাকুরের সন্ধান দেন।


●90>তেজচন্দ্র [তেজচন্দ্র মিত্র] (১৮৬৩ - ১৯১২) — ঠাকুরের একজন গৃহীভক্ত। বাগবাজার বোসপাড়া অঞ্চলের বাসিন্দা, শ্রীম-র ছাত্র। বাল্যকালেই শ্রীম-র অনুপ্রেরণায় শ্রীশ্রীঠাকুরের দর্শনলাভ করেন। শ্রীশ্রীমায়েরও কৃপাধন্য ছিলেন। তিনি নিয়মিত ধ্যান করিতেন ও মিতভাষী ছিলেন । ঠাকুর তাঁহাকে ‘শুদ্ধ আধার’ জ্ঞান করিতেন এবং আপনার লোক বলিয়া অতিশয় স্নেহ করিতেন।


●91>ত্রৈলঙ্গ স্বামী (আনুমানিক ১৬০৭ - ১৮৮৭ খ্রীষ্টাব্দ) — ভারতবিখ্যাত যোগী মহাপুরুষ। অন্ধ্রপ্রদেশের এক ধনী ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম। পূর্বনাম শিবরাম রাও। তাঁহার সুদীর্ঘ জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি কাশীতে অতিবাহিত করেন। লোকে তাঁহাকে শিবাবতার বলিত। তিনি অলৌকিক শক্তির অধিকারী ছিলেন। ১৮৬৮ সালে তীর্থভ্রমণকালে তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করেন। সেই সময় তিনি মৌন অবস্থায় ছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণদেবের সহিত ইঙ্গিতে তাঁহার ঈশ্বরবিষয়ক কথাবার্তা হয়। ঠাকুর হৃদয়কে তাঁহার ‘পরমহংস’ অবস্থার কথা বলিয়াছিলেন।


●92>ত্রৈলোক্য নাথ সান্যাল (১৮৪০ - ১৯১৬) — ব্রাহ্মভক্ত, কেশব সেনের অনুগামী। গীতিকার ও সুগায়ক। বলা যায় কেশব সেনের সংস্পর্শে আসিয়াই ত্রৈলোক্যের নবজন্ম ঘটে। বাল্যকাল হইতেই তিনি গান গাহিতেন। কিন্তু সঙ্গীত এবং পুঁথিগত বিদ্যার বিধিবদ্ধ শিক্ষা তাঁহার কেশবচন্দ্র সেনের গৃহে বসবাসকালে হয়। কেশবচন্দ্রের সঙ্গী হিসাবে তাঁহার শ্রীরামকৃষ্ণের সংস্পর্শে আসিবার সুযোগ ঘটে। দক্ষিণেশ্বরে বহুবার তিনি যান এবং সেখানে মধুর সুললিত কণ্ঠে ঠাকুরকে সঙ্গীত শুনাইবার সৌভাগ্য তাঁহার হইয়াছিল। ঠাকুর তাঁহার রচিত সঙ্গীত ঠাকুরের অত্যন্ত প্রিয় ছিল এবং ঠাকুর স্বয়ং বিশেষ ভাবোদ্দীপক গানগুলি করিতে অনুরোধ করিতেন। তিনি কেশবচন্দ্র কর্তৃক ‘চিরঞ্জীব শর্মা’ উপাধি পান এবং নিজে ‘প্রেমদাস’ নাম গ্রহণ করেন। এই দুই ছদ্ম নামে তিনি সহস্রাধিক ভক্তিসঙ্গীত ও কীর্তন রচনা করেন। তাঁহার রচিত ‘নব বৃন্দাবন’ নাটকে নরেন্দ্রনাথ ‘পাহাড়ী বাবার’ ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। ঠাকুর এই নাটক দেখিয়াছিলেন এবং ত্রৈলোক্যের প্রণীত গ্রন্থ ‘ভক্তিচৈতন্য চনিদ্রকা’ পড়িতে ভক্তদের বলিয়াছিলেন। তাঁহার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলি হইল গীতরত্নাবলী, পথের সম্বল, কেশবরচিত, ভক্তিচৈতন্য চন্দ্রিকা।


●93>ত্রৈলোক্য বিশ্বাস — ত্রৈলোক্যনাথ বিশ্বাস ছিলেন মথুরামোহন বিশ্বাসের পুত্র এবং রাণী রাসমণির দৌহিত্র। ১৮৭১ সালে তিনি দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরের সেবাইতের অধিকারী হন এবং আজীবন ওই দায়িত্ব পালন করেন। ত্রৈলোক্যনাথ দায়িত্ব ভার নেওয়ার পর ঠাকুর দক্ষিণেশ্বরে অধিক দিন বাস করিতে পারেন নাই। অসুস্থ হইয়া পড়ায় তিনি অনত্র যান।


●94>দমদমার মাস্টার (শ্রীযজ্ঞেশ্বর চন্দ্র ঘোষ) — দমদমার একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা করিতেন বলিয়া তিনি কথামৃতে ‘দমদমার মাস্টার’ বলিয়া পরিচিত। বাঁকুড়া জেলার কাটিকা গ্রামে ইঁহার বাড়ি। শ্রীরামকৃষ্ণদেব ইঁহাকে খুব স্নেহ করিতেন। তিনি নিয়মিত দক্ষিণেশ্বরে যাতায়াত করিতেন। ঠাকুরের দেহত্যাগের পর যজ্ঞেশ্বর বরাহনগর মঠে প্রায়ই আসিতেন। তিনি সকলের বিশেষ প্রিয়ভাজন হন।


●95>দয়ানন্দ সরস্বতী, স্বামী (১৮২৪ - ৮৩) — আর্যসমাজের প্রতিষ্ঠাতা, পূর্বনাম মূলশঙ্কর। বেদ, বেদান্ত তাঁহার কণ্ঠস্থ ছিল; সংস্কৃত ভাষায় অসামান্য ব্যুৎপত্তি ছিল। দয়ানন্দের মতে মূল হিন্দুধর্ম বেদের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং মূর্তিপূজা বেদ-বিরোধী কার্য। তিনি ব্রাহ্মণ, খ্রীষ্টান, মুসলমান সকল ধর্মের লোকের সহিত বিচার করিতেন। কাশীতে এক শাস্ত্রীয় সম্মেলনে বিচার সভায় জয়লাভের পর তাঁহার খ্যাতি সর্বত্র ছড়াইয়া পড়ে। শ্রীরামকৃষ্ণ উত্তর কলিকাতার সিঁথিতে নৈনারের (সিঁথির) ঠাকুরদের প্রমোদ কাননে ভক্ত কাপ্তেন বিশ্বনাথ উপাধ্যায়কে সঙ্গে লইয়া তাঁহাকে দর্শন করিতে যান। দয়ানন্দ ১৮৭৫ খ্রীষ্টাব্দে বোম্বাই শহরে প্রথম আর্যসমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। দেহত্যাগের পূর্বে তিনি প্রায় ১০০টি আর্যসমাজ আশ্রম প্রতিষ্ঠা করিয়া যান পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ, রাজপুতানা ও বোম্বাই ইত্যাদি স্থানে। তিনি জাতিভেদ প্রথা মানিতেন না। স্ত্রী পুরুষের সমান অধিকার, নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা সর্বদা স্বীকার করিতেন। তাঁহার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘সত্যার্থ প্রকাশ’।


●96>দারোয়ান — যদু মল্লিকের বাগানের দারোয়ান। শ্রীশ্রীঠাকুরের ভক্ত। শ্রীশ্রীঠাকুরের সমাধিস্থ অবস্থায় হাতপাখা লইয়া বাতাস করিয়াছিলেন। শ্রীশ্রীঠাকুরকে মাঝে মাঝে নিমন্ত্রণ করিয়া সেবা করাইতেন।


●97>দীন মুখুজ্জে (দীননাথ মুখার্জী) — উত্তর কলিকতার বাগবাজার নিবাসী ভক্তিমার্গের গৃহীসাধক। দীননাথের ঈশ্বর ভক্তির কথা জানিতে পারিয়া ঠাকুর স্বেচ্ছায় একদা মথুরামোহন বিশ্বাসের সহিত দীননাথের গৃহে উপস্থিত হন। কিন্তু সেদিন দীননাথের গৃহে উপনয়ন উপলক্ষে সকলে অত্যন্ত ব্যস্ত থাকায় ঠাকুর কাহাকেও আর ব্যতিব্যস্ত না করিয়া ফিরিয়া আসেন।


●98>দীননাথ খাজাঞ্চী — দক্ষিণেশ্বর-মন্দিরের খাজাঞ্চী (কোষাধ্যক্ষ)। ইনি কয়েকবার ঠাকুরের সমাধিস্থ অবস্থা প্রত্যক্ষ করেন।


●99>দুকড়ি ডাক্তার — শ্যামপুকুরে শ্রীশ্রীঠাকুরকে গলরোগের সময় দেখিতে আসিয়াছিলেন। রাজেন্দ্রনাথ মিত্রের বাড়িতে সমাধিস্থ ঠাকুরের চোখে অঙ্গুলি দিয়া তিনি ঠাকুরের সমাধি পরীক্ষা করিয়াছিলেন।


●100>দুর্গাচরণ ডাক্তার — দক্ষিণেশ্বর হইতে ঠাকুর ভক্তদের সাথে কলিকাতায় এই ডাক্তারকে দেখাইতে আসিয়াছিলেন। যদিও তিনি অতিমাত্রায় মদ্যপান করিতেন, তথাপি তাঁহার চিকিৎসার ব্যাপারে খুব হুঁশ থাকিত — ইহা শ্রীশ্রীঠাকুর উল্লেখ করিয়াছেন।


