Tuesday, March 21, 2017

9>গিরিশচন্দ্র ঘোষ।

9>গিরিশচন্দ্র ঘোষ।
জুড়াইতে চাই কোথায় জুড়াই


আমৃত্যু সয়েছেন প্রিয়জনের বিয়োগ-ব্যথা। লাঞ্ছনা, অপমানও। থিয়েটারই ছিল তাঁর জিয়নকাঠি। তিনি গিরিশচন্দ্র ঘোষ। ঠিক এক মাস পর তাঁর জন্মদিন। লিখছেন আবীর মুখোপাধ্যায়


২৮ জানুয়ারি, ২০১৭, ০০:০০:০০
লোকটা আজ বেহেড মাতাল!
শহরের বারাঙ্গনারাও তাঁকে দরজা খুলে দিতে নারাজ!
কত গিলেছে কে জানে! মদ খেয়ে একেবারে টং! লাল চোখ।
ওই দক্ষিণেশ্বরের কথা মনে পড়ল বুঝি। সে জানে সেখানে একজন আছেন, তিনি কখনও দরজা বন্ধ করেন না!


যেমন ভাবা, অমনি জুড়ি গাড়িতে লাফিয়ে উঠল সে। নিজের লেখা পাহাড়ি পিলুতে খেমটা গাইতে গাইতে চলল। গঙ্গাপারের ভিজে হাওয়ায় ওই শোনা যাচ্ছে, ‘ছি ছি ছি ভালবেসে,/ আপন বশে কি রয়েছো।’
ঢের রাত।
মন্দিরের চারপাশে নিকষ অন্ধকার। গাড়ি থামতেই, খোঁয়ারি জড়ানো গলায় লোকটা চিৎকার করল, ‘‘ঠাকুর, ঠাকুর!’’
বেরিয়ে এলেন শ্রীরামকৃষ্ণদেব! তিনি বুঝি অপেক্ষা করছিলেন। বললেন, ‘‘কাতর প্রাণে, এমন করে কে ডাকে? গিরিশ না!’’
ঠাকুরের ছোঁয়ায় যেন বিদ্যুৎস্পর্শ। সম্বিৎ ফিরে লজ্জায় নুয়ে পড়ল লোকটা।
পরমহংস বললেন, ‘‘মদ খেয়েছিস তো কি, আমিও মদ খেয়েছি। ‘সুরাপান করি না আমি, সুধা খাই জয়কালী বলে, মন-মাতালে মাতাল করে, মদ-মাতালে মাতাল বলে।’’’ গান গাইতে গাইতে লোকটার হাত ধরে নাচতে লাগলেন ঠাকুর।


মোদো-মাতাল লোকটাই বাংলার রঙ্গমঞ্চ ও নাট্য ইতিহাসে তাঁর কালের শ্রেষ্ঠ নট!


গিরিশচন্দ্র ঘোষ।
গিরিশের জন্ম বাগবাজারে।
বাবা নীলকমল ঘোষ ছিলেন সওদাগরি অফিসের বুক-কিপার। মা রাইমণি। পাঠশালায় একদিন হাফ-আখড়াইয়ের আসরে কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সংবর্ধনা দেখে, গিরিশের ইচ্ছে হল কবি হওয়ার। কিন্তু লেখা-পড়ায় মন কই ছেলের! সারা দিন টো টো।
মাকে হারিয়ে ফেলল গিরিশ!
ছেলেমেয়েদের নিয়ে বাবা নীলকমলবাবু গঙ্গাবক্ষে ভ্রমণে বের হলেন। হঠাৎ ঝড়। নৌকো ডুবে যায়-যায়! গিরিশ শক্ত করে বাবার হাতটা ধরল। মা নেই, কার হাতই বা ধরবে!


ঝড় থামলে নীলকমল বললেন, ‘‘হাতটা ধরে ছিলিস, নিজের প্রাণ বড় না তোর? নৌকো ডুবলে কি ভাবছিস, তোকে বাঁচাবার চেষ্টা করতুম? যেমন করে পারি নিজেকেই বাঁচাতুম!’’


এ কী শুনল গিরিশ!


সে বুঝল এ পৃথিবীতে বিপদে তার হাত ধরার কেউ নেই আর!


‘মা’ বলে কেঁদে ফেলল সে!


সারাজীবন এ ব্যথার উপশম মেলেনি তাঁর! দুঃখ ছিল নিত্য সহচর। যখন বয়স আট, এক দাদার মৃত্যু হল। চোদ্দো বছর বয়সে হারাল বাবাকে! বোনেদের মৃত্যুও দেখতে হয়!


বাবা মারা যাওয়ার পরে বিয়ে হয়ে গেল গিরিশের! বউ, শ্যামপুকুরের নবীন সরকারের মেয়ে, প্রমোদিনী।
বিয়ের পরে, গিরিশ ফের স্কুলে ভর্তি হলেন। কিন্তু পরীক্ষাই দিলেন না। চুকে গেল তাঁর স্কুলের সঙ্গে সম্পর্ক।
তাঁর উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনে ভয় পেয়ে গেলেন শ্বশুরমশাই নবীনচন্দ্র! তিনি জামাইকে ‘অ্যাটকিনশন টিলটন’ কোম্পানিতে শিক্ষানবিশি চাকরি জুটিয়ে দিলেন।
গিরিশ হলেন ‘বুক-কিপার।’ এ বার তার মতি ইংরেজি সাহিত্যে।
কিন্তু স্বস্তির জীবন যে নয় তাঁর!


অফিস গেল উঠে।


১৮৭৪, ডিসেম্বরে মারা গেলেন স্ত্রী। রেখে গেলেন ছেলেমেয়ের পালনভার। গিরিশের সব কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেল। দিন কাটে তখন গঙ্গার ধারে। নেশার দিন। কবিতার দিন।
বাগবাজার। কলুটোলা। কখনও ১৪৫ কর্নওয়ালিশ স্ট্রিটেও!
মৃত্যুর এই শমন একে একে কেড়ে নিয়েছে তাঁর দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী, পুত্র-কন্যাকেও! সব... সব হারিয়েছেন!
মর্মশোকে কেবলই বলতেন, ‘সংসার বৃহৎ রঙ্গালয়। নাট্যরঙ্গালয় তাহারই ক্ষুদ্র অনুকৃতি।’
লাট খেতে খেতে গাইতেন, ‘জুড়াইতে চাই, কোথায় জুড়াই,/ কোথা হতে আসি, কোথা ভেসে যাই।/ ফিরে ফিরে আসি, কত কাঁদি হাসি,/ কোথা যাই সদা ভাবি গো তাই।’


‘‘এত কষ্ট কেন? আয়, আমরা দু’জনে যেমন পারি, গান বাঁধি!’’
‘‘আমরা!’’
‘হ্যাঁ আমরা, কেন পারব না!’’


গিরিশের কথা শুনে হতবাক সহচর উমেশচন্দ্র চৌধুরী!


দু’জন ফিরছিলেন সে যুগের গীতিকার প্রিয়মাধব বসু মল্লিকের বাড়ি থেকে। তাঁদের প্রতিষ্ঠিত বাগবাজার শখের যাত্রাদল মাইকেলের ‘শর্মিষ্ঠা’ পালা করবে। গান চাইতে গিয়েছিলেন। কিন্তু গান দেননি প্রিয়মাধব।


অগত্যা দু’জনেই গান বাঁধলেন।


গিরিশ লিখলেন, ‘আহা! মরি! মরি!/ অনুপমা ছবি, মায়া কি মানবী,/ ছলনা বুঝি করে বনদেবী!’


সেই বয়স থেকেই এমন চট-জলদি লিখে ফেলায় গিরিশ ছিলেন তুখড়।


একবার শনিবার রাতে মিনার্ভা থিয়েটারে ‘প্রফুল্ল’ হচ্ছে। ঠিক হল পরের শনিবার নতুন নাটক নামবে।
গিরিশচন্দ্র ঠিক করলেন সেই রবিবারই তিনি নতুন নাটক লিখবেন!
খবর দিলেন কলমচিকে।
সে দিন ‘প্রফুল্ল’-তে যোগেশ চরিত্রে অভিনয় করেন আর গ্রিনরুমে এসে নতুন নাটকের কাহিনি-সংলাপ বলে যান। সেই রাতে গানও লিখলেন।
ফিরলেন শেষ প্রহরে।
লেখা হয়ে গেল ‘মণিহরণ।’
বলতেন, ‘‘চোখে না দেখে কিছু লিখিনি।’’ যাঁরা তাঁর কলমচি ছিলেন, দেখেছেন, তাঁর সেই ব্যথাকাতর সময়।
একবার তিনি মিনার্ভায়।
স্বভাবমতো ঘুরতে ঘুরতে বলছেন।


দ্রুত লিখে নিচ্ছেন কলমচি অবিনাশচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়, যিনি পরে তাঁর জীবন লিখবেন। লেখার মাঝে প্রশ্ন করতেই গিরিশচন্দ্র বিরক্ত হয়ে চিৎকার করে উঠলেন। রাগে কাঁপছেন!
হাঁপানির জন্য কষ্ট হচ্ছে। শ্বাস নিতে কেঁপে কেঁপে উঠছেন!
তবু নাটক লেখা চাই!


হেমন্তকাল এলেই রোগ যেন বেড়ে যায়। সারা শীতকাল জুড়ে ভোগেন। কিন্তু কারও কথা শুনবেন না!
লিখছিলেন, ‘সিরাজদ্দৌল্লা’।
বুকে, গলায় হাত দিয়ে চেপে ধরে বলছিলেন, ‘ওহে হিন্দু-মুসলমান—/ এস করি পরস্পর মার্জ্জনা এখন...।’
‘‘কী বললেন?’’
‘‘আহা! ভাবনার মাঝে প্রশ্ন করে কী ক্ষতি করলে জানো! কত বার বলেছি, তবু মনে রাখতে পারো না! লেখার মাঝে থামালে সব গোলমাল হয়ে যায়!’’


যাত্রার পরে নাটক নিয়ে পড়েন। ঠিক হল, দীনবন্ধু মিত্রের ‘সধবার একাদশী’। চতুর্থ অভিনয়ের রাতে হাজির খোদ নাট্যকার।
দীনবন্ধু মিত্র।


জড়িয়ে ধরলেন গিরিশকে!
বাগবাজার ন্যাশনাল থিয়েটার ভেঙে গেলে হিন্দু ন্যাশনাল থিয়েটার আর ন্যাশনাল থিয়েটারের জন্ম।
তবে এই সময় গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারের পত্তনের ইতিহাস একটু অন্যরকম। সে’ও এক গল্প!
বাগবাজারের তরুণ জমিদার ভুবনমোহন নিয়োগী বেঙ্গল থিয়েটারে গ্রিনরুমে ঢুকতে গিয়ে বাধা পেলেন।
নিজেই থিয়েটার খুললেন। গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটার।
গিরিশ বঙ্কিমের ‘মৃণালিনী’র নাট্যরূপ দিলেন। চাকরিও করছেন। ইন্ডিয়ান লিগের হেড ক্লার্ক।
এক বছর পরে গেলেন পার্কার কোম্পানিতে। তাঁর দ্বিতীয় বিয়ে হয়েছে, স্ত্রী সুরতকুমারী।
হঠাৎ অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইনে গোল ছড়াল থিয়েটার পাড়ায়। বন্ধ হল শো!
দেনার দায়ে ডুবে
ভুবনবাবু গিরিশকে অনুরোধ করলেন থিয়েটার লিজে নিতে।
গিরিশ রাজি। তবে ‘গ্রেট’ নয়, নাম দিলেন ‘ন্যাসান্যা‌ল থিয়েটার।’
ঠিক করলেন প্রথম নাটক হবে মধুসূদনের ‘মেঘনাদবধ কাব্য।’
তত দিনে জোড়াসাঁকোর জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের মঞ্চনাটক ‘সরোজিনী’তে অভিনয় করে বিনোদিনীও গাইছে রবিঠাকুর।
‘জ্বল জ্বল চিতা। দ্বিগুণ, দ্বিগুণ!’
‘‘কী রে বিনোদ এখান হইতে যাইলে তোর মন কেমন করিবে না?’’
বিনোদিনী কী উত্তর দেবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না।
তাঁর ছোটবাবু মানে বেঙ্গল থিয়েটারের শরৎচন্দ্র ঘোষের কথায় তিনি চুপ করে ছিলেন।
কী’ই বা বলবেন!
সামনে দাঁড়িয়ে গিরিশ ঘোষ! তাঁরা তাঁকে নিয়ে যাচ্ছেন নতুন দলের জন্য।


বিনোদিনী নিজের আত্মজীবনীতে লিখছেন, ‘‘গিরিশবাবুর সহিত থিয়েটার আরম্ভ করিয়া বিডন স্ট্রীটের ‘ষ্টার থিয়েটার’ শেষ হওয়া পর্যন্ত আমি তাঁহার সঙ্গে বরাবরের কার্য্য করিয়া আসিয়াছি। কার্য্য ক্ষেত্রে তিনি আমার শিক্ষক ছিলেন এবং আমি তাঁহার প্রথমা ও প্রধানা শিষ্যা ছিলাম।’’


কেমন সম্পর্ক?


