Friday, March 15, 2019

20> মদনমোহন তর্কালঙ্কার


20> মদনমোহন তর্কালঙ্কার

মদনমোহন তর্কালঙ্কার (জন্ম: ১৮১৭ – মৃত্যু: ৯ই মার্চ, ১৮৫৮) ভারতীয় উপমহাদেশের ঊনবিংশ শতাব্দীয় অন্যতম পণ্ডিত ব্যক্তিত্ব যিনি লেখ্য বাংলা ভাষার বিকাশে বিশেষ অবদান রেখে গেছেন। তিনি বাংলার নবজাগরণের অন্যতম অগ্রদূত হিসিবেও পরিগণিত। তিনি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজেরঅধ্যাপক ছিলেন এবং বাল্যশিক্ষার জন্য একাধিক পাঠ্যপুস্তক রচনা করেন।

মদনমোহন তর্কালঙ্কার
জন্ম ৩ জানুয়ারি ১৮১৭

বিল্বগ্রাম, নাকাশীপাড়া, নদিয়া জেলা, বাংলা প্রেসিডেন্সি,পশ্চিমবঙ্গ

মৃত্যু৯ মার্চ ১৮৫৮(বয়স ৪০–৪১)

স্মৃতিস্তম্ভআসান্নাগর মদন মোহন তর্কালঙ্কার কলেজ,
কৃষ্ণনাথ কলেজের সংস্কৃত বিভাগের স্নাতকোত্তর শাখার গ্রন্থাগারআন্দোলনবাংলার নবজাগরণসন্তানভুবনমালা ও কুন্দমালাপিতা-মাতারামধন চট্টোপাধ্যায়

তিনি ছিলেন 'হিন্দু বিধবা বিবাহ' প্রথার অন্যতম উদ্যোক্তা। এই সম্পর্কে বহরমপুর কলেজের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মৃণালকান্তি চক্রবর্তী বলেন, “১৮৫৭ সালে প্রথম বিধবা বিবাহ হয়। ওই বিয়ের পাত্র শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন এবং পাত্রী ছিলেন কালীমতি। তাঁদের দুজনের সন্ধান ও যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে মদনমোহন তর্কালঙ্কার ছিলেন অন্যতম।”
স্ত্রী শিক্ষার প্রসারে তার অবদান অনস্বীকার্য। ১৯৪৯ এ বেথুন কর্তৃক হিন্দু মহিলা স্কুল প্রতিষ্ঠিত হলে নিজের দুই মেয়েকে সেখানে ভর্তি করেন। নিজে বিনা বেতনে এই স্কুলে বালিকাদের শিক্ষা দিতেন। সর্বশুভকরী পত্রিকায় স্ত্রী শিক্ষার পক্ষে একটি যুগান্তকারী প্রবন্ধ লেখেন ১৮৫০ সালে।

মদনমোহন তর্কালঙ্কার বাংলা ভাষায় শিক্ষা বিস্তারের জন্য যথেষ্ট শ্রম ব্যয় করেন; তাঁর রচিত শিশুশিক্ষা গ্রন্থটি ঈশ্বরচন্দ্র কর্তৃক রচিত "বর্ণপরিচয়" গ্রন্থটিরও পূর্বে প্রকাশিত।
তিনি 'শিশুশিক্ষা' পুস্তকটির 'প্রথম ভাগ' ১৮৪৯ সালে এবং 'দ্বিতীয় ভাগে' ১৮৫০ সালে প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে পুস্তকটির 'তৃতীয় ভাগ' এবং 'বোধোদয়' শিরোনামে 'চতুর্থ ভাগ' প্রকাশিত হয়। 'বাসব দত্তা' ও রসতরঙ্গিনী নামে তাঁর দুটি গ্রন্থ ছাত্রাবস্থায় রচিত হয়।

