Wednesday, April 8, 2026

51>|| কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য ||

 

   51>|| কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য  ||
[ 15 আগস্ট 1926 ---13 মে 1947]

সুকান্ত ভট্টাচার্যের পৈতৃক নিবাস ছিল অবিভক্ত বাংলার (বর্তমান বাংলাদেশ) ফরিদপুর জেলার কোটালীপাড়ায়। কিন্তু তাঁর জন্ম হয় 15ই আগস্ট, 1926 সালে, কলকাতার কালীঘাটের মহিম হালদার স্ট্রিটে, তাঁর মামাবাড়িতে। বাবা নিবারণচন্দ্র ভট্টাচার্য এবং মা সুনীতি দেবীর এই সন্তান ছোটবেলা থেকেই দেখেছেন শুধুই অভাব আর মৃত্যু। খুব অল্প বয়সেই তিনি মাকে হারান।

ছোটবেলায় বাংলা বইয়ের পাতায় আমরা অনেকেই পড়েছি— "ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।" লাইনটা পড়ার সময় হয়তো আমরা বাহবা দিয়েছি কবির উপমা ব্যবহারের ক্ষমতাকে। কিন্তু জানেন কি? এই কালজয়ী লাইনটি লেখার সময় কবির নিজের পেটে ছিল একটানা কয়েক দিনের মারাত্মক খিদে! এটা কোনো রোমান্টিক কবিতা ছিল না, ছিল এক অভুক্ত তরুণের নাড়ির টান, পেটের চরম জ্বালা।
ইনি কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। যার কলম দিয়ে আগুনের ফুলকি বেরোত, কিন্তু নিজের পকেটে একটা ফুটো পয়সা পর্যন্ত থাকত না।

তিনি বড় হচ্ছিলেন এমন এক সময়ে, যখন বিশ্বজুড়ে চলছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, আর বাংলায় আছড়ে পড়েছে ১৯৪৩ সালের ভয়ংকর 'পঞ্চাশের মন্বন্তর'। রাস্তায় রাস্তায় পড়ে থাকা কঙ্কালসার মৃতদেহ আর ডাস্টবিনের এঁটো খাবার নিয়ে কুকুর আর মানুষের লড়াই সুকান্তের কিশোর মনকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল। তিনি যোগ দেন কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র আন্দোলনে। নিজের পড়াশোনা, স্বাস্থ্য— সব কিছু শিকেয় তুলে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে।

সুকান্তের পকেটে টাকা ছিল না, পেটে অন্ন ছিল না, কিন্তু আত্মসম্মান ছিল পাহাড়ের মতো অটুট।
দিনের পর দিন না খেয়ে কাটাতেন, কিন্তু বন্ধুদের কাছে হাত পাততে তাঁর চরম লজ্জা করত। তাই খিদে পেলে এই কিশোর কবি বেছে নিয়েছিলেন এক ভয়ংকর আত্মঘাতী পথ।
খিদে যখন সহ্যসীমা ছাড়িয়ে যেত, তিনি সস্তা বিড়ি বা সিগারেট কিনে একের পর এক ফুঁকতেন। কারণ তাঁর মনে হতো, নিকোটিন পেটে গেলে খিদের জ্বালাটা হয়তো কিছুটা মরে যাবে। মাসের পর মাস আধপেটা খেয়ে বা না খেয়ে, কেবল বিড়ির ধোঁয়া গিলে আর রোদে পুড়ে পার্টির কাজ করে তাঁর শরীরে নিঃশব্দে বাসা বাঁধল এক মারণ রোগ— যক্ষ্মা বা টিবি (Tuberculosis)।

অপুষ্টি, ক্লান্তি আর অতিরিক্ত ধূমপান তাঁকে ভেতর থেকে শেষ করে দিয়েছিল। অবশেষে তাঁকে ভর্তি করা হয় কলকাতার যাদবপুর টিবি হাসপাতালে (বর্তমান K. S. Roy T.B. Hospital)।

13ই মে, 1947। ভারতের স্বাধীনতার ঠিক কয়েক মাস আগে, মাত্র 20 বছর 9 মাস (প্রায় 21 বছর) বয়সে এই হাসপাতালেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বিদ্রোহী কিশোর কবি। শোনা যায়, মৃত্যুর সময়ও তাঁর পকেটে পাওয়া গিয়েছিল এক মুঠো সস্তা বিড়ি আর কয়েকটা খুচরো পয়সা।