বিনোদিনী লেখেন, ‘‘জোর জবরদস্তি, মান অভিমান, রাগ প্রায়ই চলত। তিনি আমায় অত্যধিক আদর দিতেন, প্রশ্রয় দিতেন।’’
‘‘কী হল গিরিশবাবু! বারে, অমন করে তাকিয়ে থাকবেন!’’
‘‘বিনোদ! তোমাকে নিজের হাতে গড়ব। তুমি আমার সজীব প্রতিমা!’’
গিরিশের জীবনে যেন ঝেঁপে এলেন বিনোদিনী! তাঁর বিনি। মেয়ে লেখে, ‘প্রেমডোর দিয়ে তারে বাঁধি অনিবার/ সে মালা কি ভালবাসা প্রাণেশ আমার?’
অমৃতলাল বসু ‘অমৃত মদিরা’য় সেই সব দিনের কথায় লিখছেন, ‘‘গিরিশের পদাবলী রোম্যান্সের মেলা/ কবিতা লিখায়ে তাই বিনি করে খেলা/ হাসির কথায় নিশ হয়ে গেছে ভোর/ তথাপি ওঠে না কেহ ছাড়িয়া আসোর।’’
গিরিশ বিনোদকে খুব বিশ্বাস করতেন। বিনোদও মানুষটার সামনে তাঁর সব গ্রন্থি আলগা করে দেন।
এক দিন বিনোদ চুপটি করে শোনেন হর-পার্বতীর গল্প। রাত বাড়ে। নেশা ভেজানো গলায় গিরিশ শোনান তাঁর নতুন নাটক ‘আগমনী।’


গিরিশের ভাগ্য বিড়ম্বিত!


খরচের বোঝা বইতে বইতে একসময় ন্যাশনাল থিয়েটার বিকিয়ে গেল! কিনলেন প্রতাপচাঁদ মুহুরি। ১০০ টাকায় গিরিশ সেখানে ম্যানেজার!


দিন-রাত নাটক লিখছেন তিনি।
অক্লান্ত!
৮২-তে ৭টি পৌরাণিক নাটক! সঙ্গে চলছে আকণ্ঠ মদ্যপান। অমৃতলাল লিখছেন, ‘আমি আর গুরুদেব (গিরিশ) যুগল ইয়ার/ বিনির (বিনোদিনী) বাড়িতে যাই খাইতে বিয়ার।’ শেষ হলে ফের আনা হয় ‘বি-ফাইভ ব্র্যান্ডি।’
হাঁটুতে মুখ রেখে স্থির হয়ে বসে আছেন বিনোদিনী।
তাঁর চোখ লাল!
খোলা চুল। এলোমেলো শাড়ির কুঁচি-আঁচল। থমথমে ঘর-দুয়ার।
বিনোদ থিয়েটার ছেড়ে দিতে চান!
গিরিশ আর অমৃত তাঁকে বোঝাচ্ছেন। কোনও কথাই যেন বিনোদের কানে ঢুকছে না।
তাঁর কেবল মনে পড়ে যাচ্ছে প্রতাপ জুহুরির কুৎসিত ভাষা, চোখের ইঙ্গিত! বিনির কী দোষ!
পনেরো দিনের ছুটি নিয়ে কাশী গিয়েছিলেন। ফিরতে দেরি হয়েছে। তাই বলে ছুটির মাইনে দেবেন না!
বিনোদিনীর সঙ্গে গিয়ে প্রতিবাদ করেছিলেন গিরিশও। প্রতাপকে বলেছিলেন, ‘‘মাইনে না দিলে বিনোদ কিন্তু কাজ করবে না!’’


‘‘মাহিনা কেয়া?’’


গিরিশ হতবাক প্রতাপের কথা শুনে। ঘেন্নায় গা রি রি করছিল বিনোদের! বটে মাহিনা দেবে না!
রাগে কাঁপতে কাঁপতে চলে এসেছিলেন বিনোদ। কিন্তু সে চলে গেলে এখন যে খুব বিপদ হয় গিরিশের। দলের সবার। গিরিশ বোতল নিঃশেষ করে বিনোদকে আদর করে বোঝাতে গেলেন, তিনি জানেন তাঁর কথা এই মেয়ে ফেলবে না!


গিরিশবাবুর চোখের দিকে তাকিয়ে ‘না’ ব‌লতে গিয়ে ঠোঁট কেঁপে উঠল বিনোদের! পারল না তাঁর বিনি!
অমৃত মিত্র বললেন, ‘‘দেখ বিনোদ, এখন গোল করিস না। একজন মাড়োয়ারির ছেলে নতুন থিয়েটার করতে চায়। যত টাকা লাগে সে খরচ করবে। কিছু দিন চুপ করে থাক। দেখ কী হয়!’’
কিছু দিন পরে ন্যাশনাল ছেড়ে দিলেন গিরিশ। ছাড়লেন বিনোদিনীও।


কলকাতায় তখন নটী বিনোদিনীর ঢলঢলে রূপের বেশ কদর! সব পুরুষই তাঁকে ছুঁতে চায়। ছোঁয়া কী সহজ!


মুগ্ধ মাড়োয়ারি ঘরের ছেলে গুর্মুখ রায়। ৬৮ বিডন স্ট্রিটে লিজের জায়গায় তিনি তৈরি করলেন পাকা মঞ্চ। ঠিক ছিল নাম দেবেন, বিনোদিনীর নামে।
কিন্তু হল কই!
গড়ে উঠল স্টার থিয়েটার।
সকাতরে বিনোদিনী দাসী লিখছেন স্টার-কথা, ‘‘সকলে চলিয়া যাইলে আমি নিজে ঝুড়ি করিয়া মাটী বহিয়া পিট, ব্যাক সিটের স্থান পূর্ণ করিতাম।... আমার সেই সময় আনন্দ দেখে কে?...সকলে আমায় বলেন যে, ‘এই যে থিয়েটার হাউস হইবে, ইহা তোমার নামের সহিত যোগ থাকিবে।’...কিন্তু কার্যকালে উঁহারা সে কথা রাখেন নাই কেন— তাহা জানি না!’’
বিনির মনখারাপ!
সকলে ঠকিয়েছে তাঁকে!
গিরিশ জানেন কী করে দুলালির মন ভাল করতে হয়। বিনোদকে ‘সতী’ চরিত্রে রেখে লিখলেন ‘দক্ষযজ্ঞ’। নিজে সাজলেন ‘দক্ষ।’
কিন্তু বেশি দিন সুখ সইল না।
বিনোদিনীকে সর্বক্ষণের সঙ্গী হিসাবে দাবি করে স্টারে টাকা ঢেলেছিল যে গুর্মুখ রায়, সেও সরে গেল। ভেঙে গেল ‘স্টার’-এর স্বপ্ন!
এগারো হাজার টাকায় স্টার হস্তান্তরের ব্যবস্থা করলেন দলের কয়েক জনের নামে। কিন্তু নিজে মালিক হলেন না। কেন না, অনুজ অতুলকৃষ্ণকে কথা দিয়েছিলেন, থিয়েটারে যত দিন থাকবেন, কখনও নিজে মালিক হবেন না! মালিকানা বদল হলেও নাটক থেমে রইল না। কিন্তু গিরিশের ভিতরে ভিতরে অস্থিরতা যেন বেড়েই চলেছে।
বুক জুড়ে জ্বালা!
লরোগে, শোকে দহিত তিনি!
মুক্তি মেলে না!
কালীঘাটে ফি সপ্তাহে শনি-মঙ্গলবার হাড়কাঠের কাছে বসে সারারাত্তির জগদম্বাকে ডাকতে থাকেন।
উচ্চারণ করেন মাতৃনাম, ‘কালী করালবদনা।’ পথের লোককে জিজ্ঞেস করেন, ‘‘মুক্তি কীসে গা!’’
গিরিশের দিকে তাকিয়ে হাসছেন ঠাকুর। নাচতে নাচতেই হাসছেন!
ভাব-কোমল নৃত্য!
আর রাম দত্ত খোল বাজাচ্ছেন।
আর পরমহংস নাচছেন।
দু’হাত তুলে ঠাকুর গাইছেনও, ‘নদে টলমল করে গৌরপ্রেমের হিল্লোলে।/ নদে টলমল...।’ গাইতে গাইতেই সমাধি নিলেন ঠাকুর।
তিনি চোখ খুলতে গিরিশ ঠাকুরকে ফের জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘আমার মনের বাঁক যাবে?’’
ঠাকুর বললেন, ‘‘যাবে।’’
যেন বিশ্বাস হচ্ছে না গিরিশের! তিনি বার বার জিজ্ঞেস করছেন। ঠাকুর হেসে তিন সত্যি করলেন।
এ প্রথম নয়। গিরিশের যখন চল্লিশ, শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে সেই প্রথম দেখা তাঁর।
এক সন্ধ্যায় পরমহংসকে বারবার ‘সন্ধে হল, সন্ধে হল’ জিজ্ঞেস করতে দেখে বলেছিলেন, ‘‘ঢং দেখো, সন্ধ্যা হইয়াছে, সম্মুখে সেজ জ্বলিতেছে, তবু উনি বুঝিতে পারিতেছেন না!’’
আরেক বার বলরাম বসুর বাড়িতে দেখে পালিয়ে এসেছিলেন!
ঠাকুরের তাঁর তৃতীয়বার দেখা ১৮৮৪-তে। ‘চৈতন্যলীলা’র অভিনয় দেখতে এলেন শ্রীরামকৃষ্ণদেব।
স্টার থিয়েটার। ২০ সেপ্টেম্বর। মঞ্চে চৈতন্যের ভূমিকায় বিনোদিনী বৈষ্ণবনৃত্যের পরে যখন ‘কৃষ্ণ কই-কৃষ্ণ কই’ বলে জ্ঞান হারালেন দর্শক বৃন্দাবনী প্রেমে ভাসল!
নাটক শেষ। বিনোদিনীর ‘নিমাই’ দেখে তাঁর মাথায় হাত রেখে পরমহংস বললেন, ‘‘তোর চৈতন্য হোক।’
আর গিরিশের?
দু’জনে বসে আছেন এক দিন দক্ষিণেশ্বরে। মন উচাটন গিরিশের!
পরমহংস গিরিশকে বললেন, ‘‘এখন থেকে এদিক-ওদিক দু’দিক রেখে চল। তারপর যদি এই দিক ভাঙে তখন যা হয় হবে। সকালে-বিকালে স্মরণ-মননটা একটু রাখিস, পারবিনে?’’
গিরিশ চুপ করে থাকেন! ভাবেন এ কেমন বাঁধাবাধি! বলেন, ‘‘যদি কথা রাখিতে না পারি!’’
ঠাকুর বলেন, ‘‘তবে আমায় বকলমা দে। শ্রীভগবানে পাপ-পুণ্যের ভার দিয়ে সম্পূর্ণ আত্ম-সমর্পণ কর।’’
গিরিশ এ বার রাজি হলেন!
ঠাকুরের অপার করুণায় চোখে জল গিরিশের! হাপুস নয়নে কাঁদছেন তিনি!
মেঘ যেন ঘনিয়ে এল ফের!
‘বেল্লিক বাজার’ নাটকের প্রথম রাতের অভিনয়ের পরে থিয়েটার ছেড়ে দিলেন বিনোদিনী!
প্রিয়জনের ‘ছলনার আঘাত’ তিনি ভুলতে পারেননি! অন্য দিকে গোপাললাল শীল নামে এক ব্যক্তি স্টার থিয়েটারের জমি কিনে নিলেন!
গিরিশের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল যেন! ত্রিশ হাজার টাকায় পুরনো স্টারকে বিক্রি করে এ বার গিরিশ অনুগামীরা চলেন হাতিবাগানে।
যেন পুনর্জন্ম স্টার থিয়েটারের!
সে সময় গোপাললালের ‘এমারেল্ড’-এ গিরিশ মাসিক তিনশো পঞ্চাশ টাকার কাজ করেছে।
সে টাকাও তিনি পাঠাতেন পুরনো দলকে। প্রতিদানে কী পেলেন?
কী-ই’বা পেতেন!
মাসে একশো টাকা মাইনে।
আর দৈনিক চার পয়সার তামাক। জুটল ক্ষত!
প্রিয় শিষ্যদের কাছ থেকে লাঞ্ছনা-অপমান! স্টারে ফিরলে গিরিশ ঘোষকে তাড়িয়ে দিলেন তাঁরই শিষ্যরা। বরখাস্ত হলেন!
মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে অঙ্গীকার করতে বাধ্য হলেন বৃদ্ধ নট, স্টারের শর্তে। গিরিশ কথা দিলেন, মাসে ১০০ টাকা পেনশনের বিনিময়ে আর কোথাও কখনও থিয়েটার করবেন না! কখনও না!
‘মমতা এস না বক্ষে মম/ জ্বল জ্বল রে অনল/ প্রতিহিংসানল জ্বল হৃদে।’
পারলেন না!
তিনি লিখলেন, ‘জনা’। ক্ষত মেটাতে ক্ষতিপূরণ দিয়ে তার আগেই জন্ম হল মিনার্ভার। অভিনয় হল অনুবাদে ম্যাকবেথ।
স্থির হতে পারছেন না!
উইংসের আড়াল থেকে কে যেন তাঁকে ডাকছে! বিনোদ না! প্রতি মুহূর্তে নিজেরই তৈরি করা চরিত্রেরা বুঝি কথা বলছে ফিসফিস হাওয়ায়। তাদের সংলাপ, হাসি, কান্না ক্যাকফনি হয়ে মিশে যাচ্ছে গিরিশের বুকের জ্বালায়, হাহাকারে! আর্তরবে!
থিয়েটার পাড়ার পথের হাওয়ায় তখন গিরিশকে নিয়ে স্টার থিয়েটারের হ্যান্ডবিল উড়ছে! ধুলোয় লাট খাচ্ছে কাগজগুলো। তাতে লেখা, ‘তোমার শিক্ষিত বিদ্যা দেখাব তোমায়।’
গিরিশ হাসছেন!
পঁয়তাল্লিশ বছরের অভিনয় জীবন। কখনও লিখবেন না?
হেসে উঠতেন নট। দমকা কাশি সামলে আত্মজীবনী লেখার অনুরোধ ফিরিয়ে দিতেন। বলতেন, ‘‘সে বড় সহজ কথা নয় হে। বেদব্যাসের মতো যেদিন অকপটে আত্মদোষ বলতে পারব, সেদিন লিখব।’’ শেষ কয়েক বছর কাটে ‘মিনার্ভা’, ‘ক্লাসিক’-এ।
‘ক্লাসিক’ থাকতেই একদিন চললেন তারকেশ্বর। মেয়ের জন্য পুজো দিতে। কলকাতায় যখন ফিরলেন, ততক্ষণে সব শেষ! শুনলেন দাহ হয়ে গিয়েছে মেয়ের দেহ! দুমড়ে উঠল বুক। কান্না হাহাকার হয়ে ভিজিয়ে দিল দু’চোখ! দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী চলে যাওয়ার পরে বহু কষ্টে-যত্নে-আদরে মানুষ করেছিলেন সেই শিশুটিও এভাবেই চলে গিয়েছিল! সারদামায়ের স্পর্শও তাকে ফেরাতে পারেনি! আর জীবনের এই অবেলায় চলে গেল মেয়ে! আর কত!
তাঁর শেষ অভিনয় করলেন ১৯১১-তে। নাটক ‘বলিদান’-এ করুণাময়ের চরিত্রে। সেদিন খুব বৃষ্টি। হাঁপের টান নিয়ে বার বার খালি গায়ে স্টেজে আসতে হচ্ছে গিরিশকে। অসুস্থ হলেন। রোগশয্যায় নিবেদিতাকে উৎসর্গ করে লিখলেন শেষ নাটক ‘তপোবল’।
বুকের জ্বালা যেন বেড়েই চলেছে। ঘুম নেই! সারাক্ষণ বসে থাকেন। আর বলেন, ‘‘প্রভু, আর কেন, শান্তি দাও, শান্তি দাও, শান্তি দাও!’’
চলেই গেলেন!
ফেব্রুয়ারি, ১৯১২।
বৃষ্টিতে ছেয়ে রয়েছে আকাশ। তার পেয়ে ফরিদপুর থেকে ফিরলেন ছেলে দানিবাবু। গহন রাত। মহল্লা মাতোয়ারা সংকীর্তনে।
শেষ সময় গিরিশের মৃদু কণ্ঠে শোনা গেল শ্রীরামকৃষ্ণ-নাম!
ঋণ: গিরিশচন্দ্র (অবিনাশচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়, সম্পাদনা স্বপন মজুমদার), পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ, (অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত), গিরিশ রচনাবলী (সম্পাদনা রথীন্দ্রনাথ রায় ও দেবীপদ ভট্টাচার্য), বাই-বারাঙ্গনা গাথা (সমন্বয় ও সম্পাদনা দেবজিত বন্দ্যোপাধ্যায়), বিনোদিনী রচনাসমগ্র, (সম্পাদনা দেবজিত বন্দ্যোপাধ্যায়)
=≠================≠============

