26>||ভগিনী নিবেদিতা ||
Bushing Moved it's::--
Born::--28 October 1867 at Dungannon, United Kingdom.
Died::--13 October 1911 at Roy Villa, Siliguri.
Died at the Age of 44 years.
দিন টি ছিল ২৫সে মার্চ ১৮৯৮ -এই দিনে মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল স্বামী বিবেকানন্দের নিকট দীক্ষা ও ব্রহ্মচর্য গ্রহণ করিয়ে ছিলেন।
২৮ অক্টোবর ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দে উত্তর আয়ারল্যান্ডের ডানগ্যানন শহরে মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার বাবা স্যামুয়েল রিচমন্ড নোবেল ছিলেন ধর্মযাজক। মায়ের নাম ছিল মেরি ইসাবেলা। মাত্র দশ বছর বয়সে মার্গারেটের পিতৃ বিয়োগ হয়। তারপর তাঁর দাদামশাই তথা আয়ারল্যান্ডের বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী হ্যামিলটন মার্গারেটকে
লালনপালন করেন। মার্গারেট লন্ডনের চার্চ বোর্ডিং স্কুলে পড়াশোনা করেছিলেন। এরপর হ্যালিফ্যাক্স কলেজে তিনি এবং তাঁর বোন মেরি পড়াশোনা করেছিলেন।
১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে, সতেরো বছর বয়সে শিক্ষাজীবন শেষ করে মার্গারেট শিক্ষিকার পেশা গ্রহণ করেন। দুবছরের জন্যে কেসউইকের একটি প্রাইভেট স্কুলে পড়ান। এরপরে একে একে রেক্সহ্যামে (১৮৮৬), চেস্টারে (১৮৮৯) এবং লন্ডনের উইম্বলডনে (১৮৯০) তিনি শিক্ষকতা করেন। কিছুদিন পরে ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে উইম্বলডনে নিজে 'রাস্কিন স্কুল' উদ্বোধন করেন। তিনি এই স্কুলে নতুন শিক্ষাপদ্ধতি ব্যবহার করেন। পাশাপাশি নানা পত্রপত্রিকায় প্রবন্ধ লিখতে ও গির্জার হয়ে নানা সেবামূলক কাজও শুরু করেন। তিনি একজন ওয়েলশ যুবকের কাছে বিবাহের প্রতিশ্রুতি পান, কিন্তু তিনি অচিরে মারা যান।
স্বামী বিবেকানন্দের সঙ্গে সাক্ষাৎ ---
১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে লন্ডনে এক পারিবারিক আসরে মার্গারেট স্বামী বিবেকানন্দের বেদান্ত দর্শনের ব্যাখ্যা শোনেন। বিবেকানন্দের ধর্মব্যাখ্যা ও ব্যক্তিত্বে তিনি মুগ্ধ এবং অভিভূত হন। তাঁর প্রতিটি বক্তৃতা ও প্রশ্নোত্তরের ক্লাসে উপস্থিত থাকেন মার্গারেট। তারপর বিবেকানন্দকেই নিজের গুরু বলে বরণ করে নেন।
১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দের ২৮ জানুয়ারি স্বদেশ ও পরিবার-পরিজন ত্যাগ করে মার্গারেট চলে আসেন ভারতে।এই সময় বিবেকানন্দের কাছে ভারতের ইতিহাস, দর্শন, সাহিত্য, জনজীবন, সমাজতত্ত্ব, প্রাচীন ও আধুনিক মহাপুরুষদের জীবনকথা শুনে মার্গারেট ভারতকে চিনে নেন। ভারতে আসার কয়েক দিন পর শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের স্ত্রী 'মা' সারদা দেবীর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। এরপর ২৫ মার্চ স্বামী বিবেকানন্দ তাকে ব্রহ্মচর্য ব্রতে দীক্ষা দেন। তিনিই মার্গারেটের নতুন নাম রাখেন ‘নিবেদিতা’।