●101>দেবেন্দ্র (দেবেন্দ্রচন্দ্র ঘোষ) — শ্যামপুকুর নিবাসী দেবেন্দ্র ঠাকুরের একজন অনুরাগী ভক্ত। দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুরের কাছে যাতায়াত করিতেন এবং ঠাকুরের নিকট নানা উপদেশ গ্রহণ করিতেন।


●102>দেবেন্দ্র [মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর] (১৮৭১-১৯০৫) — ইনি মনীষী, পরম সাধক, আদিব্রাহ্মসমাজের প্রতিষ্ঠাতা ও বিখ্যাত নেতা। দেবেন্দ্রনাথ ব্রাহ্মসমাজে উপাসনার প্রচলন করেন। কেশবচন্দ্র সেন তাঁহার সংস্পর্শে আসেন। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঈশ্বরচিন্তা করেন শুনিয়া শ্রীরামকৃষ্ণদেব মথুরবাবুর সহিত একদা মহর্ষির বাড়িতে তাঁহাকে দেখিতে যান। প্রথম পরিচয়েই ঠাকুর মহর্ষির ভিতর সাধকের লক্ষণ দেখিতে পান। অত জ্ঞানী এবং ঈশ্বরোপাসক হওয়া সত্ত্বেও মহর্ষিকে সংসারের কাজে ব্যাপৃত দেখিয়া শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁহাকে ‘কলির জনক’ বলেন। ইহার পর তাঁহার অনুরোধে মহর্ষি তাঁহাকে বেদ হইতে কিছু কিছু শোনান। ঠাকুরের ধ্যানাবস্থায় দর্শনের সঙ্গে ইহার মিল ছিল। মহর্ষিও ঠাকুরের সহিত ধর্মালোচনায় প্রীত হন ও তাঁহাকে ব্রাহ্মসমাজের উৎসবে যোগ দিবার আমন্ত্রণ জানান। কথামৃতে ঠাকুর বহুবার মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের কথা উল্লখ করিয়াছেন।


●103>দেবেন্দ্র [দেবেন্দ্রনাথ মজুমদার] (১৮৪৪-১৯১১) — শ্রীশ্রীঠাকুরের গৃহীভক্ত। যশোহর জেলার নড়াইল মহকুমার জগন্নাথপুর গ্রামে ‘মজুমদার’ উপাধিধারী বন্দ্যোপাধ্যায় বংশে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা প্রসন্ননাথ, মাতা বামাসুন্দরী দেবী । প্রথম জীবন তাঁহার দারিদ্রের মধ্যে অতিবাহিত হওয়ায় তিনি কলিকতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে জমিদারী সেরেস্তায় চাকুরী গ্রহণ করেন। সাহিত্যে চর্চাও করেন। তিনি যোগাভ্যাস করিতেন, এই সময় বহু দেবদেবীর দর্শন হইত। ১৮৮৪ খ্রীষ্টাব্দে দক্ষিণেশ্বরে প্রথম শ্রীরামকৃষ্ণের দর্শন লাভ করেন। এই সময়ে পুস্তকে ‘পরমহংস রামকৃষ্ণ’ কথা দুইটি পড়িয়া তিনি এক মহা আকর্ষণে তৎক্ষণাৎ দক্ষিণেশ্বরে যাইয়া শ্রীরামকৃষ্ণের দেবদুর্লভ আচরণে মুগ্ধ হন। কিন্তু সেইদিনই তিনি আকস্মিক অসুস্থতা লিয়া কলিকাতায় ফিরিয়া আসেন। প্রবল জ্বরে শয্যাগত অবস্থায় তিনি শিওরে শ্রীরামকৃষ্ণকে দর্শন করিতেন। ইহার পর বলরাম বসুর গৃহে ঠাকুরকে পুনরায় দর্শন করিয়া তিনি তখন গৃহ হইতেই মাঝে মাঝে দক্ষিণেশ্বরে যাইতে আরম্ভ করেন। এই সময়ে কলিকাতায় নিজ গৃহে দেবেন্দ্রনাথ একদিন ঠাকুরকে সেবা করিয়াছিলেন। দেবেন্দ্রনাথ ‘সন্ন্যাস’ গ্রহণের জন্য ঠাকুরের নিকট প্রার্থনা জানাইলে ঠাকুর তাহাতে সম্মত হন নাই। পরবর্তী কালে “শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ অর্চনালয়” প্রতিষ্ঠা করিয়া দেবেনদ্রনাথ সেখানে তাঁহার স্বরচিত শ্রীরামকৃষ্ণ ভজন কীর্তনাদি পরিবেশনের ব্যবস্থা করেন এবং এই গানগুলিই পরে ‘দেবগীতি’ নামক পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়। তাঁহার বিখ্যাত “ভব সাগর তারণ কারণ” ইত্যাদি গুরুবন্দনা ও অন্যান্য ভক্তিমূলক ভজন বহুল গীত হইয়া থাকে।


●104>দ্বারিকানাথ (দ্বারিকানাথ বিশ্বাস) — মথুরবাবুর জ্যেষ্ঠ পুত্র ও শ্রীশ্রীঠাকুরের বিশেষ ভক্ত। তিনি পিতার ন্যায় শ্রীরামকৃষ্ণের পরম অনুরাগী ছিলেন। ঠাকুরও তাঁহাকে বিশেষ স্নেহ করিতেন। একদা দক্ষীণেশ্বরে আগত এক নেপালী ব্রহ্মচারিণীর কণ্ঠে ‘গীতগোবিন্দে’র গান শুনিয়া তিনি ঠাকুরের সম্মুখেই অশ্রুমোচন করিতে থাকিলে ঠাকুর তাঁহার ভক্তির প্রশংসা করিয়াছিলেন। একবার দ্বারিকানাথ তাঁহার মোকদ্দমা সংক্রান্ত প্রয়োজনে আগত ব্যারিস্টার কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তকে ঠাকুরের কাছে লইয়া গিয়াছিলেন। মাত্র ৪০ বৎসর বয়সে ইনি দেহত্যাগ করেন।


●105>দ্বিজ (দ্বিজ সেন) — কথামৃতকার শ্রীম-র শ্যালক। শ্রীরামকৃষ্ণের অনুরাগী ভক্ত। ১৮৮৪ খ্রীষ্টাব্দে শ্রীশ্রীঠাকুরের সহিত তাঁহার প্রথম সাক্ষাৎ হয়। দক্ষিণেশ্বরে যাতায়াতে দ্বিজর বাবার প্রবল আপত্তি ছিল। এ বিষয়ে ঠাকুরের সহিত পিতা আলোচনা করিতে আসিলে ঠাকুর মিষ্ট কথায় তাঁহাকে বুঝান যে অধ্যাত্মগুণসম্পন্ন পুত্র হওয়া পিতার পুণ্যের চিহ্ন। ঠাকুর তাঁহার নিকট দ্বিজর প্রশংসা করেন এবং দ্বিজকে দক্ষিণেশ্বরে আসার জন্য বাধা দিতে নিষেধ করেন। ঠাকুরের প্রতি দ্বিজর একান্ত অনুরাগকে তিনি পূর্ব সংস্কার বলিয়া উল্লেখ করিয়াছিলেন। ঠাকুর মাস্টার মহাশয়ের নিকট ইঁহার আধ্যাত্মিক উন্নতির কথা বলিয়াছিলেন।


●106>দ্বিজর পিতা (ঠাকুরচরণ সেন) — মাস্টার মহাশয়ের শ্বশুর ঠাকুরচরণ সেন শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে দক্ষিণেশ্বরে দর্শন করিয়াছিলেন। ইনি কেশবচন্দ্র সেনের জ্ঞাতিভ্রাতা। ইঁহার কন্যা শ্রীমতি নিকুঞ্জবালা দেবীর সহিত শ্রীমর বিবাহ হয়। সওদাগরী অফিসের ম্যানেজার ছিলেন।


●107>ধনী কামারিনী — মধুসূদন কর্মকারের কন্যা ধনীকামারিনী। উপনয়নের উপলক্ষে — ঠাকুরের ভিক্ষামাতা এবং মাতা চন্দ্রমণির ঘনিষ্ঠ সহচরী, কামারপুকুরে লাহাবাবুদের বাড়ির নিকটে এক ক্ষুদ্র কুটীরে এই বিধবা মহিলা বাস করিতেন। ১৮৩৬ খ্রীষ্টাব্দে ঠাকুর ভূমিষ্ঠ হইবার পরমুহূর্তেই ধনীই সদ্যোজাত শিশুকে ভস্মমাখা অবস্থায় উনুনের ভিতর হইতে উঠাইয়া লইয়া এই পৃথিবীতে অবতার পুরুষের প্রথম মুখদর্শন ও প্রথম তাঁহাকে কোলে লইবার পরম সৌভাগ্য অর্জন করেন। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ধনীকে ‘মা’ বলিয়া ডাকিতেন। উপনয়নের সময় তিনি অন্য সকলের মতের বিরুদ্ধে ধনীর নিকট হইতে সর্বাগ্রে ভিক্ষা গ্রহণ করিয়া তাঁহার পূর্বাভিলাষ পূরণে স্বীয় প্রতিশ্রুতি রক্ষা করিয়াছিলেন। ইহা শ্রীরামকৃষ্ণ-জীবনের একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। ভক্তিমতী ধাত্রীমাতা ও ভিক্ষামাতা শ্রীশ্রীঠাকুরকে বাৎসল্যভাবে অত্যন্ত স্নেহ করিতেন এবং অনেক সময়ে তাঁহাকে খাওয়াইয়া তৃপ্তি লাভ করিতেন।