8>উৎপল দত্ত==প্রবন্ধ 1

8>উৎপল দত্ত


প্রবন্ধ ১


‘আপনি এক নূতন সমাজের স্বপ্ন দেখিতেন’


২৮ জানুয়ারি, ২০১৭, ০০:০০:০০


পাখিদের চিরকাল ঠাঁই দিয়ে এসেছি আমাদের প্রতি দিনের জীবনে, গানে, কবিতায়, গদ্যে। আবহাওয়া পরিবর্তনের খবর এনে দেওয়া থেকে শস্য উৎপাদনে, কীটনাশকের কাজে, মায় জঞ্জাল সাফাইতেও অপরিহার্য পাখিরা আজ বিলুপ্তির পথে। পাখির পিছনে ছুটে, ছবি তুলে যাঁর দিন কাটে সেই রূপঙ্কর সরকারের কলমে পরিবেশের এই বিপন্নতা, সঙ্গে স্কেচ। পাখালিনামা (৯ঋকাল বুকস্‌। ৪৫০.০০)।


শুধু তো রাজনীতি নয়, সমাজ, রাষ্ট্র, ইতিহাস, দর্শন, ধর্ম, মনস্তত্ত্ব, নারীমুক্তির প্রশ্নগুলি কী ভাবে শিল্পের স্তরে উন্নীত করতেন উৎপল দত্ত তাঁর নাটকে, কী ভাবে তাঁর আত্মজীবনে গড়ে উঠেছিল শিল্পদর্শন বা সৃষ্টিলোক, তাই শঙ্কর শীলের অনুসন্ধিৎসু কলমে: উৎপল দত্ত: মনন ও সৃজন (প্রতিভাস। ৮০০.০০)।


নগরকেন্দ্রিক মঞ্চনাট্যের পরিমণ্ডল থেকে বেরিয়ে, অভিনেতা-দর্শকের দূরত্ব-ব্যবধান ভেঙে, বাজারি হিসেবের বাইরে স্বাধীন থিয়েটারের স্বপ্নে যে মানুষটা ‘থার্ড থিয়েটার’-এর জন্ম দিয়েছিলেন সেই বাদল সরকারকে নিয়ে শমীক বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত বাদল সরকার: এবং ইন্দ্রজিৎ থেকে থার্ড থিয়েটার (থীমা। ৩৫০.০০)। ভূমিকা ছাড়াও শমীকের তিন পর্বের কথোপকথন বাদলবাবুর সঙ্গে। তাঁকে নিয়ে বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্বদের দৃষ্টিকোণ, বাদলবাবুর নিজেরও রচনাদি। থীমা থেকেই বেরোচ্ছে থার্ড থিয়েটার আন্দোলনের কর্মী বিশাখা রায়ের বর্ণনায় ও বিচারে থার্ড থিয়েটার: অন্য স্বর, অন্য নির্মাণ (২০০.০০)।


হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের রেকর্ডিং, সংগ্রহ, আর্কাইভিং বিষয়ে দীর্ঘ কথোপকথনের পাশাপাশি অম্লান দাশগুপ্ত লিখেছেন খেয়াল গানের গোড়ার কথা ও আধুনিকতা নিয়ে। উস্তাদ আমীর খাঁ ও উস্তাদ মল্লিকার্জুন মনসুরকে নিয়েও তাঁর রচনা। গান নিয়ে (তালপাতা। ১৮০.০০)।


‘শৈশবে যা ছিল নেহাৎই নির্জনতার ব্যথা, আজ পরিণত বয়সে তা বেড়ে গিয়ে নিঃসঙ্গতার যন্ত্রণায় পরিণত।’ কবি জয়দেব বসুর দিনলিপি— ডায়েরি থেকে (সপ্তর্ষি। ২৫০.০০)। ১৯৮৬-২০০৫ পর্যন্ত তাঁর অকপট রোজনামচা, যা ব্যক্তি পরিসর ছাপিয়ে পৌঁছে যায় বাঙালি সংস্কৃতি-রাজনীতির নানা ঘটনা-দুর্ঘটনায়। মূল ডায়েরির প্রতিলিপি ও টীকাসহ প্রকাশ পেল।


সাহিত্যিক, সাংসারিক মানুষ, গ্রামীণ শিল্পী— প্রবীণ-নবীন দুই প্রজন্মেরই স্মৃতিকথন, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিবেদন বর্ডার/ বাংলা ভাগের দেওয়াল-এ (গাঙচিল। ৪৫০.০০)। সম্পাদক অধীর বিশ্বাস জানিয়েছেন ‘একটা সীমারেখা হঠাৎ করে একটা জাতির জীবন তছনছ করে দেশ আর বাসভূমিকে আলাদা করে দিয়ে গেছে। সেই সীমারেখা, সেই বর্ডার আমাদের বাংলা আর বাঙালির জীবনে যে স্থায়ী ক্ষত তৈরি করে দিয়ে গেছে... আমরা বরং সেই অন্তহীন যন্ত্রণায় অস্থির মানুষগুলির নিজেদের মুখের কথা শুনব।’ এখানেই আছে বাংলাদেশের বিশিষ্ট চলচ্চিত্রকার তানভীর মোকাম্মেলের সাক্ষাৎকার। তাঁরই দ্বিতীয় উপন্যাস কীর্তিনাশা-ও (অনার্য। ১৫০.০০) প্রকাশ পেল, তাতে ভিন্ন সম্প্রদায়ের দুই বন্ধুর সম্পর্কের প্রেক্ষিতে ধরা পড়েছে বাংলা ভাগের বিপর্যয়ের চালচিত্রটি।


১৯৭৬-এ স্বাধীন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত যে রাষ্ট্রসত্তা তা পালটে দেওয়ার এক চক্রান্ত শুরু হয়, তার হদিশ মিলবে শামসুজ্জামান খান-এর দিনলিপি-তে (অন্বেষা। ৩৫০.০০)। ওপার বাংলার সংস্কৃতি-তাত্ত্বিক ও গবেষক শামসুজ্জামানের ১৯৭৬-২০০৫-এর দিনলিপিতে ইতিহাসের নানা ইঙ্গিত।
সে ইস্কুলে ছিল অনেক খেলার মাঠ, লাইব্রেরি, হাসপাতাল, গোশালা। শিল্পী সুনীল পাল আর রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোঁয়া সেই অপরূপ ইস্কুলের শরীরে। স্বামী হিরণ্ময়ানন্দের শ্রম আর স্বপ্নে গড়ে ওঠা পুরুলিয়া রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যাপীঠের ছাত্ররা মাধ্যমিকে করত তাক লাগানো রেজাল্ট। সেখানকার মজা, দুষ্টুমি, খাওয়া-দাওয়া, ফাঁকিবাজি, শাসন, অবদমন সব নিয়ে বর্ণময় রূপকথা: ইস্কুলগাথা (বিশ্বজিৎ রায়, সপ্তর্ষি। ২০০.০০)।
সাহিত্য-দর্শনের প্রেক্ষিতের তুলনায় মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে রবীন্দ্রব্যক্তিত্ব ও তার বিকাশ বিষয়ে আলোচনা সীমাবদ্ধ এবং অপ্রতুল। রিমঝিম রায় ও সংযুক্তা দাশের রবীন্দ্রনাথ ও কাদম্বরীদেবী/ মনোবিজ্ঞানের আলোকে সম্পর্কের ইতিবৃত্ত (সিগনেট প্রেস। ২০০.০০) বইটিতে এরিকসনের তত্ত্বের ভিত্তিতে কবির ব্যক্তিত্ব বিকাশের প্রতিটি পর্যায়ে নতুন বউঠানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কী প্রভাব ফেলেছিল তারই আলোচনা।
উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে হরিচাঁদ ঠাকুর ও পরে তাঁর পুত্র গুরুচাঁদ ঠাকুরের নেতৃত্বে মতুয়া আন্দোলনের শুরু। তাঁদের ধর্ম দর্শনের বিস্তারিত আলোচনা মনোশান্ত বিশ্বাসের বাংলার মতুয়া আন্দোলন/সমাজ সংস্কৃতি রাজনীতি গ্রন্থে (সেতু প্রকাশনী। ৪৫০.০০)। দেখানো হয়েছে কী ভাবে সেই দর্শনে নিহিত ছিল বর্ণ সমাজের বিরুদ্ধে অবদমিত দলিত শ্রেণির জাগরণের বাণী। মতুয়াদের সামাজিক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস এই বইতে আটটি অধ্যায়ে বিশ্লেষিত।
‘বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশে বিভিন্ন সম্পাদক ও তাঁদের
সম্পাদিত পত্রপত্রিকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু সম্পাদনা কর্মের এই পথটি কোনওদিনই তেমন মসৃণ ছিল না, আজও নেই।... হরিনাথ মজুমদার, নজরুল ইসলাম প্রমুখ সম্পাদককে রাষ্ট্রীয় পীড়ন পর্যন্ত সহ্য করতে হয়েছিল।’ লিখেছেন বাংলা পত্রপত্রিকা/ সম্পাদক ও সম্পাদনা-র (কোরক। ২০০.০০) সম্পাদক তাপস ভৌমিক। বইটিতে তত্ত্ববোধিনী থেকে এক্ষণ পর্যন্ত বিভিন্ন পত্রপত্রিকার সম্পাদকদের অবদানের কথা রয়েছে।
‘স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা রাজপুত্তুর তো গল্পে-টল্পে হয়। কিন্তু স্বপ্নে দেখা কাকাবাবু! ভাবাই যায় না। কিন্তু তাও হল। বুদ্ধবাবু স্বপ্নে কাকাবাবুর সঙ্গে বৈঠক করলেন।...’ শুভাশিস মৈত্র লিখেছেন তাঁর রাজনীতি টাজনীতি, পরিবর্তনের পরে (প্রাচী প্রতীচী। ২০০.০০) বইতে। লেখক ‘আমার কথা’য় বলে রেখেছেন, রাজনীতি-টাজনীতিতে-র কোনও চরিত্রের সঙ্গে বাস্তবের কোনও মিল কেউ পেলে তা নেহাতই কাকতালীয়।
‘নজরুলকে আমরা প্রায় হারাতে বসেছিলাম। শতবর্ষ-ঘটনা কিছুটা আমাদের গ্লানিমোচনের সুযোগ ঘটাল।...নজরুল-জীবনী প্রকাশিত হল কলকাতা বইমেলার সরকারি মঞ্চে ২০০০ সালের জানুয়ারিতে’ লিখেছেন সদ্যপ্রয়াত অরুণকুমার বসু তাঁর নজরুল জীবনী (আনন্দ। ৬০০.০০) বইয়ের নতুন সংস্করণের ভূমিকায়। বইটি প্রতিভাময় কবির বিচিত্র জীবনসংগ্রাম তথা সৃষ্টিকর্মের খ্যাতি-অখ্যাতি, সাফল্য-অসাফল্যের নেপথ্য কাহিনির পূর্ণাঙ্গ, মর্মগ্রাহী উপস্থাপনায় অনন্য।

