49>ঋষি অরবিন্দ ঘোষ::---
ভারতীয় বাঙালি রাজনীতিক, দার্শনিক, যোগ এবং আধ্যাত্মিক গুরু।
অরবিন্দ ঘোষ জন্মগ্রহণ করেন কলকাতায় ৷ তিনি অধুনা পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার কোন্নগর এর প্রাচীন কুলীন কায়স্থ ঘোষবংশের সন্তান৷ তাঁর বাবা কৃষ্ণধন ঘোষ ছিলেন তৎকালীন বাংলার রংপুর জেলার জেলা সার্জন। মা স্বর্ণলতা দেবী, ব্রাহ্ম ধর্ম অনুসারী ও সমাজ সংস্কারক রাজনারায়ণ বসুর কন্যা। সংস্কৃতে "অরবিন্দ" শব্দের অর্থ "পদ্ম"। বিলেতে থাকাকালীন সময়ে অরবিন্দ নিজের নাম "Aaravind", বারোদায় থাকতে "Aravind" বা "Arvind" এবং বাংলায় আসার পর "Aurobindo" হিসেবে বানান করতেন। পারিবারিক পদবির বানান ইংরেজিতে সাধারণত "Ghose" হলেও অরবিন্দ নিজে "Ghosh" ব্যবহার করেছেন।
শ্রীঅরবিন্দ (জন্মগত নাম: অরবিন্দ অ্যাক্রয়েড ঘোষ; ১৫ অগস্ট ১৮৭২ – ৫ ডিসেম্বর ১৯৫০) ছিলেন একজন ভারতীয় দার্শনিক, যোগী, কবি ও জাতীয়তাবাদী। সাংবাদিক হিসেবে তিনি বন্দে মাতরম্ প্রভৃতি সংবাদপত্র সম্পাদনা করেন। তিনি ভারতকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। ১৯১০ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন স্বাধীনতা আন্দোলনের এক প্রভাবশালী নেতা। তারপর তিনি এক আধ্যাত্মিক সংস্কারকে পরিণত হন এবং মানব-প্রগতি ও আধ্যাত্মিক বিবর্তনের ক্ষেত্রে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির কথা প্রচার করেন।
ইংল্যান্ডের কেমব্রিজের কিং'স কলেজে অরবিন্দ ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস অধ্যয়ন করেন। ভারতে প্রত্যাবর্তনের পর বরোদার দেশীয় রাজ্যের মহারাজের অধীনে তিনি একাধিক অসামরিক পরিষেবা কার্যে অংশগ্রহণ করেন। এই সময় তিনি ক্রমশই ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের জাতীয়তাবাদী রাজনীতি এবং বাংলায় অনুশীলন সমিতির ক্রমবর্ধমান বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। একটি শুনানির মামলা চলাকালীন একাধিক বোমা নিক্ষেপের ঘটনায় এই সংগঠন জড়িয়ে পড়লে অরবিন্দও গ্রেফতার হন। এই সময় তাঁর বিরুদ্ধে আলিপুর ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনীত হয়। যদিও ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে নিবন্ধ রচনার অভিযোগেই কেবল তাঁকে দোষীসাব্যস্ত ও কারারুদ্ধ করা যেত। মামলা চলাকালীন নরেন্দ্রনাথ গোস্বামী নামে এক রাজসাক্ষী নিহত হওয়ার পর প্রমাণাভাবে অরবিন্দ মুক্তি পান। জেলে বন্দী থাকার সময় অরবিন্দ অতীন্দ্রিয় ও আধ্যাত্মিক কিছু অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। মুক্তিলাভের পর তিনি পন্ডিচেরি চলে যান এবং রাজনীতি থেকে নিজেকে সরিয়ে আধ্যাত্মিক সাধনায় মনোনিবেশ করেন।
পন্ডিচেরিতে অরবিন্দ অধ্যাত্ম-সাধনার যে বিশেষ প্রক্রিয়াটির বিকাশ ঘটান তার নাম তিনি দেন যোগ সমন্বয়। তাঁর অন্তর্দৃষ্টির মূল বক্তব্যটি ছিল মানব জীবনের বিবর্তন ঘটে এক দিব্য দেহে এক দিব্য জীবনলাভে। তিনি এমন এক আধ্যাত্মিক উপলব্ধিতে বিশ্বাস করতেন, যা শুধুমাত্র মোক্ষলাভই ঘটায় না, বরং মানব প্রকৃতির রূপান্তর ঘটিয়ে মর্ত্যেই এক দিব্য জীবনকে সম্ভব করে তোলে। ১৯২৬ সালে নিজের আধ্যাত্মিক সহকারী মীরা আলফাসার (যিনি "শ্রীমা" নামে অভিহিতা হতেন) সাহায্যে শ্রীঅরবিন্দ আশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয়।
লোকমান্য তিলক এবং ভগিনী নিবেদিতার সাথেও যোগাযোগ স্থাপিত হয়। বাঘা যতীন হিসেবে পরিচিত যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের জন্য তিনি বারোদার সেনাবিভাগে সামরিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন এবং পরবর্তীতে তাকে বাংলার অন্যান্য বিপ্লবী দলগুলোকে সংগঠিত করার কাজে পাঠান।
=====================
মৃত্যুভয়কে জয় করা ।
শ্রীঅরবিন্দ বলছেন, শেষ পর্যন্ত যদি কাউকে এক বা অন্য কারণে দেহ পরিত্যাগ হয় এবং অন্য দেহ গ্রহণ করতে হয় তাহলে মৃত্যুকে হতাশা-পূর্ণ পরাজয়ে পরিণত না ক'রে তাকে মহীয়ান ও আনন্দময় ক'রে তোলাই কি ভাল নয় ?