তাঁর রচিত 'আমার পণ' কবিতাটি বাংলাদেশে দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের বাংলা পাঠ্যবইয়ের অন্যতম একটি পদ্য এবং শিশু মানস গঠনের জন্য চমৎকার দিক-নির্দেশনা। তাঁর বিখ্যাত কিছু পংক্তির মধ্যে রয়েছে: ‘পাখী সব করে রব, রাতি পোহাইল’; ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি, সারা দিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি’; ‘লেখাপড়া করে যে/ গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে’

তিনি ১৪টি সংস্কৃত বই সম্পাদনা করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহের মধ্যে রয়েছে:

রসতরঙ্গিণী (১৮৩৪)
বাসবদত্তা (১৮৩৬)
শিশু শিক্ষা - তিন খণ্ড (১৮৪৯ ও ১৮৫৩)

১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে ৯ মার্চ কান্দিতে কলেরা রোগে ভুগে তিনি মৃত্যু বরণ করেন।
========================================================
 শিশুদেড় সার্থক ও স্বরণ যোগ্য দুটি কবিতা 

আমাদের ছোট বেলায় আমরা পড়তাম বর্ণ পরিচয় ও শিশু শিক্ষা নামক দুটি বই। 
এই শিশুশিক্ষা বইটির লেখক মদনমোহন তর্কালঙ্কার। 
আর বর্ণপরিচয় তো সকলেরই জানা পন্ডিত ঈস্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। 

 ৩রা জানুয়ারী 'শিশুশিক্ষা'-রচয়িতা তথা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সহপাঠী মদনমোহন তর্কালঙ্কার এর দ্বিশততম জন্মবার্ষিকী। সশ্রদ্ধচিত্তে বাংলার নবজাগরণের এই অগ্রপথিককে আজ স্মরণ করি।
আমার জীবনের প্রথম বই ছিল 'শিশুশিক্ষা'। এর শেষ পাতায় ছিল বাংলা ভাষায় প্রথম সার্থক কবিতা 'পাখি-সব করে রব'। তার অমর চরণ গুলি আজও ভুলতে পারি না।

পাখী-সব করে রব, রাতি পোহাইল।
কাননে কুসুমকলি, সকলি ফুটিল।।
রাখাল গরুর পাল, ল'য়ে যায় মাঠে।
শিশুগণ দেয় মন নিজ নিজ পাঠে।।
ফুটিল মালতী ফুল, সৌরভ ছুটিল।
পরিমল লোভে অলি, আসিয়া জুটিল।।
গগনে উঠিল রবি, লোহিত বরণ।
আলোক পাইয়া লোক, পুলকিত মন।।
শীতল বাতাস বয়, জুড়ায় শরীর।
পাতায় পাতায় পড়ে, নিশির শিশির।।
উঠ শিশু মুখ ধোও, পর নিজ বেশ।
আপন পাঠেতে মন, করহ নিবেশ।।

ছোটবেলায় যাঁরা এই বই পড়ে বড় হয়েছেন, তাঁরা কমেন্ট করলে ভাল লাগবে।

তাঁর আর একটি বিখ্যাত কবিতা 'আমার পণ'। প্রতিদিন সকালে ঘুম ভাঙ্গার পর শপথের মতো করে এই পদ্য আমরা ভাই-বোনেরা মিলে আওড়াতাম।

সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি,
সারা দিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি।
আদেশ করেন যাহা মোর গুরুজনে,
আমি যেন সেই কাজ করি ভালো মনে।
ভাইবোন সকলেরে যেন ভালোবাসি,
এক সাথে থাকি যেন সবে মিলেমিশি।
ভালো ছেলেদের সাথে মিশে করি খেলা,
পাঠের সময় যেন নাহি করি হেলা।
সুখী যেন নাহি হই আর কারো দুখে,
মিছে কথা কভু যেন নাহি আসে মুখে।
সাবধানে যেন লোভ সামলিয়ে থাকি,
কিছুতে কাহারে যেন নাহি দিই ফাঁকি।
ঝগড়া না করি যেন কভু কারো সনে,
সকালে উঠিয়া এই বলি মনে মনে।
================