●108>নকুড় আচার্য — কামারপুকুর অঞ্চলের অধিবাসী। শ্রীশ্রীঠাকুর তাঁহার নৃত্যসহ গানের প্রশংসা করিতেন।


●109>নকুড় বাবাজী — বৈষ্ণব ভক্ত, ভাল কীর্তনীয়া। কামারপুকুর গ্রামের অধিবাসী। কলকাতার ঝামাপুকুরে তাঁহার একটি দোকান ছিল। শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁহার জ্যেষ্ঠভ্রাতা রামকুমারের ঝামাপুকুরের বাসায় অবস্থানকালে মধ্যে মধ্যে নকুড়ের দোকানে গিয়া বসিতেন। দেশের লোক হিসেবে নকুড় তাঁহাকে বিশেষ আপ্যায়ন করিতেন। পানিহাটীর রাঘব পণ্ডিতের বিখ্যাত চিঁড়া মহোৎসবে তিনি প্রতিবছর যোগদান করিতেন এবং কীর্তন করিতেন। ফিরিবার পথে দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুরের সহিত তাঁহার প্রতিবার সাক্ষাৎ হইত এবং তিনি পূর্ব পরিচয় অক্ষুণ্‌ণ রাখিতেন।


●110>নগেন্দ্র (নগেন্দ্রনাথ মিত্র) — সুরেন্দ্রনাথ মিত্রের ভ্রাতুষ্পুত্র। দক্ষিণেশ্বরে ও স্বগৃহে তাঁহার শ্রীরামকৃষ্ণকে দর্শন করিবার সৌভাগ্য হইয়াছিল।


●111>নগেন্দ্রনাথ গুপ্ত (১৮৬২-১৯৪০) — বিহার প্রদেশের মতিহারিতে নগেন্দ্রনাথের জন্ম। পিতা মথুরনাথ আরা জেলার সাবজজ ছিলেন। বাল্যেই নগেন্দ্রনাথ নরেন্দ্রনাথের সহিত পরিচিত ছিলেন। উভয়ে একসঙ্গে জেনারেল এসেমব্লিজ ইনস্টিটিউশনে অধ্যয়ন করিতেন। সাংবাদিক ও সাহিত্যিক রূপে তিনি সমধিক খ্যাতি লাভ করিয়াছিলেন। নগেন্দ্রনাথ কেশবচন্দ্রের সহিত স্টীমবোটে সোমড়া পর্যন্ত ভ্রমণকালে (১৮৮১ খ্রীষ্টাব্দে) শ্রীরামকৃষ্ণদেবের সান্নিধ্য লাভ করেন। ঠাকুরের কথা বলার মধুর ভঙ্গি, সাধারণ কথ্য ভাষার বাস্তব উদাহরণের সহিত গভীর ধর্মতত্ত্বের কথা বলার বৈশিষ্ট্য তিনি পরম কৌতুহলের সহিত লক্ষ্য করেন। শ্রীরামকৃষ্ণের স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিরবচ্ছিন্ন জ্ঞান ও ভক্তিপ্রসঙ্গ আলোচনা করিবার ধারাও নগেন্দ্রনাথকে মুগ্ধ করে। যদিও নগেন্দ্রনাথ মাত্র একবারই ঠাকুরকে দর্শন করেন তবুও এই ঘটনাই তাঁহার মনে গভীর রেখাপাত করে। তিনি একটি প্রবন্ধে ঠাকুরের চেহারা হুবুহু বর্ণনা দিয়াছেন। শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত প্রণেতা মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত নগেন্দ্রনাথের এই ভ্রমণের বিবরণ শুনিয়া অনুপ্রাণিত হইয়াছিলেন। তাহার কিছুকাল পরেই মহেন্দ্রনাথ শ্রীরামকৃষ্ণকে দর্শন করেন। প্রবুদ্ধ ভারত, উদ্বোধন, মডার্ণ রিভিউ প্রভৃতি পত্র-পত্রিকায় নগেন্দ্রনাথ শ্রীরামকৃষ্ণ সম্পর্কে কয়েকটি প্রবন্ধ লেখেন। মডার্ণ রিভিউতে নগেন্দ্রনাথের লেখা শ্রীরামকৃষ্ণের সমাধির বর্ণনা পড়িয়া মনীষী রোমা র‌্যোঁলা মুগ্ধ হন।


●112>নটবর (নটবর গোস্বামী) — হুগলী জিলার ফুলুই শ্যামবাজারের পার্শ্ববর্তী বেলটে গ্রামের অধিবাসী। ঠাকুরের অনুরাগী বৈষ্ণব ভক্ত। ঠাকুর নটবর গোস্বামীর গৃহে একবার গিয়াছিলেন। ঠাকুর তাঁহার ভাগ্নে হৃদয়ের সহিত সে সময়ে সাতদিন গোস্বামীজীর গৃহে ছিলেন। গোস্বামীজী ও তাঁহার স্ত্রী উভয়েই ভক্তিভরে ঠাকুরে সেবা করিতেন। ফুলুইয়ে বহু বৈষ্ণবের বাস ছিল এবং তাঁহারা প্রতিদিনই সংকীর্তন করিতেন। ঠাকুরকে সংকীর্তন শুনাইবার বাসনায় গোস্বামীজী নিকটবর্তী স্থান রামজীবনপুর ও কৃষ্ণগঞ্জের বিখ্যাত কীর্তনীয়া ও মৃদঙ্গবাদককে আনয়ন করিয়াছিলেন। শ্রীশ্রীঠাকুরের ভাবসমাধি দর্শনে বৈষ্ণবগণ বিশেষভাবে আকৃষ্ট হইয়াছিলেন। ‘যোগমায়ার আকর্ষণ’ কাহাকে বলে — ইহা ওইখানে ঠাকুর প্রত্যক্ষ করিয়াছিলেন।


●113>নন্দ বসু (নন্দলাল বসু) — ধনী ব্যক্তি। বাগবাজারে বাড়ি। তাঁহার গৃহে নানা দেবদেবীর সুন্দর ছবি আছে জানিতে পারিয়া ১৮৮৫ সালে বলরাম বসুর বাড়ি হইতে তথায় যান। অনেকক্ষণ ধরিয়া সেই সব ছবি দেখিয়া গৃহস্বামী এবং তাঁহার ভাই পশুপতি বসুর সহিত ঈশ্বরীয় প্রসঙ্গ করেন। ঠাকুর ওই ছবিগুলির প্রশংসা করিয়া নন্দবাবুকে যথার্থ হিন্দু বলিয়া সাধুবাদ দিয়াছিলেন।


●114>নন্দলাল সেন — কেশবচন্দ্র সেনের ভ্রাতুষ্পুত্র। কেশবচন্দ্রের মাধ্যমে শ্রীরামকৃষ্ণের সংস্পর্শে তিনি আসেন। শ্রীশ্রীঠাকুরকে কয়েকবার দর্শন করেন। ১৮৮২ সালের ২৭শে অক্টোবর কেশবচন্দ্র সেন ঠাকুরকে এবং আরো অনেককে লইয়া স্টীমারে গঙ্গাভ্রমণের ব্যবস্থা করেন। নন্দলাল সেই দলে ছিলেন। তিনি সেদিন ঠাকুরের ভাবাবিষ্ট অবস্থার প্রত্যক্ষদর্শী এবং বহু আধ্যাত্মিক আলোচনার শ্রোতা হন। নন্দলাল পরবর্তী কালে কেশবচন্দ্র সেনের ও ঠাকুরের অনুগামী ভক্ত হীরানন্দের সহিত সিন্ধু প্রদেশে যান এবং সেখানে সমাজসেবী ও শিক্ষাব্রতী হিসাবে সুনাম অর্জন করেন।


●115>নন্দিনী (নন্দিনী মল্লিক) — ব্রাহ্মভক্ত মণিলাল মল্লিকের বিধবা কন্যা। তিনি ধর্মপরায়ণা ছিলেন এবং ঠাকুরকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করিতেন। এক সময়ে তিনি কিছুতেই ধ্যানে মনঃসংযোগ করিতে পারিতেন না। ঠাকুর এই সমস্যার কথা শুনিয়া তাঁহাকে তাঁহার সর্বাপেক্ষা প্রিয় পাত্রকেই (ভ্রাতুষ্পুত্র) বালগোপাল ভাবিয়া সেবা করিতে নির্দেশ দিয়াছিলেন। ঠাকুরের আদিষ্ট পথ অবলম্বনে ইঁহার আধ্যাত্মিক উন্নতি হইয়াছিল।


●116>নফর বন্দ্যোপাধ্যায় — শিওড় নিবাসী সঙ্গতি সম্পন্ন ভক্তিমান ব্যক্তি। শ্রীরামকৃষ্ণ একবার শিওড় গিয়া কীর্তনানন্দে বিভোর হইয়া পড়েন। নফর সেই সময় শ্রীরামকৃষ্ণের সেবা করিয়া ধন্য হইয়াছিলেন।