মেয়েদের লেখাপড়া শেখানোর জন্য নিবেদিতা উত্তর কলকাতার বাগবাজার অঞ্চলে ১৬ নম্বর বোসপাড়া লেনে নিজবাসভবনে কটি মেয়েদের স্কুল খোলেন (বর্তমানে নাম রামকৃষ্ণ সারদা মিশন ভগিনী নিবেদিতা বালিকা বিদ্যালয়)। ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের কলকাতায় মহামারী দেখা দিলে তিনি দিন রাত স্থানীয় যুবকদের সহায়তায় সকল রোগীদের সেবাশুশ্রূষার জন্য নিজেকে
ব্যয় করেন তাদের সেবা করেন ও পল্লী-পরিষ্কারের কাজে নিজেকে সমর্পণ করেন।
১৯০২ খ্রিস্টাব্দের ৪ জুলাই নিবেদিতার পরম গুরু স্বামী বিবেকানন্দের মৃত্যু হয়।
এরপর তিনি ব্রিটিশ-বিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে যোগ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। কিন্তু রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের নিয়মানুসারে ধর্ম ও রাজনীতির সংস্রব ঠেকাতে সংঘের কেউ রাজনীতিতে জড়াতে পারতনা। তাই মিশনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক পরিত্যাগ করতে হয় নিবেদিতাকে। যদিও সারদা দেবী ও রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীদের সঙ্গে তাঁর আমৃত্যু সুসম্পর্ক বজায় ছিল। তিনি ভারতবর্ষে প্লেগ দমনে উদ্যোগী হন।
১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের সময় গোপনে বিপ্লবীদের সাহায্য করতে শুরু করেন নিবেদিতা। এই সময় অরবিন্দ ঘোষ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জগদীশচন্দ্র বসু প্রমুখ বিশিষ্ট ভারতীয় ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে। এসবের পাশাপাশি নিবেদিতা মডার্ন রিভিউ, দ্য স্টেটসম্যান, অমৃতবাজার পত্রিকা, ডন, প্রবুদ্ধ ভারত, বালভারতী প্রভৃতি পত্রিকায় ধর্ম, সাহিত্য, রাজনীতি, সমাজতত্ত্ব, শিল্প ইত্যাদি বিষয়ে প্রবন্ধ লিখতেন। তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য বইগুলি হল 'কালী দ্য মাদার', 'ওয়েব অফ ইন্ডিয়ান লাইফ', 'ক্রেডল টেলস অফ হিন্দুইজম', 'দ্য মাস্টার অ্যাজ আই শ হিম' ইত্যাদি।
ভারতীয়দের প্রতি ভগ্নি নিবেদিতার
অবদান ভারতবর্ষ কোনদিন ভুলবেনা।
( সংকলিত)
<----আদ্যনাথ রায় চৌধুরী--->
==========================
ভগনী নিবেদিতা::--
Bhagini Nivedita
【আনন্দবাজার পত্রিকা,28/10/2024.】
ভারতই তাঁর সাধনার ধন
নিবেদিতার জন্ম হয়েছিল ব্রিটিশ-শাসিত আয়ারল্যান্ডে ১৮৬৭-র আজকের দিনে। ঠাকুরদা জন নোবল ছিলেন ধর্মযাজক, আবার ব্রিটিশের বিরুদ্ধে আয়ারল্যান্ডের বিপ্লবী আন্দোলনের নেতাও।