===========================================================================================================================================================================================================


1>আজ ৩রা জানুয়ারী মদনমোহন তর্কালঙ্কার এর  জন্ম ।

মনেপড়ে ছোট বেলায়  আমরা পড়তাম বর্ণ পরিচয় ও শিশু শিক্ষা নামক দুটি বই। 
এই শিশুশিক্ষা বইটির লেখক মদনমোহন তর্কালঙ্কার। 
আর বর্ণপরিচয় তো সকলেরই জানা পন্ডিত ঈস্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। 

মদনমোহন তর্কালঙ্কার ( জন্ম ৩ জানুয়ারি  ১৮১৭--মৃত্যু ৯ই মার্চ ১৮৫৮)

 ৩রা জানুয়ারী 'শিশুশিক্ষা'-রচয়িতা তথা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সহপাঠী 
মদনমোহন তর্কালঙ্কার এর দ্বিশততম জন্মবার্ষিকী।

 সশ্রদ্ধচিত্তে বাংলার নবজাগরণের এই অগ্রপথিককে আজ স্মরণ করি।
আমার জীবনের প্রথম বই ছিল 'শিশুশিক্ষা'। 
এই বইটির শেষ পাতায় ছিল বাংলা ভাষায় প্রথম সার্থক কবিতা 'পাখি-সব করে রব'। 
যে কবিতাটি আজও  ভুলতে পারি নি ।

পাখী-সব করে রব, রাতি পোহাইল।
কাননে কুসুমকলি, সকলি ফুটিল।।
রাখাল গরুর পাল, ল'য়ে যায় মাঠে।
শিশুগণ দেয় মন নিজ নিজ পাঠে।।
ফুটিল মালতী ফুল, সৌরভ ছুটিল।
পরিমল লোভে অলি, আসিয়া জুটিল।।
গগনে উঠিল রবি, লোহিত বরণ।
আলোক পাইয়া লোক, পুলকিত মন।।
শীতল বাতাস বয়, জুড়ায় শরীর।
পাতায় পাতায় পড়ে, নিশির শিশির।।
উঠ শিশু মুখ ধোও, পর নিজ বেশ।
আপন পাঠেতে মন, করহ নিবেশ।।

 

তাঁর আর একটি বিখ্যাত কবিতা 'আমার পণ'। 
যে কবিতাটি রোজ পড়তাম প্রতিদিন সকালে। 
 
সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি,
সারা দিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি।
আদেশ করেন যাহা মোর গুরুজনে,
আমি যেন সেই কাজ করি ভালো মনে।
ভাইবোন সকলেরে যেন ভালোবাসি,
এক সাথে থাকি যেন সবে মিলেমিশি।
ভালো ছেলেদের সাথে মিশে করি খেলা,
পাঠের সময় যেন নাহি করি হেলা।
সুখী যেন নাহি হই আর কারো দুখে,
মিছে কথা কভু যেন নাহি আসে মুখে।
সাবধানে যেন লোভ সামলিয়ে থাকি,
কিছুতে কাহারে যেন নাহি দিই ফাঁকি।
ঝগড়া না করি যেন কভু কারো সনে,
সকালে উঠিয়া এই বলি মনে মনে।
================

 



মদনমোহন তর্কালঙ্কার (জন্ম: ৩ জানুয়ারি  ১৮১৭ – মৃত্যু: ৯ই মার্চ, ১৮৫৮) ভারতীয় উপমহাদেশের ঊনবিংশ শতাব্দীয় অন্যতম পণ্ডিত ব্যক্তিত্ব যিনি লেখ্য বাংলা ভাষার বিকাশে বিশেষ অবদান রেখে গেছেন। তিনি বাংলার নবজাগরণের অন্যতম অগ্রদূত হিসিবেও পরিগণিত। তিনি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের অধ্যাপক ছিলেন এবং বাল্যশিক্ষার জন্য একাধিক পাঠ্যপুস্তক রচনা করেন।


