12>|| যুগপুরুষ রাজা রামমোহন রায় ||
সত্যি কারের যুগপুরুষ একেই বলে।
আজ ,আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি তার ভিত কিন্তু চওড়া কাঁধের ওই ছয় ফুট লোকটা।
সত্যিকারের রাজা।
রাজা রামমোহন রায় অথবা রামমোহন রায় (২২ মে, ১৭৭২ – সেপ্টেম্বর ২৭, ১৮৩৩) প্রথম ভারতীয় ধর্মীয়-সামাজিক পুনর্গঠন আন্দোলন ব্রাহ্মসমাজের প্রতিষ্ঠাতা এবং বাঙালি দার্শনিক।
সেই সময়ের কলকাতা শহর, গোরুর গাড়ি চলে, ট্রাম আসেনি তখনও, ট্রেনের নাম শোনেনি ভারতবাসী।
শিয়ালদহতে শিয়ালের আড্ডা। রাস্তায় মেয়েদের বেরোনো খুন করার মতো অপরাধ।
শিক্ষা বলতে বেদ পুরাণ, চিকিৎসা বলতে ঝাড় ফুঁক। সমাজ ডুবে আছে অশিক্ষা আর কুসংস্কারের অন্ধকারে। কুলীন ব্রাহ্মণ আর রক্ষণশীল জমিদারদের দাপট। এদিক ওদিক হলেই সমাজচ্যুত।
সেদিনের কথা ভাবলেই ভয়ে শরীরে শিহরণ জাগে।
এক পাঁচ বছরের মেয়ের লাল চেলি পরে বিয়ে হচ্ছে এক সত্তর বছরের বুড়োর সাথে।
প্রবল কাশছে বুড়ো।
এর ঠিক দুয়েক মাস পর সেই কন্যা আবার সেজেছে লাল চেলিতে।
ঢাক বাজছে। দাউদাউ করে জ্বলছে লেলিহান শিখা।
ছুড়ে দেওয়া হলো বাচ্চাটাকে সেই আগুনে।
একটা তীব্র চিৎকার।
কিন্তু সেই প্রবল আর্তনাদ ঢাকা পড়েগেল ঢাক ঢোল এর শব্দে।
পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে আমার দেশের কন্যা।
কোথাও কুলীনের ২০ টা বউ। নদীর তীরে পরপর ২০ টা চিতা।
কেউ কাঁদছে, কেউ ছুটে পালাতে চাইছে, বাঁচার তীব্র আর্তনাদ, হাহাকার।
সমাজ লাফাচ্ছে উল্লাসে, পালাতে চাওয়া কন্যাকে লাঠির ঘা মেরে আবার ফেলছে আগুনে।
আমার দেশ,আমার ধর্ম, আমার সমাজ। বাঁচাবে কে?
সমাজের এমন অবস্থায় সারাদিন দৌড়চ্ছে মানুষটা কলকাতার বাবুদের দরজায় দরজায়।
সই সংগ্রহের আশায়। জনমত গড়ার জন্য আপ্রাণ প্রচেষ্টা, অসম্ভব পরিশ্রম।
কিন্তু বেশিরভাগ বাড়ি থেকেই জুটছে ধিক্কার, লাঞ্ছনা, রাস্তায় ব্যঙ্গ বিদ্রূপ মুরগির ডাক, সশব্দে মুখের ওপর বন্ধ হয়ে যাচ্ছে দরজা।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নিচু করে বেরিয়ে আসতে গিয়ে নজর যায় দোতলার জানলার এক কিশোরী মুখের দিকে, আকুল হয়ে তাকিয়ে আছে তাঁর দিকে।
তাই তিনি থামতে পারলেন না, আবার দৌড়।
এবার বড়লাটের দরবারে, বড়লাট ব্যস্ত। সারাদিন বসে থাকেন বড়লাটের সময়ের অপেক্ষায়।
শেষে যখন দেখা হল, বড়লাট মাথা নাড়লেন। এদেশের ধর্মে হস্তক্ষেপ করা যাবে না। আপনি আসুন।