পূর্বজীবনে যিনি মার্গারেট নোবল, সেই নিবেদিতার জন্ম হয়েছিল ব্রিটিশ-শাসিত আয়ারল্যান্ডে ১৮৬৭-র আজকের দিনে। ঠাকুরদা জন নোবল ছিলেন ধর্মযাজক, আবার ব্রিটিশের বিরুদ্ধে আয়ারল্যান্ডের বিপ্লবী আন্দোলনের নেতাও। পিতা স্যামুয়েল ও মা মেরি জীবিকার সন্ধানে ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারে এলেন। স্যামুয়েলও ধর্মযাজক, কিন্তু তাঁকে ঘিরেও গড়ে উঠেছিল একটি বিপ্লবী গোষ্ঠী। ধর্ম ও বিপ্লব দুই-ই ছিল মার্গারেটের উত্তরাধিকার, তাই ভারতে আসার পরেও তাঁর সংগ্রামী চেতনা ব্রিটিশ-বিরাগ থেকে মুক্ত হয়নি। সতেরো বছর বয়সে রেক্সহ্যাম সেকেন্ডারি স্কুলে তাঁর শিক্ষকতা শুরু, একই সময়ে সমাজসেবার ইচ্ছায় যোগ দেন সেন্ট মার্ক’স চার্চে।
পত্রপত্রিকায় লেখালিখির সূত্রে প্রতিবাদী লেখিকা হিসাবে পরিচিতি হয় তাঁর। ফ্রবেল, পেস্টালোৎসি তখন নতুন শিক্ষাপদ্ধতি উদ্ভাবনে রত। মার্গারেটও উইম্বলডনে গড়ে তোলেন নিজস্ব স্কুল। লন্ডনে শুরু করেন ক্লাব, যেখানে ভাষণ দিতেন বার্নাড শ, হাক্সলির মতো বিদ্বজ্জন। ভারতে আসার আগেই তিনি পান বিদগ্ধ সমাজের স্বীকৃতি।
লন্ডনেই ১৮৯৫-এর সেপ্টেম্বরে প্রথম শোনেন স্বামী বিবেকানন্দের বক্তৃতা। মার্গারেটের মন এই যোগাযোগেরই প্রতীক্ষায় ছিল। স্বামীজি কয়েক মাস পরে আবার ইংল্যান্ডে এলেন, কথাপ্রসঙ্গে তাঁকে বললেন, “স্বদেশের নারীদের কল্যাণকল্পে আমার কতকগুলি পরিকল্পনা আছে। আমার মনে হয় সেগুলিকে কার্যকর করতে তুমি বিশেষ ভাবে আমাকে সাহায্য করতে পারো।” এ ছিল প্রত্যক্ষ আহ্বান। স্বামীজি তাঁকে অবহিত করেছিলেন ভারতীয় আবহাওয়া, হিন্দু সংস্কার ও মার্গারেটের স্বজাতীয়দের সম্ভাব্য অবজ্ঞা-উপেক্ষা সম্পর্কে। কিছুই বাধা হল না। ১৮৯৮-এর ২৮ জানুয়ারি মার্গারেট পৌঁছলেন কলকাতা। ফেব্রুয়ারিতে সাক্ষাৎ দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে; ১৭ মার্চ শ্রীমা সারদাদেবীর সঙ্গে। ২৫ মার্চ মহা গুরুত্বপূর্ণ দিন, গুরু বিবেকানন্দ তাঁকে দিলেন ব্রহ্মচর্য। প্রথমে করালেন শিবপূজা, পরে দীক্ষান্তে অঞ্জলি দেওয়ালেন বুদ্ধদেবকে। নাম রাখলেন ‘নিবেদিতা’। এক বিদেশিনি ভারতে এসে, তার ধর্ম ও সমাজকে গ্রহণ করলেন।
কলকাতায় তিনটি বক্তৃতার সূত্রে নিবেদিতা হয়ে ওঠেন আলোচনার কেন্দ্র। আলবার্ট হলে ও কালীঘাট মন্দিরে কালী নিয়ে, আর ১১ মার্চ স্টার থিয়েটারে পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহে বললেন ‘ইংল্যান্ডে ভারতীয় অধ্যাত্মচিন্তার প্রভাব’ নিয়ে। পরিচয় হল রবীন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ, সরলা দেবী, জগদীশচন্দ্র বসু প্রমুখের সঙ্গে। ১৮৯৯-এর ভয়াবহ প্লেগে কলকাতাবাসী অবাক বিস্ময়ে দেখল, ঝাঁটা হাতে এক বিদেশিনি বাগবাজারে রাস্তার আবর্জনা