‘আবৃত্তির কি ক্লাসরুম হয়? কিংবা অন্য কোনও শিল্পের? আমি নিজেই তো সে অর্থে কোনও ক্লাসরুম প্রোডাক্ট নই। নিজের খুশিতে, বাবা-মা’র হাত ধরেই তো আমার কবিতার পথে চলা শুরু।’ লিখছেন ব্রততী বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর কবিতার পাঠশালা-য় (আনন্দ। ১৫০.০০)। কবিতাকে কেমন ভাবে তুলে নেবেন নিজ কণ্ঠস্বরে, তার জন্য কী ভাবে প্রস্তুত করবেন নিজেকে— এ সব কিছু নিয়েই বইটি। সঙ্গে লেখকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার টুকরো স্মৃতি।

মনের দিক থেকে ধর্মীয় ভাবাবেগ, রাজনীতি ও সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত অধ্যাপক ভবতোষ দত্ত প্রবন্ধ রচনার নিজস্ব একটি সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিলেন। তথ্যাশ্রয়ী বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধ সাহিত্যের প্রতি এই নিষ্ঠা, এই নিবেদন, তিনি তাঁর অগণিত ছাত্রমহলে চারিেয় দিতে পেরেছিলেন। তাঁর প্রবন্ধের বিষয়ভিত্তিক সংকলন প্রবন্ধ সংগ্রহ/ভবতোষ দত্ত (সম্পা: গার্গী দত্ত, দীপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, এবং মুশায়েরা। ৫০০.০০)।

রবীন্দ্রকুমার দাশগুপ্তের (১৯১৫-২০০৯) অগ্রন্থিত রচনাগুলি প্রকাশ পেল বিবিধ প্রবন্ধ/রবীন্দ্রকুমার দাশগুপ্ত (সম্পা: অমলকুমার মুখোপাধ্যায় ও চিন্ময় গুহ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। ৩০০.০০) বইয়ে। সাহিত্য, ধর্ম, সমাজ বিষয়ক অসামান্য রচনাদির সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ‘কলেজ স্কোয়ারে অ্যারিস্টটল’, যেখানে বর্তমান বাঙালি সমাজের সার্বিক অবক্ষয় দেখে মুহ্যমান বিদ্যাসাগরকে অ্যারিস্টটল বলছেন, ‘আপনি এক নূতন সমাজের স্বপ্ন দেখিতেন।’ রচনাগুলি সাজিয়ে দিয়েছেন শঙ্খ ঘোষ।

উনিশ শতকে স্বদেশ চেতনার প্রসারে অগ্রগণ্য ভূমিকা ছিল রাজনারায়ণ বসুর (১৮২৬-১৮৯৯)। তাঁর স্বল্পালোচিত জীবন ও কর্ম ফিরে দেখার তাগিদেই প্রকাশিত হল প্রবন্ধ সং‌কলন/ রাজনারায়ণ বসু (সম্পা: অর্ণব নাগ, ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল অ্যান্ড কালচারাল স্টাডিজ। ২৫০.০০)। একালের পাশাপাশি রাজনারায়ণকে সেকেলে মানুষজনও ঠিক কোন দৃষ্টিতে দেখেছিলেন, সেই অপরীক্ষিত সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায় এই বই।

রাষ্ট্রব্যবস্থায় গণতন্ত্রের স্তম্ভ আইন-আদালত আমাদের কাছে যেন ধ্রুব সত্য হয়ে ওঠে। ঈশ্বরের মতো তাকে বিশ্বাস করি আমরা। ধনঞ্জয় চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যুদণ্ড ঘিরে সেই বিশ্বাসের মিথ-টিকে ছিঁড়ে তার বিচার প্রক্রিয়ার মধ্যের ফাঁকফোকরগুলি তুলে ধরেছেন দেবাশিস সেনগুপ্ত, প্রবাল চৌধুরী, পরমেশ গোস্বামী। আদালত-মিডিয়া-সমাজ এবং ধনঞ্জয়ের ফাঁসি (গুরুচণ্ডা৯। ১১০.০০)।

মৃত্যুর ঝুঁকির কথা ভেবে সদা-সতর্ক থাকার চেয়ে জীবন উপভোগ অনেক বড়। স্বাভাবিক জীবন যাপনের সব কিছুর বিরুদ্ধেই যে যুদ্ধ হেঁকেছে আমাদের ব্যবহারিক চিকিৎসা, তার সেই অনাধুনিক ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধের বিপ্রতীপে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের যুক্তিকে তত্ত্বে-তথ্যে, চিকিৎসক হিসেবে নিজের সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পেশ করেছেন স্থবির দাশগুপ্ত। জীবন যাপন ও ক্যানসার (ধানসিড়ি। ৩২৫.০০)।

কবিতা গল্প উপন্যাস প্রবন্ধ স্মৃতিকথার পাঠপ্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি নাটক-চলচ্চিত্রের দর্শক-প্রতিক্রিয়া— অবশ্যই বিকল্প পড়া এবং বিকল্প দেখা। তাতে মণীন্দ্র গুপ্তের উপন্যাস, শম্ভু মিত্রের অভিনয়, বা অপু ট্রিলজি-র ষাট বছর পূর্তি থেকে হালফিল ‘প্রাক্তন’ নিয়েও আলোচনা। রুশতী সেনের কিছু মুহূর্ত কিছু আশ্রয় (এবং মুশায়েরা। ২৫০.০০)।

নিজের দেশ থেকে সারা দুনিয়ায় যেন পিঠ ঠেকে গিয়েছে বাঙালির, আত্মপরিচয় হারাতে বসেছে, তার অনেকটা কারণই আমাদের চারপাশের অযোগ্য আস্ফালন। এমন এক ক্লিষ্ট মুহূর্তে শঙ্খ ঘোষ আমাদের পৌঁছে দেন তাঁর এক আশ্চর্য স্মৃতির সম্ভারে, সেখানে ‘সামনে-দেখা অনেক বিনয়ছবিও কি ভেসে আসে না কাছে? নিরহং আচরণের অনেক অনাবিল চিহ্নও কি ধরা থাকে না আমাদের অভিজ্ঞতায়?’ তাঁর এই নিরহং শিল্পী (তালপাতা। ২০০.০০) নতুন ভাবে সচল করে তোলে আমাদের মন।

রাষ্ট্রীয় শাসন-শোষণের নিগড় ভাঙতে নিয়ত লড়াই করে চলেছেন অজিত চক্রবর্তী, তাঁর কলমে তাঁরই নিজের দীর্ঘ কারাবাসের কাহিনি জেলের গারদে জীবনের গান (সেতু। ২০০.০০)।

১৯৮২-’৮৯, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলে বন্দি থাকার সময়ে নকশাল নেতা আজিজুল হক ডায়রি লিখেছেন একাধিক। সেরকমই একটি অপ্রকাশিত ডায়রি, ১৯৮৮-র জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে লেখা, জেলখানার নোটবই (আর বি এন্টারপ্রাইজেস। ১৩০.০০)। ‘মার্কসবাদী কারাসাহিত্যে এক নতুন দিক ফলক’, লিখেছেন সম্পাদক।

=========================
 

7>পণ্ডিত গুপ্তচর= তাঁর নাম শরৎচন্দ্র দাস।

7>পণ্ডিত গুপ্তচর= তাঁর নাম শরৎচন্দ্র দাস।


(সৌজন্যে আনন্দবাজার পত্রিকা)

TAGS : Sarat Chandra Das Indian scholar Tibetan language Rabibasariya

পরনে লামার পোশাক, সঙ্গে রিভলভার। বঙ্গসন্তান গিরিপথ পেরিয়ে তিব্বত গিয়ে নিয়ে আসছেন পুরনো পুঁথি। তৈরি করছেন তিব্বতি-ইংরেজি অভিধান।

২২ জানুয়ারি, ২০১৭, ০০:০৩:০০

প্রা য় ১৫ দিন ঘোড়ার পিঠে চলতে চলতে ৩০ মে বিকেল চারটেয় তিব্বতের রাজধানী লাসা পৌঁছল দলটি। দূরে, পাহাড়ের ওপর দলাই 9 পোতালা প্রাসাদ, অস্তগামী সূর্যের আলো ঠিকরে পড়ছে তার শিখরে। পাহাড়ের নীচে, সারা শহরে চিনা কেতায় সাজানো ঘরবাড়ি। তিব্বতি, চিনা, লাদাখি, অনেকেরই বাস দুর্গম এই লাসা শহরে।

সালটা ১৮৮২। এই দলে মালবাহক ও তিব্বতি লামারা আছেন। আর আছে লামার পোশাক-পরা, লাল পাগড়ি, চোখে সানগ্লাস, এক ভিনদেশি। ক্লান্তিতে মাঝে মাঝে নুয়ে পড়ছে সে। চিনে পেস্ট্রির দোকানে জমায়েত হওয়া ভিড়টা তাকে দেখে মন্তব্য করল, ‘দেখেছ, আবার এক বসন্ত রোগী হাজির হয়েছে। ইস, বেচারির চোখ দুটো বোধহয় নষ্ট হয়ে গিয়েছে। আহা রে! বাঁচলে হয়!’ ব্রিটেনে তার ৩২ বছর আগে এডওয়ার্ড জেনার নামে এক ডাক্তার বসন্তের টিকা বের করে ফেলেছেন, তবে এই দেশে সেই খবর পৌঁছয়নি।
পেস্ট্রির দোকানের জমায়েত জানে না, লাল পাগড়ি ভিনদেশির সঙ্গে আছে রিভলভার, কম্পাস, সেটস্কোয়ার ও হরেক কাগজ। ভিনদেশি তিব্বতি ভাষায় সুদক্ষ, কখনও পাঞ্চেন লামার মঠে খুঁজে পেয়েছেন তিব্বতি হরফে দণ্ডীর কাব্যাদর্শ, কাশ্মীরি কবি ক্ষেমেন্দ্রের ‘অবদানকল্পলতা’ ও চান্দ্র ব্যাকরণের প্রাচীন পুঁথি। সেগুলি নকল করে তাঁর দেশে নিয়ে যাবেন। ভারতে।

তিব্বতি সংস্কৃতি ও জনজীবনে আগ্রহী এই ভিনদেশি আর একটি কাজ করেছেন। চলার পথে প্রতিটি পাহাড়, নদীনালা ও ভূপ্রকৃতির বৈশিষ্ট্য কাগজে লিখে নিয়েছেন, লাসায় আসার পথে চুম্বি উপত্যকা, ‘ইয়ামদ্রোক সো’ হ্রদে ঝটিতি জরিপ করেছেন। টুকে নিয়েছেন কাঞ্চনজঙ্ঘা এলাকার হরেক পাহাড় ও পথের পরিচয়। পরে সেগুলি ভারত সরকারের দফতরে গোপনে বাক্সবন্দি হবে, তার পরে লর্ড কার্জনের আমলে ব্রিটিশ সেনাপতি ইয়ংহাজব্যান্ড এই সব তথ্যের ওপর নির্ভর করেই তিব্বত দখলে হানাদারি চালাবেন।

ওই ভিনদেশি এক বঙ্গসন্তান। শরৎচন্দ্র দাস। তাঁর পরিচয় নিয়ে কয়েক বছর পরেও তিব্বতে ঘোর ধোঁয়াশা। যে তিব্বতি লামারা তাঁকে সাহায্য করেছিলেন, সকলকেই পরবর্তী কালে এক ধার সে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। শরৎচন্দ্র দাস তবে ঠিক কী? পণ্ডিত? রোমাঞ্চকর দুর্গম পথের অভিযাত্রী? না কি ব্রিটিশের বেতনভুক গুপ্তচর?

