Wednesday, April 8, 2026

51>|| কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য ||

 

   51>|| কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য  ||
[ 15 আগস্ট 1926 ---13 মে 1947]

সুকান্ত ভট্টাচার্যের পৈতৃক নিবাস ছিল অবিভক্ত বাংলার (বর্তমান বাংলাদেশ) ফরিদপুর জেলার কোটালীপাড়ায়। কিন্তু তাঁর জন্ম হয় 15ই আগস্ট, 1926 সালে, কলকাতার কালীঘাটের মহিম হালদার স্ট্রিটে, তাঁর মামাবাড়িতে। বাবা নিবারণচন্দ্র ভট্টাচার্য এবং মা সুনীতি দেবীর এই সন্তান ছোটবেলা থেকেই দেখেছেন শুধুই অভাব আর মৃত্যু। খুব অল্প বয়সেই তিনি মাকে হারান।

ছোটবেলায় বাংলা বইয়ের পাতায় আমরা অনেকেই পড়েছি— "ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।" লাইনটা পড়ার সময় হয়তো আমরা বাহবা দিয়েছি কবির উপমা ব্যবহারের ক্ষমতাকে। কিন্তু জানেন কি? এই কালজয়ী লাইনটি লেখার সময় কবির নিজের পেটে ছিল একটানা কয়েক দিনের মারাত্মক খিদে! এটা কোনো রোমান্টিক কবিতা ছিল না, ছিল এক অভুক্ত তরুণের নাড়ির টান, পেটের চরম জ্বালা।
ইনি কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। যার কলম দিয়ে আগুনের ফুলকি বেরোত, কিন্তু নিজের পকেটে একটা ফুটো পয়সা পর্যন্ত থাকত না।

তিনি বড় হচ্ছিলেন এমন এক সময়ে, যখন বিশ্বজুড়ে চলছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, আর বাংলায় আছড়ে পড়েছে ১৯৪৩ সালের ভয়ংকর 'পঞ্চাশের মন্বন্তর'। রাস্তায় রাস্তায় পড়ে থাকা কঙ্কালসার মৃতদেহ আর ডাস্টবিনের এঁটো খাবার নিয়ে কুকুর আর মানুষের লড়াই সুকান্তের কিশোর মনকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল। তিনি যোগ দেন কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র আন্দোলনে। নিজের পড়াশোনা, স্বাস্থ্য— সব কিছু শিকেয় তুলে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে।

সুকান্তের পকেটে টাকা ছিল না, পেটে অন্ন ছিল না, কিন্তু আত্মসম্মান ছিল পাহাড়ের মতো অটুট।
দিনের পর দিন না খেয়ে কাটাতেন, কিন্তু বন্ধুদের কাছে হাত পাততে তাঁর চরম লজ্জা করত। তাই খিদে পেলে এই কিশোর কবি বেছে নিয়েছিলেন এক ভয়ংকর আত্মঘাতী পথ।
খিদে যখন সহ্যসীমা ছাড়িয়ে যেত, তিনি সস্তা বিড়ি বা সিগারেট কিনে একের পর এক ফুঁকতেন। কারণ তাঁর মনে হতো, নিকোটিন পেটে গেলে খিদের জ্বালাটা হয়তো কিছুটা মরে যাবে। মাসের পর মাস আধপেটা খেয়ে বা না খেয়ে, কেবল বিড়ির ধোঁয়া গিলে আর রোদে পুড়ে পার্টির কাজ করে তাঁর শরীরে নিঃশব্দে বাসা বাঁধল এক মারণ রোগ— যক্ষ্মা বা টিবি (Tuberculosis)।

অপুষ্টি, ক্লান্তি আর অতিরিক্ত ধূমপান তাঁকে ভেতর থেকে শেষ করে দিয়েছিল। অবশেষে তাঁকে ভর্তি করা হয় কলকাতার যাদবপুর টিবি হাসপাতালে (বর্তমান K. S. Roy T.B. Hospital)।

13ই মে, 1947। ভারতের স্বাধীনতার ঠিক কয়েক মাস আগে, মাত্র 20 বছর 9 মাস (প্রায় 21 বছর) বয়সে এই হাসপাতালেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বিদ্রোহী কিশোর কবি। শোনা যায়, মৃত্যুর সময়ও তাঁর পকেটে পাওয়া গিয়েছিল এক মুঠো সস্তা বিড়ি আর কয়েকটা খুচরো পয়সা।

ডাক্তাররা আক্ষেপ করে বলেছিলেন, টিবি নয়, মূলত অপুষ্টি আর অবহেলাই তাঁকে এত তাড়াতাড়ি শেষ করে দিল। ভাবলে চোখে জল আসে— আমরা রাতের আকাশে সুন্দর চাঁদ দেখি, আর তিনি খিদের তীব্র যন্ত্রণায় সেই চাঁদের মধ্যেও শুধু এক টুকরো পোড়া রুটি খুঁজেছিলেন।

তথ্যসূত্র (Sources):
সুকান্ত সমগ্র (পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি)
কবির জন্ম ও মৃত্যু তারিখ: ১৫ আগস্ট ১৯২৬ – ১৩ মে ১৯৪৭ (যাদবপুর টিবি হাসপাতাল)।
         (সংগ্রহীত)
=====================