বাড়ি ফিরে আবার রাত জেগে ধর্মগ্রন্থ ঘেঁটে দেখা। কোথায় আছে সতী প্রথার বিরোধিতা।
সেই তথ্য পেলে সরকারকে বোঝানো যাবে কিছুটা।
রাতের পর রাত জেগে বেদ, পুরাণ, মনু সংহিতা। পেয়ে গেলেন, শেষ পর্যন্ত পেয়ে যান সতীদাহ যে অশাস্ত্রীয় সেই ব্যাখ্যা। সেটি নিয়ে ছোটেন বড়লাটের দরবারে।
ওদিকে কলকাতার কুলীন সমাজ। তাদের নেতা ব্রিটিশ অনুগত রাধাকান্ত দেব।
প্রবল প্রতাপ তাঁর। বিরাট সমর্থন তাদের। সতীদাহের পক্ষে পাল্টা প্রচার করেন তাঁরা। ধর্মের সমর্থন তাঁদের দিকে। সংস্কারাচ্ছন্ন দেশকে ধরে রাখতে তাঁরা অটল।
আরও বড়ো লড়াই শুরু করলেন রামমোহন। একটি উদার আধুনিক ধর্ম গড়তে হবে। যার মূল সেই বৈদিক চেতনা আর একেশ্বরবাদ।
যেমনি ভাবা তেমনি কাজ। রামমোহন রায় কলকাতায় ২০ আগস্ট, ১৮২৮ সালে ইংল্যান্ড যাত্রার আগে দ্বারকানাথ ঠাকুরের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ব্রাহ্মসমাজ স্থাপন করেন। পরবর্তীকালে এই ব্রাহ্মসমাজ এক সামাজিক ও ধর্মীয় আন্দোলন এবং বাংলার পুনর্জাগরণের পুরোধা হিসাবে কাজ করে।
গড়ে উঠলো ব্রাহ্ম ধর্ম। যে সমাজের আলোয় আলোকিত বংশ থেকেই এসেছেন রবি ঠাকুর, জগদীশ চন্দ্র, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, মহেন্দ্রলাল সরকার, কাদম্বিনী গাঙ্গুলি, দ্বারকানাথ গাঙ্গুলির মতো মানুষ।
উনিশ শতকে পাশ্চাত্য শিক্ষা ও স্ত্রী শিক্ষা বিস্তারে এই সমাজের মানুষেরা ছিলেন মূল কান্ডারী। রামমোহনের হাতে গড়া এই ধর্ম আধুনিক করেছিল সমাজকে।
কিন্তু শুধু ধর্ম দিয়ে নয়, এই জাতিকে অন্ধকার থেকে তুলতে গেলে লাগবে শিক্ষার আলো।
ব্রিটিশ চায় না পাশ্চাত্য শিক্ষার পেছনে খরচ করতে। ধর্ম আর পুরানেই ডুবে থাক নেটিভরা।
কিন্তু রামমোহন অদম্য। অ্যাংলো হিন্দু স্কুল গড়ে তুললেন। সাথে পেলেন ডেভিড হেয়ারকে।
হেয়ারকে স্কুল বুক সোসাইটি, হিন্দু কলেজ, হেয়ার স্কুল গড়ে তোলার জন্য সক্রিয় ভাবে সাহায্য করলেন তিনি।
লর্ড আমহারস্টকে চিঠি দিলেন পাশ্চাত্য শিক্ষার দাবি জানিয়ে। সম্বাদ কৌমূদি কাগজে প্রচার চালালেন পাশ্চাত্য শিক্ষার জন্য। আধুনিক করতেই হবে দেশবাসীকে। তাঁর ধনুকভাঙা পণ।
এরপর এলেন লর্ড বেন্টিংক। উদার, আধুনিক, ভারতবন্ধু। রামমোহন ছুটলেন তাঁর কাছে। সতীদাহ রদ করুন। এমন অমানবিক প্রথা আপনি বন্ধ না করলে কে করবে? বিশাল জনসমর্থন নিয়ে হাজির হলো রক্ষণশীল সমাজ।