লাসা সফরের তিন বছর পর এই রহস্যময় চরিত্রটিকে দেখা গেল চিনের রাজধানী পিকিং (এখন বেজিং) শহরে। সেখানে বাণিজ্যের খোঁজে আসা তিব্বতিরা তাঁকে ‘কা চে লামা’ বা কাশ্মীরের লামা বলে ডাকেন। শরৎচন্দ্র দাসের সঙ্গে অবশ্য কাশ্মীরের কোনও সম্পর্ক নেই, তিনি এসেছেন কোলম্যান মেকলে নামে এক ব্রিটিশ কূটনীতিককে সাহায্য করতে। কোলম্যান লাসা শহরে ব্রিটিশ দূতাবাস খুলতে যাবেন, পিকিং শহরে তাই ঘাঁটি গেড়ে বসে আছেন। চিনের রাজধানীতে বাঙালি শরৎচন্দ্র দাস এ বিষয়ে তাঁর প্রধান সাহায্যকারী।

দূতাবাস খোলা আর হয়নি। কিন্তু শরৎচন্দ্র দাসের পরিশ্রমী তথ্য থেকে ব্রিটিশরা এ ভাবেই নানা সাহায্য পেয়েছে। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ‘রায়বাহাদুর’ খেতাব, ‘অর্ডার অব ইন্ডিয়ান এম্পায়ার’-এ ভূষিত করেছে। হিমালয়ের খুঁটিনাটি অজানা ভৌগোলিক তথ্য আবিষ্কারের জন্য সম্মানিত করেছে লন্ডনের রয়্যাল জিয়োগ্রাফিক সোসাইটি।

আবার, কলকাতায় এশিয়াটিক সোসাইটির পত্রিকায় এই গুপ্তচরের লেখালিখি খুলে দিয়েছে তিব্বত ও বৌদ্ধ সংস্কৃতি চর্চার নতুন দিগন্ত। নিজেই তৈরি করেছেন তিব্বতি-ইংরেজি ভাষার অভিধান। অতঃপর তাইল্যান্ডে গিয়েছেন, বৌদ্ধ শাস্ত্রচর্চার জন্য খেতাব দিয়েছেন সেখানকার রাজা। মৃত্যুর দু’বছর আগেও বৌদ্ধ শাস্ত্র ও সংস্কৃতি ঘাঁটতে কয়েক মাসের জন্য পাড়ি দিয়েছেন জাপান। উনিশ শতকেই তিব্বতচর্চার জন্য সারা পৃথিবীর কুর্নিশ আদায় করে নিয়েছেন এই বাঙালি।

এই পণ্ডিত গুপ্তচর আসলে চট্টগ্রামের আলমপুর গ্রামের লোক। ১৮৪৯ সালে তাঁর জন্ম। ছাত্র হিসাবে মেধাবী, উদ্ভিদবিজ্ঞান থেকে জ্যোতির্বিদ্যা, হরেক বিষয়েই তাঁর আগ্রহ। স্কুল শেষে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনার জন্য ভর্তি হয়েছেন প্রেসিডেন্সি কলেজে। সেখানে তখন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ানো হত।

বাদ সাধল পিলেজ্বর। ম্যালেরিয়াকে তখন বাঙালি ওই নামেই ডাকত। ১৮৭৪ সালে ফাইনাল পরীক্ষার সময় অসুস্থ হলেন শরৎচন্দ্র, সারা ক্ষণই ঠকঠকে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর। বাঁচিয়ে দিলেন উদ্ভিদবিজ্ঞানের অধ্যাপক সি বি ক্লার্ক। দার্জিলিঙের ডেপুটি কমিশনার স্যর জন এডগার তত দিনে সেখানকার শিশুদের লেখাপড়ার জন্য ভোটিয়া বোর্ডিং স্কুল তৈরি করেছেন। ক্লার্ক সেখানকার প্রধান শিক্ষক হওয়ার প্রস্তাব দিলেন ছাত্রকে। শরৎচন্দ্র প্রথমে দোনোমোনো করছিলেন। তার পর ভেবেচিন্তে, পাহাড়ি জলহাওয়ায় স্বাস্থ্য উদ্ধার হবে ভেবে সায় দিলেন।

সাহেবগঞ্জ অবধি ট্রেন। তার পর স্টিমারে কারগোলা ঘাট পেরিয়ে বলদ-টানা গাড়িতে পূর্ণিয়া হয়ে শিলিগুড়ি। সেখান থেকে হাঁটতে হাঁটতে কার্সিয়াং। অতঃপর জীবনে প্রথম ঘোড়ার পিঠে চাপলেন তিনি। এবং ঘোড়ায় চেপেই কার্সিয়াং থেকে দার্জিলিং পৌঁছেছেন ২৫ বছরের শরৎচন্দ্র দাস।
স্কুলের ছাত্ররা বাংলা, ইংরেজি বোঝে না। হেডমাস্টারমশাইও তাদের ভাষা বোঝেন না। কিন্তু আগ্রহী শিক্ষক আস্তে আস্তে রপ্ত করে ফেললেন তাদের ভাষা। সিকিমের তৎকালীন রাজা, মন্ত্রী, অমাত্যরাও ইংরেজি শেখাতে তাঁদের ছেলেদের পাঠাচ্ছেন ভোটিয়া বোর্ডিং স্কুলে।
দু’বছর পরে হেডমাস্টারমশাই ছুটিতে ছাত্রদের এক্সকারশনে নিয়ে গেলেন পাশের দেশ সিকিমেই। সেখানে পেমিয়াংচি মঠ। ‘পুজোর আচার-অনুষ্ঠান, লামাদের ভাবগম্ভীর মন্ত্রোচ্চারণ আমার মনে জাগিয়ে তুলল আগ্রহ। জানতে হবে এই তান্ত্রিক বৌদ্ধমত,’ আত্মজীবনীতে লিখছেন শরৎচন্দ্র।
১৮৭৯ সালে এই পেমিয়াংচি মঠের লামা উগ্যেন গিয়াতসো-কে নিয়ে তিব্বতে পাঞ্চেন লামার তাশিলুনপো মঠে পৌঁছলেন শরৎচন্দ্র। সেখানে পাঞ্চেন লামার প্রধান সহকারী, তাশি লামা হিন্দি ও ইংরেজি শিখতে চান, সিকিমবাসী তিব্বতি বৌদ্ধ উগ্যেন সেই
সূত্র ধরে সহজেই জোগাড় করে ফেললেন তাঁর ও শরৎচন্দ্র দাসের তিব্বত যাত্রার অনুমতি।
দার্জিলিং থেকে পেমিয়াংচি, তার পর কাঞ্চনজঙ্ঘা ধরে জোংরি। সেখান থেকে চাং থাং গিরিপথ। বরফে পা ডুবে যাচ্ছে, এক এক জায়গায় উগ্যেন কোমরের কুকরি দিয়ে বরফ কেটে তৈরি করছেন পায়ে চলার ধাপ। গাছের শাখাপ্রশাখা কেটে তৈরি করছেন রাস্তা। ঝুরো পাথর নেমে আসছে, ১৯০০০ ফুট উচ্চতায় দুজনেরই নিশ্বাস পড়ছে ঘন ঘন। রাতে থাকার জায়গা বলতে পাহাড়ি গুহা। চাং থাং পেরিয়ে এ ভাবেই ওঁরা ঢুকে এসেছেন তিব্বতি সীমানার মধ্যে।
তিব্বতি সংস্কৃতিতে আগ্রহী বাবু শরৎচন্দ্র দাস সে যাত্রায় প্রায় ছয় মাস ছিলেন পাঞ্চেন লামার তাশি লুনপো মঠে। নিয়ে এসেছেন ভারতে হারিয়ে-যাওয়া নানা বৌদ্ধ গ্রন্থের অনুলিপি। তারই মধ্যে ব্রিটিশ সরকারকে জানাচ্ছেন দেশটা নিয়ে হরেক তথ্য। ভারতের তৎকালীন সার্ভেয়ার জেনারেল বাবু শরৎচন্দ্র দাসের পাঠানো রিপোর্ট সম্বন্ধে লিখছেন, ‘ওঁর পাঠানো প্রতিটি তথ্য মূল্যবান, মানচিত্র তৈরিতে কাজে দেবে।’ অচেনা দেশকে জানতে গেলে, দখল করতে গেলে প্রথমেই দরকার তার মানচিত্র। ব্রিটিশ সরকার শরৎচন্দ্রকে তাদের মতো ব্যবহার করছে, আবার শরৎচন্দ্র গুপ্তচরবৃত্তির ফাঁকে জেনে নিচ্ছেন বৌদ্ধ ধর্মের হরেক তথ্য, নিয়ে আসছেন তিব্বতি ভাষায় লেখা বিভিন্ন সংস্কৃত পুঁথি। এই সব পুঁথিপত্র সংগ্রহ তাঁর ব্যক্তিগত উদ্যোগের ফল, ব্রিটিশ সরকারের এ বিষয়ে কোনও মাথাব্যথা নেই।

দু’বছর বাদে শুক্লপক্ষের এক রাতে ফের দার্জিলিং থেকে রওনা দিলেন শরৎচন্দ্র ও উগ্যেন। এ বার ১৪ মাসের সফর।
তাশি লুনপোয় ফের পরিচিতদের সঙ্গে দেখা। দেখা গেল, পাঞ্চেন লামার দরবারে এক মন্ত্রীর বউ সিকিমের রাজকন্যা। মেয়েরা নাচগানে অভ্যর্থনা জানাচ্ছে পরিচিত অতিথিদের। একই গান প্রথমে তিব্বতিতে, তার পর চিনা ভাষায়। বাবু শরৎচন্দ্র দাস জানেন, হিমালয়ের সংস্কৃতিতে প্রত্যেক দেশের সঙ্গে প্রত্যেকের সম্পর্ক থাকে। পঞ্জাবকেশরী রণজিৎ সিংহের পর তাঁর এক সেনাপতি তিব্বত দখলের প্রবল চেষ্টা চালিয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত তিব্বতি ও চিনা সৈন্যরা সেই শিখদের পরাস্ত করে।
তাশি লুনপোয় পাঁচ মাস থেকে শরৎচন্দ্র এ বার লাসা শহরে। তিব্বতি জনজীবন ফুটে উঠছে তাঁর রিপোর্টে, সেখানে কখনও জানা যাচ্ছে ‘রাগ্যিবা’দের কথা। রাগ্যিবারা মূলত ভিক্ষা করে খায়। ‘লাসার সমাধিস্থলে মৃতদেহ এলে সেগুলিকে টুকরো টুকরো করে কুকুর, শকুনদের খাওয়ায়।’ কখনও বহুবিবাহের কথা, ‘মেয়েটি অবাক হয়ে তাকাল। সে কী, তোমাদের ওখানে এক মেয়ের একটাই স্বামী? তোমার মনে হয় না, আমরা অনেক বেশি সুখী?’ পরক্ষণে তাঁর মন্তব্য, ‘ভারতে স্ত্রীরা স্বামীর প্রেম ও সম্পত্তির অংশীদার। কিন্তু পরিবারের সব ভাইয়ের উপার্জন ও উত্তরাধিকার যাঁর হাতে বর্তায়, সেই তিব্বতি স্ত্রী সত্যিকারের ক্ষমতাবান গৃহিণী।’ জনশ্রুতি, তাঁর এক তিব্বতি স্ত্রীও ছিল। কিন্তু ঘটনাটিকে আজকের দৃষ্টিতে দেখলে হবে না। তখন নেপাল বা চিন থেকে যাঁরা তিব্বতে ব্যবসা করতে চান, তাঁদের অনেকেরই দেশে একটি স্ত্রী, তিব্বতে আর একটি।
দু’মাস লাসায় থাকতে থাকতে ১০ জুন সকালে পরিচিত এক তিব্বতি লামা তাঁকে নিয়ে গেলেন পোতালা প্রাসাদের অভ্যন্তরে, দলাই লামার দর্শনে। বিশাল হলঘরের প্রতিটি আসবাবে সোনার আবরণ। ছয় ফুট লম্বা, চার ফুট উঁচু সিংহাসনে বাবু হয়ে, করজোড়ে বসে তখনকার আট বছর বয়সী শিশু ত্রয়োদশ দলাই লামা। মাথায় হলুদ চাদর। সোনার বাটিতে জাফরান মেশানো হলুদরাঙা জল নিয়ে এক জন এগিয়ে গেল সেই শিশুর কাছে। তিনি উচ্চারণ করলেন, ‘ওম মণিপদ্মে হুম।’ তার পর লামার সোনার কাপে মাখন চা ঢেলে দিলেন এক জন, শরৎচন্দ্র প্রণামী হিসেবে শিশুর কোলে রেখে দিলেন এক তোলা সোনা। এ বার সোনার বাটিতে চাল নিয়ে এগিয়ে এলেন এক জন, শিশু লামা সমবেত অতিথিদের মধ্যে ভাগ করে দিলেন সেটি। বেরিয়ে আসার সময় শরৎচন্দ্রকে এক লামা পরিয়ে দিলেন লাল রঙের খাদা বা চাদর। অনুপুঙ্খ বিবরণ দিতে দিতে প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রাক্তন ছাত্র শরৎচন্দ্র এ কথাও লিখেছেন, ‘ফুটফুটে শিশুটির চোখে যেন ক্লান্তির ছাপ। রোজ রাজসভার এই বাঁধাধরা রিচ্যুয়াল, ধর্মীয় আচার নিশ্চয় ক্লান্ত করে তাকে!’ পরবর্তী একশো বছরের মধ্যে এই শিশু লামার উত্তরসূরি চতুর্দশ দলাই লামা চিনের হাত থেকে বাঁচতে শরৎচন্দ্রের দেশ ভারতে স্বেচ্ছা নির্বাসনে চলে আসবেন। কিন্তু সে সব পরের গল্প।