Friday, March 27, 2026

50>||গৌতম বুদ্ধ ::--

   50>||গৌতম বুদ্ধ ::--


গৌতম বুদ্ধের গৃহ ত্যাগ,:::---

সেদিন হঠাৎ মাঝরাতে সেই রাজকীয় প্রমোদকক্ষে এমন কী ঘটেছিল, যার জন্য তিনি সব ছেড়ে পালিয়েছিলেন? :---

আমাদের কাছে হয়তো এমনটা ভাবনার অতীত বা শুনতে কিছুটা অদ্ভুত  লাগলেও,--

 

বাস্তবে ঘটনাটি মানব মনস্তত্ত্বের এক চরম সত্যি! যা রাজপুত্র সিদ্ধার্থের সেই রাত্রির আসল ঘটনা যা গল্প মনে হলেও 

ঘটনাটি ঐতিহাসিক সত্যতার প্রমান রাখে।

আমরা ইতিহাসে জেনেছি যে সিদ্ধার্থের জন্মের পরই ভবিষ্যৎবাণী করা হয়েছিল— এই ছেলে বড় হয়ে হয় পুরো পৃথিবী শাসন করবে (চক্রবর্তী সম্রাট), আর না হয় সব ছেড়ে এক মহান সন্ন্যাসী হবেন।


 মন ভবিষ্যৎ বাণী তে রাজা শুদ্ধোধন অতিশয় ভীত হয়ে পরলেন  এবং ছেলের মন যাতে কোনোভাবেই বৈরাগ্যের দিকে না যায়, তার জন্য তিনি তৎপরতা অবলম্বন হেতু  সিদ্ধার্থের জন্য তৈরি করলেন তিনটি আলাদা বিলাসবহুল প্রাসাদ— গ্রীষ্মকালের জন্য 'সুরম্য', বর্ষার জন্য 'শুভ' এবং শীতকালের জন্য 'রম্য'।

শুধু তাই নয়, এই প্রাসাদগুলো ভরিয়ে দেওয়া হলো শত শত রূপসী নর্তকী, গায়িকা এবং সেবিকাদের দিয়ে। দিনরাত ২৪ ঘণ্টা সিদ্ধার্থকে পার্থিব সুখ, মদ এবং রূপের নেশায় পাগল করে রাখাই ছিল এদের একমাত্র কাজ। প্রাসাদের বাইরে পৃথিবীটা কেমন, দুঃখ-কষ্ট কাকে বলে, তা সিদ্ধার্থের ধারণাতেই ছিল না।


কিন্তু বিধির বিধানকে খণ্ডাবে কেমন করে।

আর তাই রাজকুমারের বয়স তখন ২৯।

তখন একদিন তিনি লুকিয়ে প্রাসাদের বাইরে গিয়ে বার্ধক্য, রোগ আর মৃত্যু— এই রূঢ় বাস্তব গুলো দেখে ফেলেছেন। তার মনে তখন সৃষ্টি হলো এক বিশাল দ্বন্দ্ব।

এর পরে একদিন রাত্রি কালে রাজপ্রাসাদে এক বিশাল উৎসব চলছিল। শত শত সুন্দরী নারী তাদের রূপ, নাচ আর গান দিয়ে সিদ্ধার্থের মনোরঞ্জনের চেষ্টায় ব্যস্ত ছিল। 

কিন্তু সিদ্ধার্থের মন তখন অন্য কোথাও। একসময় ক্লান্ত হয়ে রাজকুমার ঘুমিয়ে পড়লেন। তাকে সঙ্গ দিতে আসা ওই শত শত সুন্দরী নারীও ক্লান্ত হয়ে সেই বিশাল ঘরের মেঝেতেই যত্রতত্র ঘুমিয়ে পড়ে।

মাঝরাতে হঠাৎ রাজকুমার সিদ্ধার্থের ঘুম ভেঙে যায়। আর চোখ খুলেই তিনি এমন এক দৃশ্য দেখলেন, যা তার শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা স্রোত নামিয়ে দিল!

যে নারীদের একটু আগেও স্বর্গের অপ্সরা মনে হচ্ছিল, ঘুমের ঘোরে তাদের সেই মেকি সৌন্দর্যের মুখোশ খসে পড়েছে।


 অশ্বঘোষের লেখা বিখ্যাত মহাকাব্য 'বুদ্ধচরিত' (Buddhacarita, 5th Canto)-এর বর্ণনা অনুযায়ী— সিদ্ধার্থ দেখলেন, ওই সুন্দরীরা অত্যন্ত বিকট ভঙ্গিতে শুয়ে আছে। কারোর মুখ হা হয়ে আছে এবং সেখান থেকে লালা ঝরছে, কেউ বিকট শব্দে নাক ডাকছে, কারোর পোশাক অবিন্যস্ত, আবার কেউ ঘুমের ঘোরে দাঁত কিড়মিড় করছে।


এহেন ঘটনার প্রকৃত তত্ত্ব হলো  সিদ্ধার্থ  সেই রাতে নারীদের শারীরিক কদর্যতা দেখেননি, তিনি দেখেছিলেন মানুষের অস্তিত্বের নগ্ন বাস্তবতা (Reality of Impermanence)। 


তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, আমরা যে রূপ-যৌবনের মোহে পাগল হয়ে থাকি, তা আসলে ক্ষণস্থায়ী। ঘুমন্ত বা মৃত অবস্থায় এই শরীরের কোনো গরিমা নেই।

বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ 'নিদানকথা' অনুসারে, সিদ্ধার্থের চোখে ওই বিলাসবহুল রাজপ্রাসাদ মুহূর্তের মধ্যে একটা জ্যান্ত শ্মশান ঘাটে (Charnel ground) পরিণত

হয়ে ছিল ।


সেই ক্ষণে সিদ্বার্থ অনুভব করলেন যে তিনি যেন সারি সারি  শত শত  মৃতদেহের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন। এবং তিনি অনুভব করলেন, এই রূপ, যৌবন, রাজকীয় বিলাসিতা, — সবটাই একটা চরম ধোঁকা ও পাপের আঁধার।

এ-হেন অনুভবের পরে আর এক মুহূর্তও দেরি করলেন না তিনি। স্ত্রী যশোধরা আর শিশুপুত্র রাহুলকে ঘুমন্ত অবস্থায় রেখে, সেই রাতেই ওই ঘুমন্ত নারীদের মাঝখান দিয়ে পা টিপে টিপে তিনি চিরকালের মত রাজপ্রাসাদ ছেড়ে বেরিয়ে যান। যাকে ইতিহাসে বলা হয় 'মহাভিনিষ্ক্রমণ' (The Great Renunciation)'মহাত্যাগ' বা 'মহান প্রস্থান।


শত শত নারীর রূপ যৌবন ভোগের বিলাসিতা বিশাল সাম্রাজ্য, অফুরন্ত ঐশ্বর্য,সর্বাধিক শক্তি শালী পূর্ন ক্ষমতার লোভ, প্রলোভন — কোনো কিছুই সেই রাতে তাকে আটকাতে পারেনি।

বৃহত্তর সত্যের খোঁজে পরিবার এবং রাজপ্রাসাদ ছেড়ে সিদ্ধার্থ চলে গিয়েছিলেন জীবনে আসল সত্যের সন্ধানে।

মানুষের জরা,রোগ ,ভোগ ও মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষার উৎস সন্ধানে।

সেদিন যদি সিদ্ধার্থ সর্বস্ব ত্যাগ করে বেরিয়ে না যেতেন তবে হয়তো বৌদ্ধ ধর্মের সৃষ্টি হতো না।

আমরাও অমৃতের সন্ধান পেতাম না।

সেদিন সিদ্বর্থের সেই আত্ম ত্যাগের

কারনে মানুষ লাভ করেছে অমৃত ফলস্বরূপ জীবনে রোগ জ্বালা শোক মৃত্যুকে জয় করার পথ।

      (সংগ্রহীত)

      

======================

■■■■■■■■■■■■■■■■■■■■■


  

Tuesday, July 15, 2025

49>ঋষি অরবিন্দ ঘোষ::---

 49>ঋষি অরবিন্দ ঘোষ::---

ভারতীয় বাঙালি রাজনীতিক, দার্শনিক, যোগ এবং আধ্যাত্মিক গুরু।


অরবিন্দ ঘোষ জন্মগ্রহণ করেন কলকাতায় ৷ তিনি অধুনা পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার কোন্নগর এর প্রাচীন কুলীন কায়স্থ ঘোষবংশের সন্তান৷  তাঁর বাবা কৃষ্ণধন ঘোষ ছিলেন তৎকালীন বাংলার রংপুর জেলার জেলা সার্জন। মা স্বর্ণলতা দেবী, ব্রাহ্ম ধর্ম অনুসারী ও সমাজ সংস্কারক রাজনারায়ণ বসুর কন্যা। সংস্কৃতে "অরবিন্দ" শব্দের অর্থ "পদ্ম"। বিলেতে থাকাকালীন সময়ে অরবিন্দ নিজের নাম "Aaravind", বারোদায় থাকতে "Aravind" বা "Arvind" এবং বাংলায় আসার পর "Aurobindo" হিসেবে বানান করতেন। পারিবারিক পদবির বানান ইংরেজিতে সাধারণত "Ghose" হলেও অরবিন্দ নিজে "Ghosh" ব্যবহার করেছেন।



শ্রীঅরবিন্দ (জন্মগত নাম: অরবিন্দ অ্যাক্রয়েড ঘোষ; ১৫ অগস্ট ১৮৭২ – ৫ ডিসেম্বর ১৯৫০) ছিলেন একজন ভারতীয় দার্শনিক, যোগী, কবি ও জাতীয়তাবাদী। সাংবাদিক হিসেবে তিনি বন্দে মাতরম্‌ প্রভৃতি সংবাদপত্র সম্পাদনা করেন। তিনি ভারতকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। ১৯১০ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন স্বাধীনতা আন্দোলনের এক প্রভাবশালী নেতা। তারপর তিনি এক আধ্যাত্মিক সংস্কারকে পরিণত হন এবং মানব-প্রগতি ও আধ্যাত্মিক বিবর্তনের ক্ষেত্রে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির কথা প্রচার করেন।