●117>নবকুমার — বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর সঙ্গী। নবকুমার দক্ষিণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণকে দর্শন করেন। এবং সেই সময় শ্রীরামকৃষ্ণের মুখে ঈশ্বরীয় প্রসঙ্গাদি শুনেন। পরে বলরাম বসুর সহিত একই নৌকাতে কলিকাতা ফিরেন। আর একদিন ঠাকুরের নিকট ভক্ত সমাগম দেখিয়া দম্ভভরে দরজার কাছ হইতে চলিয়া যাওয়ায়, ঠাকুর তাঁহাকে অহঙ্কারের প্রতিমূর্তি বলিয়া মন্তব্য করিয়াছিলেন।


●118>নবগোপাল ঘোষ (১৮৩২ - ১৯০৯) — হুগলী জেলার বেগমপুরে গ্রামে জন্ম। শ্রীরামকৃষ্ণের পরমভক্ত। নবগোপাল বাদুড় বাগানের বাসিন্দা। প্রথমবার ঠাকুরকে দর্শনের পর বহুদিন তিনি ঠাকুরের সঙ্গে আর যোগাযোগ করেন নাই। ঠাকুরই তাঁহার বন্ধু কিশোরীর কাছে তাঁহার খবর জানিতে চাহিলে নবগোপাল তাঁহার মত একজন সাধারণ মানুসকেও ঠাকুর স্মরণে রাখিয়াছেন জানিয়া বিস্মিত ও পুলকিত হন। তিনি সস্ত্রীক ঠাকুরকে দর্শন করিতে আসেন। তাঁহার গৃহ ঠাকুরের পদধূলিতে ও নৃত্য গীতে ধন্য হইয়াছিল। নবগোপাল ঠাকুরের মধ্যে শ্রীচৈতন্য রূপ দেখিতে পান। ১৮৮৬-র ১লা জানুয়ারি ঠাকুর যখন কল্পতরু হইয়া সকলকে আশীর্বাদ করিতেছিলেন সেই সময় নবগোপালও উপস্থিত ছিলেন। সেইদিন সমাধিস্থ অবস্থায় তিনি নবগোপালকে তাঁহার নাম বারংবার উচ্চারণ করিতে বলেন। তাহার পর হইতে নবগোপালের মুখে সবসময় “জয় রামকৃষ্ণ” ধ্বনি লাগিয়াই থাকিত। ১৮৯৮ সালে হাওড়ায় নবগোপালের নবনির্মিত গৃহে স্বামী বিবেকানন্দ কর্তৃক শ্রীরামকৃষ্ণের প্রতিকৃত স্থাপিত হয়। সেই শুভমুহূর্তে স্বামীজী “ওঁ স্থাপকায় চ ধর্মস্য সর্বধর্মস্বরূপিণে। অবতারবরিষ্ঠায় রামকৃষ্ণায় তে নমঃ ৷৷” প্রণাম মন্ত্রটি রচনা করেন। সেইসময় বিবেকানন্দের গুরুভাইদের মধ্যেও অনেকেই সেখানে উপস্থিত ছিলেন। নবগোপালের স্ত্রী নিস্তারিণী দেবীকে শ্রীরামকৃষ্ণ বিশেষ স্নহ করিতেন। শ্রীসারদা দেবীও বলিয়াছিলেন — “নবগোপালের পরিবার বড় শুদ্ধ।”


●119>নবদ্বীপ গোস্বামী — ১৮৮৩ সালে পানিহাটীতে রাঘব পণ্ডিতের চিড়ার মহোৎসবে শ্রীরামকৃষ্ণ যোগ দিতে গেলে সেখানে নবদ্বীপ গোস্বামী তাঁহার দর্শন লাভ করেন। সেখানে মণিমোহন সেনের বাড়িতে উভয়ের মধ্যে ধর্মালোচনা হয়। এই উপলক্ষে ঠাকুর গীতার সার কথা “ত্যাগী” বলিলে নবদ্বীপ গোস্বামী তাহা প্রমাণ সহ সমর্থন করেন।


●120>নবাই চৈতন্য — প্রকৃত নাম নবগোপাল মিত্র। শ্রীরামকৃষ্ণের গৃহীভক্ত মনোমোহন মিত্রের জ্যেষ্ঠতাত। তিনি দক্ষিণেশ্বরে প্রায়ই আসিতেন এবং শ্রীশ্রীঠাকুরের কথামৃত শ্রবণপূর্বক উচ্চ সংকীর্তনাদি করিতেন। পানিহাটীর উৎসবে শ্রীশ্রীঠাকুরের বিশেষ কৃপালাভ করিয়া ধন্য হন। তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের দর্শন ও কৃপালাভ করিবার পরে সংসারের ভার পুত্রের উপর দিয়া কোন্নগরে গঙ্গাতীরে পর্ণকুটিরে দিবারাত্র জপধ্যান ও কীর্তনাদি করিতেন। ১৮৮২ খ্রীষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁহার গৃহে পদার্পণ করিয়াছিলেন।


●121>নবীন নিয়োগী (নবীনচন্দ্র নিয়োগী) — দক্ষিণেশ্বর নিবাসী ভক্ত নবীন নিয়োগী প্রায়ই ঠাকুরকে দর্শন করিতে আসিতেন। ১৮৮৪ খ্রীষ্টাব্দের ৫ই অক্টোবর নবীন নিয়োগীর গৃহে আয়োজিত নীলকণ্ঠ মুখার্জীর যাত্রা উপলক্ষে ঠাকুরের পদার্পণ হয়। সেদিন ঠাকুর নবীনচন্দ্র ও তাঁহার পুত্রের ভক্তির প্রশংসা করেন। ঠাকুর বলিয়াছিলেন তাঁহার যোগ ও ভোগ দুইই আছে। দুর্গাপূজার সময় নবীন ও তাঁহার পুত্র মা-দুর্গাকে ব্যজন করিতেন। সাধনকালে দক্ষিণেশ্বরে ভৈরবী ব্রাহ্মণীকে ঠাকুর মণ্ডল ঘাটে থাকিবার অনুরোধ করিয়াছিলেন। ভৈরবীর সেখানে অবস্থানকালে নবীন নিয়োগীর ভক্তিমতী স্ত্রী তাঁহার সেবা ও যত্নের সুব্যবস্থা করিয়াছিলেন।


●122>নবীন সেন — কেশবচন্দ্র সেনের জেষ্ঠ ভ্রাতা। তাঁহার কলুটোলার বাড়িতে কেশবের মাতাঠাকুরানীর নিমন্ত্রণে ঠাকুর শুভাগমন করিয়াছিলেন এবং ব্রাহ্মভক্তদের হিত কীর্তন করিয়াছিলেন।


●123>নরেন্দ্র [নরেন্দ্রনাথ দত্ত] (১৮৬৩ - ১৯০২) — ইনি পরবর্তী জীবনে শ্রীরামকৃষ্ণসঙ্ঘে বিশ্ববিখ্যাত স্বামী বিবেকানন্দ নামে পরিচিত। পিতা বিশ্বনাথ দত্ত প্রখ্যাত অ্যাটর্নী ছিলেন। তিনি খুব উদার মনোভাবাপন্ন এবং প্রবল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ ছিলেন। মাতা ভুবনেশ্বরী অতিশয় ভক্তিমতী মহিলা ছিলেন। রামায়ণ-মহাভারত ও পুরাণাদি গ্রন্থপাঠে তাঁহার বিশেষ দখল ছিল। বীরেশ্বর শিবের কৃপায় তিনি পুত্র নরেন্দ্রনাথকে পাইয়াছিলেন। পুত্রের উপর মায়ের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। নরেন্দ্রনাথ অতিশয় মেধাবী এবং তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন ছাত্র ছিলেন। বালক নরেনের বুদ্ধিমত্তায় সকলেই মুগ্ধ ও বিস্মিত হইতেন। সমবয়স্ক ছাত্রদের মধ্যে নরেন্দ্রনাথ ছিলেন ধ্যানপ্রবণ, প্রত্যুৎপন্নমতি এবং অসমসাহসিক ও হৃদয়বান নেতা। একাধারে অনেক গুণের অধিকারী। বাল্যকাল হইতে সত্যনিষ্ঠা এবং দেবদেবীর প্রতি অনুরাগ নরেন্দ্রনাথের মধ্যে বিশেষ লক্ষিত হয়। কলেজের পাঠকালেই ঈশ্বরান্বেষী যুবক নরেন্দ্রনাথ একজন প্রকৃত ঈশ্বরদ্রষ্টাকে খুঁজিয়া বেড়াইতেছিলেন। মন সময়ে ব্রাহ্মধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হইয়া তিনি বহু মনীসীর সান্নিধ্য লাভেও তৃপ্ত হন নাই। অবশেষে দক্ষিণেশ্বরে নরেন্দ্রনাথ শ্রীরামকৃষ্ণের মধ্যে সেই আকাঙ্খিত ঈশ্বরদ্রষ্টার সাক্ষাৎলাভ করেন। শ্রীরামকৃষ্ণ ওই সাক্ষাৎকালে নরেন্দ্রনাথকে জানিতে পারেন যে এই সেই চিহ্নিত ঋষি যিনি লোকহিতার্থে পৃথিবীতে আসিয়াছেন। নরেন্দ্র সেই দিনেই তাঁহার এতদিনের প্রশ্নের উত্তর শ্রীরামকৃষ্ণের নিকট হইতে মহূর্তমধ্যে পাইয়া যান। শ্রীরামকৃষ্ণের দৃঢ়কণ্ঠের উত্তর — তিনি ঈশ্বরকে দর্শন করিয়াছেন; ভগবানকে তিনি নিজেই শুধু দেখেন নাই, অপরকেও দেখাইতে পারেন। শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁহার আধ্যাত্মিক সাধনার সকল শক্তি নরেন্দ্রনাথকে অর্পণ করিয়া মহাসমাধি লাভ করেন। শ্রীরামকৃষ্ণের তিরোধানের পরে শ্রীরামকৃষ্ণের যুবক ভক্তদের একত্র করিয়া বরাহনগর মঠে সন্ন্যাস গ্রহণপূর্বক প্রথমে বিবিদিষানন্দ পরে সচ্চিদানন্দ ও শেষে বিবেকানন্দ নামে তিনি পরিচিত হন। তারপর পরিব্রাজক রূপে ভারতের সর্বত্র পরিভ্রমণ করিয়া দেশের বাস্তবরূপের সহিত তাঁহার প্রত্যক্ষ পরিচয় হিয়াছিল। অবশেষে মাদ্রাজের যুবক ভক্তদের উৎসাহ-উদ্দীপনায় বিবেকানন্দ আমেরিকার শিকাগো শহরে আয়োজিত বিশ্বধর্ম মহাসভায় যোগদান করিতে রওনা হন ১৮৯৩ খ্রীষ্টাব্দের ৩১শে মে। অনেক অসুবিধার মধ্যে অগ্রসর হইয়া শেষ পর্যন্ত তিনি উক্ত সম্মেলনে হিন্দুধর্মের প্রতিনিধিরূপে যোগদান করিয়া হিন্দুধর্মের মহিমা ঘোষণা করেন। উক্ত সম্মেলনে বক্তৃতা দিয়া জগৎসভায় ভারতের প্রতিষ্ঠাপূর্বক বিপুল সাফল্য লাভ করেন। আমেরিকার নানা স্থানে ঘুরিয়া ভারতীয় ধর্ম, সংস্কৃতি, দর্শন ও বেদান্তের প্রচার করা এই সময়ে তাঁহার একমাত্র লক্ষ্য হইয়া দাঁড়ায়। ইউরোপেও তিনি বেদান্ত প্রচার করেন। ১৮৯৭ খ্রীষ্টাব্দে ভারতে ফিরিলে কলম্বো হইতে আলমোড়া পর্যন্ত সর্বত্র অভূতপূর্ব অভ্যর্থনা লাভ করেন। নানাস্থানে বক্তৃতার পরে ভাবী রামকৃষ্ণ মিশন গঠনের কাজে উদ্যোগী হন এবং ১৮৯৭ খ্রীষ্টাব্দের ১লা মে রামকৃষ্ণ মিশনের প্রতিষ্ঠা করেন।