ডাক্তাররা আক্ষেপ করে বলেছিলেন, টিবি নয়, মূলত অপুষ্টি আর অবহেলাই তাঁকে এত তাড়াতাড়ি শেষ করে দিল। ভাবলে চোখে জল আসে— আমরা রাতের আকাশে সুন্দর চাঁদ দেখি, আর তিনি খিদের তীব্র যন্ত্রণায় সেই চাঁদের মধ্যেও শুধু এক টুকরো পোড়া রুটি খুঁজেছিলেন।

তথ্যসূত্র (Sources):
সুকান্ত সমগ্র (পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি)
কবির জন্ম ও মৃত্যু তারিখ: ১৫ আগস্ট ১৯২৬ – ১৩ মে ১৯৪৭ (যাদবপুর টিবি হাসপাতাল)।
         (সংগ্রহীত)
=====================

Friday, March 27, 2026

50>||গৌতম বুদ্ধ ::--

   50>||গৌতম বুদ্ধ ::--


গৌতম বুদ্ধের গৃহ ত্যাগ,:::---

সেদিন হঠাৎ মাঝরাতে সেই রাজকীয় প্রমোদকক্ষে এমন কী ঘটেছিল, যার জন্য তিনি সব ছেড়ে পালিয়েছিলেন? :---

আমাদের কাছে হয়তো এমনটা ভাবনার অতীত বা শুনতে কিছুটা অদ্ভুত  লাগলেও,--

 

বাস্তবে ঘটনাটি মানব মনস্তত্ত্বের এক চরম সত্যি! যা রাজপুত্র সিদ্ধার্থের সেই রাত্রির আসল ঘটনা যা গল্প মনে হলেও 

ঘটনাটি ঐতিহাসিক সত্যতার প্রমান রাখে।

আমরা ইতিহাসে জেনেছি যে সিদ্ধার্থের জন্মের পরই ভবিষ্যৎবাণী করা হয়েছিল— এই ছেলে বড় হয়ে হয় পুরো পৃথিবী শাসন করবে (চক্রবর্তী সম্রাট), আর না হয় সব ছেড়ে এক মহান সন্ন্যাসী হবেন।


 মন ভবিষ্যৎ বাণী তে রাজা শুদ্ধোধন অতিশয় ভীত হয়ে পরলেন  এবং ছেলের মন যাতে কোনোভাবেই বৈরাগ্যের দিকে না যায়, তার জন্য তিনি তৎপরতা অবলম্বন হেতু  সিদ্ধার্থের জন্য তৈরি করলেন তিনটি আলাদা বিলাসবহুল প্রাসাদ— গ্রীষ্মকালের জন্য 'সুরম্য', বর্ষার জন্য 'শুভ' এবং শীতকালের জন্য 'রম্য'।

শুধু তাই নয়, এই প্রাসাদগুলো ভরিয়ে দেওয়া হলো শত শত রূপসী নর্তকী, গায়িকা এবং সেবিকাদের দিয়ে। দিনরাত ২৪ ঘণ্টা সিদ্ধার্থকে পার্থিব সুখ, মদ এবং রূপের নেশায় পাগল করে রাখাই ছিল এদের একমাত্র কাজ। প্রাসাদের বাইরে পৃথিবীটা কেমন, দুঃখ-কষ্ট কাকে বলে, তা সিদ্ধার্থের ধারণাতেই ছিল না।


কিন্তু বিধির বিধানকে খণ্ডাবে কেমন করে।

আর তাই রাজকুমারের বয়স তখন ২৯।

তখন একদিন তিনি লুকিয়ে প্রাসাদের বাইরে গিয়ে বার্ধক্য, রোগ আর মৃত্যু— এই রূঢ় বাস্তব গুলো দেখে ফেলেছেন। তার মনে তখন সৃষ্টি হলো এক বিশাল দ্বন্দ্ব।

এর পরে একদিন রাত্রি কালে রাজপ্রাসাদে এক বিশাল উৎসব চলছিল। শত শত সুন্দরী নারী তাদের রূপ, নাচ আর গান দিয়ে সিদ্ধার্থের মনোরঞ্জনের চেষ্টায় ব্যস্ত ছিল। 

কিন্তু সিদ্ধার্থের মন তখন অন্য কোথাও। একসময় ক্লান্ত হয়ে রাজকুমার ঘুমিয়ে পড়লেন। তাকে সঙ্গ দিতে আসা ওই শত শত সুন্দরী নারীও ক্লান্ত হয়ে সেই বিশাল ঘরের মেঝেতেই যত্রতত্র ঘুমিয়ে পড়ে।

মাঝরাতে হঠাৎ রাজকুমার সিদ্ধার্থের ঘুম ভেঙে যায়। আর চোখ খুলেই তিনি এমন এক দৃশ্য দেখলেন, যা তার শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা স্রোত নামিয়ে দিল!

