15>পুত্রহীন #নজরুল vs রবীন্দ্রনাথপুত্রহীন
সুমিত_চট্টোপাধ্যায়
■■কে , নজরুল ? বোসো । কখন এলে ?
এই ত । স্তিমিত কন্ঠে বললেন নজরুল ।
তা গলাটা এরকম শোনাচ্ছে কেন ! রবীন্দ্রনাথ ঈষৎ বিস্মিত । নজরুল খুবই হুল্লোডবাজ রগুডে মানুষ । আজ তো গলা শোনাই যাচ্ছে না ! কি ব্যাপার , কারোর শরীর টরীর খারাপ নাকি !
আমার ছেলেটা কাল চলে গেল , গুরুদেব । ফুঁপিয়ে উঠলেন কাজী নজরুল ।
সে কী ! চমকে উঠলেন রবীন্দ্রনাথ । ঊনসত্তর বছর বয়স তার । এখন কি শুধু খারাপ খবর পাওয়ার জন্যেই বেঁচে থাকা । রবীন্দ্রনাথ মাঝে মাঝেই একথা ভাবেন । চিকিৎসাশাস্ত্র একেবারেই অনুন্নত । বাঙালি পুরুষের গড় আয়ু মেরেকেটে চল্লিশ । নিজের অদ্ভুত ভালো স্বাস্হ্যের জন্য নিজেরই বিড়ম্বনা লাগে ।
খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে জিজ্ঞাসা করলেন - কি হয়েছিল ?
বসন্ত । স্মল পক্স ।
কত বয়স হয়েছিল । তিন , না?
চার পূর্ণ হয়ে পাঁচ ।
আবার দীর্ঘক্ষণের নীরবতা । বাঙালির দুই প্রাণের কবি । শব্দের দুই জাদুকর । আজ দুজনেই নীরব ।
একটু পরে রবীন্দ্রনাথই আবার নীরবতা ভাঙলেন - তোমার ছেলেটি বড় ট্যালেন্টড ছিল শুনেছিলাম । কি যেন নাম রেখেছিলে ?
ভালো নাম অরিন্দম খালিদ । সবাই ডাকতাম বুলবুল বলে ।
হ্যাঁ , বুলবুল বুলবুল । নিজের মনেই দুবার নামটা আওডালেন রবীন্দ্রনাথ । শুনেছিলাম তার নাকি অদ্ভুত স্মৃতিশক্তি ।
আপনি কি করে জানলেন ? অবাক চোখে তাকালেন নজরুল ইসলাম । কত ব্যস্ত মানুষ গুরুদেব । অথচ কত ছোট ছোট ব্যাপারের খবর রাখেন !
আরে না , সেরকম কিছু না । আমায় মুজফফর আহমেদ বলেছিল । গতবছর । জেলে যাবার আগে আমার সঙ্গে দেখা করেছিল । তোমরা ত একসময় মেসে একই ঘরে থাকতে ?
হ্যাঁ । দশ বছর আগে কলেজস্ট্রীটে । বত্রিশ নম্বর ।
নজরুল আবারও একটু চুপ করে থেকে জিগ্যেস করলেন - তা কি বলছিল আহমেদ সাহেব ?
বলছিল তোমার ছেলে নাকি শ্রুতিধর ।
হ্যাঁ গুরুদেব । যখন ওর দেড় দু বছর বয়স তখন ওকে একটা ছবির বই দেখিয়ে আমি পাখিদের ইংলিশ নাম বলেছিলাম । ব্যাটা সঙ্গে সঙ্গে মুখস্থ করে ফেলল ! করুণ হেসে বললেন নজরুল । অথচ তখন তো অক্ষরজ্ঞান হওয়া সম্ভব ছিল না !
বলো কী !
