24> || শিবরাম চক্রবর্তী ||
(ডিসেম্বর ১৩, ১৯০৩-আগস্ট ২৮, ১৯৮০)
প্রখ্যাত বাঙালি রম্যলেখক। কবিতা-রচনা দিয়ে সাহিত্য-জীবনের শুরু।
জীবনে বিয়ে করেন নি।
বিচিত্র জীবন ছিল তার। রাজনীতি করেছেন, জেল খেটেছেন, রাস্তায় কাগজ ফেরি করেছেন, ফুটপাথে রাত্রিবাস করেছেন, সাংবাদিকতা করেছেন, আজীবন মেস-জীবন যাপন করেছেন ।
------------------------------
আমি দেখেছিলাম কিছু সময়ের জন্য সেই মহান জীবনকে।
মনেপরে তখন কলেজে ফাস্ট ইয়ারে পড়ি।
কলেজের পড়ে আমি টেক্সি চালাতাম কলকাতার রাস্থায়।
আমাদের বাংলা প্রফেসর পি কে এবংইংরেজি প্রফেসর রুদ্রপ্রশাদ সর জানতেন যে আমি বিকেলে টেক্সি চালাই।
সেদিন টেক্সি নিয়েই কলেজে গিয়েছিলাম।
পি কে সর বললেন কলেজের পরে 4:30 টার সময় উনি যাবেন কলেজ স্ট্রিটে।
আমি ওনার জন্য একঘন্টা কলেজে অপেক্ষা করে বসে ছিলাম।
আমার লাস্ট প্রাকটিক্যাল ক্লাস 3টের সময় শেষ হয়ে গিয়ে ছিল।
তবুও আমি অপেক্ষা করলাম ওনার জন্য।
এমনটা আমার রোজেই করতে হতো।
কারন রোজই কলেজ থেকে কেউ না কেউ আগেই বলে রাখতো।
সে যাইহোক সেদিন পি কে সরকে নিয়ে পৌঁছে ছিলাম মুক্তারামবাবু স্ট্রিটে এক মেসে।
স্যার বললেন ওনার সাথে যেতে , তাই আমিও ওনার সাথে গিয়ে একটি বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম গেটটি তালা বন্ধ।
প্রফেসর ওই তালা দেখেও বার বার কলাপসিবিল গেট ধরে নাড়া দিচ্ছিলেন, এবং স্যার স্যার বলে ডাকছিলেন।
আমি বললাম স্যার , গেটে তো তালা লাগানো , আপনি কাকে ডাকছেন, উনি বোধ হয় বাড়িতে নাই।
পি কে স্যার ইশারায় আমাকে চুপ থাকতে বলে গেট ধরে নাড়িয়েই যাচ্ছেন।
প্রায় আধা ঘন্টা পরে দেখলাম এক জন বেশ বয়স্ক মানুষ এগিয়ে এসে পি কে স্যার কে এক ধমক দিয়ে বললেন " "কাকে চাই, এখানে কেউ থাকে না"
পিকে স্যার অনেক অনুনয় বিনয় করে বললেন " স্যার আমি আপনাকেই চাই ,
আমার প্রুফ টা দেখেছেন কি?"
ওই বয়স্ক লোকটি আরও রেগে গিয়ে বললেন " আমি কেউ নই, এখানে কেউ থাকে না।"
প্রুফ ট্রুফ দেখাতে হয় থানায় গিয়ে দেখান, এখানে কি চান?"