কিন্তু বেনটিংক রামমোহনের যুক্তিতে আস্থা রাখলেন।
শুধু লক্ষ লক্ষ নারী আগুনের গ্রাস থেকে মুক্তি পেলো না, এক অমানবিক বর্বর প্রথার লজ্জা থেকে মুক্তি পেলো ভারতবর্ষ, মুক্তি পেলো হিন্দু ধর্ম।
লড়াই শেষ হলো না, ইংল্যান্ডে প্রিভি কাউন্সিলে আবেদন করলেন রাধাকান্ত দেব। এই আইন অগণতান্ত্রিক এবং ভারতীয় সমাজের ওপর আঘাত।
আবার ছুটলেন রামমোহন। ইংরেজ সরকারের কাউন্সিল সভা লোকারণ্য। পরপর সুতীক্ষ্ণ প্রশ্নবাণ আর যুক্তিজালের মুখে চওড়া কাঁধের ওই ছয় ফুট মানুষটি বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে একা। সারা ভারতের হিন্দু নারীদের রক্ষাকল্পে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
একের পর এক যুক্তিতে নাকচ করলেন সব বিরোধিতা। চূড়ান্ত ভাবে রদ হলো সতীদাহ।
সেই কারণেই ভাবতে হচ্ছে আজকের আধুনিক সমাজ, শিক্ষা, সংবাদপত্র, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান সবের সাথে জড়িয়ে আছেন তিনি। সারা ভারতকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছেন অগ্রগতির পথে,আর সমাজ ধিক্কার দিচ্ছে, ব্যঙ্গ করছে তাঁকে। কিন্তু তিনি রাজা। অদম্য তাঁর মানসিক বল। তাইতো তিনি ভারতপথিক। ভারতের প্রথম আধুনিক মানুষ।
কাল ২২সে মে তাঁর জন্মদিন ছিল। প্রণাম জানাই তাঁকে।
না, তাঁর ছবি টাঙানো হয় নি। কলেজ স্ট্রিটের বই পাড়ায় তাঁর পূর্ণ দৈর্ঘ্যের ছবি নেই। দোকানদার বলছিলেন চাহিদা নেই।
উল্টো দিকের হিন্দু কলেজটা কেমন দাঁত বার করে হাসছিলো তখন। ধিক্কারে না ব্যঙ্গে জিজ্ঞাসা করার সাহস হয় নি।
(সংগৃহীত)
<--©➽-আদ্যনাথ রায় চৌধুরী--->
===========================
42>রাজা রামমোহন রায়
জন্মদিন -২২ সে মে
এবারে একটু ইতিহাসের গল্প বলি।
আশা করি আপনার জানা গল্প তথাপি বলতে ইচ্ছা করছে তাই লিখলাম---
অস্থির ভাবে পায়চারি করছিলেন রাজা। বড় হতাশ লাগছে তাঁর। মানুষই যদি বিরোধিতা করে, তাহলে তিনি লড়বেন কাদের নিয়ে? আর করবেনই বা কাদের জন্য? ধুস, আর লড়াই করে লাভ নেই।
এমন সময় দারোয়ান এসে বলল একজন গেঁয়ো ব্রাহ্মন দেখা করতে চাইছে। একটু বিরক্ত হয়ে তিনি বললেন, এখন আমার সময় নেই বলে দে। দারোয়ান বলল, বলেছি। কিন্তু উনি যেতে চাইছেন না। তখন রাজা বললেন, পাঠিয়ে দে।
এক ব্রাহ্মন ঘরে ঢুকলো। খাটো ধুতি, গায়ে নামাবলি, মাথায় টিকি। টিকি দেখলেই রাজার মাথাটা যায় গরম হয়ে। রুক্ষ স্বরে বললেন কী চাই? ব্রাহ্মন বলতে শুরু করলেন।