পরিষ্কার করছেন। নিবেদিতা প্লেগের সেবাকাজে যোগ দিলেন, সঙ্গে স্বয়ং বিবেকানন্দ। নিবেদিতার থেকে কলকাতাবাসী শিখল নাগরিক জীবনে স্বাবলম্বনের শিক্ষা। তাঁর আরও একটি রূপ প্রতিভাত হল; ডা. রাধাগোবিন্দ কর দেখলেন, প্লেগ-আক্রান্ত মুমূর্ষু এক শিশুকে কোলে নিয়ে বস্তিতে রাত জাগছেন তিনি। এ-ই তাঁর সেবাকাজের শুরু— প্রয়াণের কয়েক মাস আগে পূর্ববঙ্গে ম্যালেরিয়ার সেবাকাজ অবধি যা চলেছে।
কাজের জায়গা হিসেবে সাহেবপাড়া বেছে নেননি তিনি। তাঁর গড়া ইস্কুলের ঠিকানা বাগবাজারে ১৬ নং বোসপাড়া লেনের গলির মধ্যে একটি বাড়ি। রবীন্দ্রনাথ কাছ থেকে দেখে লিখেছেন, “তাঁহার এই কাজটিকে তিনি বাহিরে কোনোদিন ঘোষণা করেন নাই... তিনি যে ইহার ব্যয় বহন করিয়াছেন তাহা চাঁদার টাকা হইতে নহে, উদ্বৃত্ত অর্থ হইতে নহে, একেবারই উদরান্নের অংশ হইতে।”
পল্লিতে পল্লিতে ঘুরে, অবজ্ঞা পরিহাস উপেক্ষা করে নিবেদিতা তাঁর স্কুলের ছাত্রী জোগাড় করেছেন। কালক্রমে এই বিদ্যালয়ই হয়ে উঠল বাগবাজার অঞ্চলে বালিকা কিশোরী তরুণী সধবা-বিধবাদের শিক্ষালয়। ১৯০২-এর ৪ জুলাই বিবেকানন্দ প্রয়াত হলেন, গুরুপ্রয়াণের পর স্বামীজির সাধনধন ভারতবর্ষ তাঁরও সাধনধন হল। এক দিকে তিনি হলেন ভারতীয় শিল্প আন্দোলনের যাজ্ঞিক, অন্য দিকে দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে সমর্পিতা। ভারতীয় শিল্পের পুনরুজ্জীবনে তাঁর অবদান অপরিসীম। তিনি প্রাণিত করেছিলেন ই বি হ্যাভেল, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জগদীশচন্দ্র বসু, ওকাকুরাকে; নন্দলাল বসু, অসিত হালদারকে পাঠিয়েছিলেন অজন্তায়। সদস্য ছিলেন ১৯০৭-এ প্রতিষ্ঠিত ‘ইন্ডিয়ান সোসাইটি অব ওরিয়েন্টাল আর্ট’-এর।
সে সময় দেশে এমন কোনও বিপ্লবী ছিলেন না যিনি তাঁর দ্বারা প্রভাবিত হননি। অরবিন্দ ঘোষ, হেমচন্দ্র ঘোষ, বারীন্দ্র ঘোষ, বাঘা যতীন, সকলেই তাঁর দ্বারা প্রাণিত ছিলেন। রবীন্দ্রনাথেই ফিরতে হয়, “ভগিনী নিবেদিতা একান্ত ভালবাসিয়া সম্পূর্ণ শ্রদ্ধার সঙ্গে আপনাকে ভারতবর্ষে দান করিয়াছিলেন, তিনি নিজেকে বিন্দুমাত্র হাতে রাখেন নাই।” শিক্ষা, রাজনীতি, শিল্প, সমাজ প্রতিটি ক্ষেত্রেই তার ছাপ। দার্জিলিঙে তাঁর স্মৃতিস্তম্ভেও লেখা, “এখানে শান্তিতে শায়িত ভগিনী নিবেদিতা, যিনি ভারতবর্ষকে দান করেছিলেন তাঁর সর্বস্ব।”
°===============_
অসামান্যা নিবেদিতা
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সখ্যের সূত্রে নিবেদিতা তাঁর আমন্ত্রণে শিলাইদহ ভ্রমণে যান ১৯০৪ সালের শেষে।