●124>নরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় — অধ্যাপক রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুত্র। তিনি স্ত্রী-পুত্র সহ শ্যামপুকুরে বাস করিতেন। এবং মাঝে মাঝে দক্ষিণেশ্বরে আসিয়া ঠাকুরের সঙ্গলাভে নিজেকে ধন্য মনে করিতেন।


●125>নরোত্তম — কীর্তনীয়া। ঠাকুরের ভক্তেরা নিজেদের গৃহে উৎসবের ব্যবস্থা করিলেই কীর্তনগানের জন্য নরোত্তমকে আমন্ত্রণ করিতেন। ঠাকুর এই কীর্তনীয়াকে খুব স্নেহ করিতেন।


●126>নারায়ণ — কলিকাতার সঙ্গতিপন্ন ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান। সরল ও পবিত্র স্বভাবের জন্য ঠাকুর তাঁহাকে খুব স্নেহ করিতেন। নারায়ণ কথামৃত প্রণেতা মহেন্দ্রনাথ গুপ্তের ছাত্র। বাড়ির লোকের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও দৈহিক নির্যাতন সহ্য করিয়া তিনি দক্ষিণেশ্বরে আসিতেন। তাঁহার প্রতি এই শারীরিক অত্যাচারের জন্য ঠাকুর ব্যাথা বোধ করিতেন। অল্প বয়সেই নারায়ণ দেহত্যাগ করেন।


●127>নারায়ণ শাস্ত্রী — রাজস্থানের অধিবাসী। দার্শনিক, পণ্ডিত এবং ঠাকুরের ভক্ত। সাধনকালে তিনিঠাকুরের দিব্যোন্মত্ত অবস্থা দেখিয়াছিলেন। পরে নবদ্বীপ হইতে নবন্যন্যায়ে ব্যুৎপত্তি লাভ করিয়া ফিরিবার পথে ঠাকুরের ভাবময় মূর্তি ও সমাধি দর্শন করিয়া তাঁহার প্রতি আকৃষ্ট হন। তিনি ঠাকুরের মধ্যে শাস্ত্রের সূক্ষ্ম বিষয় সমূহ উপলব্ধ লক্ষ্য করিয়াছিলেন। ঠাকুরের ভাবে আকৃষ্ট হইয়া তিনি দক্ষিণেশ্বরে থাকিয়া যান। পরে ঠাকুরের নিকট সন্ন্যাস গ্রহণ করেন এবং বশিষ্ঠাশ্রমে তপস্যা করিতে চলিয়া যান। ১৮৭৫ খ্রীষ্টাব্দে কেশবের সহিত ঠাকুরের মিলনের আগে তিনি ঠাকুরের নির্দেশে কেশবচন্দ্রের সঙ্গে দেখা করেন এবং ঠাকুরকে জানান যে কেশব জপে সিদ্ধ। দক্ষিণেশ্বরে মাইকেল মধুসূদনের সহিত শ্রীরামকৃষ্ণের সাক্ষাতের সময় শাস্ত্রীজী সেখানে উপস্থিত থাকিয়া মাইকেলের সঙ্গে সংস্কৃতে কথা বলেন।


●128>নিতাই মল্লিক — ডাক্তার নিতাই মল্লিক দক্ষিণেশ্বরে শ্রীশ্রীঠাকুরকে দর্শন করিয়াছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণের উপদেশও তিনি শুনিয়াছিলেন।


●129>নিত্যগোপাল [নিত্যগোপাল বসু — জ্ঞানানন্দ অবধূত] (১৮৫৫ - ১৯১১) — শ্রীরামকৃষ্ণের স্নেহধন্য ভক্ত। রামচন্দ্র এবং মনোমোহন মিত্রের মাসতুতো ভাই। তুলসীচরণ দত্ত (পরে স্বামী নির্মলানন্দ) নিত্যগোপালের ভাগিনেয়। কলিকাতা আহিরীটোলায় বিখ্যাত বসু বংশের সন্তান। পিতা জনমেজয়, মাতা গৌরী দেবী। নিত্যগোপাল কখনো একা কখনো রামচন্দ্রের সহিত ঠাকুরকে দর্শন করিতে আসিতেন। তিনি সর্বদা ভগবদ্ভাবে বিভোর হইয়া থাকিতেন। শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁহার আধ্যাত্মিক অবস্থা লক্ষ্য করিয়া তাঁহাকে অত্যন্ত স্নেহ করিতেন। ঠাকুর তাঁহার অবস্থা দেখিয়া তাঁহার সম্পর্কে ‘পরমহংস অবস্থা’ বলিতেন। ঠাকুর তাঁহার সম্বন্ধে বলিতেন যে তাঁহার আধ্যাত্মিক অনুভূতিলাভ বিশেষ সাধন-ভজনাদির উদ্যোগ ব্যতীতই হয়। নিত্যগোপালের পৃথক ভাবে জন্য ঠাকুর তাঁহার অন্যান্য ভক্তদের তাঁহার সঙ্গে মিশিতে নিষেধ করিতেন। বলিতেন, “ওর ভাব আলাদা, ও এখানকার লোক নয়।” ঠাকুরের তিরোধানের পর ঠাকুরের অস্থিভস্ম কাঁকুড়গাছির যোগোদ্যানে রাখা হয় এবং নিত্যগোপাল তখন পাঁচ-ছয় মাস কাল ঠাকুরের নিত্যপূজা করিতেন। নিত্যগোপাল সেইসময়ে দিনের অধিকাংশ সময় ধ্যান করিয়া কাটাইতেন। তিনি ‘জ্ঞানানন্দ অবধূত’ নাম গ্রহণ করেন। ১১৩ নং রাসবিহারী এভেনিউতে ‘মহানির্বাণ মঠ’ স্থাপন করেন। পানিহাটিতে তাঁহার প্রতিষ্ঠিত অন্য মঠের নাম কৈবল্য মঠ। তাঁহার রচিত প্রায় ২৫ খানা গ্রন্থের মধ্যে কিছু কিছু ইংরেজীতে অনূদিত হইয়াছে।