আমি নদীয়ার মহাদেব ভট্টাচার্য।থামলেন একটু,বোধহয় গুছিয়ে নিলেন একটু। আবার শুরু করলেন।জানেন,সেদিন ছিল বৈশাখ মাস। টোল থেকে ফিরতেই অপর্ণা এসে ঝাঁপিয়ে পড়লো কোলে। জল দিলো, গামছা দিলো, বাতাস দিলো পাখা করে।আমার জন্য তার যতো চিন্তা।বাপে মেয়েতে আদর খাচ্ছি। তখন ওর মা ডাকলো ঘর থেকে। ভেতরে যেতে বলল, মেয়ের তো ৭ বছর বয়স হোল। আর কতদিন ঘরে বসিয়ে রাখবে? পাড়ায় যে কান পাতা দায়। আমি বললাম,পাত্র পাচ্ছি কই? যার কাছেই যাই। ১০০০ টাকার কমে পন নেবেনা কেউ। মন্দিরা ফিসফিস করে বলল, সবার তো কপাল সমান হয়না। কিন্তু জাত ধর্ম তো রাখতে হবে। কাল নদীপথে একজন কুলীন ব্রাহ্মন এসেছেন। বয়সটা বেশি। ৭০ এর ঘরে। কিন্তু বংশ উঁচু। ৫০ টাকায় কন্যা উদ্ধার করেন তিনি। আমাদের অপুকে ওর হাতে গৌরি দান করো। আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, না না এ হবেনা। কিন্তু সমাজের চাপতো বুঝি। বুঝি সংসারের চাপও। নিজের সঙ্গে অনেক লড়াই করে অপুর সাথে বিবাহ দিলাম। লাল চেলি, গয়না, আলতা, সিঁদুরে মেয়েকে আমার দেবীর মতো লাগছিলো। সে যে কী রূপ কী বলবো!! বোধয় বাপের নজরটাই লেগেছিল সেদিন।
পরদিনই মেয়েকে ছেড়ে জামাই বাবাজীবন আবার পাড়ি দিলেন নদীপথে। আরও কারোর কন্যা উদ্ধার করতে। বলে গেলেন আবার আসবো পরের বৎসর।
আমাদের বাপ মেয়ের আনন্দের জীবন চলছিলো বেশ। সারাক্ষন আমার পিছনে। সব কাজ শিখে গেলো। পারতো না শুধু রান্না। একদিন হাতে ফোস্কা পড়ে কী অবস্থা। আমি ওর মা কে বলে দিলাম, ওকে রান্নার কাজে লাগাবেনা। আগুনে ওর কষ্ট হয়। কী খুশি সেদিন মেয়ে। আমাকে জড়িয়ে ধরে কতো আদর।
আশ্বিন মাস গড়িয়ে যায়। পুজো আসছে, চারদিকে সাজো সাজো রব। আমি হাট থেকে মেয়ের জন্য লালটুকটুকে শাড়ি, আলতা সব নিয়ে এলাম। মেয়ে খুব খুশি। বলল ওঃ!! কখন যে পড়বো এইসব।বাবা, আমাকে রানীর মতো লাগবে, বলো? আনন্দে আমার চোখ ভিজে উঠলো। অভাবী সংসারে খুশি উপচে পড়লো।
ঠিক তার পরের দিন, জানেন ঠিক পরের দিন। সকাল দশটা হবে। মেয়ের শ্বশুরবাড়ি থেকে লোক এলো পত্র নিয়ে। গতকাল নারায়ন বন্দ্যোপাধ্যায় দেহ রেখেছেন। যথাবিহিত বিধি অনুসারে কন্যাকে সতী করার নির্দেশ দিয়েছেন তারা। ভেবেছিলাম, পত্র ছিঁড়ে ফেলবো। কিন্তু পত্রবাহক গ্রামের মাতব্বরদের জানিয়েই এসেছেন আমার বাড়ি। কোন উপায় ছিল না। রাজা বলে উঠলেন তারপর???