মদনমোহন তর্কালঙ্কার
জন্ম ৩ জানুয়ারি ১৮১৭ বিল্বগ্রাম, নাকাশীপাড়া, নদীয়া জেলা, বাংলা প্রেসিডেন্সি বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ
ব্রিটিশ ভারত (বর্তমান  ভারত)
মৃত্যু ৯ মার্চ ১৮৫৮ (বয়স ৪০–৪১) কলকাতা, বাংলা প্রেসিডেন্সি (বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ), ব্রিটিশ ভারত (বর্তমান  ভারত) । কান্দিতে কলেরা রোগে ভুগে তিনি মৃত্যু বরণ করেন।

পিতা--রামধন চট্টোপাধ্যায় 

শিক্ষা জীবন ---
তিনি সংস্কৃত কলেজের শিক্ষাগ্রহণ করেছিলেন, সেখানে তিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সহপাঠী ছিলেন। তিনি পরবর্তীতে কোলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজের শিক্ষা গ্রহণ করেন।

কর্ম জীবন----
তিনি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। পরবর্তীতে ১৮৫০ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বরে তিনি মুর্শিদাবাদ জেলার বিচারক নিযুক্ত হন। তিনি ১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বরে মুর্শিদাবাদের এবং ১৮৫৬ খ্রিষ্টাব্দে কান্দির ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট নিযুক্ত হয়েছিলেন।

সমাজ সংস্কারক------
তিনি ছিলেন 'হিন্দু বিধবা বিবাহ' প্রথার অন্যতম উদ্যোক্তা। এই সম্পর্কে বহরমপুর কলেজের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মৃণালকান্তি চক্রবর্তী বলেন, “১৮৫৭ সালে প্রথম বিধবা বিবাহ হয়। ওই বিয়ের পাত্র শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন এবং পাত্রী ছিলেন কালীমতি। তাঁদের দুজনের সন্ধান ও যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে মদনমোহন তর্কালঙ্কার ছিলেন অন্যতম।”। স্ত্রী শিক্ষার প্রসারে তার অবদান অনস্বীকার্য। ১৮৪৯ এ বেথুন কর্তৃক হিন্দু মহিলা স্কুল প্রতিষ্ঠিত হলে নিজের দুই মেয়েকে সেখানে ভর্তি করেন। নিজে বিনা বেতনে এই স্কুলে বালিকাদের শিক্ষা দিতেন। সর্বশুভকরী পত্রিকায় স্ত্রী শিক্ষার পক্ষে একটি যুগান্তকারী প্রবন্ধ লেখেন ১৮৫০ সালে।

প্রণীত গ্রন্থাবলী------
মদনমোহন তর্কালঙ্কার বাংলা ভাষায় শিক্ষা বিস্তারের জন্য যথেষ্ট শ্রম ব্যয় করেন। তাঁর রচিত শিশুশিক্ষা গ্রন্থটি ঈশ্বরচন্দ্র কর্তৃক রচিত "বর্ণপরিচয়" গ্রন্থটিরও পূর্বে প্রকাশিত। তিনি 'শিশুশিক্ষা' পুস্তকটির 'প্রথম ভাগ' ১৮৪৯ সালে এবং 'দ্বিতীয় ভাগে' ১৮৫০ সালে প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে পুস্তকটির 'তৃতীয় ভাগ' এবং 'বোধোদয়' শিরোনামে 'চতুর্থ ভাগ' প্রকাশিত হয়। 'বাসব দত্তা' ও 'রসতরঙ্গিনী' নামে তাঁর দুটি গ্রন্থ ছাত্রাবস্থায় রচিত হয়।

তাঁর রচিত 'আমার পণ' কবিতাটি বাংলাদেশে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বাংলা পাঠ্যবইয়ের অন্যতম একটি পদ্য এবং শিশু মানস গঠনের জন্য চমৎকার দিক-নির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত। তাঁর বিখ্যাত কিছু পংক্তির মধ্যে রয়েছে: ‘পাখী সব করে রব, রাতি পোহাইল’; ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি, সারা দিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি’; ‘লেখাপড়া করে যে/ গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে’