ভগিনী নিবেদিতাকে নিয়ে হর্ষ দত্তের লেখায় (‘শঙ্খের মাঝে বজ্র’, পত্রিকা, ১-৬) উল্লিখিত দু’টি বিষয়ের সূত্রে দু’টি প্রাসঙ্গিক তথ্য সংযোজন। প্রথমটি শিল্প বিষয়ে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের আবহাওয়ায় উদ্বুদ্ধ হয়ে শিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর নতুন করে এঁকেছিলেন তাঁর বিখ্যাত ‘ভারতমাতা’ ছবিটি। নিবেদিতাই এর নামকরণ করেছিলেন। ওই সময়ে নিবেদিতাকে আদর্শ করে অবনীন্দ্রনাথ ছবিটি পরিকল্পনা করেছিলেন। কেননা, তিনি ভারতবর্ষের জন্য নিবেদিত প্রাণ। ত্যাগের আদর্শের অনন্য প্রতিমূর্তি। এই নিঃস্বার্থ আত্মনিবেদনের ভূমিকাই শিল্পীকে সেই জাতীয়তাবাদী আবহে উদ্বুদ্ধ করেছিল। তাঁর মনে হয়েছিল, সমগ্র ভারতবাসীকেও এই মূর্তি স্বদেশি ভাবধারায় অনুপ্রাণিত করবে। তাঁর নিজের কথায়, ‘‘নিবেদিতার মতো দুটি মেয়ে আর দেখিনি। অমন আর হয় না।... ভারতবর্ষকে নিবেদিতা যে কতখানি ভালবেসেছিলেন, তা আমি জানি। অন্তরের যোগ ছিল তাঁর ভারতবর্ষের সঙ্গে।’’
সেই ভাব নিবেদিতার করা ছবিটির আলোচনাতেও ‘‘চিত্রপটে পরিব্যক্ত মানসিক আদর্শটি খাঁটি ভারতের জিনিস, আকারপ্রকারও ভারতীয়।... ইহাই প্রথম উৎকৃষ্ট ভারতীয় চিত্র যাহাতে এক জন ভারতীয় শিল্পী যেন মাতৃভূমির অধিষ্ঠাত্রীকে... তাঁহার সন্তানগণের মানসনেত্রে তিনি যে-রূপে প্রতিভাত হন, সেইভাবে অঙ্কিত করিয়াছেন।’’ (প্রবাসী, ১৩১৩ ভাদ্র। উদ্ধৃতিসূত্র, মনোজিৎ বসু, অবনীন্দ্রনাথ)। নিবেদিতা এখানে শিল্পরসিক জাতীয়তাবাদী। ভারতশিল্পের জন্য নিবেদিত।
দ্বিতীয়টি সাহিত্য বিষয়ে। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সখ্যের সূত্রে নিবেদিতা তাঁর আমন্ত্রণে শিলাইদহ ভ্রমণে যান ১৯০৪ সালের শেষে। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে পড়ে শোনান পরিকল্পিত ‘গোরা’ উপন্যাসের একটি সংক্ষিপ্ত খসড়া। তার সারমর্ম, প্রধান চরিত্র গোরা এক জন আইরিশ বংশোদ্ভূত যুবক। তাই বাঙালি সুচরিতার সঙ্গে তার মিলন ঘটে না, সে প্রত্যাখ্যাত হয়। আপনজনের স্বীকৃতি পায় না।
তিনি তো জন্মসূত্রে আইরিশ, ফলে ক্ষুব্ধ হন নিবেদিতা। সরাসরি রবীন্দ্রনাথকে জানিয়ে দেন খসড়ার এই বক্তব্যে তাঁর তীব্র আপত্তির কথা। তাঁর মনে হয়েছিল, এক মহৎ সাহিত্যসৃষ্টিতে ভারতবর্ষের আদর্শ জাতিভেদ হতে পারে না। তাঁর স্বপ্নের ভারতবর্ষও তা ছিল না। পরবর্তী কালে, রবীন্দ্রনাথ এই বিরোধিতার কথা মনে রেখে গোরা উপন্যাসে বেশ কয়েকটি পরিবর্তন করেন এবং পরিণতিতে গোরা ও সুচরিতার মিলনে এক উদার মানবিকতায় সমৃদ্ধ ভারতবর্ষের নবজাগরণ হয়। সি এফ অ্যান্ড্রুজ়কে লেখা চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ বিষয়টি জানিয়েছিলেন। (দ্র. রবিজীবনী, প্রশান্তকুমার পাল, ৫ম খণ্ড)। নিবেদিতা এখানে সাহিত্যরসিক জাতীয়তাবাদী। আজকের ভারতের পটভূমিতে নিবেদিতার ভূমিকার গুরুত্ব অনস্বীকার্য।
,======================
নিজের দেশেই এ বার মূর্তি বসছে ভগিনী নিবেদিতার