দুর্গম এই সফর পণ্ডিত গুপ্তচরকে কখনও ক্লান্ত করেছে, কখনও বা হতবাক। দেখেছেন নীল পোশাকে, ঘোড়ায় চড়া ‘তেসি’-দেরও। তেসি-রা এক রকমের কুরিয়ার, হলুদ ব্যাগে চিঠিপত্র ও দলিল দস্তাবেজ নিয়ে লাসা-পিকিং যাতায়াত করেন। এই ঘোড়সওয়ার, ডাকহরকরাদের অন্য খাতির। একটি সরাইখানায় পৌঁছেই বন্দুক উঁচিয়ে আকাশে ব্ল্যাঙ্ক ফায়ার করেন, যাতে পরবর্তী সরাইখানা তাঁর জন্য ঘোড়াদের সাজিয়ে রাখতে পারে। প্রতি সরাইখানায় তেসি-র জন্য পাঁচটি ঘোড়া মজুত থাকে, মধ্যরাতে তেসি বসে তিন ঘন্টা ঝিমিয়ে নেন, তার পরই সরাইওয়ালা ডেকে দেয়। তেসি-র চাকরিতে শুয়ে ঘুমোনো বারণ। পেঁয়াজ, রসুন, শুকনো লঙ্কা ও দুধ খাওয়াও নিষিদ্ধ।

লাসা ভ্রমণের এ রকমই সব বিবরণ লিখে গিয়েছেন এই পণ্ডিত গুপ্তচর। সে যাত্রা লাসা থেকে ফেরার পর আর তিব্বতে ঢোকার অনুমতি তিনি পাননি। কিন্তু হিমালয়ের গহনে সেই দুর্গম দেশটিকে কোনও দিনই ভুলতে পারেননি তিনি। বাড়ি করলেন দার্জিলিঙে, নাম রাখলেন ‘লাসা ভিলা।’ সেখানেই থাকত তিব্বতি পুঁথিপত্র ও মূর্তিসম্ভার। মাঝে মাঝে কলকাতায় মানিকতলার বাড়িতে স্ত্রী, পুত্রদের কাছে আসতেন। জাপান থেকে ফেরার পর ১৯১৭ সালে এই দার্জিলিঙের বাড়িতেই মারা যান শরৎচন্দ্র।
মানিকতলার সেই বাড়ি আর নেই। দার্জিলিঙে স্টেশনের কাছে ‘লাসা ভিলা’ বাড়িটি টিকে আছে হতমান অবস্থায়। শরৎচন্দ্রের উত্তরসূরিরা বাড়িটি বেচে দিয়েছেন। তার পিছনে বেখাপ্পা সব ইমারত। ভিলার বর্তমান মালিক সুদীপ তামাং পণ্ডিত গুপ্তচরের কাহিনি জানেন, তিনিই কোনও মতে ঐতিহাসিক বাড়িটিকে প্রোমোটারের আগ্রাসন থেকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।
ভোলেননি স্থানীয় তিব্বতিরাও। বছর দুয়েক আগে নোরবু নামে তিব্বতি বংশোদ্ভূত স্থানীয় এক ভারতীয়ের ব্যক্তিগত উদ্যোগে দার্জিলিঙে তৈরি হয়েছে ‘হিমালয়ান টিবেট মিউজিয়াম।’ সেখানে আধুনিক তিব্বতচর্চার অন্যতম পথিকৃৎ হিসাবে শরৎচন্দ্র সসম্মানে উল্লিখিত।
মৃত্যুশতবর্ষেও বাঙালির কাছে বিস্মৃত তিনি। বাঙালির ঐতিহ্য অনুসারে।
=======================+========


6>"অভ্র"--সফটওয়্যার এর আবিষ্কারের কাহিনী

6> "অভ্র"--সফটওয়্যার এর আবিষ্কারের কাহিনী 


স্বপ্নের নাম "অভ্র"। অভ্র, মেহদীর ব্রেনচাইল্ড। ---মেহদীর স্লোগান, "ভাষা হোক উন্মুক্ত"।

(বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক মর্যাদা দিতে প্রযুক্তির সমস্ত সম্ভাবনাকে ব‍্যবহার করবার জানকবুল লড়াইয়ের একটি উদ্দীপনা যোগানোর ইতিবৃত্ত....)

মেডিকেল কলেজ চিকিৎসক তৈরী করবে, সেটাই স্বাভাবিক, কিন্তু মেডিক্যাল কলেজ যদি সফটওয়্যার ডেভেলপার সৃষ্টি করে, তাহলে তা আশ্চর্যের বই কি!!! কিন্তু তাই ঘটেছিল ২০০৩ সালে। কিভাবে? তাহলে শোনাই যাক গল্পটা।

 বাংলা দেশের  ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজের এক ছাত্র 
 মেহদী, মেহদী হাসান খান।

১৭ বছরের ছেলেটা মেডিসিন ক্লাবে  আসতো।বেশ আড্ডাবাজ ছেলে হঠাৎ করে ছেলেটার কি  হয়ে গেলো একেবারে  চুপচাপ। মাথা নিচু করে হাঁটছে, জিজ্ঞাসা করলে কথা বলছে। মেহদীর চরিত্রের 
হঠাৎ এমন পরিবর্তনে সকলেই চিন্তিত  অন্তত যারা ওর সাথে আড্ডা দিতো তারা  অবশ্যই বিশেষ চিন্তিত ।
কিছুদিন পরে  জানা গেলো বাংলা লেখার জন্য ওর নিজের বানানো একটা সফটওয়্যার আছে। 
সকলেই ভাবতে শুরু করলো যে বিজয় নামক সফটওয়্যার  থাকতে কেনো আরেকটা সফটওয়্যার লাগবে তা কারুরই  অজানা। মেহদীকে  খুব করে চেপে ধরতেই জানা গেলো ঘটনা। ইংরেজি অক্ষর চেপে কীবোর্ড এ বাংলা লেখা যায়। এই হচ্ছে মেহদীর বানানো সফটওয়্যার এর বৈশিষ্ট্য। রোমান টাইপ করে বাংলা লেখার প্রথম সফটওয়্যার।

" কত করে নিবি?, জানতে পেরে বন্ধুরা জিজ্ঞাসা করে মেহদী কে।
কিসের কত করে নে বো?

এরপরে মেহদী যা বললো তাতে আক্কেলগুড়ুম হয়ে গেলো। ১৮ বছরের একটা ছেলে বলছে, 'ফ্রি। ভাষার জন্য টাকা নেবো কেন?'
হ্যাঁ, এ ধরনের বৈপ্লবিক কথাবার্তা এই বয়সেই মানায়। কারণ এই সফটওয়্যার তৈরীর কাজটাও যে লেখনী জগতে এক বিপ্লবেরই সামিল।

এরপরের সময়টা মেহদীর আত্মনিবেদন। বিপ্লবকে সফল করার প্রতিজ্ঞা।

দুর্ধর্ষ ১৮ বছর বয়েসটাকে দরজার ওপাশে আটকে, হোস্টেলের একটা রুমে নিজের পৃথিবী বেঁধে ফেলে মেহদী তখন গোটা পৃথিবীর জন্য বাংলা ভাষাকে উন্মুক্ত করে দেয়ার যুদ্ধে নেমে গেছে।

রুমে না গেলে ছেলেটার সাথে দেখা হয়না। কলেজ ক্যান্টিনে নেই। মাথার চুল ছেড়ে দেয়া বাড়তে দিয়ে, থুতনির নীচে ফিনফিনে দাড়ি গজাচ্ছে। চোখের নীচে কালিটুকু হয়ে যাচ্ছে স্থায়ী।

এর মাঝে আছে মেডিকেল নামের রোডরোলার। তাবৎ বিজ্ঞ শিক্ষকেরা ঘোষনা দিয়ে জানিয়ে দিলেন, এ ছেলে মেডিকেলের অনুপযোগী। বিজ্ঞ শিক্ষকেরা বলে দিলেন, সময় থাকতে মেডিকেল ছেড়ে দিতে।

মেডিকেলের অসহ্য, দমবন্ধকরা পৃথিবী মেহদীকে চেপে ধরছিলো আষ্টেপৃষ্ঠে, মরে যাওয়ার কথা ছেলেটার। একদিকে নতুন আইডিয়া, তার স্বপ্ন, আরেকদিকে মেডিকেল। অসম্ভব অস্থিরতা কাটাতে যখন রাতে একটু রাস্তায় হাঁটত মেহদী, তার একাকী পথের সঙ্গী হত হোস্টেলের সারমেয়বাহিনী।

মেহদী আটকায়নি। সৃষ্টি সুখের উল্লাস প্রথম সফল হয় ২৬/০৩/২০০৩ এ। অভ্রর আবির্ভার এই দিনই। মেডিকেলটাও শেষ করেছে সন্মানের সাথেই। আটকায়নি। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ অনেক রথীমহারথী চিকিৎসক তৈরী করেছে, আর অন্যদিকে সব অপমানকে হেলায় তুচ্ছ করে মেহদী বরং সেই কলেজটাকে সমৃদ্ধ করেছে।

মেহদী লেগে থেকে এই পৃথিবীকে যেটা দিয়েছে, তা হচ্ছে মুক্তি, স্বাধীনতা। বাংলা লেখার স্বাধীনতা। ইংরাজি হরফ নিজেই রূপান্তরিত হয়ে বাংলায় মনখোলার স্বাধীনতা। সামঞ্জস্যতা রেখেই তাই মেহদীর স্লোগান, "ভাষা হোক উন্মুক্ত"।

উন্মুক্ত এই সফটওয়্যার বাঁচিয়েছে সরকারের কোটি কোটি টাকা। সরকারী দপ্তরগুলোতে অভ্র ব্যবহার হয়। নির্বাচন কমিশন ব্যবহার করে আমার আপনার পরিচয়পত্র বানাচ্ছে,পাসপোর্ট বানাচ্ছে,সরকারী ফাইলে হচ্ছে লেখা। সবকিছুর মূলে ছিলো মেহদীর সেই এক রুমের পৃথিবী, একটা ছোট্ট কম্পিউটার আর পর্বতসম স্বপ্ন। স্বপ্নের নাম "অভ্র"। অভ্র, মেহদীর ব্রেনচাইল্ড। সেই সন্তান আজ আমাদের সকলেরই আত্মজ।

আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বাংলা ভাষাকে ভালবেসে আজ আপনি যত পোষ্ট করবেন, অভ্রর সাহায্যে, তা সম্ভবই হোত না মেহদী না থাকলে। তাই আপামর বাঙালীর কাছ থেকে সেই প্রচারবিমুখ, নিজের কাজে ডুবে থাকা একাগ্র ছেলেটার জন্য অনেক শুভকামনা।

একুশে মাতৃভাষা দিবসে সকল ভাষাশহীদ দের সাথে বাংলায় লেখাকে এই আন্তর্জাতিক রূপ দেওয়ার জন্য তার নামও এক সারিতে উচ্চারিত হোক।
(সংগৃহিত)

5>‘বনফুল’,,সাহিত্যিক ডা. বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়-এর জীবনের টুকরো টুকরো গল্প .

5>‘বনফুল’,,সাহিত্যিক ডা. বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়-এর জীবনের   টুকরো টুকরো গল্প .

‘বনফুল’,সাহিত্যিক ডা. বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়-এর জীবনের   টুকরো টুকরো গল্পে ভ্রাতুষ্পুত্র অভিজিৎ মুখোপাধ্যায়------...

                                    অনুলিখন: দেবশঙ্কর মুখোপাধ্যায়
                              TAGS : Balai Chand Mukhopadhyay


শখ ছিল পাখি দেখা। আকাশের তারা চেনাও। সাহিত্যিক ডা. বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়-এর জীবনের টুকরো টুকরো গল্পে ভ্রাতুষ্পুত্র অভিজিৎ মুখোপাধ্যায়

নবজাতককে লোকে মুখে দেয় মধু। বড়জেঠু আমায় দিয়েছিলেন চা!

তিনি তখন রীতিমত নামী চিকিৎসক। ডা. বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়। সাহিত্যিক হিসেবেও কেউকেটা নাম— বনফুল!

