19>কালী প্রসন্ন সিংহ ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
(আনন্দবাজার পত্রিকা dt 13 September2016
মঙ্গলবার ২৮ ভাদ্র ১৪২৩)
বিনোদ ঘোষাল লিখেছেন,-----
বিনোদ ঘোষাল (‘কালীপ্রসন্নর কথা অমৃতসমান’, পত্রিকা, ২০-৮) লিখেছেন,
সংস্কৃত মহাভারতকে বাংলায় অনুবাদের কাজ শুরু করে আঠারো বছর
বয়সি কালীপ্রসন্ন সিংহ গুরুদেব ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কাছে গিয়ে বললেন,
‘আমার পক্ষে আর অনুবাদ সম্ভব হচ্ছে না। আপনি দায়িত্ব নিন’।
প্রকৃত ঘটনা একটু অন্য রকম। ১৮৩৯ সালে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের
নেতৃত্বে ব্রাহ্মসমাজের একটি সমিতি গঠিত হয়, যার নাম ‘তত্ত্ববোধিনী সভা’।
১৮৪৩-এর অগস্ট মাসে এই সভার নিজস্ব মাসিক পত্রিকা ‘তত্ত্ববোধিনী’
প্রথম প্রকাশিত হয়। শুরু থেকেই এই পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলীতে ছিলেন
বিদ্যাসাগর। ১৮৪৮-এর ফেব্রুয়ারি সংখ্যা থেকে বিদ্যাসাগরের নিজের করা
মহাভারতের অনুবাদ ধারাবাহিক ভাবে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় বেরোতে থাকে।
কিছু দিন পর মহাভারতের এই অনুবাদ প্যামফ্লেট আকারেও প্রকাশিত হয়।
১৮৫৮ সালে বিদ্যাসাগর যখন কালীপ্রসন্নের মহাভারত অনুবাদের কথা জানতে
পারেন তখন তিনি নিজের অনুবাদের কাজ থেকে বিরত হন। পরে কালীপ্রসন্ন
তাঁকে কৃতজ্ঞতা জানান এই বলে যে, বিদ্যাসাগর মহাভারতের অনুবাদের কাজ
বন্ধ না-করলে তাঁর পক্ষে মহাভারতের অনুবাদের কাজ চালানো সম্ভব হত না।
লেখক অনুবাদের কাজে সাহায্যের জন্য সাত জন সংস্কৃত পণ্ডিত নিয়োগের
কথা বলেছেন। এই সাত জন সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত ছাড়াও আরও অনেকের
প্রতি কালীপ্রসন্ন কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন মহাভারতের ভূমিকায়।
তিনি লিখেছিলেন, ‘ইহার অনুবাদ সময়ে অনেক কৃতবিদ্য মহোদয়গণের
ভূয়িষ্ঠ সাহায্য গ্রহণ করিতে হইয়াছে।’ মহাভারত অনুবাদের সাহায্যের জন্য
কালীপ্রসন্ন যাঁদের কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানান, তাঁরা হলেন ঈশ্বরচন্দ্র
বিদ্যাসাগর, পুরাণ-বিশেষজ্ঞ গঙ্গাধর তর্কবাগীশ, রাজা কমলকৃষ্ণ বাহাদুর,
যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর, রাজেন্দ্রলাল মিত্র, ‘সোমপ্রকাশ’ পত্রিকার সম্পাদক
দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ, প্রেসিডেন্সি কলেজের বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক
রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকার প্রাক্তন সম্পাদক নবীনকৃষ্ণ
বন্দ্যোপাধ্যায়, দীনবন্ধু মিত্র, ‘ভাস্কর’ পত্রিকার সম্পাদক ক্ষেত্রমোহন
বিদ্যারত্ন এবং প্রুফরিডাররা।
অনুবাদক গোষ্ঠীর কয়েক জনের মৃত্যুর পর শেষ পর্যন্ত অর্থাৎ ১৮৬৬ সাল
পর্যন্ত অনুবাদের কাজ চালিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন অভয়চরণ তর্কালঙ্কার,
কৃষ্ণধন বিদ্যারত্ন, রামসেবক বিদ্যালংকার এবং হেমচন্দ্র বিদ্যারত্ন।
কালীপ্রসন্ন মহাভারতের পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করেছিলেন এশিয়াটিক
সোসাইটি ও শোভাবাজার রাজবা়ড়ি থেকে এবং আশুতোষ দেব,
যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর ও নিজের প্রপিতামহ শান্তিরাম সিংহের কাশীতে
অবস্থিত বাড়ির ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে। কালীপ্রসন্ন কলকাতায় না-থাকলে
বিদ্যাসাগর মহাশয় প্রেসের কাজ এবং অনুবাদের তদারকি নিজে করতেন।
ব্যাসকূট শ্লোক ও জটিল শ্লোকগুলির অনুবাদে সবচেয়ে বেশি সাহায্য
করেছিলেন কলকাতা সংস্কৃত বিদ্যামন্দিরের শিক্ষক তারানাথ তর্কবাচস্পতি।
পীযূষ রায়। বেহালা
প্রতিবেদকের উত্তর: পীযূষবাবুকে তথ্যসমৃদ্ধ চিঠির জন্য ধন্যবাদ। প্রসঙ্গত,
যত দূর আমি জানতে পেরেছি বাংলায় কালীপ্রসন্ন সিংহের জীবন নিয়ে বিশদে
এখনও প্রায় কোনও কাজই হয়নি। তাই উক্ত নিবন্ধটি লেখার সময় আমাকে
প্রধানত যে বইটির সাহায্য নিতে হয়েছিল তা হল ১৩২২ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত
মন্মথনাথ ঘোষ বিরচিত মহাত্মা কালীপ্রসন্ন সিংহ। প্রকাশক ছিলেন প্রিয়নাথ দাস।
ওই বইয়ের ষষ্ঠ পরিচ্ছেদের ৭৩ পৃষ্ঠায় যা লেখা আছে তার প্রয়োজনীয় অংশ
হুবহু উল্লেখ করছি, ‘বিদ্যাসাগর মহাশয় সময়াভাববশতঃ স্বয়ং এই অনুবাদ
কার্য্য গ্রহণ করিতে অস্বীকৃত হইলেন। কিন্তু পরমস্নেহভাজন কালীপ্রসন্নের
অনুরোধ উপেক্ষা করিতে না পারিয়া উপযুক্ত পণ্ডিতমণ্ডলী দ্বারা মহাভারত
অনুবাদের ব্যবস্থা করিয়া দেন’। এবং ওই পৃষ্ঠারই শেষ অংশে লেখা রয়েছে,
মহাভারতের উপসংহারে কালীপ্রসন্ন লিখিয়াছেন ‘১৮৭০ শকে সৎকীর্ত্তি ও
জন্মভূমির হিতানুষ্ঠান লক্ষ্য করিয়া ৭ জন কৃতবিদ্য সদস্যের সহিত আমি
মূল সংস্কৃত মহাভারত বাঙ্গালা ভাষায় অনুবাদ করিতে প্রবৃত্ত হই’।
(আনন্দবাজার পত্রিকা dt 13 September2016
মঙ্গলবার ২৮ ভাদ্র ১৪২৩)
বিনোদ ঘোষাল লিখেছেন,-----
বিনোদ ঘোষাল (‘কালীপ্রসন্নর কথা অমৃতসমান’, পত্রিকা, ২০-৮) লিখেছেন,
সংস্কৃত মহাভারতকে বাংলায় অনুবাদের কাজ শুরু করে আঠারো বছর
বয়সি কালীপ্রসন্ন সিংহ গুরুদেব ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কাছে গিয়ে বললেন,
‘আমার পক্ষে আর অনুবাদ সম্ভব হচ্ছে না। আপনি দায়িত্ব নিন’।
প্রকৃত ঘটনা একটু অন্য রকম। ১৮৩৯ সালে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের
নেতৃত্বে ব্রাহ্মসমাজের একটি সমিতি গঠিত হয়, যার নাম ‘তত্ত্ববোধিনী সভা’।
১৮৪৩-এর অগস্ট মাসে এই সভার নিজস্ব মাসিক পত্রিকা ‘তত্ত্ববোধিনী’
প্রথম প্রকাশিত হয়। শুরু থেকেই এই পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলীতে ছিলেন
বিদ্যাসাগর। ১৮৪৮-এর ফেব্রুয়ারি সংখ্যা থেকে বিদ্যাসাগরের নিজের করা
মহাভারতের অনুবাদ ধারাবাহিক ভাবে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় বেরোতে থাকে।
কিছু দিন পর মহাভারতের এই অনুবাদ প্যামফ্লেট আকারেও প্রকাশিত হয়।
১৮৫৮ সালে বিদ্যাসাগর যখন কালীপ্রসন্নের মহাভারত অনুবাদের কথা জানতে
পারেন তখন তিনি নিজের অনুবাদের কাজ থেকে বিরত হন। পরে কালীপ্রসন্ন
তাঁকে কৃতজ্ঞতা জানান এই বলে যে, বিদ্যাসাগর মহাভারতের অনুবাদের কাজ
বন্ধ না-করলে তাঁর পক্ষে মহাভারতের অনুবাদের কাজ চালানো সম্ভব হত না।
লেখক অনুবাদের কাজে সাহায্যের জন্য সাত জন সংস্কৃত পণ্ডিত নিয়োগের
কথা বলেছেন। এই সাত জন সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত ছাড়াও আরও অনেকের