‘অপরাজিতা’ এখন থেকে স্থায়ী ভাবে থাকবেন। বেলফাস্ট থেকে মাত্র এক ঘণ্টার দূরত্বে এই ছোট্ট শহরটির নাম ডুঙ্গানন। বহু পুরনো আলস্টার অঞ্চলে নদী-জঙ্গলে ঘেরা ছবির মতো এই শহরটিতে এলে মনে হয়, সময় বুঝি থমকে দাঁড়িয়ে এখানে।
উত্তর আয়ার্ল্যান্ডের কাউন্টি টাইরোনের এই প্রত্যন্ত গ্রামেই জন্ম হয়েছিল সিস্টার নিবেদিতার। কিন্তু, আইরিশ মানুষজনের কাছে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। এত দিন পর ডুঙ্গানন ট্যুরিস্ট সেন্টারে তাঁর স্থায়ী বসবাস শুরু হবে এ বার। ১৫০তম জন্মবার্ষিকীর প্রাক্কালে ভগিনী নিবেদিতার প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ সকল ভারতীয়ের। মূর্তির নাম ‘অপরাজিতা’। আগামী ১৫ অগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবসের সকালে এই মূর্তির আবরণ উন্মোচন হবে।
আইরিশ পরিবারে মার্গারেটকে মার্গো বা মার্গট বলে ডাকা হয়। বিবেকানন্দের ভাবনায় নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া আইরিশ কন্যা মার্গারেট নোবল। যে বাড়িতে নিবেদিতার জন্ম সেটি এখন একটি পাউন্ড শপ। কিন্তু, সেই পুরনো বাড়ির দেওয়াল আজও রয়েছে। হাত ছোঁয়ালে এখনও জাদুমন্ত্রে সমুদ্রের গর্জন শুনতে পাওয়া যায়। জাহাজে চড়ে নিবেদিতা প্রথম বারের জন্য ইন্ডিয়া যাচ্ছেন— ডেকের উপর দাঁড়িয়ে মার্গো হাত নাড়ছেন, মাথার স্কার্ফ দিয়ে সযত্নে ঢেকে রেখেছেন চোখের জল— ফেলে যাচ্ছেন ভাই রিচমন্ড, বোন মে আর মা ইসাবেলাকে। তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল পরাধীন ভারত। স্বামীজির ব্রত সম্পূর্ণ করতে এমনই এক তেজস্বিনী দুর্গার প্রয়োজন ছিল।
এই ঘটনা নিয়ে নাটক লিখেছেন ডুঙ্গাননের আর এক ভূমিকন্যা, জিন ম্যাকগিনেস, এত দিন পরে আবার। ডুঙ্গাননের রেনফ্রিউ হলে অভিনীত হয় ‘অ্যাওয়েকেনিং অব এ নেশন’। কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা জিন ম্যাকগিনেস আইরিশ ভাষায় লিখেছেন এই নাটকটি। কলোনিয়াল বাঙালি তথা ভারতীয়ের মনে কেমন করে স্বাধীনতার তিন রং এঁকে দিয়েছিলেন নিবেদিতা, তা নিয়েই এই নাটক। চারুকলা শিল্প, সাহিত্য, আধ্যাত্মিকতা এবং জাতীয়তাবাদ নিবেদিতার জীবনের এই চারটি দিকের কথা সম্পূর্ণ অজানা ছিল ডুঙ্গাননের তথা আয়ার্ল্যান্ডের মানুষদের। ২০১০ সালে জিনের নাটকের গ্রুপ ‘নোবেল থেস্পিয়ান্স’ এই নাটকের অভিনয় করে নানা জায়গায়। ডাবলিনের স্যামুয়েল বেকেট থিয়েটার উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে। স্যামুয়েল বেকেটও ডুঙ্গানন শহরেরই মানুষ। তাই সাধারণ মানুষের উৎসাহ সীমাহীন। এ ভাবে আয়ার্ল্যান্ডে জিন নিঃশব্দে আনলেন নিবেদিতা বিপ্লব।
কিন্তু, এত কিছু ঘটল কেমন করে?