তারপর মেয়েকে সাজালাম। নতুন লাল চেলির শাড়ি, গয়না, আলতা, সিঁদুরে মেয়ে সেদিন অপরূপা। গ্রামে উৎসব, ঢাক বাজছে। এয়োরা সবাই ওর মাথার সিঁদুর,ওর আলতা নিচ্ছে। আর ও নিজে কী খুশি সেজেগুজে। ওর পছন্দের দধি মিষ্টান্ন এসেছে ঘর ভরে। জানেন, তার মধ্যেও ও সেসব আমাকে খাওয়াবে বলে ব্যস্ত। কথা বন্ধ হয়ে আসে ব্রাহ্মনের। চোখটা মুছে আবার শুরু করেন। খালি সে বুঝতে পারেনি উৎসবটা কিসের।
এরপর খবর এলো নদীর তীরে চিতা সাজানো সমাপ্ত। সতীমাতাকে নিয়ে যাবার নির্দেশ দিয়েছেন কুলীন সমাজ। মেয়েকে কোলে নিয়ে চললাম। কাঁদিনি একটুও। ওকে বুঝতে দিতে চাইনি কিছুই। চিতার পাশে সমস্ত আনুষ্ঠানিক কাজ মিটলো। মেয়ে অবাক হয়ে দেখছিল সব। আগুন দেওয়া হোল চিতায়। দাউদাউ করে জ্বলে উঠলো চিতা। মেয়ে বলল বাবা, বাড়ি চলো। আগুনে আমার বড় ভয়। আমি বললাম, আমার গলাটা একবার ছাড় মা। কচি হাত দুটো গলাটা ছাড়তেই ছুঁড়ে দিলাম অগ্নিকুণ্ডে। আগুনের মধ্যে থেকে একটা রিনরিনে গলা পাওয়া গেল, বাবাআআআআআআআআ ।
সেই ডাক আমি ভুলতে পারিনি। তারপর থেকে একদিনও রাত্রে ঘুম হয়নি। উঠতে বসতে খেতে শুতে শুধু এক আওয়াজ। বাবাআআআআআআআ। আমি পারিনি তাকে বাঁচাতে। আপনি পারেন। পায়ে ধরি আপনার। মেয়েগুলাকে বাঁচান। কতো মেয়ে গ্রাম ঘরে আপনার মুখ চেয়ে আছে। আছি আমরা, মেয়ের বাপ মা রা। বলতে পারিনা সমাজের ভয়ে। কিন্তু আপনি পারবেন।
উঠে দাঁড়ালেন রাজা রামমোহন রায়। বললেন,আমায় আপনি শক্তি দিলেন। পারতে আমাকে হবেই। এখানে না হলে ব্রিটেন যাবো। প্রিভি কাউন্সিলে দরবার করবো। কথা দিলাম আপনাকে।
বাকিটা ইতিহাস। সেই যুগে দাঁড়িয়ে তাঁর সেই লড়াই কতোটা কঠিন ছিল বলে বোঝানো যাবেনা। কলকাতার রাজ পরিবার থেকে ভারতের পণ্ডিত সমাজ সকলে ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। কম নিন্দা অপমানের ঝড় বয়নি তাঁর ওপর দিয়ে। কিন্তু বটবৃক্ষের মতো অটুট ছিলেন তিনি। রামমোহন রায়, ভারতের 'প্রথম আধুনিক মানুষ'। এই মাসেই(২২মে) তাঁর জন্ম। জন্মমাসে প্রনাম জানাই তাকে। হে মহামানব, প্রনমি তোমায়।
রাজা রামমোহন রায়
(মে ২২, ১৭৭২– সেপ্টেম্বর ২৭, ১৮৩৩)
রাজা রামমোহন রায় (মে ২২, ১৭৭২ – অক্টোবর ৩০, ১৮৩৩)
বাংলার নবজাগরণের জনক রাজা রামমোহন রায়।
প্রথম ভারতীয় ধর্মীয়-সামাজিক পুনর্গঠন আন্দোলন ব্রাহ্মসমাজেরপ্রতিষ্ঠাতা এবং বাঙালি দার্শনিক। তৎকালীন রাজনীতি, জনপ্রশাসন, ধর্মীয়
এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে তিনি উল্লেখযোগ্য প্রভাব রাখতে পেরেছিলেন। তিনি সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত হয়েছেন, সতীদাহপ্রথা বিলুপ্ত করার প্রচেষ্টার জন্য।