বাবারা ছ’ভাই। বড়জেঠু সবার বড়। আমার বাবা, অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়, যাঁকে সিনেমাজগতের লোকজন ‘ঢুলুদা’ নামেও চেনেন, ভাইদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট।

বাবা আর জেঠুর বয়সের ফারাক কুড়ি বছর। বাবা ওঁকে এমনই সম্ভ্রম করতেন যে, কোনও দিন সামনে বসে গল্প করতে দেখিনি। চা খেলেও আড়ালে খেতেন।

বড়জেঠুর স্ত্রী আমার ‘বড়মা’। ওঁরা দু’জনেই এককালে থাকতেন ভাগলপুরে। ১৯৬৮ সালে জেঠু যখন ওখানকার পাট চুকিয়ে লেকটাউনে বাসা নিলেন, বাবা তারই কাছাকাছি সময়ে আমাদের নিয়ে উঠে এসেছেন টালিগঞ্জে।

বড়জেঠু মানেই ভারী চেহারা। ধুতি। পাঞ্জাবি। গম্ভীর চাউনি। তারই মধ্যে সারল্য খেলে বেড়াত মুখেচোখে। গল্প করতেন, মজার মজার গল্প। তার বেশিটাই খাওয়ার টেবিলে।

বড়জেঠুকে নিয়ে আমাদের পরিবারে গল্পের শেষ নেই।

যুবকবেলায় এক সময় তিন নম্বর মির্জাপুর স্ট্রিটের মেসে থাকতেন। তখনই একবার অভিন্নহৃদয় বন্ধু পরিমল গোস্বামীকে সঙ্গী করে জোড়াসাঁকোয় রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করে আসেন। ঠাকুরবাড়ির বিখ্যাত দক্ষিণের বারান্দায় কবির এক দিকে তখন অবনঠাকুর, অন্য দিকে গগনেন্দ্রনাথ।

প্রথম আলাপেই থেমে যাওয়া নয়, সম্পর্ক গড়ায় তার পরেও। জেঠুর উপন্যাস ‘কিছুক্ষণ’ পড়ে উচ্ছ্বসিত কবি উৎসাহ দিয়ে চিঠি পাঠান জেঠুকে। আবার ‘শ্রীমধুসূদন’ নাটক পড়ে কড়া পত্রাঘাতও। এর মধ্যেই একবার কবি জেঠুকে বলেন, ‘‘তুমি আমার কোন জিনিসটি স্মৃতিস্বরূপ রেখে দিতে চাও, বলো।’’

জবাবে কবির একটি জোব্বা চেয়ে বসেন জেঠু। কবি নিজে সেটি তাঁর হাতে তুলে দেন।

‘কিছুক্ষণ’-এর প্রসঙ্গ উঠতে সত্যজিৎ রায়ের কথা মনে পড়ে গেল। মানিকবাবু তখন সবে ‘পথের পাঁচালী’-তে হাত দিয়েছেন। কিছুক্ষণ-এর কাহিনি নিয়ে তিনি ছবি করতে চেয়েছিলেন। তার আগে বাবাও ওই একই কাহিনি চেয়েছিলেন বলে, জেঠু চিত্রস্বত্ব দেন বাবাকেই।

এমনও শোনা যায়, খ্রিষ্টান মুচির মেয়েকে প্রাধান্য দিয়ে মানিকবাবু নাকি ‘কিছুক্ষণ’-এর স্ক্রিপ্ট করেছেন, এই খবর পেয়ে পিছিয়ে যান জেঠু!

জেঠুর কাহিনি ‘ভুবন সোম’ নিয়ে ছবি করার গল্পটি আবার এক্কেবারে অন্য রকম।

‘ভুবন সোম’ যে ছবি হতে পারে, প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেননি জেঠু। তার ওপর পরিচালকের ওপর প্রযোজকের চাপ ছিল, নায়ক ভুবন সোমের বয়স কমিয়ে চরিত্রটা রোম্যান্টিক-রোম্যান্টিক করতে হবে। রাজি হননি মৃণালকাকুই। তার পরের কাহিনি তো ভারতীয় ছায়াছবির ইতিহাসে মাইলফলক! যেমন মৃণালকাকুর পরিচালনা, তেমন অভিনয় করেছিলেন উৎপল দত্ত, সুহাসিনী মুলে!

উৎপল দত্ত কী যে শ্রদ্ধা করতেন বনফুলকে! জেঠু যখন পাকাপাকি ভাবে কলকাতায় চলে এলেন, নতুন থিয়েটার করলেই, জেঠুর বাড়ি বয়ে নেমন্তন্ন করতে যেতেন উৎপল দত্ত নিজে। উদ্দেশ্য, ওঁকে প্রথম শো-তেই দেখানো চাই। টিফিন বাক্সে দিয়ে আসতেন জেঠুর প্রিয় কষা মাংস!

জেঠুর এই মাংসপ্রীতির ব্যাপারটা চাউর ছিল ভালই। অভিনেতা অশোককুমারও জানতেন।

একবারের গল্প বলি। জেঠুরই কাহিনি নিয়ে ‘হাটেবাজারে’ ছবির কাজ চলছে। অশোককুমার সেখানে সদাশিব ডাক্তার। হঠাৎই তিনি খবর পেলেন, তাঁর ‘বলাইদা’ এখন ভাগলপুরে! প্রসঙ্গত, অশোককুমারের মামাবাড়ি আবার ওই ভাগলপুরেই।

খুব ভাল রাঁধতে জানতেন অশোককুমার। সাতসকালে নিজের রাঁধা মাংস নিয়ে সোজা হাজির হয়ে গিয়েছিলেন বনফুলের কাছে!

ভোজনরসিক তো ছিলেনই, কিন্তু বড়জেঠুর নিজের হাতের রান্না?

শীর্ষেন্দুকাকু (মুখোপাধ্যায়) একবার ওঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘‘এত যে খেতে ভালবাসেন, রান্না করতে জানেন?’’

তাতে জেঠুর জবাবটি শুনুন।— বলেছিলেন, ‘‘জানি মানে! শোনো, রান্না নিয়ে এক্সপেরিমেন্টও করি। সেবার আলুর দম করছি, বুঝলে! কী খেয়াল হল, জলের বদলে দুধ ঢেলে দিলাম। আহা, কী স্বাদ হল গো!’’

বেশির ভাগ সময়ই জেঠুকে দেখতাম রাশভারী। কিন্তু এই মানুষটিরই আবার শৈশব ছিল দস্যিপনা আর দুষ্টুমিতে ঠাসা!

আদি-বাস হুগলির শিয়াখালা হলেও আমাদের দাদু থাকতেন পূর্ণিয়া জেলার মণিহারী গ্রামে। পেশায় উনিও ডাক্তার। ওখানেই জেঠুর জন্ম। বড় হওয়া।

গঙ্গা আর কোশি নদীর সঙ্গমে ওই জায়গাটিতে পিরবাবার পাহাড়। জঙ্গল। সরু সরু পায়ে চলা পথ। এবড়োখেবড়ো চাষের জমি। একহাতি একটা লাঠি নিয়ে সেই তল্লাটের এ-মুড়ো সে-মুড়ো চষে বেড়াত ছোট্ট বলাই। আর সুযোগ পেলেই লাঠি দিয়ে বাড়ি বসাতো অন্যের পিঠে।

ছোটবেলায় মায়ের বুকের দুধ পায়নি। এক মুসলিম মজদুর চামরুর স্তন পান করে বড় হওয়া। শক্তপোক্ত চেহারা। রাজ্যের জীবজন্তু নাড়াঘাঁটা শখ। সন্ধে হলে পড়া নয়, গানের আসরেই তাকে পাওয়া যেত বেশি। আর বলিহারী স্মরণশক্তি! সে বোধ হয় মায়ের দৌলতেই।

কিশোরবেলায় ‘বিকাশ’ নামে হাতে লেখা পত্রিকা বের করত। তারই থেকে ক’টি কবিতা নিয়ে এক পরিচিত পাঠিয়ে দিয়েছিল ‘মালঞ্চ’ পত্রিকায়। ছাপাও হয়ে গেল। সবাই কী খুশি! শুধু চটে গেলেন হেড পণ্ডিতমশাই! এবার উপায়? লেখা তো ছাড়া যাবে না! কিন্তু পণ্ডিতমশাইয়ের গোঁসা সামলাবে কে? অগত্যা ছদ্মনাম ধারণ। সেই থেকে বলাইচাঁদ হয়ে গেলেন ‘বনফুল’!

সুনীলকাকা (গঙ্গোপাধ্যায়) একটা কথা প্রায়ই বলতেন, ‘‘লোকে বাংলা ভাষায় তিন ‘বন্দ্যোপাধ্যায়’-কে এককালের প্রধান সাহিত্যিক ঠাওরায়! তারাশঙ্কর, মানিক, বিভূতিভূষণ! এই তালিকায় বনফুলকে বাদ দেওয়াটা আমার মনে হয় ঠিক নয়।’’

বড়জেঠুর লেখার জনপ্রিয়তা যে কী পর্যায়ের ছিল, ভাবা যায় না!

একবার হন্তদন্ত হয়ে স্টেশনে পৌঁছেছেন, দেখেন হুশ হুশ করে লাস্ট ট্রেন বেরিয়ে যাচ্ছে।

হা কপাল! এখন বাড়ি ফিরবেন কী করে! মুহূর্তে দেখেন, থেমে গেল ট্রেন। পরে শুনেছিলেন, তাঁকে গাড়ি ধরার জন্য ছুটতে দেখে চলন্ত ট্রেন থামিয়ে দিয়েছিলেন বনফুল-ভক্ত গার্ড ও ট্রেন-চালক!

বনফুলের কাহিনি তো বটেই, ওঁর নাটকেরও প্রচণ্ড প্রশংসা করতেন সুনীলকাকু।

ঠিক যেমন নাট্যাচার্য শিশির ভাদুড়ী। তিনি যখন একেবারে খ্যাতির মধ্যগগনে, তখনই ঠিক করেন, বনফুলের ‘শ্রীমধুসূদন’ থিয়েটার করবেন। যে জন্য ভাগলপুরের বাড়ি পর্যন্ত ছুটে গিয়েছিলেন।

সে এক অদ্ভুত দৃশ্য সে দিন! শিশিরকুমারকে আসতে দেখে বারান্দায় হাসি-হাসি মুখে দাঁড়িয়ে বড়জেঠু। ও দিকে বাগানের গেট খুলে নাট্যাচার্য ঢুকলেন, উচ্চস্বরে গান গাইতে গাইতে, ‘‘আজি এসেছি, আজি এসেছি, এসেছি বঁধু হে...’’

লিখতেন। ছবি আঁকতেন। তারা দেখা, পাখি চেনা ছিল শখ। পাখিদের নিয়ে অসাধারণ একটি কাহিনিও লেখেন, ‘ডানা’।

ছিল অসম্ভব আত্মসম্মানবোধ। যে জন্য পটনা মেডিকেল কলেজে ঢুকে যখন দেখেন, উঠতে-বসতে ওপরওয়ালাদের সেলাম ঠুকতে হবে, ‘ধুত্তোর’ বলে কলেজ ছেড়েছিলেন।

ডাক্তারি পড়তে পড়তেই বিয়ে করতে হয় দাদুর ফরমানে। পাত্রীর নাম লীলাবতী। আমার বড়মা। তিনি তখন বেথুন কলেজে। আইএ-র ছাত্রী। মা সারদার স্নেহধন্যা। শৈশবে তাঁকে চুল পর্যন্ত আঁচড়ে দিতেন সারদাময়ী। কটকট করে করে কথা বলতেন বলে, নাম দিয়েছিলেন ‘কটকটি’।

বড়মা’র বোন সুপ্রিয়াদেবী। শ্যালিকার সিনেমা করা জামাইবাবুর ছিল না-পসন্দ। সেজন্য অনুযোগও করতেন।

তাতে বেণুমাসি সোজাসাপটা বলে দিতেন, ‘‘যাব্বাবা, বনফুলের এত কাহিনি নিয়ে যে ছবি হয়, তার বেলা!’’

সংসারে বড়মা ছিলেন ছায়ার মতো। কঠিন রোগভোগের পর ১৯৭৬ সালে বড়মা যখন চিরকালের জন্য চলে গেলেন, বড়জেঠু খুব ‘একা’ হয়ে গিয়েছিলেন।

দেখলে খুব কষ্ট হত সেই সময়টায়। শেষ বয়সে বহুকালের সঙ্গীকে হারিয়ে তিনি তখন মনে মনে একেবারে নিঃস্ব!

এই একাকী জীবন অবশ্য দীর্ঘকাল সইতে হয়নি ওঁকে। ১৯৭৯-র শ্রীপঞ্চমী। সকালের জলখাবার খেয়ে বিছানা ছেড়ে টেবিলে বসতে গিয়ে হঠাৎই চলচ্ছক্তিহীন হলেন বড়জেঠু। ন’দিন যমে-মানুষে কী টানাটানি! কী টানাটানি!