ইংল্যান্ডের কেমব্রিজের কিং'স কলেজে অরবিন্দ ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস অধ্যয়ন করেন। ভারতে প্রত্যাবর্তনের পর বরোদার দেশীয় রাজ্যের মহারাজের অধীনে তিনি একাধিক অসামরিক পরিষেবা কার্যে অংশগ্রহণ করেন। এই সময় তিনি ক্রমশই ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের জাতীয়তাবাদী রাজনীতি এবং বাংলায় অনুশীলন সমিতির ক্রমবর্ধমান বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। একটি শুনানির মামলা চলাকালীন একাধিক বোমা নিক্ষেপের ঘটনায় এই সংগঠন জড়িয়ে পড়লে অরবিন্দও গ্রেফতার হন। এই সময় তাঁর বিরুদ্ধে আলিপুর ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনীত হয়। যদিও ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে নিবন্ধ রচনার অভিযোগেই কেবল তাঁকে দোষীসাব্যস্ত ও কারারুদ্ধ করা যেত। মামলা চলাকালীন নরেন্দ্রনাথ গোস্বামী নামে এক রাজসাক্ষী নিহত হওয়ার পর প্রমাণাভাবে অরবিন্দ মুক্তি পান। জেলে বন্দী থাকার সময় অরবিন্দ অতীন্দ্রিয় ও আধ্যাত্মিক কিছু অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। মুক্তিলাভের পর তিনি পন্ডিচেরি চলে যান এবং রাজনীতি থেকে নিজেকে সরিয়ে আধ্যাত্মিক সাধনায় মনোনিবেশ করেন।


পন্ডিচেরিতে অরবিন্দ অধ্যাত্ম-সাধনার যে বিশেষ প্রক্রিয়াটির বিকাশ ঘটান তার নাম তিনি দেন যোগ সমন্বয়। তাঁর অন্তর্দৃষ্টির মূল বক্তব্যটি ছিল মানব জীবনের বিবর্তন ঘটে এক দিব্য দেহে এক দিব্য জীবনলাভে। তিনি এমন এক আধ্যাত্মিক উপলব্ধিতে বিশ্বাস করতেন, যা শুধুমাত্র মোক্ষলাভই ঘটায় না, বরং মানব প্রকৃতির রূপান্তর ঘটিয়ে মর্ত্যেই এক দিব্য জীবনকে সম্ভব করে তোলে। ১৯২৬ সালে নিজের আধ্যাত্মিক সহকারী মীরা আলফাসার (যিনি "শ্রীমা" নামে অভিহিতা হতেন) সাহায্যে শ্রীঅরবিন্দ আশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয়।


লোকমান্য তিলক এবং ভগিনী নিবেদিতার সাথেও যোগাযোগ স্থাপিত হয়। বাঘা যতীন হিসেবে পরিচিত যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের জন্য তিনি বারোদার সেনাবিভাগে সামরিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন এবং পরবর্তীতে তাকে বাংলার অন্যান্য বিপ্লবী দলগুলোকে সংগঠিত করার কাজে পাঠান।

=====================


মৃত্যুভয়কে জয় করা । 


          শ্রীঅরবিন্দ বলছেন, শেষ পর্যন্ত যদি কাউকে এক বা অন্য কারণে দেহ পরিত্যাগ হয় এবং অন্য দেহ গ্রহণ করতে হয় তাহলে মৃত্যুকে হতাশা-পূর্ণ পরাজয়ে পরিণত না ক'রে   তাকে মহীয়ান ও আনন্দময় ক'রে তোলাই কি ভাল নয় ?

     অতএব সিদ্ধান্ত এই হবে যে :—

     

     কখনও মৃত্যুর ইচ্ছা পোষণ করবে না ;

     কখনও মরতে চাইবে না ;

     কখনও মৃত্যুকে ভয় করবে না;

     সকল অবস্থায় নিজের ব্যাপ্তি বা প্রসারের ইচ্ছা      

     পোষণ করবে ৷


       শ্রীঅরবিন্দ বলছেন, সর্বপ্রকার ভয়ের মধ্যে সব থেকে অস্পষ্ট ও আঁকড়ে থাকা ভয় হচ্ছে মৃত্যুভয় ৷এর মূল রয়েছে গভীরে অবচেতনায় এবং সেখান হতে তার অপসারণ সহজ নয় ৷এই ভয় থেকে উদ্ধার পাওয়ার অনেক রকম উপায় আছে ৷

প্রথম ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে জানা যে জীবন এক ও অবিনশ্বর ৷কেবলমাত্র আকৃতিই অসংখ্য,অল্পকালস্থায়ী ও ক্ষণভঙ্গুর ৷যে দেহ জন্ম নিয়েছে তা একদিন না একদিন মরবেই ("জাতস্য হি ধ্রুবো মৃত্যুর্ধ্রুবং" গীতা—অর্থাৎ, যে জন্মগ্রহণ করেছে তার মৃত্যু নিশ্চিত ৷)

           যুক্তি এই শিক্ষা দেয় যে,যে বস্তুকে এড়াতে পারা যাবে না তাকে ভয় করা নিরর্থক ৷একমাত্র পথ হচ্ছে সেই ধারণাকে গ্রহণ করা এবং ধীর স্থিরভাবে দিনের পর দিন,ঘন্টার পর ঘন্টা,কি ঘটবে না ঘটবে তার প্রতি একেবারেই দৃষ্টি না দিয়ে সর্বোত্তমরূপে যা করতে পারবে তাই করে যাওয়া ৷