●130>নিরঞ্জন [নিত্যনিরঞ্জন ঘোষ — স্বামী নিরঞ্জনানন্দ] (১৮৬২ - ১৯০৪) — নিরঞ্জনের জন্ম ২৪ পরগণার রাজারহাট বিষ্ণুপুরে। তিনি শ্রীরামকৃষ্ণ সঙ্ঘে স্বামী নিরঞ্জনানন্দ নামে সুপরিচিত। শ্রীরামকৃষ্ণের ১৬ জন ত্যাগী সন্তানের মধ্যে স্বামী নিরঞ্জনানন্দ অন্যতম ও ছয় জন ঈশ্বরকোটির অন্যতম। নিরঞ্জনের বাল্যকাল মাতুলালয়ে কাটে। তাঁহার অতি সুন্দর চেহারা ব্যায়ামাদির ফলে সুদীর্ঘ, সবল ও সুঠাম ছিল। তাঁহার প্রকৃতি ও অনুরূপ নির্ভীক ও বীরভাবাপন্ন ছিল। শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে আসিবার পূর্বে তিনি এক প্রেততত্ত্বান্বেষী দলের সহিত যুক্ত ছিলেন। এই প্রেততত্ত্বানুসন্ধিৎসু জনকয়েক বন্ধুর সহিত নিরঞ্জন প্রথম দক্ষিণেশ্বরে আসেন। প্রথম দর্শনে নিরঞ্জন দেখেন শ্রীরামকৃষ্ণ ভক্তপরিবেষ্টিত হইয়া বসিয়া আছেন। সন্ধ্যায় সকলে উঠিয়া গেলে শ্রীরামকৃষ্ণ নিরঞ্জনের এমন অনতরঙ্গভাবে খবর নেন, যেন কতকালের পরিচিত। সেই সময়ই তিনি নিরঞ্জনকে জানাইয়া দেন যে, মানুষ ভূত ভূত করিতে থাকিলে ভূত হইয়া যায়, আর ভগবান ভগবান করিলে মানুষই ভগবান হইয়া যায়। সঙ্গে সঙ্গে নিরঞ্জন স্থির করিলেন যে, ভগবান ভগবান করাই তাঁহার জীবনের লক্ষ্য হওয়া উতিত। প্রথম দিন হইতেই নিরঞ্জনের সরলতা শ্রীরামকৃষ্ণের মন জয় করে। নিরঞ্জনের সরলতা ও বৈরাগ্যের জন্য ঠাকুর তাঁহার প্রতি কতখানি স্নেহপরায়ণ ছিলেন তাহার উদাহরণ কথামৃতের বহু জায়গায় দেখা যায়। বলরামভবনে একদিন বলিয়াছিলেন, “দেখ না নিরঞ্জন কিছুতেই লিপ্ত নয়।” এছাড়া আরও অনেক গুহ্য কথা বলিয়াছিলেন নিরঞ্জন সম্পর্কে। দক্ষিণেশ্বরে একদিন ঠাকুর নিরঞ্জনকে আলিঙ্গন করিয়া আকুলস্বরে ভগবান লাভের জন্য ব্যগ্র হইতে বলিয়াছিলেন। নিরঞ্জন এই ভালবাসায় অভিভূত হন। শ্রীরামকৃষ্ণের প্রতি তাঁর ত্যাগী সন্তানদের এমন প্রাণঢালা ভালবাসা ছিল, যার উদাহরণ নিরঞ্জনের ভাষায়, “আগে ভালবাসা ছিল বটে কিন্তু এখন ছেড়ে থাকতে পারবার যো নাই।” কর্তব্যানুরোধে ও বৈরাগ্যের আবেগে নিরঞ্জনকে আপাতদৃষ্টিতে কঠোর মনে হইলেও তাঁহার চরিত্রে কোমলতার অভাব ছিল না। এককথায় প্রয়োজন বোধে তিনি যেমন বজ্রাদপি কঠোর হইতেন, তেমনি আবার কুসুমাদপি মৃদুও হইতে পারিতেন। ১৮৮৭ খ্রীষ্টাব্দের প্রথম ভাগে সন্ন্যাস গ্রহণের পরে তিনি স্বামী নিরঞ্জনানন্দ নামে অভিহিত হন। স্বামী নিরঞ্জনানন্দের তপস্যার দিকেই বেশি ঝোঁক ছিল। তবে গুরুভাইদের কাহাকেও অসুস্থ দেখিলে তিনি সেখানে ঝাঁপাইয়া পড়িতেন। তাঁহার শেষ সময় হরিদ্বারে অতিবাহিত হয়।


●131>নিরঞ্জনের ভাই — স্বামী নিরঞ্জনানন্দের পূর্বাশ্রমের ভাই। ১৮৮৪ খ্রীষ্টাব্দে কালীপূজার দিনে দক্ষিণেশ্বরে তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের সম্মুখে ধ্যান করিয়াছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁহার সেই ধ্যানের প্রশংসা করেন।


●132>নীলকণ্ঠ [নীলকণ্ঠ মুখোপাধ্যায়] (১৮৪১ - ১৯১১) — ইনি বর্ধমানের ধরণী গ্রাম নিবাসী বিখ্যাত যাত্রাওয়ালা। গোবিন্দ অধিকারীর যাত্রা দলে প্রথম ছিলেন। সুগায়ক নীলকণ্ঠ কৃষ্ণযাত্রায় দূতীর ভূমিকায় অভিনয় করিতেন। তিনি সংস্কৃত ভাল জানিতেন। গোবিন্দ অধিকারীর মৃত্যুর পর তিনি তাঁহার যাত্রা দলের মালিক হন। কবিত্ব শক্তির জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তাঁহার রচিত ‘কৃষ্ণযাত্রা’ বর্ধমান, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ এবং বাঁকুড়ায় খুব খ্যাতিলাভ করিয়াছিল। ‘কালীর দমন’ (কৃষ্ণলীলা) নীলকণ্ঠের রচিত শ্রেষ্ঠ পালা। তিনি নিজে ওই যাত্রায় রাধার সখীরূপে অত্যন্ত সুন্দর অভিনয় ও গান করিতেন। নবদ্বীপের পণ্ডিতদের নিকট হইতে ‘গীতরত্ন’ উপাধি লাভ করেন। নীলকণ্ঠ দক্ষিণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণকে গান শুনাইয়া মুগ্ধ করেন। ঠাকুরও তাঁহাকে গান শুনাইয়া ধন্য করিয়াছিলেন। নীলকণ্ঠের যাত্রা অনুষ্ঠান দেখিতে আগ্রহী শ্রীরামকৃষ্ণ হাটখোলার বারোয়ারী তলায় গিয়াছিলেন। পরে আর একবার ঠাকুর ১৮৮৪ খ্রীষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে নবীন নিয়োগীর গৃহে আমন্ত্রিত হইয়া নীলকণ্ঠের যাত্রা শুনেন। সেদিনও তিনি সমাধিস্থ হন। নীলকণ্ঠ ঠাকুরকে প্রশ্ন করেন যে, তাঁহার মতো সংসারী জীবের গতি কি। ঠাকুর তাঁহাকে বলেন যে, তিনি (নীলকণ্ঠ) ভগবান দ্বারা পরিচালিত হইয়াই তাঁহার নামগান, ভক্তিরসের ধারা সাধারণ মানুষের মনে পৌঁছাইয়া দিতেছেন। তাহার পর তিনি নীলকণ্ঠকে মায়ের গান করিতে অনুরোধ করিলেন। মধুর কণ্ঠে গান শুনিয়া তিনি ভাববিভোর হইয়া নৃত্য করিতে আরম্ভ করেন। এইভাবে নীলকণ্ঠ তাঁহার গানের যথার্থ পুরস্কার পাইলেন। ঠাকুর তাঁহাকে বলিয়াছিলেন যে, দুর্লভ রত্ন নীলকণ্ঠের নিজের কাছেই আছে।


●133>নীলমণিবাবু — অধ্যাপক। ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকারের সহিত শ্যামপুকুরে আসিয়া শ্রীরামকৃষ্ণকে দর্শন করেন এবং তাঁহার কথামৃত পান করেন।


●134>নীলমাধব সেন (গাজীপুরের ব্রাহ্মভক্ত) — তিনি গাজীপুর হইতে ঠাকুরকে দর্শন করিতে আসিয়াছিলেন। কেশবচন্দ্র সেন এবং তাঁহার ব্রাহ্মভক্তদের সহিত ঠাকুর যখন গঙ্গাবক্ষে ভ্রমণ করিতেছিলেন, সেই সময় নীলমাধব সেনও উপস্থিত ছিলেন। ঠাকুর সমাধিস্থ হইয়াছিলেন। ধীরে ধীরে তিনি বাহ্যজগতে ফিরিয়া আসিতেছিলেন, তখন নীলমাধব ও অপর একজন ভক্ত ঠাকুরের ছবি ঘরে রাখেন। তাহাদের কথা শুনিয়া ঠাকুর স্মিত হাসেন এবং নিজের দেহের দিকে অঙ্গুলি সংকেত করিয়া বলেন যে শরীরটা কেবলমাত্র খোল।