আমি ত কিছুদিন জমিরউদ্দিন খানের সঙ্গে সংগীতচর্চা করলাম । কি বলব গুরুদেব । যা গান শিখি , হরকত কব্জা করি ও ব্যাটাও সব গলায় বসিয়ে নেয় ! অবিকল । সেই ছেলে .... কেঁদে ফেললেন কাজী ।
রবীন্দ্রনাথ কিছু বললেন না । সন্তান হারানোর চেয়ে বড় শোক আর কি আছে । কেঁদে একটু হাল্কা হোক ।
বাডির কি খবর । আবার রবীন্দ্রনাথই নীরবতা ভাঙলেন । এমনিতে নীরবতা তার বড় প্রিয় । কিন্তু আজ যেন বড্ড অস্বস্তিকর লাগছে ।
সেইজন্যেই ত আপনার কাছে চলে এলাম । কাঁদতে । আমার বাডির দুজনই খুব চাপা । মনে মনে কষ্ট পাচ্ছে । কিন্তু বাইরে প্রকাশ করছে না । আমি আর সেইখানে কি করে ..... । নজরুলের কথা অসমাপ্তই থেকে গেল । তারপর আবার বললেন - আমাকে আপনি শান্তিনিকেতনে নিয়ে চলুন । কলকাতা আমার আর ভাল লাগছে না ।
রবীন্দ্রনাথ মৃদু হাসলেন । তোমার মনে আছে নজরুল , আজ থেকে দশ বারো বছর আগে তুমি যখন সেনাবাহিনী ছেডে কলকাতা এলে তখন আমি তোমাকে শান্তিনিকেতন যাবার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম । বলেছিলাম তুমি আমাদের শরীরচর্চা শেখাবে আর প্রাণের খুসিতে গান গাইবে । তুমি রাজি হও নি ।
মনে আছে গুরুদেব ।
পরে কিন্তু আর বলি নি , তাই ত ?
না ।
কেন বলতো ?
আমার ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন নিশ্চই । এ তো বোঝাই যায় । ধীর কন্ঠে জানালেন নজরুল ।
আরে , না রে পাগল । সেই জন্য নয় । রবীন্দ্রনাথ হেসে উঠলেন ।
সেই জন্যে না ? আমি ত ভাবতাম .....
না হে , না । তোমার গুরুদেবের মন অত সংকীর্ণ নয় । তাহলে ত তোমার আমার রিলেশানই কবে খারাপ হয়ে যেত । তাহলে কি আর তোমার লেখা 'বিদ্রোহী' কবিতা পড়ে তোমাকে সকলের সামনে ওরকম জাপ্টে ধরতে পারতাম ? আমি আর কখনো কি কোথাও ওরকম আবেগ প্রকাশ করেছি ?
তা ঠিক । আপনি আমার বড্ড প্রশংসা করেন । সবজায়গায় ।
করবো না ? তুমি ত সরস্বতীর বরপুত্র । কি অপূর্ব তোমার লেখার হাত । তোমাকে ও কথা বললাম । তুমি রাজি হলে না । তারপরে আমি তোমার লেখা পড়েই বুঝেছিলাম তুমি অস্বাভাবিক প্রতিভাবান । শান্তিনিকেতনে গেলে তোমার ট্যালেন্ট একটা ছোট জায়গাতেই আবদ্ধ হয়ে থাকত । কলকাতায় না রইলে তোমাকে এত লোক চিনত না !
আপনি আমায় খুব ভালবাসেন গুরুদেব ।
বাসিই ত । তুমিও ত প্রথমদিকে খালি আমার গানই গাইতে । তুমি আর তোমার এক বন্ধু তো জুটি বেঁধে সারা বাংলায় আমার গানই গেয়ে বেড়াতে ।
গাইব না ! এবার নজরুল কথা বলে উঠলেন রবীন্দ্রনাথের সুরে । কি অপূর্ব গান । পরে ত আমিও গান লিখতে শুরু করলাম । কিন্তু আপনার মত লিখতে পারলাম কই ?
ও কথা বোলো না । আমাদের দুজনের স্টাইল তো আলাদা । কি চমৎকার শ্যামাসংগীত লেখো তুমি । আমি ত সেরকম কিছু লিখলামই না !
তাহলেও । আমার গান ত শুনেই বোঝা যায় কোন রাগরাগিনীর আশ্রয় করে সেগুলো গড়ে উঠেছে । আর আপনার ....। কি অদ্ভুতভাবে যে রাগগুলোকে মিলিয়ে নেন ।
তুমি ত প্রচুর গান লেখ । তোমার গানের সংখ্যা ত এখনই আমাকে ছাডিয়ে গেছে শুনতে পাই ।
আসলে গ্রামাফোন কোম্পানিতে চাকরি নেবার পর গানের অর্ডার এত বেডে গেছে । নজরুল সলজ্জ ভঙ্গিমায় বললেন । আর গান লেখা ছাড়া ত আমাদের কোন কাজই নেই । ওদিকে আপনি ? গান লিখছেন , বিদ্যালয় চালাচ্ছেন , জমিদারি দেখছেন , দেশবিদেশে বক্তৃতা দিচ্ছেন । উফফ্ । কি করে যে পারেন !