আইরিশ অল্ডারম্যান মরিস হেয়েজ গিয়েছিলেন আমেরিকায়। সেখানে দেখা হয় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে। তখন লেখা হচ্ছিল ‘সেই সময়’ উপন্যাসটি। মরিস যে আইরিশ, সে কথা শুনে লেখক তাঁকে নিবেদিতার কথা বলেন। জানান আয়ার্ল্যান্ডের এই ক্ষুদ্র জনপদটির কথাও। মরিস ফিরে এসে খুঁজতে থাকেন। এমনকী বাড়ি বাড়ি ঘুরেও জিজ্ঞাসা করেন কারওর মনে আছে কি না? অবশেষে কাউন্সিলের রেকর্ড খুঁজে কিছুটা হদিশ পান। বাকিটা ইতিহাস।
আলস্টার হিস্ট্রি সার্কেলের উদ্যোগে নিবেদিতার জন্মস্থানটি চিহ্নিত করা হয়েছিল ২০০৭ সালে। প্রায় দেড়শো বছর পরে আয়ার্ল্যান্ডের এই গ্রামের শরীরেও এসেছে অবধারিত পরিবর্তন। তাই এত সহজ ছিল না, সেই কাজ। অবশেষে খোঁজ মিলল সেই জায়গার। ১৬ নম্বর স্কচ স্ট্রিটে এখন একটি পাউন্ডশপ। এখানেই জন্ম নিয়েছিল এক বিরল ইতিহাস! এই কিংবদন্তি নারীর কথা এত দিন বিস্মরণের অতলেই তলিয়ে গিয়েছিল। এই ব্লু প্ল্যাকের সঙ্গে সঙ্গে মার্গারেট নোবল স্থায়ী ভাবে থিতু হলেন আইরিশ মানুষজনের মনে।
ক্যারেন করিগান, যিনি নাটকে নিবেদিতার ভূমিকায় অভিনয় করেন, বললেন, ‘‘এ এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। এমন এক জন অসাধারণ প্রতিভাময়ী নারীর কথা সারা পৃথিবীর মানুষ জানবে এটাই স্বপ্ন। তিনি শুধু আইরিশই নয় আমারই গ্রামের মেয়ে! ভাবা যায়?’’ অরবিন্দ ঘোষের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন পল ডনাঘি। অভিনয়ের সঙ্গে সঙ্গে পড়তে শুরু করেছেন নিবেদিতা এবং অরবিন্দ ঘোষের লেখা বইপত্রও। ভারত এবং আয়ার্ল্যান্ডের স্বাধীনতা সংগ্রামের মিল আজও তাঁকে আপ্লুত করে।
সর্বস্ব ত্যাগ করার পরেও নিবেদিতাকে তাঁর প্রাপ্য স্বীকৃতিটুকু বহু দিনই কেউ দেননি। বাঙালি সমাজ, ভারতের মানুষ, ব্রিটিশ রাজতন্ত্র বা পশ্চিম দুনিয়া— সকলে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। কিন্তু স্বাভিমানী জাতীয়তাবাদী ডুঙ্গাননের মানুষ নিবেদিতার পতাকা হাতে দেরিতে হলেও পথে নেমেছে। এ ভাবে আজকের দিনে আইরিশ জাতীয়তাবাদ ও ভারতীয় চিন্তায় ভাবতে শুরু করল— শুধু ডুঙ্গানন শহরের সেই মেয়েটির নামেই— মার্গারেট নোবল যাঁর নাম!
=======================
No comments:
Post a Comment