অতএব সিদ্ধান্ত এই হবে যে :—
কখনও মৃত্যুর ইচ্ছা পোষণ করবে না ;
কখনও মরতে চাইবে না ;
কখনও মৃত্যুকে ভয় করবে না;
সকল অবস্থায় নিজের ব্যাপ্তি বা প্রসারের ইচ্ছা
পোষণ করবে ৷
শ্রীঅরবিন্দ বলছেন, সর্বপ্রকার ভয়ের মধ্যে সব থেকে অস্পষ্ট ও আঁকড়ে থাকা ভয় হচ্ছে মৃত্যুভয় ৷এর মূল রয়েছে গভীরে অবচেতনায় এবং সেখান হতে তার অপসারণ সহজ নয় ৷এই ভয় থেকে উদ্ধার পাওয়ার অনেক রকম উপায় আছে ৷
প্রথম ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে জানা যে জীবন এক ও অবিনশ্বর ৷কেবলমাত্র আকৃতিই অসংখ্য,অল্পকালস্থায়ী ও ক্ষণভঙ্গুর ৷যে দেহ জন্ম নিয়েছে তা একদিন না একদিন মরবেই ("জাতস্য হি ধ্রুবো মৃত্যুর্ধ্রুবং" গীতা—অর্থাৎ, যে জন্মগ্রহণ করেছে তার মৃত্যু নিশ্চিত ৷)
যুক্তি এই শিক্ষা দেয় যে,যে বস্তুকে এড়াতে পারা যাবে না তাকে ভয় করা নিরর্থক ৷একমাত্র পথ হচ্ছে সেই ধারণাকে গ্রহণ করা এবং ধীর স্থিরভাবে দিনের পর দিন,ঘন্টার পর ঘন্টা,কি ঘটবে না ঘটবে তার প্রতি একেবারেই দৃষ্টি না দিয়ে সর্বোত্তমরূপে যা করতে পারবে তাই করে যাওয়া ৷
কিন্তু যে সমস্ত মানুষ আবেগপ্রবণ,তাদের পক্ষে এ কার্যকারী হবে না ৷তাদের গ্রহণ করতে হবে অন্তর্দর্শনের পথ ৷আমাদের সত্তার নীরব ও শান্ত গভীরে এক অগ্নিশিখা প্রজ্জ্বলিত রয়েছে—তা হ'চ্ছে চৈত্য চেতনার শিখা ৷এই অগ্নিশিখার সন্ধান কর',এর ওপরই একাগ্র হও—এ তোমার ভিতরেই আছে ৷যে মুহূর্তে তুমি তার ভিতরে প্রবেশ করবে—সেই মুহূর্ত্ত হতে অমরত্বের বোধ তোমার মধ্যে জাগ্রত হবে ৷তুমি বোধ করবে তুমি অনন্তকাল জীবিত আছ—তুমি অনন্তকাল জীবিত থাকবে ৷
তৃতীয় পন্থাটি তাদের জন্য,যাদের কোন দেবতায় বিশ্বাস আছে—তাদের ভগবান,যাঁর নিকট পরিপূর্ণভাবে তারা নিজেদের সমর্পণ করেছে ৷তারা
বিশ্বাস করে যে যা কিছু ঘটে তা তাদের ভালর জন্যই ঘটে ৷তাদের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তারা দেখে যে তারা তাদের পরম প্রিয়ের পদতলে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ নিয়ে আসীন বা তাঁর বাহুযুগলের মধ্যে বাস ক'রে পূর্ণ নিরাপত্তা উপভোগ করছে ৷তাদের চেতনায় আর ভয়ের উৎকন্ঠার বা বিপদের কোন স্থান নেই —সবই এক শান্ত,আনন্দময় পরম সুখের অবস্থায় পরিণত হয়েছে ৷
( সংগৃহীত)
=======================