●135>ন্যাংটা (তোতাপুরী) — শ্রীরামকৃষ্ণদেবের অদ্বৈত বেদান্ত সাধনার গুরু। পাঞ্জাবের লুধিয়ানা মঠের পুরীনামা দশনামা সম্প্রদায়ভুক্ত অদ্বৈতবাদী নাগা সন্ন্যাসী। দীর্ঘ ৪০ বৎসর সাধনার পর নির্বিকল্প সমাধিলাভ করিয়াছিলেন। উত্তর-পশ্চিম ভারত হইতে পুরী ও গঙ্গাসাগর তীর্থ করিয়া ফিরিবার পথে তিনি ১৮৬৫ খ্রীষ্টাব্দে দক্ষিণেশ্বরে আসেন। এখানে ঠাকুরের সহিত তাঁহার সাক্ষাৎকার হয়। তোতাপুরী বাল্যকাল হইতেই সন্ন্যাসীদের মঠে ছিলেন। এই সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসীরা দিগম্বর থাকিতেন বলিয়া (ন্যাংটা) নাগা বা নাংগা সাধু সম্প্রদায় বলা হইত। তোতা অল্প বয়সেই গুরুর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং বিশেষ যত্ন সহকারে শিক্ষাপ্রাপ্ত হন। অল্প সময়ের মধ্যে বহু শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। বহুদিন নর্মদাতীরে কৃচ্ছ্রসাধন করেন এবং অবশেষে নির্বিকল্প সমাধি প্রাপ্ত হন। শ্রীরামকৃষ্ণকে দেখিবামাত্র তোতাপুরী তঁহার উচ্চ আধ্যাত্মিক অবস্থা উপলব্ধি করিতে পারেন। তিনি ঠাকুরকে বেদান্ত শিক্ষা দিতে পারেন কিনা প্রশ্ন করিলে ঠাকুর বলেন যে সবই মায়ের ইচ্ছার উপর নির্ভর করে। অবশেষে ঠাকুর মায়ের আদেশানুসারে তোতাপুরীর কাছে বেদান্ত সাধনা করেন। সন্ন্যাসদীক্ষান্তে তিনদিনের মধ্যেই ঠাকুরের নির্বিকল্প সমাধি লাভ হইয়াছিল। তোতাপুরী পরীক্ষা করিয়া দেখিয়াছিলেন যে, ঠাকুরের মন সম্পূর্ণভাবে বাহ্যজগৎ হইতে প্রত্যাহৃত। তাঁহার নির্বিকল্প সমাধি অবস্থা দেখিয়া তোতাপুরী বিস্মিত হইয়াছিলেন। দীর্ঘ ৪০ বৎসরের কঠিন সাধনার পর যাহা তিনি প্রাপ্ত হইয়াছিলেন তাহা শ্রীরামকৃষ্ণ মাত্র অল্প সময়েই লাভ করিয়াছিলেন। তিনদিনের পরিবর্তে ১১ মাস অতিবাহিত করার পর, তোতাপুরী দক্ষিণেশ্বর হইতে চলিয়া যান। যাইবার পূর্বে শ্রীরামকৃষ্ণের সান্নিধ্যবশতঃ তিনি হৃদয়ঙ্গম করেন যে ব্রহ্ম ও শক্তি অভিন্ন, একই সত্তা।


●136>পওহারীবাবা [হরভজন দাস] (১৮৪০ - ১৮৯৮) — উত্তর প্রদেশের জৌনপুরের নিকটবর্তী প্রেমপুরে (গুজি) মতান্তরে বারাণসী জেলার গুজি নামক স্থানের নিকটবর্তী এক গ্রামে নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ বংশে জন্ম। পিতা অযোধ্যা তেওয়ারী। শৈশবে বসন্তরোগে তাঁহার একচক্ষু নষ্ট হয়। কাকা লক্ষ্মীনারায়ণ নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচারী এবং অল্প বয়সেই সন্ন্যাস জীবন যাপনের জন্য গৃহত্যাগী। বহু বৎসর পরে গাজীপুরের তিন মাইল দক্ষিণে গঙ্গাতীরে কুর্থ নামক গ্রামের আশ্রমে লক্ষ্মীনারায়ণের অবস্থান কালে হরভজন তাঁহার নিকট আসিলে তিনি তাঁহার উপনয়নের পর শাস্ত্রাদি অধ্যয়ন করান। ১৮৫৬ খ্রীষ্টাব্দে লক্ষ্মীনারায়ণের দেহত্যাগের পর আশ্রমের দায়িত্ব গ্রহণ করিয়া বাবাজী পুরী রামেশ্বর, দ্বারকা ও বদ্রীনাথ তীর্থাদি দর্শন করেন। এ সময়ে গির্নার পর্বতে এক যোগীর কাছে উপদেশ লাভ করেন এবং হিমালয়ের এক যোগীর নিকট এক উদ্ভিদের সন্ধান পান যাহা খাইয়া অন্য খাদ্য ব্যতীতই বহুদিন বাঁচিয়া থাকা যায়। আশ্র মে ফিরিয়া সাধুর জীবনযাপন কালে শুধুমাত্র লঙ্কা ও দুধ আহার্য গ্রহণ করিতেন। পরে শুধু বিল্বপত্রের রস পান করিতেন। সেজন্য লোকে পওহারীবাবা বলিত। পুরী যাত্রার পথে মুর্শিদাবাদে বাংলা ভাষা শিখিয়া চৈতন্যচরিতামৃত প্রভৃতি গ্রন্থ পাঠ করেন। তামিল তেলেগু ভাষা শিখিয়া দক্ষিণ ভারতীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের গ্রন্থাদি পাঠ করেন। শ্রীসম্প্রদায়ের এক বৈষ্ণব সাধুর নিকট তিনি দীক্ষিত হইয়াছিলেন। গাজীপুরের নিকটে এক যোগীর কাছে তিনি যোগশিক্ষা করেন। আশ্রমের এক মৃত্তিকা গহ্বরে তিনি যোগাভ্যাস করেন। জনতাকে প্রতি একাদশীতে দর্শন দান করিতেন। পরে বৎসরে একদিন মাত্র দর্শন দানের জন্য বাহিরে আসিতেন। দীর্ঘকাল গুহায় বাস করিয়াছিলেন। তাঁহার গুহাতে শ্রীশ্রীঠাকুরের একটি ফটো ছিল। ১৮৯০ খ্রীষ্টাব্দে স্বামীজী তাঁহার সহিত আলাপাদি করিয়া মুগ্ধ হইয়াছিলেন। কথামৃতে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের সাথে ত্রৈলোক্যের কথোপকথনে পওহারীবাবার প্রসঙ্গ পাওয়া যায়। বাবাজীর দেহত্যাগের অব্যবহিত পরে স্বামীজী তাঁহার উচ্চাবস্থার কথা একটি প্রবন্ধে লিখিয়াছিলেন।


●137>পণ্ডিতজী — বড়বাজারের ভক্ত মারোয়াড়ীর গৃহে (১২ নং মল্লিক স্ট্রীটে) শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেবের শুভাগমন কালে পণ্ডিতজী তাঁহার সঙ্গে ঈশ্বরীয় প্রসঙ্গ করেন। তাঁহার পুত্রও ওইদিন ঠাকুরের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি মধ্যে মধ্যে দক্ষিণেশ্বরে আসিয়া শ্রীশ্রীঠাকুরের সান্নিধ্যে ভগবৎপ্রসঙ্গ করিতেন।


●138>পদ্মলোচন (পণ্ডিত পদ্মলোচন তর্কালঙ্কার) — বেদান্তবাদী, ন্যায়শাস্ত্রে সুপণ্ডিত এবং শ্রীশ্রীঠাকুরের পরম অনুরাগী। তিনি বর্ধমান মহারাজের সভাপণ্ডিত ছিলেন। পদ্মলোচনের পাণ্ডিত্যের খ্যাতি ও ঈশ্বরভক্তির কথা শুনিয়া ঠাকুর তাঁহাকে দেখিবার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেন। সেই সময়ে পদ্মলোচন ভগ্ন স্বাস্থ্যোদ্ধারের জন্য আড়িয়াদেহের একটি বাগানবাড়িতে ছিলেন। মিলনে উভয়েই আনন্দিত হন। ঠাকুরের মুখে তাঁহার উপলব্ধি সমূহ ও মায়ের গান শুনিয়া তিনি অত্যন্ত অভিভূত হইয়াছিলেন। পণ্ডিতের সিদ্ধাই-এর বিষয় ঠাকুর জানিতে পারিয়াছিলেন বলিয়া তিনি তাঁহাকে সাক্ষাৎ ইষ্টজ্ঞানে স্তবস্তুতি করিয়াছিলেন। কাশীতে তিনি দেহরক্ষা করেন।


●139>পল্টু (প্রমথনাথ কর) — কম্বুলিয়াটোলার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট রায় বাহাদুর হেমচন্দ্র করের পুত্র। এ্যটর্নী হিসাবে বিখ্যাত। মাস্টার মহাশয়ের ছাত্র হিসাবে খুব শৈশবেই ঠাকুরের সংস্পর্শে আসেন ও তাঁহার ভক্ত হন। ঠাকুর বলিয়াছিলেন “তোরও হবে। তবে একটু দেরিতে হবে।” পরবর্তী জীবনে তিনি বহু পরহিতব্রতী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং দরিদ্রের সেবায় আত্মনিয়োগ করিয়াছিলেন। ১৯৩৭ খ্রীষ্টাব্দে কলিকাতায় দেহত্যাগ করেন ।


●140>পশুপতি (পশুপতি বসু) — নন্দলাল বসুর ভাই। বাসস্থান — বাগবাজার, কলিকাতা। ১৮৮৫ খ্রীষ্টাব্দে ২৮শে জুলাই ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ নন্দ বসুর বাড়িতে রক্ষিত দেবদেবীর সুন্দর ছবিগুলি দর্শনের জন্য শুভাগমন করিয়া সাদর অভ্যর্থনা লাভ করেন। পশুপতি তাঁহাকে দেবদেবীর ছবিগুলি দর্শন করাইয়া সুখী হন। ঐশ্বর্যের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও পশুপতির অহংকারশূন্য মনোভাবের জন্য ঠাকুর তাঁহার প্রতি প্রসন্ন হন ও কিছুক্ষণ নন্দবাবু প্রভৃতির সহিত ঈশ্বরীয় প্রসঙ্গ করেন।