ও হয়ে যায় । প্রকৃতিগত ভাবেই আমি খুব স্বাস্হ্যবান । সামান্য অর্শ ছাড়া আমার আর কোন সমস্যাই নেই ।
এরকমই থাকুন গুরুদেব । নজরুল কাতরভাবে প্রার্থনা করলেন ।
কথায় বাঁধা পড়ল । কবিগুরুর বউমা প্রতিমাদেবী এসে জিগ্যেস করলেন , বাবা, আপনি কিছু খাবেন ?
তুমি কিছু খাবে নাকি , নজরুল ?
কে আমি ? না , গুরুদেব । নজরুল অসম্মতি জানালেন ।
আমিও এখন কিছু খাব না , বউমা ।
আপনি এখন খুবই কম খান । মৃদু অনুযোগ জানিয়ে প্রতিমা চলে গেলেন ।
খুব কম খান কেন , গুরুদেব ?
না গো বয়স হয়েছে । আমার বাবা বলতেন বেশী যদি খেয়ে চাও, তো কম কম খাও ।
তা সত্যি ।
আরেকজনও ছিল বুঝলে ? সেও আমার গান গাইত । আর খেতে বড় ভালবাসত ।
কে গুরুদেব ?
কে আবার । বিবেকানন্দ । আমি বলতাম নরেনবাবু । আমরা ত প্রায় সমবয়সী । আমি এক দেড় বছরের বড় ।
নজরুল একটু অবাক হলেন । তার কেন জানি ধারণা ছিল রবীন্দ্রনাথ আর বিবেকানন্দের পারস্পরিক সম্পর্ক সেরকম ভাল ছিল না ।
কি ভাবছ ? রবীন্দ্রনাথ যেন মনের কথা পড়তে পারলেন । তুমি জানতে আমাদের আদায় কাঁচকলায় , তাই ত ?
নজরুল আর কি বলবেন । অস্বস্তির হাসি হাসলেন ।
লোকে এসব বলে বেড়ায় । কেউ কিছু জানে না , জানার চেষ্টা করে না ।
বিবেকানন্দ আপনার গান গাইতেন ?
তবে শোন । তখন আমার বয়স বিশ । রাজনারায়ন বসুর মেয়ের বিয়ে । আমাকে জ্যোতিদাদার মাধ্যমে খবর পাঠালেন গান গাইতে হবে । বাল্মিকী প্রতিভা বেরিয়ে গেছে । একটু আধটু নামও হয়েছে । তবে অত লোকের মধ্যে একা গাইব ! একটু টেনশন হচ্ছিল । এইসময় হঠাৎ নরেনবাবুর সঙ্গে দেখা । আমাদের বাডিতে প্রায়ই আসত । আমার ভাইপোর বন্ধু ছিল । ব্যাস্ । ওঁকে চেপে ধরলাম ।
তারপর ?
বেশ কিছুদিন রিহার্সাল করলাম । তিন খানা গান । আমার লেখা । নরেনবাবু গাইল , পাখোয়াজ বাজাল । আমি অরগান বাজালাম ।
সে কি । আপনি গাইলেন না ?
ঐ । গলা মেলালাম। নরেনবাবুর গলার সঙ্গে আমি পারি নাকি ? কি জোরাল ওজস্বী গলা ছিল ।
নজরুল চুপ করে রইলেন ।
তারপর ত সারা কলকাতায় আমার গান গাইতে লাগল । রেগুলার তাডা । গান লিখুন , আরো গান লিখুন । আমার গান তো রামকৃষ্ণদেবকেও শুনিয়েছিল । তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা ।
আচ্ছা , আপনি রামকৃষ্ণকে গান শোনান নি ?
শোনাই নি , মানে ! বছরখানেক পরেই ত শোনালাম । কাশীমিত্রের বাগানবাডিতে । কি খুসি যে হলেন । বড় মধুর স্বভাবের ছিলেন । রবীন্দ্রনাথ একটু যেন অন্যমনস্ক ।
তারপর কি হল ?