তিনি ১৪টি সংস্কৃত বই সম্পাদনা করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহের মধ্যে রয়েছে:

রসতরঙ্গিণী (১৮৩৪)
বাসবদত্তা (১৮৩৬)
শিশু শিক্ষা - তিন খণ্ড (১৮৪৯ ও ১৮৫৩)
 





 



Thursday, March 14, 2019

19>কালী প্রসন্ন সিংহ ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

19>কালী প্রসন্ন সিংহ ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর 
   (আনন্দবাজার পত্রিকা dt 13 September2016 

     মঙ্গলবার ২৮ ভাদ্র ১৪২৩) 
বিনোদ ঘোষাল লিখেছেন,-----

বিনোদ ঘোষাল (‘কালীপ্রসন্নর কথা অমৃতসমান’, পত্রিকা, ২০-৮) লিখেছেন, 
সংস্কৃত মহাভারতকে বাংলায় অনুবাদের কাজ শুরু করে আঠারো বছর 
বয়সি কালীপ্রসন্ন সিংহ গুরুদেব ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কাছে গিয়ে বললেন,
 ‘আমার পক্ষে আর অনুবাদ সম্ভব হচ্ছে না। আপনি দায়িত্ব নিন’। 
প্রকৃত ঘটনা একটু অন্য রকম। ১৮৩৯ সালে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের 
নেতৃত্বে ব্রাহ্মসমাজের একটি সমিতি গঠিত হয়, যার নাম ‘তত্ত্ববোধিনী সভা’।
 ১৮৪৩-এর অগস্ট মাসে এই সভার নিজস্ব মাসিক পত্রিকা ‘তত্ত্ববোধিনী’ 
প্রথম প্রকাশিত হয়। শুরু থেকেই এই পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলীতে ছিলেন 
বিদ্যাসাগর। ১৮৪৮-এর ফেব্রুয়ারি সংখ্যা থেকে বিদ্যাসাগরের নিজের করা 
মহাভারতের অনুবাদ ধারাবাহিক ভাবে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় বেরোতে থাকে।
 কিছু দিন পর মহাভারতের এই অনুবাদ প্যামফ্লেট আকারেও প্রকাশিত হয়।

১৮৫৮ সালে বিদ্যাসাগর যখন কালীপ্রসন্নের মহাভারত অনুবাদের কথা জানতে 

পারেন তখন তিনি নিজের অনুবাদের কাজ থেকে বিরত হন। পরে কালীপ্রসন্ন 
তাঁকে কৃতজ্ঞতা জানান এই বলে যে, বিদ্যাসাগর মহাভারতের অনুবাদের কাজ 
বন্ধ না-করলে তাঁর পক্ষে মহাভারতের অনুবাদের কাজ চালানো সম্ভব হত না। 
লেখক অনুবাদের কাজে সাহায্যের জন্য সাত জন সংস্কৃত পণ্ডিত নিয়োগের 
কথা বলেছেন। এই সাত জন সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত ছাড়াও আরও অনেকের 
প্রতি কালীপ্রসন্ন কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন মহাভারতের ভূমিকায়। 
তিনি লিখেছিলেন, ‘ইহার অনুবাদ সময়ে অনেক কৃতবিদ্য মহোদয়গণের 
ভূয়িষ্ঠ সাহায্য গ্রহণ করিতে হইয়াছে।’ মহাভারত অনুবাদের সাহায্যের জন্য 
কালীপ্রসন্ন যাঁদের কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানান, তাঁরা হলেন ঈশ্বরচন্দ্র 
বিদ্যাসাগর, পুরাণ-বিশেষজ্ঞ গঙ্গাধর তর্কবাগীশ, রাজা কমলকৃষ্ণ বাহাদুর, 
যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর, রাজেন্দ্রলাল মিত্র, ‘সোমপ্রকাশ’ পত্রিকার সম্পাদক 
দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ, প্রেসিডেন্সি কলেজের বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক 
রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকার প্রাক্তন সম্পাদক নবীনকৃষ্ণ 
বন্দ্যোপাধ্যায়, দীনবন্ধু মিত্র, ‘ভাস্কর’ পত্রিকার সম্পাদক ক্ষেত্রমোহন
 বিদ্যারত্ন এবং প্রুফরিডাররা।