জন্মস্থান:--মামার বাড়ি তে শ্রীরামপুর
(অধুনা পশ্চিমবঙ্গ)
বাড়ি- রাধানগর, হুগলী জেলা, অধুনা পশ্চিমবঙ্গ
মৃত্যুস্থান:স্টেপল্টন, ব্রিস্টল, ইংল্যান্ড
জীবনকাল:মে ২২, ১৭৭২ – অক্টোবর ৩০, ১৮৩৩
রামমোহন রায় কলকাতায় আগস্ট ২০, ১৮২৮সালে ইংল্যান্ড যাত্রার আগে
দ্বারকানাথ ঠাকুরের সহিত ব্রাহ্মসমাজ
স্থাপন করেন।
পরবর্তীকালে এই ব্রাহ্মসমাজ সামাজিক ও ধর্মীয় আন্দোলন এবং বাংলার পুনর্জাগরণের পুরোধা হিসাবে কাজ করে।
১৮৩১সালে মুঘল সাম্রাজ্যের দূত হয়ে
যুক্ত রাজ্য ভ্রমন করেন।
তিনি ফ্রান্স ও পরিদর্শন করেছিলেন।
১৮৩৩সালে মেনিনজাইটিসে আক্রান্ত
হয়ে ব্রিস্টলের কাছে স্টেপল্টনে মৃত্যুবরণ
করেন।ব্রিস্টলে আর্নস ভ্যাল সমাধিস্থলে তাঁকে কবর দেওয়া হয়।
১৯৯৭ সালে ব্রিস্টলে তাঁর একটি মূর্তি স্থাপন করা হয়।
---------( সংগ্রহ--)----------
||""--©--●অনাথ●---""||
||-anrc-22/05/2018--||
||=01:20:12am===24 L=||
=====================
এবারে একটু ইতিহাসের গল্প বলি।
আশা করি আপনার জানা গল্প তথাপি বলতে ইচ্ছা করছে তাই লিখলাম---
অস্থির ভাবে পায়চারি করছিলেন রাজা। বড় হতাশ লাগছে তাঁর। মানুষই যদি বিরোধিতা করে, তাহলে তিনি লড়বেন কাদের নিয়ে? আর করবেনই বা কাদের জন্য? ধুস, আর লড়াই করে লাভ নেই।
এমন সময় দারোয়ান এসে বলল একজন গেঁয়ো ব্রাহ্মন দেখা করতে চাইছে। একটু বিরক্ত হয়ে তিনি বললেন, এখন আমার সময় নেই বলে দে। দারোয়ান বলল, বলেছি। কিন্তু উনি যেতে চাইছেন না। তখন রাজা বললেন, পাঠিয়ে দে।
এক ব্রাহ্মন ঘরে ঢুকলো। খাটো ধুতি, গায়ে নামাবলি, মাথায় টিকি। টিকি দেখলেই রাজার মাথাটা যায় গরম হয়ে। রুক্ষ স্বরে বললেন কী চাই? ব্রাহ্মন বলতে শুরু করলেন।
আমি নদীয়ার মহাদেব ভট্টাচার্য।থামলেন একটু,বোধহয় গুছিয়ে নিলেন একটু। আবার শুরু করলেন।জানেন,সেদিন ছিল বৈশাখ মাস। টোল থেকে ফিরতেই অপর্ণা এসে ঝাঁপিয়ে পড়লো কোলে। জল দিলো, গামছা দিলো, বাতাস দিলো পাখা করে।আমার জন্য তার যতো চিন্তা।বাপে মেয়েতে আদর খাচ্ছি। তখন ওর মা ডাকলো ঘর থেকে। ভেতরে যেতে বলল, মেয়ের তো ৭ বছর বয়স হোল। আর কতদিন ঘরে বসিয়ে রাখবে? পাড়ায় যে কান পাতা দায়। আমি বললাম,পাত্র পাচ্ছি কই? যার কাছেই যাই। ১০০০ টাকার কমে পন নেবেনা কেউ। মন্দিরা ফিসফিস করে বলল, সবার তো কপাল সমান হয়না। কিন্তু জাত ধর্ম তো রাখতে হবে। কাল নদীপথে একজন কুলীন ব্রাহ্মন এসেছেন। বয়সটা বেশি। ৭০ এর ঘরে। কিন্তু বংশ উঁচু। ৫০ টাকায় কন্যা উদ্ধার করেন তিনি। আমাদের অপুকে ওর হাতে গৌরি দান করো। আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, না না এ হবেনা। কিন্তু সমাজের চাপতো বুঝি। বুঝি সংসারের চাপও। নিজের সঙ্গে অনেক লড়াই করে অপুর সাথে বিবাহ দিলাম। লাল চেলি, গয়না, আলতা, সিঁদুরে মেয়েকে আমার দেবীর মতো লাগছিলো। সে যে কী রূপ কী বলবো!! বোধয় বাপের নজরটাই লেগেছিল সেদিন।