           কিন্তু যে সমস্ত মানুষ আবেগপ্রবণ,তাদের পক্ষে এ কার্যকারী হবে না ৷তাদের গ্রহণ করতে হবে অন্তর্দর্শনের পথ ৷আমাদের সত্তার নীরব ও শান্ত গভীরে এক অগ্নিশিখা প্রজ্জ্বলিত রয়েছে—তা হ'চ্ছে চৈত্য চেতনার শিখা ৷এই অগ্নিশিখার সন্ধান কর',এর ওপরই একাগ্র হও—এ তোমার ভিতরেই আছে ৷যে মুহূর্তে তুমি তার ভিতরে প্রবেশ করবে—সেই মুহূর্ত্ত হতে অমরত্বের বোধ তোমার মধ্যে জাগ্রত হবে ৷তুমি বোধ করবে তুমি অনন্তকাল জীবিত আছ—তুমি অনন্তকাল জীবিত থাকবে ৷


        তৃতীয় পন্থাটি তাদের জন্য,যাদের কোন দেবতায় বিশ্বাস আছে—তাদের ভগবান,যাঁর নিকট পরিপূর্ণভাবে তারা নিজেদের সমর্পণ করেছে ৷তারা 

বিশ্বাস করে যে যা কিছু ঘটে তা তাদের ভালর জন্যই ঘটে ৷তাদের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তারা দেখে যে তারা তাদের পরম প্রিয়ের পদতলে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ নিয়ে আসীন বা তাঁর বাহুযুগলের মধ্যে বাস ক'রে পূর্ণ নিরাপত্তা উপভোগ করছে ৷তাদের চেতনায় আর ভয়ের উৎকন্ঠার বা বিপদের কোন স্থান নেই —সবই এক শান্ত,আনন্দময় পরম সুখের অবস্থায় পরিণত হয়েছে ৷

      ( সংগৃহীত)

=======================

Friday, May 30, 2025

48>একটি শিক্ষনীয় গল্প।[ (সক্রেটিস)]

 একটি শিক্ষনীয় গল্প।[ (সক্রেটিস)]


সক্রেটিস, সেই মহান দার্শনিক, যিনি তার প্রজ্ঞা, ধৈর্য এবং গভীর চিন্তনের জন্য সুপরিচিত ছিলেন — এমন একজন স্ত্রীর সঙ্গে বসবাস করতেন, যিনি প্রতিনিয়ত তার সহনশীলতার পরীক্ষা নিতেন। তার স্ত্রী বিখ্যাত ছিলেন তীক্ষ্ণ ভাষা, প্রভাবশালী উপস্থিতি এবং অদম্য রাগের জন্য।


প্রতিদিন সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই তিনি সক্রেটিসকে ঘর থেকে বের করে দিতেন, আর সক্রেটিস ফিরতেন সূর্য অস্ত যাওয়ার ঠিক আগে।


তবুও, এই কঠিন স্বভাবের স্ত্রীর প্রতি সক্রেটিস সবসময় সম্মান প্রদর্শন করতেন, এমনকি কৃতজ্ঞও ছিলেন। তিনি একবার বলেছিলেন, "আমার প্রজ্ঞার অনেকখানি আমার স্ত্রীর কাছ থেকে পাওয়া। কারণ, এই প্রতিদিনের পরীক্ষাগুলো ছাড়া আমি কখনো শিখতে পারতাম না যে, প্রকৃত জ্ঞান নীরবতায় বাস করে, আর শান্তি মেলে স্থিরতায়।”


একদিন, তিনি যখন তার ছাত্রদের সঙ্গে আলোচনা করছিলেন, তখন তার স্ত্রী রাগে চিৎকার করতে করতে এসে তার মাথায় পানি ঢেলে দিলেন। সক্রেটিস শান্তভাবে মুখ মুছতে মুছতে বললেন, "আহা, বজ্রপাতের পর বৃষ্টি তো স্বাভাবিক!"


তার জীবনের দাম্পত্য অধ্যায়ের সমাপ্তি আসে আরেকটি উত্তাল মুহূর্তে, যখন তিনি যথারীতি শান্ত ও নিশ্চুপ ছিলেন, আর তার স্ত্রী রাগে অস্থির হয়ে ওঠেন। অতিরিক্ত উত্তেজনার কারণে সেই রাতেই তার স্ত্রীর হৃদরোগে মৃত্যু ঘটে। সক্রেটিস তখনও স্থির — যেন কোনো বিশাল পাহাড়।


ইতিহাসে তার স্ত্রীর নাম বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কিন্তু সক্রেটিসের নীরব সহনশীলতা আজ কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে।


এটি কেবল একটি দাম্পত্য দ্বন্দ্বের গল্প নয় — এটি এক স্মরণিকা: শক্তি সবসময় শব্দে নয়, অনেক সময় নীরবতায় প্রকাশ পায়। আর জীবনের কঠিনতম মুহূর্তগুলোতেই আসে সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

Friday, January 10, 2025

47>আত্মা কখনো বিনষ্ট হয় না

 আজকের বিজ্ঞানীদের গবেষণালব্ধ জ্ঞান প্রাচীন কালেই আর্য ঋষিগণ বেদ, বেদান্ত, গীতায় লিপিবদ্ধ করেছিলেন।

ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচি-

ন্নায়ং ভূত্বা ভবিতা বা ন ভূয়ঃ৷

অজো নিত্যঃ শাশ্বতোহয়ং পুরাণো

ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে৷৷dS

                   — শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ২/২০


অর্থাৎ আত্মার কখনো জন্ম হয় না বা মৃত্যু হয় না। অথবা  পুণঃ পুণঃ তার উৎপত্তি বা বৃদ্ধি হয় না, তিনি জন্ম রহিত শাশ্বত, নিত্য এবং নবীন। শরীর  নষ্ট হলেও আত্মা কখনো বিনষ্ট হয় না।


   সবাই বলে মৃত্যু বড়ো ভয়ংকর,বিভীষিকাময়,বিধাতার নিষ্ঠুর অভিশাপ।

কিন্তু কই আমার তো তা মনে হয় না।আমার কাছে মৃত্যু হল আনন্দস্বরূপ,অমৃতস্বরূপ, সচ্চিদানন্দঘন ব্রহ্মস্বরূপ।মৃত্যুতে কীসের ভয়?  কীসের শোক?  কীসের দু:খ? কীসের কষ্ট?  কীসের পরিতাপ?  কীসের অনুশোচনা?

মা যেমন তার প্রিয় সন্তানকে আদর করে কপালে হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয়,মৃত্যুও তো ঠিক সেইরকমই আদর করে তার শীতল হাতের ছোঁয়ায় আমাদেরও জগৎসংসার থেকে চিরনিদ্রায় পাঠিয়ে দেয় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেবার জন্য।

মৃত্যুতে শুধুমাত্র দেহের বিনাশ ঘটে,আত্মার নয়।আত্মা অনন্ত,অবিনাশী,অচিন্তনীয় সত্ত্বা বিশেষ।।


"কত মহামানবের দেহত্যাগ হইয়াছে; কত দুর্বলচিত্ত মানুষ মৃত্যু-কবলিত হইয়াছে; কত দেবতারও মৃত্যু ঘটিয়াছে। মৃত্যু, মৃত্যু—সর্বত্র মৃত্যুই বিরাজ করিতেছে। এই পৃথিবী অনাদি অতীতের একটি শ্মশানক্ষেত্র; তথাপি আমরা এই দেহকেই আঁকড়াইয়া থাকি আর বলি, ‘আমি কখনও মরিব না।’ জানি ঠিকই যে, দেহের মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী; অথচ উহাকেই আঁকড়াইয়া থাকি। ঠিক অমর বলিতে আত্মাকে বুঝায়, আর আমরা ধরিয়া থাকি এই শরীরকে—ভুল হইল এখানেই।"

 

স্বামী বিবেকানন্দ ।।

=====================

Monday, November 25, 2024

46>নৃসিংহ ভাদুরী::---

 46>নৃসিংহ ভাদুরী::----

নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী একজন ভারতীয় ইতিহাসবিদ,  ভারততত্ত্ববিদ ও লেখক (মহাভারত ও রামায়ণ  বিশ্বকোষ  তৈরিতে অবদান) 

 জন্ম:;--- ২৩ নভেম্বর, ১৯৫০ পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমানে বাংলাদেশ)

পাবনা জেলার গোপালপুর গ্রামে  জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ভারতীয় মহাকাব্য ও পুরাণ বিশেষজ্ঞ। নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী ২০১২ সালে প্রধান ভারতীয় মহাকাব্য মহাভারত ও রামায়ণের একটি বিশ্বকোষ তৈরির বৃহত আকারের প্রকল্প গ্রহণ করেন। কাজের অসুবিধা ও জটিলতার কারণে, প্রকল্পটিকে শেষ করতে তাঁর এক দশক সময় লেগেছিল। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংস্কৃত ভাষায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

শ্রী ভাদুড়ী প্রাচীন ভারতীয় গল্পগুলির সহজ ব্যাখ্যা ক্ষেত্রে তাঁর পণ্ডিতের জন্য খ্যাতিমান, বিশেষত ভারতীয় মহাকাব্য রামায়ণ ও মহাভারত বিষয়ক।  তিনি সাধারণত বাংলা ভাষায় লেখেন এবং বাল্মিকীর রাম ও রামায়ণ, অর্জুন ও দ্রৌপদী এবং কৃষ্ণা কুন্তি এবং কৌন্তেয় সহ বহু বই লিখেছেন। 

বহু বছর ধরে তিনি নানান পত্র পত্রিকায় নিয়মিত লেখেন।

২০২০: মহাভারতের অষ্টাদশী প্রবন্ধের জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার।

ওনার বিখ্যাত কিছু  বইসমূহ---

1>বাল্মীকির রাম ও রামায়ণ [ ১৯৮৯] বাংলা আনন্দ পাবলিশার্স

2>মহাভারতের ভারত যুদ্ধ ও কৃষ্ণ[ ১৯৯০] বাংলা আনন্দ পাবলিশার্স

3>মহাভারত (ছোটদের জন্য) [১৯৯৩ ]বাংলা শিশু সাহিত্য সংসদ

4>অর্জুন ও দ্রৌপদী [ ১৯৯৩] বাংলা সাহিত্য সংসদ

5>দেবতার মানবায়ন [ ১৯৯৫] বাংলা আনন্দ পাবলিশার্স

6>কৃষ্ণা কুন্তী ও কৌন্তেয় [১৯৯৮] বাংলা আনন্দ পাবলিশার্স

7>শুকসপ্ততি [২০০১] বাংলা আনন্দ পাবলিশার্স

8>মহাভারতের ছয় প্রবীণ [২০০২ ]বাংলা আনন্দ পাবলিশার্স

9>মহাভারতের অষ্টাদশী [২০১৩ ]বাংলা আনন্দ পাবলিশার্স

10>মহাভারতের প্রতিনায়ক [২০১৫] বাংলা আনন্দ পাবলিশার্স।

            ( সংগৃহীত)