প্রতি কালীপ্রসন্ন কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন মহাভারতের ভূমিকায়।
তিনি লিখেছিলেন, ‘ইহার অনুবাদ সময়ে অনেক কৃতবিদ্য মহোদয়গণের
ভূয়িষ্ঠ সাহায্য গ্রহণ করিতে হইয়াছে।’ মহাভারত অনুবাদের সাহায্যের জন্য
কালীপ্রসন্ন যাঁদের কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানান, তাঁরা হলেন ঈশ্বরচন্দ্র
বিদ্যাসাগর, পুরাণ-বিশেষজ্ঞ গঙ্গাধর তর্কবাগীশ, রাজা কমলকৃষ্ণ বাহাদুর,
যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর, রাজেন্দ্রলাল মিত্র, ‘সোমপ্রকাশ’ পত্রিকার সম্পাদক
দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ, প্রেসিডেন্সি কলেজের বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক
রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকার প্রাক্তন সম্পাদক নবীনকৃষ্ণ
বন্দ্যোপাধ্যায়, দীনবন্ধু মিত্র, ‘ভাস্কর’ পত্রিকার সম্পাদক ক্ষেত্রমোহন
বিদ্যারত্ন এবং প্রুফরিডাররা।
অনুবাদক গোষ্ঠীর কয়েক জনের মৃত্যুর পর শেষ পর্যন্ত অর্থাৎ ১৮৬৬ সাল
পর্যন্ত অনুবাদের কাজ চালিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন অভয়চরণ তর্কালঙ্কার,
কৃষ্ণধন বিদ্যারত্ন, রামসেবক বিদ্যালংকার এবং হেমচন্দ্র বিদ্যারত্ন।
কালীপ্রসন্ন মহাভারতের পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করেছিলেন এশিয়াটিক
সোসাইটি ও শোভাবাজার রাজবা়ড়ি থেকে এবং আশুতোষ দেব,
যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর ও নিজের প্রপিতামহ শান্তিরাম সিংহের কাশীতে
অবস্থিত বাড়ির ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে। কালীপ্রসন্ন কলকাতায় না-থাকলে
বিদ্যাসাগর মহাশয় প্রেসের কাজ এবং অনুবাদের তদারকি নিজে করতেন।
ব্যাসকূট শ্লোক ও জটিল শ্লোকগুলির অনুবাদে সবচেয়ে বেশি সাহায্য
করেছিলেন কলকাতা সংস্কৃত বিদ্যামন্দিরের শিক্ষক তারানাথ তর্কবাচস্পতি।
পীযূষ রায়। বেহালা
প্রতিবেদকের উত্তর: পীযূষবাবুকে তথ্যসমৃদ্ধ চিঠির জন্য ধন্যবাদ। প্রসঙ্গত,
যত দূর আমি জানতে পেরেছি বাংলায় কালীপ্রসন্ন সিংহের জীবন নিয়ে বিশদে
এখনও প্রায় কোনও কাজই হয়নি। তাই উক্ত নিবন্ধটি লেখার সময় আমাকে
প্রধানত যে বইটির সাহায্য নিতে হয়েছিল তা হল ১৩২২ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত
মন্মথনাথ ঘোষ বিরচিত মহাত্মা কালীপ্রসন্ন সিংহ। প্রকাশক ছিলেন প্রিয়নাথ দাস।
ওই বইয়ের ষষ্ঠ পরিচ্ছেদের ৭৩ পৃষ্ঠায় যা লেখা আছে তার প্রয়োজনীয় অংশ
হুবহু উল্লেখ করছি, ‘বিদ্যাসাগর মহাশয় সময়াভাববশতঃ স্বয়ং এই অনুবাদ
কার্য্য গ্রহণ করিতে অস্বীকৃত হইলেন। কিন্তু পরমস্নেহভাজন কালীপ্রসন্নের
অনুরোধ উপেক্ষা করিতে না পারিয়া উপযুক্ত পণ্ডিতমণ্ডলী দ্বারা মহাভারত
অনুবাদের ব্যবস্থা করিয়া দেন’। এবং ওই পৃষ্ঠারই শেষ অংশে লেখা রয়েছে,
মহাভারতের উপসংহারে কালীপ্রসন্ন লিখিয়াছেন ‘১৮৭০ শকে সৎকীর্ত্তি ও
জন্মভূমির হিতানুষ্ঠান লক্ষ্য করিয়া ৭ জন কৃতবিদ্য সদস্যের সহিত আমি
মূল সংস্কৃত মহাভারত বাঙ্গালা ভাষায় অনুবাদ করিতে প্রবৃত্ত হই’।
===============================
No comments:
Post a Comment