তারপর ত রামকৃষ্ণদেব মারা গেলেন । নরেনবাবুও ভ্যানিশ । প্রায় দশ বছর পর হঠাৎ উদয় -বিবেকানন্দ হয়ে । বিশ্বজোডা নাম । কলকাতায় সম্বর্ধনা দেওয়া হল । আমিও মন্চে ছিলাম । চিনতে পারলো । বেশ কথাও হল ।
আপনি ছিলেন ? নজরুল বিস্মিত । কোথায় যেন শুনেছিলেন বিবেকানন্দের নামডাক হবার পর রবীন্দ্রনাথ অস্বাভাবিক চুপচাপ ছিলেন । সেরকম কোথাও কিছু লেখেন নি ওনার সম্পর্কে ।
ছিলাম ত । কী নায়কোচিত জীবন । যেন নভেল । আমার একটা উপন্যাসে তো ওর ভালো রকম প্রভাব আছে ।
কোনটা গুরুদেব ?
কেন , গোরা ।
ও তাই বুঝি । সত্যি , আগে খেয়াল করি নি। অনেক মিল আছে ।
আর বিবেকানন্দের আরেক অনুষ্ঠানের ত আমিই ছিলাম প্রধান উদ্যোক্তা । তবে তাতে উনি ছিলেন না ।
কবে , গুরুদেব ?
কবে আর । ওনার স্মরণসভায় । যেবার আমার স্ত্রী মৃণালিনী চলে গেল , সেবছরই ত নরেনবাবুও.... । কী লোক । যেমন সাহস , তেমন অপূর্ব চিন্তাধারা , আর তেমনি বক্তৃতা দেবার ক্ষমতা । আমার বাবাও তো ওঁকে খুব ভালবাসতেন । নরেনবাবু ত খুব খেতে পারত । বাবা ওকে সামনে বসিয়ে খাওয়াতেন । আর ওর কথা শুনতেন । বলতেন ছেলেটির কথায় যেন জাদু আছে । তোমরা ত ওনার কথা বা বক্তৃতা শোনোনি , না ?
কি করে শুনবো , গুরুদেব । ঊনিশশ দুই সালেই আমার বয়স ত মাত্র তিন ।
মাত্র ? ও বাবা । তুমি ত তারমানে আমার ছোটছেলে শমী-র চেয়েও ছোট ।
নজরুল আবারও সলজ্জ হাসলেন ।
শমীও খুব প্রতিভাবান ছিল জান তো । আমাকে সবাই বলত ও নাকি আমার কার্বন কপি । তা সেও ত চলে গেল । মাত্র এগার বছর বয়স ছিল ।
কি হয়েছিল , গুরুদেব । নজরুল জিজ্ঞাসা করলেন ।
কলেরা । মুঙ্গের গেছিল । বন্ধুর বাডি । সেখানেই ।
নজরুল চুপ করে রইলেন ।
যেদিন শমী চলে গেল ...... রবীন্দ্রনাথ বলে চললেন । রাতের বেলা দেখি সারা পৃথিবী যেন চাঁদের আলোয় ধুয়ে যাচ্ছে । দেখি প্রকৃতি যেমনিভাবে চলে ঠিক তেমনভাবেই চলছে । কোথাও কোনো ব্যতিক্রম নেই । আমার এই শোকেরদিনে যেন কারোর কিছু আসে যায় না । একটা ভারি অদ্ভুত অনুভুতি হল , জানলে !
নজরুল বড় বড় চোখ মেলে রবীন্দ্রনাথের দিকে চাইলেন ।
মনে হল - ব্রম্ভান্ডের সৃষ্টিকর্তার এটাই ইচ্ছা । মৃত্যু আসবেই , হয়ত অকালেই আসবে । শোকতাপ থাকবে । যেমন আনন্দও আছে । কিন্তু কাজ থামালে চলবে না । আমাদের আরব্দ্ধ কাজ আমাদের করে যেতেই হবে । আর এইটেই হল মহাবিশ্বের পরম সত্য ।
( কথোপকথন কাল্পনিক । কিন্তু ঘটনা সবই সত্য ।
তথ্যসূত্র : কাজী নজরুল - মুজফফরআহমেদ / কবি ও সন্ন্যাসী - অমিতাভ চৌধুরী / রবিজীবনী - প্রশান্তকুমার পাল )
No comments:
Post a Comment