●141>পাগলী — কথামৃতে এক পাগলিনীর উল্লেখ আছে। সে দক্ষিণেশ্বরে ও কাশীপুরে ঠাকুরের নিকট মধ্যে মধ্যে আসিত। শ্রীবিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী এই সুগায়িকা পাগলীকে শ্রীরামকৃষ্ণ সমীপে আনয়ন করেন। কিন্তু ঠাকুরের প্রতি তাহার অন্যভাবে কথা প্রকাশ করায় ঠাকুর বিরক্ত হন। যখন তখন আসিয়া সে ঠাকুরের নিকট গান করিত।


●142>পান্না কীর্তনী (পান্নাময়ী) — বিখ্যাত মহিলা কীর্তনীয়া। পদাবলী কীর্তনে সুখ্যাতি অর্জন করিয়াছিলেন। ১৮৮৪ খ্রীষ্টাব্দের পূর্বে দক্ষিণেশ্বরে কীর্তন উপলক্ষে ঠাকুরের সহিত তাঁহার সাক্ষাৎ হয়। ঠাকুর তাঁহার ভক্ত ঈশানচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে পান্নার সুকণ্ঠের প্রশংসা করেন এবং তাঁহার ভক্তির কথা উল্লেখ করেন।


●143>পাঁড়ে জমাদার (খোট্টা বুড়ো) — শ্রীশ্রীঠাকুরের দক্ষিণেশ্বরে ভক্তদের নিকট কামিনী-কাঞ্চন প্রসঙ্গে তাহার তরুণী স্ত্রীর রক্ষণাবেক্ষণে তাহাকে উদ্বিগ্ন থাকিতে হইত — উল্লেখ করিয়াছিলেন।


●144>পিগট (মিস্‌) — আমেরিকান পাদ্রী। যোশেফ কুকের সঙ্গে কেশবচন্দ্রের স্টীমারে (২৩-২-১৮৮২) শ্রীশ্রীঠাকুরকে দর্শন করিয়াছিলেন। সেদিন ঠাকুরের গান এবং আধ্যাত্মিক আলোচনা শুনিয়া এবং ঠাকুরের ভাবসমাধির অবস্থা দেখিয়া যোশেফ কুক এবং মিস্‌ পিগট অভিভূত হইয়াছিলেন।


●145>পূর্ণ [শ্রী পূর্ণচন্দ্র ঘোষ] (১৮৭১ - ১৯১৩) — কলিকাতার সিমুলিয়ায় জন্ম। ঠাকুরের সহিত প্রথম সাক্ষাৎ ১৮৮৫ খ্রীষ্টাব্দের মার্চ মাসে। গৃহীভক্তদের মধ্যে শ্রীশ্রীঠাকুর তাঁহাকেই ঈশ্বরকোটি বলিয়া নির্দিষ্ট করিয়াছিলেন। ছাত্রাবস্থায় অতি শৈশবেই মাস্টার মহাশয়ের পরামর্শে দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুরের সংস্পর্শে আসেন। পিতা রায় বাহাদুর দীননাথ ঘোষ — উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী। ঠাকুর পূর্ণকে বলিয়াছিলেন যে যখনই তাহার সুবিধা হইবে তখনই যেন সে ঠাকুরের নিকট আসে। শ্রীশ্রীঠাকুর বলিয়াছিলেন পূর্ণচন্দ্রের ‘বিষ্ণুর অংশে জন্ম’ এবং তাঁহার আগমনে ওই শ্রেণীর ভক্তদের আগমন পূর্ণ হইল। বাহিরে সরকারীকাজে নিযুক্ত থাকিলেও অন্তরে তিনি শ্রীশ্রীঠাকুরের ভাবে ও চিন্তায় মগ্ন থাকিতেন। স্বামীজীর প্রতি তাঁহার গভীর অনুরাগ ছিল। স্বামীজীর মহিলাভক্ত মাদাম কালভে কলিকাতায় যখন আসেন, সে সময় তিনি তাঁহাকে বিবেকানন্দ সোসাইটির সম্পাদক হিসাবে উক্ত সোসাইটির পক্ষ হইতে অভিনন্দিত করেন। মাত্র ৪২ বৎসর বয়সে দেহত্যাগ করেন।


●146>প্রতাপ ডাক্তার (১৮৫১ - ১৯১২) — বিখ্যাত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক প্রতাপচন্দ্র মজুমদার। নদীয়া জেলার চাপড়া গ্রামে জন্ম। কলিকাতায় চিকিৎসা-বিদ্যায় উচ্চ শিক্ষাপ্রাপ্ত। ১৮৮৫ খ্রীষ্টাব্দে শ্যামপুকুরে ঠাকুরের সহিত প্রথম সাক্ষাৎ হয়। তিনি শ্যামপুকুর ও কাশীপুরে ঠাকুরের চিকিৎসার জন্য গিয়েছিলেন। এই সময়ে ঠাকুরের পূত সঙ্গ লাভ করিয়া এবং তাঁহার অদ্ভুত ভাবাবস্থা দর্শনে বিজ্ঞান জগতের প্রতাপচন্দ্র মোহিত হন। ১৮৯৩ খ্রীষ্টাব্দে চিকাগোতে World's Columbian Exposition-এ আমন্ত্রিত হন।


●147>প্রতাপচন্দ্র মজুমদার (১৮৪০ - ১৯০৫) — বাসস্থান কলিকাতা। পিতা গিরীশচন্দ্র মজুমদার। প্রতাপচন্দ্র বিখ্যাত ব্রাহ্মধর্ম প্রচারক। জন্ম হুগলী জেলার বাঁশবেড়িয়া গ্রামে মাতুলালয়ে। ব্রাহ্মধর্ম প্রচারের জন্য ভারত ইউরোপ, আমেরিকা ও জাপানের নানাস্থানে ভ্রমণ করেন। ১৮৭৫ খ্রীষ্টাব্দে শ্রীরামকৃষ্ণের সহিত প্রথম সাক্ষাৎ হয়। কেশবচন্দ্র সেনের দেহত্যাগের পর নববিধান ব্রাহ্মসমাজের নেতা হন। শ্রীরামকৃষ্ণের নিকট তিনি বহুবার গিয়াছেন। শ্রীরামকৃষ্ণ সম্বন্ধে তাঁহার বিখ্যাত প্রবন্ধ Hindu Saint জনপ্রিয়তা লাভ করে। Oriental Christ, Paramhamsa Ramakrishna প্রভৃতি গ্রন্থ তাঁহার রচনা। ১৮৯৩ সালে প্রতাপচন্দ্র শিকাগো ধর্মসভায় উপস্থিত হইবার জন্য নিমন্ত্রিত হইয়া ভাষণ দিয়াছিলেন এবং সেখানে স্বামী বিবেকানন্দের সাথে সাক্ষাৎ হয়। কলিকাতায় ৬৫ বৎসর বয়সে তাঁহার জীবনদীপ নির্বাপিত হয়।


●148>প্রতাপ সিং — একজন ডেপুটি। ঠাকুর কামারপুকুরে তাঁহার দানধ্যান ও ঈশ্বরে ভক্তি ইত্যাদি অনেক গুণের কথা শুনিয়াছিলেন। ইনি ঠাকুরকে লইয়া যাইবার জন্য লোক পাঠাইয়াছিলেন।


●149>প্রতাপচন্দ্র হাজরা — হুগলী জেলার মড়াগেড়ে নামক গ্রামে বাড়ি। কামারপুকুরের কয়েক মাইল পশ্চিমে এই গ্রাম। শিহড় গ্রামে হৃদয়ের বাড়িতে প্রথম তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের দর্শন পান। কয়েক বৎসর পরে বাড়িতে স্ত্রী-পুত্র-কন্যা ও বৃদ্ধা মাতাকে রাখিয়া দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুরের নিকটে আসেন। কিন্তু তাঁহার কিছু ঋণ ছিল। দক্ষিণেশ্বরে তিনি ‘হাজরামশাই’ নামে পরিচিত ছিলেন। হাজরার নিরাকারবাদের সমর্থন পাইয়া নরেন্দ্রনাথও প্রথমে তাঁহার প্রতি আকৃষ্ট হন। হাজরাকে লক্ষ্য করিয়া ঠাকুর বলিতেন — ‘জটিলে কুটিলে’ থাকলে লীলা পোষ্টাই হয়। নরেন্দ্রনাথের চেষ্টায় হাজরা ঠাকুরের কৃপাপ্রাপ্ত হইয়াছিলেন। জীবনের শেষ ভাগে তিনি স্বগ্রামে ফিরিয়া আসেন। অন্তিম সময়ে ঠাকুরের দর্শন পান। ১৯০০ খ্রীষ্টাব্দে ৬২।৬৩ বৎসর বয়সে স্বগ্রামে হাজরা লোকান্তরিত হন।


●150>প্রতাপের ভাই — শ্রীম-র দক্ষিণেশ্বরে দ্বিতীয় দর্শন দিবসে শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁহার কথা উল্লেখ করেন। বেকার অবস্থায় স্ত্রী-পুত্রকে শ্বশুরবাড়িতে রাখিয়া দক্ষিণেশ্বরে থাকিতে চাহিয়াছিলেন। সেজন্য ঠাকুর তাহাকে গৃহস্থের কর্তব্য সম্বন্ধে সজাগ করিয়া তিরস্কার করিয়াছিলেন। ইনি কোন্‌ প্রতাপের ভাই তাহা জানা যায় না।

■■◆◆◆◆◆■■■■■■■■■■■