==================================

Friday, November 22, 2024

45>|| অবলা বসু বিজ্ঞানাচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর স্ত্রী ||

45> || অবলা বসু বিজ্ঞানাচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর স্ত্রী ||

আজ 23 নভেম্বর বিজ্ঞানাচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর প্রয়ান দিবসে
আনন্দবাজার পত্রিকা থেকে::----

বিপুল বিচিত্র কর্তব্যভার
নবজাগরণের বাংলায় দুই উচ্চশিক্ষিত, বিজ্ঞানমনস্ক যুবক-যুবতীর এমন যৌথজীবন হতে পারত আধুনিক দাম্পত্যের সূচনা। যেখানে দু’জনেরই রয়েছে কর্মক্ষেত্র, দু’জনেরই রয়েছে ।

শেষ আপডেট: ২৩ নভেম্বর ২০২৪ ০৪:৪২
অগ্রণী: নারীশিক্ষা ও স্বরোজগারের কর্মক্ষেত্র তৈরী করেন অবলা বসু।
অগ্রণী: নারীশিক্ষা ও স্বরোজগারের কর্মক্ষেত্র তৈরী করেন অবলা বসু।

অবলার সঙ্গে বিয়ের পর জগদীশচন্দ্র বসু বাড়ি ভাড়া নিলেন চন্দননগরে। সেখান থেকে নৌকায় নদী পেরিয়ে নৈহাটি এসে ট্রেন ধরতে হত। তাই তাঁরা কিনলেন একটা ‘জলি বোট’। স্বামীকে ও-পারে নামিয়ে দিয়ে অবলা একাই নৌকা বেয়ে ফিরে আসতেন। বিকেলে আবার বোট নিয়ে যেতেন ও-পারে। জগদীশচন্দ্র মশলাপাতি নানা কৌটোয় ভরে লেবেল সেঁটে রাখতেন, ‘হলুদ,’ ‘জিরে’ ইত্যাদি। নববধূ সবে পড়াশোনা সেরে সংসারে ঢুকেছে, হেঁশেল সামলাতে অপটু।

নবজাগরণের বাংলায় দুই উচ্চশিক্ষিত, বিজ্ঞানমনস্ক যুবক-যুবতীর এমন যৌথজীবন হতে পারত আধুনিক দাম্পত্যের সূচনা। যেখানে দু’জনেরই রয়েছে কর্মক্ষেত্র, দু’জনেরই রয়েছে সংসার। ঠিক তেমনটি হল না। বিয়ের বারো বছর পর রবীন্দ্রনাথকে চিঠিতে (২৫ এপ্রিল, ১৮৯৯) অবলা বলছেন, ইংরেজি ‘মিসেস’-এর পরিবর্তে বাংলায় একটা নতুন কথা প্রয়োজন। “আপাততঃ গৃহলক্ষ্মী বলিতে পরেন... সহধর্ম্মিণী একান্ত সেকালের। আধুনিকা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাধিমণ্ডিতা হইলে গৃহসরস্বতী লিখিতে বলিতাম।”

অবলা বেথুন কলেজ থেকে বিএ পাশ করে প্রথম শ্রেণির ছাত্রবৃত্তি নিয়ে ভর্তি হন মাদ্রাজ মেডিক্যাল কলেজে (১৮৮২)। একা এক অচেনা শহরে থেকে চার বছর পরে ফার্স্ট এলএমএস পরীক্ষা পাশ করেন, অসুস্থতার জন্য দ্বিতীয় এলএমএস পরীক্ষা না দিয়ে ফিরে আসেন কলকাতায়। তা সত্ত্বেও সামগ্রিক ফলের ভিত্তিতে অবলাকে সাম্মানিক এলএমএস ডিগ্রি দিয়েছিল তাঁর প্রতিষ্ঠান (১৯৮৮)। এমন মেয়েকে কী করে সেকেলে ‘গৃহলক্ষ্মী’-র ছাঁচে ফেলা যায়?