পরদিনই মেয়েকে ছেড়ে জামাই বাবাজীবন আবার পাড়ি দিলেন নদীপথে। আরও কারোর কন্যা উদ্ধার করতে। বলে গেলেন আবার আসবো পরের বৎসর।
আমাদের বাপ মেয়ের আনন্দের জীবন চলছিলো বেশ। সারাক্ষন আমার পিছনে। সব কাজ শিখে গেলো। পারতো না শুধু রান্না। একদিন হাতে ফোস্কা পড়ে কী অবস্থা। আমি ওর মা কে বলে দিলাম, ওকে রান্নার কাজে লাগাবেনা। আগুনে ওর কষ্ট হয়। কী খুশি সেদিন মেয়ে। আমাকে জড়িয়ে ধরে কতো আদর।
আশ্বিন মাস গড়িয়ে যায়। পুজো আসছে, চারদিকে সাজো সাজো রব। আমি হাট থেকে মেয়ের জন্য লালটুকটুকে শাড়ি, আলতা সব নিয়ে এলাম। মেয়ে খুব খুশি। বলল ওঃ!! কখন যে পড়বো এইসব।বাবা, আমাকে রানীর মতো লাগবে, বলো? আনন্দে আমার চোখ ভিজে উঠলো। অভাবী সংসারে খুশি উপচে পড়লো।
ঠিক তার পরের দিন, জানেন ঠিক পরের দিন। সকাল দশটা হবে। মেয়ের শ্বশুরবাড়ি থেকে লোক এলো পত্র নিয়ে। গতকাল নারায়ন বন্দ্যোপাধ্যায় দেহ রেখেছেন। যথাবিহিত বিধি অনুসারে কন্যাকে সতী করার নির্দেশ দিয়েছেন তারা। ভেবেছিলাম, পত্র ছিঁড়ে ফেলবো। কিন্তু পত্রবাহক গ্রামের মাতব্বরদের জানিয়েই এসেছেন আমার বাড়ি। কোন উপায় ছিল না। রাজা বলে উঠলেন তারপর???
তারপর মেয়েকে সাজালাম। নতুন লাল চেলির শাড়ি, গয়না, আলতা, সিঁদুরে মেয়ে সেদিন অপরূপা। গ্রামে উৎসব, ঢাক বাজছে। এয়োরা সবাই ওর মাথার সিঁদুর,ওর আলতা নিচ্ছে। আর ও নিজে কী খুশি সেজেগুজে। ওর পছন্দের দধি মিষ্টান্ন এসেছে ঘর ভরে। জানেন, তার মধ্যেও ও সেসব আমাকে খাওয়াবে বলে ব্যস্ত। কথা বন্ধ হয়ে আসে ব্রাহ্মনের। চোখটা মুছে আবার শুরু করেন। খালি সে বুঝতে পারেনি উৎসবটা কিসের।
এরপর খবর এলো নদীর তীরে চিতা সাজানো সমাপ্ত। সতীমাতাকে নিয়ে যাবার নির্দেশ দিয়েছেন কুলীন সমাজ। মেয়েকে কোলে নিয়ে চললাম। কাঁদিনি একটুও। ওকে বুঝতে দিতে চাইনি কিছুই। চিতার পাশে সমস্ত আনুষ্ঠানিক কাজ মিটলো। মেয়ে অবাক হয়ে দেখছিল সব। আগুন দেওয়া হোল চিতায়। দাউদাউ করে জ্বলে উঠলো চিতা। মেয়ে বলল বাবা, বাড়ি চলো। আগুনে আমার বড় ভয়। আমি বললাম, আমার গলাটা একবার ছাড় মা। কচি হাত দুটো গলাটা ছাড়তেই ছুঁড়ে দিলাম অগ্নিকুণ্ডে। আগুনের মধ্যে থেকে একটা রিনরিনে গলা পাওয়া গেল, বাবাআআআআআআআআ ।