ফেব্রুয়ারির ৯। সব থেমে গেল।

প্রাণের মানুষ লীলার কাছে লীন হবেন বলে অনন্তের পথে পাড়ি দিলেন সাহিত্যের বনফুল....অনুলিখন: দেবশঙ্কর মুখোপাধ্যায়

TAGS : Balai Chand Mukhopadhyay

Friday, March 10, 2017

4>মাইকেল মধুসূদন দত্ত-------{ 1 to 3 )

4>>
    1>মধুসূদন দত্তদের মত
     2>জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলী হে মহাকবি
     3>মাইকেল মধুসূদন ও ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর।
         ইংরেজি "E" অক্ষরটি নাই এমন কিছু লাইন।

=======================================
1>মধুসূদন দত্তদের মত

1>সম্ভ্রান্ত বাঙালি পরিবারে জন্মে ষোলআনা বাঙালি শিক্ষাটাই পেয়েছিলেন। বাড়ির অদূরে একটা মসজিদে আরবি, ফার্সিও শিখতে যেতেন বাল্যকালে। বাংলাদেশ সরকারকে ধন্যবাদ- মসজিদটা আজও তেমনই আছে। এবং তার বাড়িঘরও সংরক্ষিত আছে পরম যত্নে! মধুমেলা হয় তার জন্মদিন থেকে! আছে বিরাট 'মধুমঞ্চ'। ছোট একটা সংগ্রহশালা! তবে কপোতাক্ষ মরে গেছে কচুরিপানার দৌরাত্ম্যে! যশোর শহর থেকে সাগরদাঁড়ি যাবার যোগাযোগ ব্যবস্থাতেও নাকাল হতে হয়! দূরও বটে! তবুও বাংলাদেশ সরকারকে অকুন্ঠচিত্তে ধন্যবাদ জানাই যে পরম যত্নে তারা সব টিকিয়ে রেখেছে আজও! বছর তিনেক আগে গিয়েছিলাম একবার।
সাগরদাঁড়িতে তার জীবন বেশীদিনের নয়। পিতার অঢেল সম্পদ তাঁকে কোলকাতায় রেখে নামীদামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ানোর জন্য অপর্যাপ্ত ছিল না! কোলকাতায় ইংরেজী শিক্ষাব্যবস্থা ও ইংরেজসংস্কৃতির প্রভাবে তাঁর মধ্যে অনেক চারিত্রিক বিকাশ ঘটে! যেমন- বাঙালী নেটিভ সংস্কৃতির প্রতি অবজ্ঞা, আমাদের ধর্ম ও সভ্যতাকে তাচ্ছিল্য, সর্বোপরি অহোরাত্র মদ্যপান! এই সময়ে ডিরোজিওর মত আচার্য্যরা এইসব শিক্ষারই প্রসার ঘটাচ্ছিলেন। মেকলে প্রভৃতি রাজশাসকরাও চাইছিলেন ভারতবর্ষের প্রাচীন শিক্ষাপ্রণালীকে একেবারে মুছে দিয়ে এখানে ইংলিশ স্টাইল চালু করে দেয়া আর সবাইকে বোঝানো 'তোমাদের ভারতীয় সভ্যতা বর্বরদের! আমাদের শিক্ষা নাও! মানুষ হও!' মধুসূদন দত্তদের মত অনেকেই এই শিক্ষাটাই নিয়েছিলেন।
তাঁর বিরাট মেধার কোন তূলনা হয় না! অনেকগুলো ভাষায় পারঙ্গম ছিলেন। একইসাথে দুটো কাব্য লিখতে পারতেন। ইংরেজী ভাষায় তাঁর অত্যাশ্চর্যকীয় দখল সবাইকে চমকে দিত! কিন্তু নেটিভ লেখক হয়ে ইংরেজী লিখলেই তো ইংরেজের জাতে ওঠা যায় না! জানা যায় এই উচ্চাভিলাষ থেকেই তিনি খ্রীষ্টধর্মে ধর্মান্তরিত হয়ে যান ও মাইকেল নামটা এ সময়ে যোজিত হয়! তবে এতে লাভ কিছু হয়নি! ধর্মত্যাগী পুত্রকে পিতা পরিত্যাগ করেন! কলেজের অর্থে পড়াশোনা করে মাদ্রাজ চলে যান চাকরীর জন্য! বিশেষ সুবিধা করতে পারেননি! চরম দারিদ্র্যতায় দিন কাটাতে হয়! এর মধ্যেই প্রথম ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ 'দ্য ক্যাপটিভ লেডি' রচনা করেন ও প্রথম বিবাহবন্ধনে জড়ান এক ইংরেজ মেয়ের সাথে! তাদের সংসার টিকেছিল আট বছর! দুই সন্তান জন্মেছিল। তারপর ডিভোর্স!
আইন পড়ার জন্য একবার লন্ডন গিয়েছিলেন- সেখানে বর্ণবাদী আচরণের স্বীকার হয়ে ফ্রান্সে চলে যান। শুধু খ্রীষ্টান হলেই তো হয় না! এমেলিয়া এঁরিয়েটার সাথে তাঁর বিয়ে ফ্রান্সে হয়েছিল কিনা এই মূহুর্তে মনে করতে পারছি না! সম্ভবত এটাও মাদ্রাজেই ঘটে। তবে মহাকবির চরম দূঃখপূর্ণ জীবনে নিজের শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত পাশে ছিলেন এই ফরাসী রমণী! ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মাসে মাসে টাকা পাঠাতেন পড়াশোনার জন্য! বিদ্যাসাগরের বদান্যতায় আইন পড়া শেষ করে দেশে ফিরতে পেরেছিলেন। কিন্তু দেশে ফিরে তিনি তাঁর পড়াশোনাকে জীবিকার প্রয়োজনে লাগাননি! তাই আমৃত্যু চরম দারিদ্র্যতার ভেতরে যেতে হয়েছে তাঁকে! মৃত্যুও ঘটেছিল মাত্র ৪৯ বছর বয়সে বলতে গেলে প্রায় কপর্দকহীন অবস্থায়!
'দ্যা ক্যাপটিভ লেডি' কবির বন্ধু গৌরদাস বসাকের মাধ্যমে বেথুন সাহেবের হাতে গিয়ে পড়ে! তিনি এই কাব্যগ্রন্থের প্রশংসা করলেও গৌরদাসকে বলেন- 'আপনার বন্ধুকে বাংলায় লিখতে বলুন।' মহাকবি এতে খুশী হননি! তিনি বিশ্বাস করতেন বাংলা ভাষায় কখনো কোন উচ্চমানের সাহিত্য রচনা সম্ভব নয়! এটা একটা লোকজ কথ্য ভাষা মাত্র! ইংরেজীর মত গভীরতা এতে নেই! অবশ্য তিনি সে সময়েও তুড়ি বাজিয়ে বাংলা কবিতা লিখে দিতে পারতেন। এই ভুল ভাঙতে কবির দেরী হয় কিছুটা! ভুল ভাঙা কিনা সঠিক বলতে পারছি না- কারণ তাঁর হাত ধরেই বাংলা কাব্য এমন একটা উচ্চতায় গেছে যা তাঁর আগে কেউ করে দেখাতে পারেননি! মাতৃভাষা ও মাতৃভূমির প্রেম তাঁকে বদলে ফেলেছিল আগাগোড়া! সংস্কৃত ভাষায় পান্ডিত্য থাকার দরুণ সংস্কৃত সাহিত্যের ভাব ও রচনাশৈলীকে দারুণ নান্দনিকতায় ফলিয়েছেন বাংলা লেখায়! 'মেঘনাদবধ' অন্যতম উদাহরণ! বাংলা সনেট প্রবর্তন করেছিলেন সংস্কৃতের 'অমিত্রাক্ষর', বাংলার লোককবিদের 'পয়ার' আর পেত্রার্কের ১৪ লাইনের আইন কানুন মেনে! তারপর তাতে দেন নিজের স্বকীয়তা! এটা এক অদ্ভুত সৃষ্টি! তবে তখন হয়ত অনেক দেরী হয়ে গেছে! টাকার জন্য লেখালেখি করতে হত অমন জমিদারপুত্রকে!
গ্লানিপূর্ণ জীবনে হয়ত একটু শান্তির হাওয়া পাবার জন্য গিয়েছিলেন দক্ষিণনেশ্বরে রামকৃষ্ণ পরমহংসের কাছে! তিনি এসেছিলেন কিন্তু একটা কথাও বললেন না! যশোলোভে স্বধর্মত্যাগী মধুসূদনের প্রতি অনুকম্পা হল না তাঁর! ব্যথিত মধুসূদন ফিরে এলেন! তাঁর সারাজীবন কেটেছে চরম আত্মগ্লানির ভেতর। শেষ দিকে আইন ব্যবসায় নামলেও নিজের অমিতব্যায়ী স্বভাব তাঁকে কখনো শান্তিতে রাখেনি। বরং ঋণগ্রস্থ হয়ে ভুগেছেন প্রচুর! তাঁর ব্যাক্তিজীবন যেভাবেই কাটুক না কেন তার বিরাটাকার প্রতিভা ও কীর্তি বাঙালীকে মুগ্ধ করে রেখেছে যুগের পর যুগ! কাব্য প্রসঙ্গে আলাপ করতে গিয়ে স্বামী বিবেকানন্দ এববার তাঁর প্রিয় বাঙাল শিষ্য শরচ্চন্দ্র চক্রবর্তীকে বলেছিলেন- "ঐ একটা অদ্ভুত genius(প্রতিভা) তোদের দেশে জন্মেছিল। ‘মেঘনাদবধে’র মতো দ্বিতীয় কাব্য বাঙলা ভাষাতে তো নেই-ই, সমগ্র ইওরোপেও অমন একখানা কাব্য ইদানীং পাওয়া দুর্লভ।" 'মেঘনাদবধ' এর বীররসাত্মক শৈলী স্বামীজিকে খুব আকৃষ্ট করত! বাঙালী নবজাগরণের এই পুরোধাপুরুষ জন্মেছিলেন ১৮২৪ খ্রীষ্টাব্দের আজকের এই দিনে! অর্থাৎ ২৫ জানুয়ারী! যে বাঙলা সংস্কৃতি ও স্বধর্মে অবজ্ঞা তিনি দেখিয়েছিলেন, জীবনের যন্ত্রণাময় দিনগুলোতে তিনি বারবার শান্তি চেয়েছিলেন সেখানেই। তাই তাঁর সমাধিস্মারকে দেখি লেখা-

"'দাঁড়াও পথিকবর, জন্ম যদি তব
বঙ্গে! তিষ্ঠ ক্ষণকাল! এ সমাধি স্থলে
(জননীর কোলে শিশু লভয়ে যেমতি
বিরাম)মহীর পদে মহা নিদ্রাবৃত
দত্তকুলোদ্ভব কবি শ্রীমধুসূদন!
যশোরে সাগরদাঁড়ি কপোতাক্ষ-তীরে
জন্মভূমি, জন্মদাতা দত্ত মহামতি
রাজনারায়ণ নামে, জননী জাহ্নবী''

2>জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলী হে মহাকবি

========================
"পরে মাইকেল মধুসূদন দত্তের কথা তুলিয়া বলিলেনঃ
ঐ একটা অদ্ভুত genius(প্রতিভা) তোদের দেশে জন্মেছিল। ‘মেঘনাদবধে’র মতো দ্বিতীয় কাব্য বাঙলা ভাষাতে তো নেই-ই, সমগ্র ইওরোপেও অমন একখানা কাব্য ইদানীং পাওয়া দুর্লভ।
শিষ্য। কিন্তু মহাশয়, মাইকেল বড়ই শব্দাড়ম্বরপ্রিয় ছিলেন বলিয়া বোধ হয়।
স্বামীজী। তোদের দেশে কেউ একটা কিছু নূতন করলেই তোরা তাকে তাড়া করিস। আগে ভাল করে দেখ্-লোকটা কি বলছে, তা না, যাই কিছু আগেকার মতো না হল, অমনি দেশের লোকে তার পিছু লাগলো। এই ‘মেঘনাদবধকাব্য’—যা তোদের বাঙলা ভাষার মুকুটমণি-তাকে অপদস্থ করতে কিনা ‘ছুঁচোবধকাব্য’ লেখা হল! তা যত পারিস লেখ্ না, তাতে কি?সেই 'মেঘনাদবধকাব্য' এখনও হিমাচলের মতো অটলভাবে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু তার খুঁত ধরতেই যাঁরা ব্যস্ত ছিলেন, সে-সব critic (সমালোচক)দের মত ও লেখাগুলো কোথায় ভেসে গেছে!মাইকেল নূতন ছন্দে, ওজস্বিনী ভাষায় যে কাব্য লিখে গেছেন, তা সাধারণে কি বুঝবে?"- (স্বামী-শিষ্য সংবাদ)

======================



3>মাইকেল মধুসূদন ও ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর।
ইংরেজি "E" অক্ষরটি নাই এমন কিছু লাইন।


Interesting read for English lovers

Once Ishwarchandra Vidyasagar jokingly asked Michael Madhusudhan Dutt, "As you are a master in English, can you make a sentence without using 'E'?"


He (  Michael Madhusudhan Dutt )  wrote this...

"I doubt I can. It’s a major part of many many words. Omitting it is as hard as making muffins without flour. It’s as hard as spitting without saliva, napping without a pillow, driving a train without tracks, sailing to Russia without a boat, washing your hands without soap. And, anyway, what would I gain? An award? A cash bonus? Bragging rights? Why should I strain my brain? It’s not worth doing."

==============================