এমনি বেশ কিছু ক্ষণ কথা কাটাকাটি হবার পরে পি কে স্যার নিজের নাম বললেন।
বললেন" আমি পরিমল"
ব্যাস জেই না বলা অমনি
সব কিছু পাল্টে গেল।
একটানা দিয়ে তালাটা খুলে নিলেন। আর গেটটা ফাক করে ভীষণ আদরে ঘরের ভেতরে ডেকে নিলেন।
আমি অবাক হয়ে দেখলাম গেটে তালা লাগানো অথচ কোন চাবি ছাড়াই তালা খুলেগেল।
প্রফেসর স্যার কত টানাটানি করেও সেই তালা খুলতে পারেনি।
অথচ উনি কিভাবে তালাটা ছুঁয়েই খুলে নিলেন।
আর ঘরের ভিতরে গিয়ে দেখি
ওটা কোন মানুষ থাকার মতন রুম নয় , চারিদিকে শুধু বই আর বই বইয়ের পাহাড়ের মাঝে ই আমি দাঁড়িয়ে রইলাম।
প্রফেসর স্যার ওনার সাথে কথায় ব্যস্ত।
আমি দেখছিলাম সমস্ত রুমের দেওয়ালে কত কি লেখা।
আমি ঐ লেখার একটুও পড়তে পারলাম না।
এমনি করে প্রায় 40 মিনিট পরে আমরা বেরিয়ে আসলাম।
ওখান থেকে আমরা কফি হাউজে গিয়ে ঢুকলাম।
সেখানে গিয়ে আমি জানলাম যে আজ যার বাড়িতে গিয়েছিলাম উনি আর কেউ নয় উনি হলেন সকলের আদরের স্যার শিবরাম চক্রবর্তী।
======================
#ফার্স্টক্লাস_আছি, শিবরাম চক্রবর্তী।
'‘প্রথমে ভেবেছিলাম যে মন্দির বানাবো। শিব মন্দির। তারপর ভেবে দেখলাম সেটা ঠিক হবে না। সেখানে কেবল হিন্দুরাই আসবে। মুসলমান, ক্রিশ্চান এরা কেউ ছায়া মাড়াবে না তার। মসজিদ গড়লেও সেই কথা। মুসলমান ছাড়া আর কেউ ঘেঁষবে না তার দরজায়। গির্জা হলেও তাই। যাই করতে যাই, সর্বধর্ম সমন্বয় আর হয় না। তাছাড়া, পাশাপাশি মন্দির, মসজিদ, গির্জা গড়লে একদিন হয়তো মারামারি লাঠালাঠিও বেঁধে যেতে পারে। তাই অনেক ভেবে চিন্তে এই পায়খানা বানিয়েছি। সবাই আসছে এখানে। আসবে চিরদিন।"
আজ এই ধর্মের হানাহানিকর পরিবেশে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারি তাঁর কথা কতটা প্রাসঙ্গিক ছিল! শিবরাম চক্রবর্তী যিনি হাসির ছলে নিগূঢ় সত্যকে লিখে গেছেন তাঁর অম্লান কলমে।
বাংলা সাহিত্যের হাসির রাজার নিজের জীবনটাই ছিল একটা মস্ত ঠাট্টা।
রাজপরিবারের উত্তরাধিকারী হয়েও আজীবন মুক্তরামবাবু স্ট্রিটের একটা মেস বাড়িতে কাটিয়ে দিয়েছিলেন। যেটাকে অনেকেই 'শিবরাম মেস' বলে চেনেন। চিরটাকাল অভাবের মধ্যে থেকেও যাঁর প্রতিটা লেখার মধ্যে বাঙালি সরসতা খুঁজে পেয়েছেন, তিনি হলেন হাসির রাজা শিবরাম চক্রবর্তী। যিনি মৃত্যুর পাঁচ মিনিট আগেও ডাক্তারবাবুকে 'ফার্স্টক্লাস আছি' বলে মৃত্যুকে হেয় করতে পারতেন।
একবার তিনি পুকুর থেকে জল তুলছিলেন, এক ভদ্রমহিলা জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনি এত বড় বংশের সন্তান। আপনার বাপ, ঠাকুর্দা এত বড় বংশের আর আপনি কিনা গামছা পরে জল তুলছেন?
আমাদের হাসির সম্রাট বেশ গম্ভীর মুখে বলেছিলেন, বাপ, ঠাকুরদা, বংশ, সব তুললেন, তাতেও হলো না? শেষ পর্যন্ত গামছা তুলে কথা বললেন?
এমন মজা বোধহয় ওই একটি মানুষই করতে পারতেন।
শোনা যায় একবার আমাদের চক্রবর্তী মহাশয় কদিনের জন্য দেশের বাড়ি গিয়েছিলেন। উনি ফিরে আসতে মেস মালিক বলেছিলেন, শিবরামবাবু আপনার ঘরটা চুনকাম করে দিলাম।
দেওয়ালগুলো যা নোংরা করে রেখেছিলেন। চারিদিক শুধু পেন্সিলের লেখা।
উনি মাথায় হাত দিয়ে রাস্তায় বসে পড়েছিলেন।
হায় হায় একি করলেন!
মেস মালিক দ্বন্দ্বে পড়ে বলেছিলেন, খারাপটা কী করলাম মশাই?
শিবরামবাবু বলেন আরে দেওয়ালের ওই নম্বর, ঠিকানা, টাকার হিসেব- ওগুলো হলো কোন কোন প্রকাশকের কাছে আমার কত টাকা পাওনা আছে তার হিসেব, আর তাদের ঠিকানা। আপনি সব চুন ঢেলে দিলেন!
আজ 28 আগস্ট সেই কিংবদন্তি মানুষটির প্রয়াণ দিবস। সশ্রদ্ধ প্রণাম রইলো তাঁর উদ্দেশ্যে। যান্ত্রিক জীবন থেকে হাসি, মজা যখন চিরবিদায় নিতে চায়, তখন আপনার লেখনীই আমাদের সঙ্গী হয়। নির্মল হাসির জোগানদার আপনি, যাঁর বিকল্প আজও পেলো না বাংলা সাহিত্য.
আর কোনদিন পাবেও বলে মনে হয় না।
========================
No comments:
Post a Comment