বিয়ের পর আট-ন’বছর এক বৃহৎ যৌথ পরিবারে গৃহিণীপনা করতে করতে অবলারও আত্মবিশ্বাস যেন ক্ষয়ে এসেছিল। “আমি যখন আচার্য্যের সহিত ইংলণ্ডে যাই, তখন জড়পিণ্ডবৎ ছিলাম... একটি কথাও বলিতে পারিতাম না,” লিখছেন অবলা (১৮৯৬)। এর পর থেকে অবশ্য স্বদেশ-বিদেশে যে কোনও সফরে স্বামীর সঙ্গী হতেন অবলা, কারণ আত্মভোলা অধ্যাপক স্ত্রীর উপর নিজের আহার, পোশাক, সব বিষয়ে সম্পূর্ণ নির্ভরশীল ছিলেন। আর অবলা গৃহিণী, সখা, সচিব হয়ে আগলে রেখেছিলেন জগদীশচন্দ্রের বিজ্ঞানসাধনাকে। বসু বিজ্ঞান মন্দিরের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য অবলা কী বিপুল, বিচিত্র কর্তব্যভার কেমন প্রশান্ত ভাবে বহন করতেন, তার সাক্ষ্য মেলে সহকর্মী, ছাত্রছাত্রীদের স্মৃতিকথায়।

পরিণত বয়সে অবলা যখন নারীশিক্ষা ও স্বরোজগারের বিস্তৃত কর্মক্ষেত্র তৈরি করেছিলেন, তখন কি জগদীশচন্দ্র তাঁর পাশে ছিলেন? অবলা-প্রতিষ্ঠিত ‘নারীশিক্ষা নিকেতন’-এর অধীনে চলত বিধবাশ্রম, হাতের কাজের প্রশিক্ষণ, সমবায়ের মাধ্যমে সে সব পণ্যের বিপণন, গ্রামে মেয়েদের স্কুল স্থাপন। মেয়েদের ভোটাধিকার আদায়ের আন্দোলনেও অবলা ছিলেন অগ্রণী। এ সব কাজ অবলাকে করতে হত দুপুরে, স্বামীর বিশ্রামের অবসরে। মনে হয় খানিক অভিমান করেই দময়ন্তী দাশগুপ্ত অবলার জীবনচরিত উৎসর্গ করেছেন দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়কে, যিনি নিজের চিকিৎসক স্ত্রী কাদম্বিনীর সর্বপ্রধান সহায় ছিলেন।

দময়ন্তী দাশগুপ্ত যে নারীবাদের তাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যে অবলা বসুর জীবন ও কাজকে আলোচনা করেছেন, এমন নয়। তিনি সাংবাদিক, তাঁর এই কাজকে বলা চলে ইতিহাসের এক নিবিড় অনুসন্ধান। তবু প্রচলিত কথাবার্তায় যা আড়ালে থেকে যায়, তার উপর আলো পড়লে ভিন্ন নকশা চোখে পড়ে। চেনা লোক, জানা কথাগুলো নতুন করে ভাবতে হয়। চিন্তায় এমন নাড়াচাড়া ফেলে দেওয়া— এও নারীবাদের বৈশিষ্ট্য।

অবলাকে জানা-বোঝায় একটা ফাঁক রয়েই গিয়েছে— অবলা যে ডায়েরি লিখতেন সে কথা পাওয়া যায়, কিন্তু ডায়েরিগুলি পাওয়া যায়নি। ফলে অবলার মানসলোকের নাগাল পাওয়া যায় না। তাঁর দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, ক্ষোভ-উদ্বেগ, মনের উপর জীবনের নানা ঘটনার অভিঘাত, কিছু জানা যায় না। লেখক এই ফাঁক ভরাতে চেয়েছেন প্রধানত দু’ভাবে— অবলার চার পাশের মানুষগুলির প্রতিকৃতি ফুটিয়ে তুলে, এবং অবলার সম্পর্কে তাঁর পরিচিতদের পর্যবেক্ষণ, তাঁদের লেখা চিঠিপত্র তুলে ধরে। সেই সব উপাদান দিয়েই অবলার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের, নিবেদিতার সম্পর্ক সূক্ষ্ম আঁচড়ে এঁকেছেন দময়ন্তী।

অবলার পারিবারিক পরিমণ্ডলের বিশদ তথ্য থেকেও নানা সম্ভাবনাপূর্ণ ইঙ্গিত দিয়ে যায়। যেমন, নারীশিক্ষার প্রচারে দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়, শিবনাথ শাস্ত্রী, দুর্গামোহন দাস প্রমুখ যে অগ্রণী ছিলেন, তা যথেষ্ট প্রচারিত। এই বইটি পড়ে আন্দাজ হয়, দুর্গামোহনের অকালপ্রয়াতা স্ত্রী ব্রহ্মময়ীর প্রভাবও কম ছিল না। এই ব্যক্তিত্বময়ী, স্নেহশীল মহিলা বিধবা এবং অন্যান্য বিপন্ন মেয়েদের নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিতেন, তাদের শিক্ষা ও বিবাহের ব্যবস্থা করতেন। তাঁর বড় মেয়ে সরলা রায় (গোখলে মেমোরিয়াল স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা) এবং মেজো মেয়ে অবলা, দু’জনেই নিজেদের পরিচালিত স্কুলের সঙ্গে রেখেছিলেন হস্টেল। ছাত্রীদের প্রতি তাঁদের স্নেহসিক্ত ব্যবহারের কথা মেলে প্রাক্তনীদের বয়ানে।

অবলার বিধবাশ্রমে স্থান পেত স্বামী-পরিত্যক্তারাও, নানা প্রশিক্ষণও পেত। ‘সেকেলে গৃহলক্ষ্মী’ অবলা একষট্টি বছর বয়সে একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “আমার মনে হয় সব মেয়েদের আর্থিক স্বাধীনতা থাকা দরকার। তা নইলে আমরা আত্মসম্মান-ভ্রষ্ট হব।”
       ( সংগৃহীত )
=============================