সেই ডাক আমি ভুলতে পারিনি। তারপর থেকে একদিনও রাত্রে ঘুম হয়নি। উঠতে বসতে খেতে শুতে শুধু এক আওয়াজ। বাবাআআআআআআআ। আমি পারিনি তাকে বাঁচাতে। আপনি পারেন। পায়ে ধরি আপনার। মেয়েগুলাকে বাঁচান। কতো মেয়ে গ্রাম ঘরে আপনার মুখ চেয়ে আছে। আছি আমরা, মেয়ের বাপ মা রা। বলতে পারিনা সমাজের ভয়ে। কিন্তু আপনি পারবেন।
উঠে দাঁড়ালেন রাজা রামমোহন রায়। বললেন,আমায় আপনি শক্তি দিলেন। পারতে আমাকে হবেই। এখানে না হলে ব্রিটেন যাবো। প্রিভি কাউন্সিলে দরবার করবো। কথা দিলাম আপনাকে।
বাকিটা ইতিহাস। সেই যুগে দাঁড়িয়ে তাঁর সেই লড়াই কতোটা কঠিন ছিল বলে বোঝানো যাবেনা। কলকাতার রাজ পরিবার থেকে ভারতের পণ্ডিত সমাজ সকলে ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। কম নিন্দা অপমানের ঝড় বয়নি তাঁর ওপর দিয়ে। কিন্তু বটবৃক্ষের মতো অটুট ছিলেন তিনি। রামমোহন রায়, ভারতের 'প্রথম আধুনিক মানুষ'। এই মাসেই(২২মে) তাঁর জন্ম। জন্মমাসে প্রনাম জানাই তাকে। হে মহামানব, প্রনমি তোমায়।
রাজা রামমোহন রায়
(মে ২২, ১৭৭২– সেপ্টেম্বর ২৭, ১৮৩৩)
রাজা রামমোহন রায় (মে ২২, ১৭৭২ – অক্টোবর ৩০, ১৮৩৩)
বাংলার নবজাগরণের জনক রাজা রামমোহন রায়।
প্রথম ভারতীয় ধর্মীয়-সামাজিক পুনর্গঠন আন্দোলন ব্রাহ্মসমাজেরপ্রতিষ্ঠাতা এবং বাঙালি দার্শনিক। তৎকালীন রাজনীতি, জনপ্রশাসন, ধর্মীয়
এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে তিনি উল্লেখযোগ্য প্রভাব রাখতে পেরেছিলেন। তিনি সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত হয়েছেন, সতীদাহপ্রথা বিলুপ্ত করার প্রচেষ্টার জন্য।
জন্মস্থান:--মামার বাড়ি তে শ্রীরামপুর
(অধুনা পশ্চিমবঙ্গ)
বাড়ি- রাধানগর, হুগলী জেলা, অধুনা পশ্চিমবঙ্গ
মৃত্যুস্থান:স্টেপল্টন, ব্রিস্টল, ইংল্যান্ড
জীবনকাল:মে ২২, ১৭৭২ – অক্টোবর ৩০, ১৮৩৩
রামমোহন রায় কলকাতায় আগস্ট ২০, ১৮২৮সালে ইংল্যান্ড যাত্রার আগে
দ্বারকানাথ ঠাকুরের সহিত ব্রাহ্মসমাজ
স্থাপন করেন।
পরবর্তীকালে এই ব্রাহ্মসমাজ সামাজিক ও ধর্মীয় আন্দোলন এবং বাংলার পুনর্জাগরণের পুরোধা হিসাবে কাজ করে।
১৮৩১সালে মুঘল সাম্রাজ্যের দূত হয়ে
যুক্ত রাজ্য ভ্রমন করেন।
তিনি ফ্রান্স ও পরিদর্শন করেছিলেন।
১৮৩৩সালে মেনিনজাইটিসে আক্রান্ত
হয়ে ব্রিস্টলের কাছে স্টেপল্টনে মৃত্যুবরণ
করেন।ব্রিস্টলে আর্নস ভ্যাল সমাধিস্থলে তাঁকে কবর দেওয়া হয়।
১৯৯৭ সালে ব্রিস্টলে তাঁর একটি মূর্তি স্থাপন করা হয়।
---------( সংগ্রহ--)----------
||""--©--●অনাথ●---""||
||-anrc-22/05/2018--||
||=01:20:12am===24 L=||
=====================
No comments:
Post a Comment