যে নারীদের একটু আগেও স্বর্গের অপ্সরা মনে হচ্ছিল, ঘুমের ঘোরে তাদের সেই মেকি সৌন্দর্যের মুখোশ খসে পড়েছে।


 অশ্বঘোষের লেখা বিখ্যাত মহাকাব্য 'বুদ্ধচরিত' (Buddhacarita, 5th Canto)-এর বর্ণনা অনুযায়ী— সিদ্ধার্থ দেখলেন, ওই সুন্দরীরা অত্যন্ত বিকট ভঙ্গিতে শুয়ে আছে। কারোর মুখ হা হয়ে আছে এবং সেখান থেকে লালা ঝরছে, কেউ বিকট শব্দে নাক ডাকছে, কারোর পোশাক অবিন্যস্ত, আবার কেউ ঘুমের ঘোরে দাঁত কিড়মিড় করছে।


এহেন ঘটনার প্রকৃত তত্ত্ব হলো  সিদ্ধার্থ  সেই রাতে নারীদের শারীরিক কদর্যতা দেখেননি, তিনি দেখেছিলেন মানুষের অস্তিত্বের নগ্ন বাস্তবতা (Reality of Impermanence)। 


তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, আমরা যে রূপ-যৌবনের মোহে পাগল হয়ে থাকি, তা আসলে ক্ষণস্থায়ী। ঘুমন্ত বা মৃত অবস্থায় এই শরীরের কোনো গরিমা নেই।

বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ 'নিদানকথা' অনুসারে, সিদ্ধার্থের চোখে ওই বিলাসবহুল রাজপ্রাসাদ মুহূর্তের মধ্যে একটা জ্যান্ত শ্মশান ঘাটে (Charnel ground) পরিণত

হয়ে ছিল ।


সেই ক্ষণে সিদ্বার্থ অনুভব করলেন যে তিনি যেন সারি সারি  শত শত  মৃতদেহের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন। এবং তিনি অনুভব করলেন, এই রূপ, যৌবন, রাজকীয় বিলাসিতা, — সবটাই একটা চরম ধোঁকা ও পাপের আঁধার।

এ-হেন অনুভবের পরে আর এক মুহূর্তও দেরি করলেন না তিনি। স্ত্রী যশোধরা আর শিশুপুত্র রাহুলকে ঘুমন্ত অবস্থায় রেখে, সেই রাতেই ওই ঘুমন্ত নারীদের মাঝখান দিয়ে পা টিপে টিপে তিনি চিরকালের মত রাজপ্রাসাদ ছেড়ে বেরিয়ে যান। যাকে ইতিহাসে বলা হয় 'মহাভিনিষ্ক্রমণ' (The Great Renunciation)'মহাত্যাগ' বা 'মহান প্রস্থান।


শত শত নারীর রূপ যৌবন ভোগের বিলাসিতা বিশাল সাম্রাজ্য, অফুরন্ত ঐশ্বর্য,সর্বাধিক শক্তি শালী পূর্ন ক্ষমতার লোভ, প্রলোভন — কোনো কিছুই সেই রাতে তাকে আটকাতে পারেনি।

বৃহত্তর সত্যের খোঁজে পরিবার এবং রাজপ্রাসাদ ছেড়ে সিদ্ধার্থ চলে গিয়েছিলেন জীবনে আসল সত্যের সন্ধানে।

মানুষের জরা,রোগ ,ভোগ ও মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষার উৎস সন্ধানে।

সেদিন যদি সিদ্ধার্থ সর্বস্ব ত্যাগ করে বেরিয়ে না যেতেন তবে হয়তো বৌদ্ধ ধর্মের সৃষ্টি হতো না।

আমরাও অমৃতের সন্ধান পেতাম না।

সেদিন সিদ্বর্থের সেই আত্ম ত্যাগের

কারনে মানুষ লাভ করেছে অমৃত ফলস্বরূপ জীবনে রোগ জ্বালা শোক মৃত্যুকে জয় করার পথ।

      (সংগ্রহীত)

      

======================

■■■■■■■■■■■■■■■■■■■■■