অনুবাদক গোষ্ঠীর কয়েক জনের মৃত্যুর পর শেষ পর্যন্ত অর্থাৎ ১৮৬৬ সাল 

পর্যন্ত অনুবাদের কাজ চালিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন অভয়চরণ তর্কালঙ্কার, 
কৃষ্ণধন বিদ্যারত্ন, রামসেবক বিদ্যালংকার এবং হেমচন্দ্র বিদ্যারত্ন। 
কালীপ্রসন্ন মহাভারতের পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করেছিলেন এশিয়াটিক 
সোসাইটি ও শোভাবাজার রাজবা়ড়ি থেকে এবং আশুতোষ দেব, 
যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর ও নিজের প্রপিতামহ শান্তিরাম সিংহের কাশীতে 
অবস্থিত বাড়ির ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে। কালীপ্রসন্ন কলকাতায় না-থাকলে 
বিদ্যাসাগর মহাশয় প্রেসের কাজ এবং অনুবাদের তদারকি নিজে করতেন। 
ব্যাসকূট শ্লোক ও জটিল শ্লোকগুলির অনুবাদে সবচেয়ে বেশি সাহায্য 
করেছিলেন কলকাতা সংস্কৃত বিদ্যামন্দিরের শিক্ষক তারানাথ তর্কবাচস্পতি।


পীযূষ রায়। বেহালা

প্রতিবেদকের উত্তর: পীযূষবাবুকে তথ্যসমৃদ্ধ চিঠির জন্য ধন্যবাদ। প্রসঙ্গত, 

যত দূর আমি জানতে পেরেছি বাংলায় কালীপ্রসন্ন সিংহের জীবন নিয়ে বিশদে 
এখনও প্রায় কোনও কাজই হয়নি। তাই উক্ত নিবন্ধটি লেখার সময় আমাকে
 প্রধানত যে বইটির সাহায্য নিতে হয়েছিল তা হল ১৩২২ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত 
মন্মথনাথ ঘোষ বিরচিত মহাত্মা কালীপ্রসন্ন সিংহ। প্রকাশক ছিলেন প্রিয়নাথ দাস। 
ওই বইয়ের ষষ্ঠ পরিচ্ছেদের ৭৩ পৃষ্ঠায় যা লেখা আছে তার প্রয়োজনীয় অংশ 
হুবহু উল্লেখ করছি, ‘বিদ্যাসাগর মহাশয় সময়াভাববশতঃ স্বয়ং এই অনুবাদ 
কার্য্য গ্রহণ করিতে অস্বীকৃত হইলেন। কিন্তু পরমস্নেহভাজন কালীপ্রসন্নের 
অনুরোধ উপেক্ষা করিতে না পারিয়া উপযুক্ত পণ্ডিতমণ্ডলী দ্বারা মহাভারত 
অনুবাদের ব্যবস্থা করিয়া দেন’। এবং ওই পৃষ্ঠারই শেষ অংশে লেখা রয়েছে, 
মহাভারতের উপসংহারে কালীপ্রসন্ন লিখিয়াছেন ‘১৮৭০ শকে সৎকীর্ত্তি ও 
জন্মভূমির হিতানুষ্ঠান লক্ষ্য করিয়া ৭ জন কৃতবিদ্য সদস্যের সহিত আমি 
মূল সংস্কৃত মহাভারত বাঙ্গালা ভাষায় অনুবাদ করিতে প্রবৃত্ত হই’।
===============================